ভালোবাসা

ভালোবাসা

বারান্দার লাইটের আলো জানালা দিয়ে বিছানার উপর এসে পড়েছে। বিছানার দুপাশে দুটো মানুষ শুয়ে আছে। ইতি আর আইয়ুব। দুজনের চোখেই ঘুম নেই। ঘন্টা খানেক আগে খুব অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা ঘটেছে। ইতি অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু চোখের পানি কিছুতেই আটকাতে পারছেনা। তার খুব কষ্ট হচ্ছে। আইয়ুব ঘুমাতে পারছেনা অপরাধ বোধের কারনে। এখন তার মনে হচ্ছে কাজটা সে ঠিক করেনি। ইতির গায়ে হাত তোলা উচিত হয়নি। কিন্তু সেসময় রাগটা কিছুতেই সামলাতে পারেনি। আইয়ুব বিছানা থেকে নামছে বুঝতে পেরে ইতি দ্রুত শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছে নিলো। আইয়ুব ঘরের লাইট অন করে ইতির মুখের দিকে তাকালো। ইতি ঘুমাচ্ছে। ইতির ফর্সা গালে আঙুলের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আইয়ুব কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে আবার লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো। ইতি জেগেই ছিলো। সে বুঝতে পারছে তার মতো আইয়ুব ও ঘুমাতে পারছেনা।

ইতির বাবা ইকবাল হোসেন তিন মেয়েসহ পাঁচজনের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। বৃদ্ধ বাবার দিকে তাকালেই ইতির কান্না আসতো। মেয়েদের বিয়ে দিতে পারলে যেন তিনি কিছুটা ভারমুক্ত হতেন। কিন্তু পাত্রপক্ষ এসে প্রথম দেখায় পছন্দ করলেও যখন মোটা অংকের যৌতুক দাবি করতো। বৃদ্ধ ইকবাল হোসেন রাত জেগে বারান্দায় পায়চারি করতেন। তখন ইতি একজন অসহায় ব্যক্তির নিরব কান্না দেখতে পেতো। সেই সময়টায় ইতির জীবনে আসে আইয়ুব। বিনা যৌতুকে মেয়ের বিয়ে দিতে পেরে বাবার মুখে তৃপ্তির হাসি দেখে ইতি সেদিন বাবার বুকে মাথা রেখে অনেকক্ষন কেঁদেছিলো। বাবা বুঝতে পারেননি মেয়ের কান্নার কারন। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন “আইয়ুব খুব ভালো ছেলে মা। তোকে সুখে রাখবে।” ইতির বাবা মিথ্যে বলেননি। সত্যি আইয়ুব একজন ভালো মানুষ। তার সব চাওয়া পূরণের চেষ্টা করে। ইতির বাবা যখন অসুস্থ্য হলেন। আইয়ুব ইতির হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বললো “বাবাকে দেখতে গিয়ে দিয়ো। তাকে বলোনা আমি দিয়েছি। বলবে তোমার টাকা।”

প্রথম ছয় মাস সংসার বেশ সুখেই কাটছিলো তাদের। কিন্তু হঠাৎ করে আইয়ুবের মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করে ইতি। পরিবর্তনটা ইতিকে খুব বেশি কষ্ট দেয়। মানুষটার প্রতি রাগ হয়না, হয় অভিমান। রাগ নেই কারন যে মানুষটা মায়ের মমতা ভালোবাসা ছাড়া বড় হয়েছে তার কাছে ভালোবাসার আদিখ্যেতা আশা করা যায় না। যে মানুষটা চিরকাল অন্যের তিক্ত কথা শুনে বড় হয়েছে তার কাছে মিষ্টি কথা আশা করাটা অন্যায়। তবে তার উপর অভিমান করা যায়। অভিমান করা যায় কারন মানুষটা ইতির ভালোবাসা বুঝেনা। ইতিকে অকারনে সন্দেহ করে। মানুষটাকে নিয়ে ইতি দ্বিধায় পড়ে যায়। একটা মানুষের মনে ভালোবাসা আর সন্দেহ একসাথে বাস করে কিভাবে। যেমন মানুষটা এখন ভালোবাসার তাড়নায় ঘুমাতে পারছেনা আবার ঘন্টা খানেক আগে সন্দেহের কারনে তার গায়ে হাত তুলেছে।

