ফিরে যাওয়া

ফিরে যাওয়া

সকালে খাবার টেবিলে ২০ মিনিট ধরে বসে আছি কিন্তু এখনো নাস্তা আসার নাম নেই। একটু পর খেয়াল করে দেখি শ্রাবণী রুটি আর ডিম ভাজি নিয়ে এসে আমার সামনে রাখলো। আমি শ্রাবণীকে বললাম,

— দেখো তো কয়টা বাজে? আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে শ্রাবণী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো,

– ৮ঃ ৪০ বাজে। আমি তখন বললাম,
— আমার অফিস কয়টায়? শ্রাবণী তখন মাথাটা নিচু করে বললো,
– ৯টায়। আমি তখন শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে বললাম,

— আমার প্রতিদিন উত্তরা থেকে মতিঝিল গিয়ে অফিস করতে হয়। এখন ৮ঃ৪০ বাজে আর আমার অফিস ৯টার সময়। আমি নাস্তা করবো কখন আর অফিসেই বা যাবো কখন? শ্রাবনী তখন বললো,

– আজ ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিলো। কাল থেকে এমন আর হবে না। আমি প্লেট থেকে রুটি গুলো নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখলাম তারপর রুটিগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললাম,

— ৯০ ঘন্টা পর নাস্তা নিয়ে এসেছো তাও আবার রুটি গুলো পোড়া। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হলো তোমার মত মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করা। যে মেয়ে কি না স্বামীকে রান্না করে একবেলা ভালোভাবে খাওয়াতে পারে না…

আমার চিৎকার চেঁচামেচি শুনে পাশের রুমে শুয়ে থাকা আমার ১০ মাসের মেয়েটা কেঁদে দিলো। আমার মেয়ের কান্না শুনে শ্রাবণী তাড়াহুড়ো করে মেয়ের কাছে চলে গেলো আর আমি পাশে থাকা গ্লাসটা ভেঙে বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম…

রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আর ভাবছি আজকেও দেরী হওয়ার কারণে বসের কাছে হয়তো কথা শুনতে হবে। মা ঠিকই বলেছিলো, মা বাবার একমাত্র মেয়ে কখনো সংসারী হতে পারে না কারন ছোটবেলা থেকেই ওদের মা ওদের সংসারের কোনো কাজ করতে দেয় না।যার ফলে ওরা সংসারের কোন কাজকর্ম করতে পারে না ৫ মিনিট ধরে কলিংবেল বাজাচ্ছি অথচ এখনো দরজা খোলার নাম নেই। বাধ্য হয়ে দরজায় যখন জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলাম তখন শ্রাবণী এসে দরজা খুললো। ঘুম ঘুম চোখ দিয়ে শ্রাবণী বললো,

– সরি সরি, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!

আমি তখন রেগে গিয়ে শ্রাবণীকে বললাম,

– ঘুমের কারনে তোমার সকালে নাস্তা দিতে দেরী হয়ে যায়। এই ঘুমের কারমে তোমার দরজা খুলতেও দেরি হয়। সারাক্ষন যদি ঘুমেই থাকো তাহলে সংসার কে সামলাবে বলো? শ্রাবণী মাথা নিচু করে বললো,

– আসলে নাযাহার( আমার ছোট মেয়ে)জন্য রাতে ঘুমাতে একটু সমস্যা হয়। শ্রাবণীর কথা শুনে মেজাজটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। আমি চিৎকার করে তখন বললাম,

— একটা ১০ মাসের বাচ্চাকে সামলাতে পারো না তাহলে বাচ্চা নিলে কেন? আমি তো আগেই বলেছিলাম এখন বাচ্চা নেবার দরকার নেই। কিন্তু তুমিই তো বাচ্চা নিবে, বাচ্চা নিবে বলে আমার মাথা খারাপ করে দিয়েছিলে। এখন বাচ্চা সামলাতে পারো না কেন?

শ্রাবণী আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে অন্য রুমে চলে গেলো। আর আমি কাঁধ থেকে অফিস ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ভাবতে লাগলাম, শ্রাবণীকে বিয়ে করে আমার জীবনটাই শেষ সকাল সকাল শ্রাবণী আমায় ডেকে বললো রিনা আন্টি মারা গিয়েছে; আমাদের যেতে হবে। আমি তখন শ্রাবণীকে বললাম,

— কোন রিনা আন্টি? শ্রাবণী তখন বললো,
– আমায় প্রপোজ করার কারনে যে আন্টি তোমায় জুতা দিয়ে মেরেছিলো।

আমার আম্মুর বান্ধবী শ্রাবণীর কথা শুনে আমি চুপ হয়ে রইলাম। আসলে ঐ মহিলা আমার দুই চোখের বিষ ছিলো। বিয়ের আগে আমি যতবারই শ্রাবণীকে নিয়ে ঘুরতে যেতাম ঐ মহিলা ততবারই আমাকে দেখতো আর ততবারই এই মহিলা জুতা খুলে আমায় মারতে আসতো আমার নীরবতা দেখে শ্রাবনী বললো,