আজকের ঘটনাটা অতি তুচ্ছ। আইয়ুব দোকান থেকে বাসা ফিরে দেখে ইতি বাসায় নেই। সারাদিন বাসায় একা একা থেকে ইতির দম বন্ধ হয়ে আসে। বিয়ের পরে লেখাপড়াটাও বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে সে পাশের বাসায় যায় গল্প করার জন্য। আজ গল্পে গল্পে দেরি হয়ে গিয়েছিলো খেয়াল করেনি ইতি। বাসা ফিরতেই আইয়ুব কোন কথা না বলে ইতির গালে চড় বসিয়ে দিয়ে বলে “কার সাথে দেখা করতে গেছিলি? আমার পেছনে কাকে যোগাড় করেছিস?”
ইতি হতবাক হয়ে আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে ছিলো। ইতি মানুষটাকে বুঝতে চেষ্টা করে কিন্তু বুঝে উঠতে পারেনা। বড় অদ্ভুত আচরন করে আইয়ুব। সকালে নাস্তা না করেই আইয়ুব দোকানে চলে গেলো। আইয়ুবের মনে শান্তি নেই। তার মনে হয় ইতির কোন সম্পর্ক রয়েছে। তার চোখের আড়ালে ইতি কারো সাথে সম্পর্ক করে। তার ধারণা হুট করে একদিন তাকে রেখে চলে যাবে কারো হাত ধরে।

দিন দিন আইয়ুবের সন্দেহের মাত্রা বাড়তে থাকে। সে দোকান থেকে হুটহাট বাসায় চলে আসে। ইতি চোখের আড়াল হলে বিছানার চাদর চেক করে। বিছানার চাদর এলোমেলো থাকলে ইতির দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। রাতে ইতি ঘুমিয়ে পড়লে ইতির পড়নের কাপড় পর্যন্ত চেক করে আইয়ুব। ইতির ব্যাগ খুঁটিয়ে দেখে। আবার ইতির জ্বর হলে রাত জেগে পাশে বসে থাকে। ইতি এসব আর সহ্য করতে পারছিলোনা। ইতির এক মামাতো ভাই হুট করে এসেছিলো ইতির বাসায়। ঠিক তখনি আইয়ুব দোকান থেকে বাসায় চলে আসে। ইতির মামাতো ভাই যতোক্ষন ছিলো আইয়ুর চুপচাপ বসে ছিলো। ইতির ভাই চলে যেতেই আইয়ুব ইতিকে বললোঃ

-ব্যাগ গুছিয়ে বিদেয় হও। দুশ্চরিত্রা মেয়ে নিয়ে সংসার করতে পারবোনা। কারো সাথে পালিয়ে যাবে তারচেয়ে ভালো এখনি চলে যাও। ইতি অবাক হয়ে বললোঃ

–এসব কি বলছেন? কোথায় যাবো আমি। আমি কোথাও যাবোনা।
-কেন যাবিনা। এক্ষুনি বের হ বাসা থেকে। কথাটা বলে আইয়ুব ইতির হাত ধরে টানতে টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে আসলো। ঘরে তালা দিয়ে বললোঃ
-যেখানে খুশি চলে যা। আমি বাসা ফিরে যেন তোকে আর না দেখি।

ইতিকে দেখে ইকবাল হোসেন জিজ্ঞাসা করলেন “কিরে মা একা এলি। জামাই কোথায়?” ইতি কোন কথার জবাব না দিয়ে রুমে চলে গেলো। ইকবাল হোসেন কিছুই বুঝতে পারলেন না। তার মনে ভয় বাসা বাঁধলো, মেয়ে ঝগড়া করে আসেনি তো আবার। তার ভয় কাটলো যখন রাতে তিন বোনকে একসাথে হাসতে শুনলেন। বুকের উপর থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেলো ইকবাল হোসেনের। কিন্তু তিনি মাঝ রাতে ইতির ভেজা চোখ দেখেননি। দেখলে হয়তো রাতে আর ঘুমাতে পারতেন না। অভাব অনটনে বেড়ে ওঠা মেয়েটার স্বপ্নগুলো খুব সাদামাটা ছিলো। ভালোবাসা আর খুনসুটিতে পরিপূর্ণ ছোট্ট একটা সংসারের মাঝেই সীমাবদ্ধ তার স্বপ্নগুলো। বিয়ের পরে ভেবেছিলো বিধাতা বুঝি তার সব মনবাসনা পূরণ করে দিয়েছেন। কিন্তু অভাগীর চোখ যে আরো কাঁদতে চায়।

আজ দশদিন হলো ইতি বাসায় নেই। বাসাটা কেমন খালি খালি লাগছে আইয়ুবের কাছে। ইতির কথা খুব বেশি মনে পড়ে তার। গম্ভীর স্বভাবের রাগি মানুষটার চোখ যে রাতের অন্ধকারে বারবার ভিজে ওঠে সেটা কেউ কখনো জানতে পারেনা। আজকের দিনটা অন্যদিনগুলোর চেয়ে আলাদা। আজ আইয়ুবের বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। আইয়ুব অনেকক্ষন যাবদ গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আইয়ুব সাহস সঞ্চার করে কলিংবেল চাপলো। কিশোরি চেহারার একটা মেয়ে দরজা খুলে কিছুক্ষন আইয়ুবের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো

–ভাইয়া তুমি।
-মোমেনা আছেন?
–ভাইয়া তুমি মায়ের নাম ধরে ডাকছো কেন?
-তিনি আছেন কি না?
–আছে। ভেতরে আসো।

আইয়ুবের সামনে যেই মহিলাটা বসে আছে পৃথিবীতে আইয়ুব তাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে। সম্পর্কে এই মহিলা তার মা হয়। যে পনেরো বছর আগে তাকে এবং তার বাবাকে রেখে তার ছোট বোনকে নিয়ে এক পরপুরুষের সাথে পালিয়ে গেছে। এই মহিলার সাথে কখনো দেখা করার ইচ্ছা ছিলোনা আইয়ুবের। তবে যেই মহিলার কারনে আজ সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনা। সেই মহিলাকে সে কিছু কথা বলতে চায়। কঠিন কিছু কথা। আইয়ুব তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললোঃ

-চিনতে পারছেন আমাকে?

–হুম…

-ভেবেছিলাম জীবনে কখনো আপনার মুখ দেখবোনা। কিন্তু যেই মহিলা আমার বাবার এবং আমার জীবন নষ্ট করেছে তাকে কেন জানি আজ দেখতে ইচ্ছা করলো।

–মনে হচ্ছে তুমি রেগে আছো।

-নাহ্ রেগে নেই। আচ্ছা আজকে কোন দিন বলতে পারেন? বলতে পারার কথা না। যাকে ফেলে এসেছেন তার মৃত্যুর দিনটা জানার কথা না। আমি এখানে কেন এসেছি বুঝতে পারছিনা। তবে কাউকে কষ্ট দিয়ে আপনি এতো সুখে আছেন সেটা কেন যেন সহ্য হচ্ছেনা। কেন এমন করেছিলেন আপনি? বাবা আপনাকে কতো ভালোবাসতো আপনি জানেন। জানতে চেষ্টা করেননি হয়তো। মানুষটা মরার আগে বারবার আপনার নাম নিচ্ছিলো। কিন্তু আপনি আরেক পুরুষের সাথে সুখের সংসার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একবারও কি ভুলে সেই মানুষটার কথা মনে পড়েনি আপনার। একটা মানুষ এতো জঘন্য হয় কিভাবে।