– কি হলো, যাবে না? আমি তখন বললাম,
–তুমি যাও। আসলে মানুষ মারা গেলে সেখানে যেতে আমার কেমন যেন লাগে। আমার কথা শুনে শ্রাবণী কিছুটা ভেবে বললো,
– তাহলে তুমি নাযাহার খেয়াল রেখো। বাচ্চা মেয়েকে ঐখানে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি ৩-৪ ঘন্টা পরেই এসে পড়বো |

নাযাহা এখন ঘুমাচ্ছে। আমি ওর জন্য দুধ গরম করতে গেলাম। ভাবলাম নাযাহার ঘুম ভাঙ্গলে দুধ খাওয়াবো। দুধটা যখন চুলায় বসালাম তখনি নাযাহার কান্নার আওয়াজ শুনলাম। তাড়াহুড়ো করে নাযাহার কাছে গেলাম। নাযাহাকে কোলে নিয়ে শান্ত করার জন্য যখন ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম তখন হঠাৎ মনে হলো চুলোয় তো দুধ বসানো ছিলো। দৌঁড়ে চুলোর কাছে গিয়ে দেখি হাঁড়িতে দুধ নেই সমস্ত দুধ উপচে পড়ে গিয়েছে। কোনো উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে ফ্রিজ থেকে দুধ নামিয়ে আবার গরম করলাম। এই একটু দুধ খাওয়াতেই আমার ১ ঘন্টার উপরে সময় লেগেছে…

নাযাহাকে কোলে নেওয়ার কারনে আমার কোলে প্রস্রাব করে দিয়েছিলো। ভাবলাম নাযাহা যেহেতু এখন ঘুমিয়ে আছে সেই সুযোগে আমি গোসলটা করে ফেলি। গোসল করে এসে যখন নাযাহাকে আবার কোলে নিলাম তখন আবার পায়খানা করে দিলো। বাধ্য হয়ে নাকে রুমাল বেঁধে নাযাহার গায়ের আর আমার গায়ে লেগে থাকা এসবকিছু পরিষ্কার করলাম। এর মাঝে শ্রাবনী ফোন দিয়ে বললো, নাযাহাকে হালকা গরম পানি নিয়ে গোসল করাতে। এই এতটুকু মেয়েকে গোসল করাতে গিয়ে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। মেয়েকে পানির বালতিতে বসিয়ে রাখলে মেয়ে হাসে কিন্তু বালতি থেকে সরিয়ে ফেললেই চিৎকার করে কান্না করতে থাকে। তাই বাধ্য হয়ে ২০ মিনিট ধরে মেয়েকে বালতিতেই বসিয়ে রেখেছি..

এর মধ্যে শ্রাবণী আবার ফোন দিয়ে বললো মেয়েকে কমলার জুস করে বানিয়ে খাওয়াতে। এত কষ্ট করে জুস বানিয়ে মেয়েকে খাওয়াতে গেলাম। মেয়ে একটুখানি জুস মুখে নিয়েই বমি করে সব ভাসিয়ে দিলো। শ্রাবণীকে যখন ফোন দিয়ে বললাম নাযাহা বমি করেছে তখন শ্রাবণী বললো,

– বমি করে ফেলেছে। হায় আল্লাহ আমার মেয়ের পেটে তো কিছুই নেই। তুমি আবার ওরে দুধ গরম করে খাওয়াও…

বারবার দুধ গরম করে খাওয়ানো। একটু পর পর প্রস্রাব পায়খানার কাপড় পরিষ্কার করতে করতে জীবন শেষ আমার। আমি যতক্ষন সজাগ থাকি ততক্ষণ আমার মেয়ে শান্ত থাকে কিন্তু যখনি আমি একটু চোখটা বন্ধ করি তখনি আমার মেয়ের কান্না শুরু হয়ে যায়…

এই দুইঘন্টা মেয়েকে সামলাতে গিয়ে আমার অবস্থা খারাপ অথচ আমার এই মেয়েকেই জন্মের দিন থেকে আজ পর্যন্ত শ্রাবণী সামলিয়ে রেখেছে। দুই ঘন্টা আগেও আমি মনে করতাম বাচ্চা সামলানো কত সহজ আর এখন মনে হচ্ছে পৃথিবীর কয়েকটা কঠিন কাজের মধ্যে বাচ্চা সামলানোটা অন্যতম। শ্রাবণী দিনের পর দিন এত কাজ করতো অথচ সেগুলো আমার চোখেই পড়তো না। আমার চোখে শুধু পড়তো পুড়ে যাওয়া রুটি আর ঘড়ির সময়ের কাঁটা।
ছিঃ! নিজেকে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ মনে হচ্ছে….

আমরা বাবারা মনে করি বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পর বাচ্চার খরচ দিলেই বাচ্চা নিজ থেকেই বড় হয়ে যায়। কিন্তু একটা বাচ্চা বড় হওয়ার পিছনে যে একজন মায়ের কতটা কষ্ট কতটা ত্যাগ আর কতটা ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে সেটা কিছু বাবারা হয়তো কখনোই বুঝেই না| নাযাহাকে কোলে নিয়ে রিনা আন্টির বাসায় গেলাম। ঘর ভর্তি মানুষ কিন্তু শ্রাবণীকে কোথাও পাচ্ছি না। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন আমার কাঁধে হাত রাখলো