–তুমি কি আমাকে অপমান করতে এসেছো? যদি সেজন্য এসে থাকো তবে আমি চুপ করে সব কথা শুনবো। কিন্তু তার আগে তুমি আমাকে এটা বলো। আমার প্রতি তোমার যতো রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা তার শাস্তি তুমি ইতিকে দিচ্ছোনা তো? তার তো কোন দোষ নেই। সেও তো তোমাকে ভালোবাসে। মায়ের কথা শুনে আইয়ুব একটু দ্বিধায় পড়ে গেলো। মোমেনা বেগম বললেনঃ

–একজনের পাপের শাস্তি অন্য কাউকে দেয়া নিশ্চই ঠিক না। তুমি আমাকে ঘৃণা করতে পারো। তোমার কাছ থেকে আমার সেটাই প্রাপ্য কেননা ছোটবেলায় তোমাদের ফেলে আমি চলে এসেছি। খুব কষ্টে তোমাদের সময় কেটেছে। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বড় হয়েছো তুমি। আমি তোমার অপরাধী। তবে তুমি অনেক বড় অন্যায় করছো। ইতি খুব ভালো মেয়ে। সে এমন আচরন ডিজার্ভ করেনা। ইতির কথা শুনে আইয়ুব কুন্ঠিত বোধ করতে শুরু করলো। সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মোমেনা বেগম বললেনঃ

–তুমি কি চলে যাচ্ছো? আইয়ুব কথার জবাব না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। আইয়ুবের ছোট বোন আনিকা তার পেছন পেছন বাইরের গেইট পর্যন্ত আসলো। আনিকা বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললোঃ

–ভাইয়া মা কিন্তু আজকের দিনটা ভুলে যায়নি। প্রতিবছর বাবার মৃত্যু বার্ষিকীতে মা রোজা রাখেন। নামাজ পড়ে বাবার জন্য দোয়া করেন। মায়ের ডায়েরিতে বাবার একটা ছবি এখনো আছে।

-এতো ভালোবাসলে পালিয়েছিলো কেন?

–সেটা আমি জানিনা ভাইয়া। মানুষ ভুল করে। তবে মায়ের শাস্তি তুমি ভাবিকে দিয়োনা।

-তোরা ইতিকে কিভাবে চিনিস। তোদের তো বিয়ের খবর কিছুই জানাইনি। সেটা পরের কথা। পালিয়ে আসার পর আজ প্রথম তোদের সাথে দেখা হচ্ছে।

–মা তোমাদের খোঁজ ঠিক রাখতো। ভাবির সাথে আমরা দেখাও করেছি। ভাবি খুব ভালো মেয়ে ভাইয়া।

মোমেনা বেগম বাসার ভেতর থেকে আনিকাকে ডাকতেই আনিকা বাসার ভেতরে ঢুকলো। আইয়ুব রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। ছাদের উপর দাঁড়িয়ে মোমেনা বেগম ছেলের চলে যাওয়া দেখছেন। চশমার আড়ালে তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মোমেনা বেগম দ্রুত চোখ মুছে রাস্তার দিকে তাকালেন।

ইতি ঘুমিয়ে পড়েছিলো। মায়ের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙ্গলো তার। ঘুমঘুম চোখে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে। মা বললেন “ওঠ জামাই এসেছে।” ইতি ঘর থেকে বের হয়ে দেখলো আইয়ুব আর তার বাবা বারান্দায় বসে কথা বলছে। ইতি আইয়ুবের চোখে অনুশোচনা দেখেছিলো। সেই দিনটার চার বছর পেরিয়ে গেছে। আইয়ুব ইতিকে দেয়া সেই রাতের কথা রেখেছে। নিজেকে পরিবর্তন করেছে। সেই মানুষটি হয়ে দেখিয়েছে যেই আইয়ুবকে চেয়েছিলো ইতি। তাদের সংসারে নতুন এক মেহমান ও এসেছে। যে তার দুষ্টুমি দিয়ে সারাদিন বাসাটাকে মাথায় তুলে রাখে।।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত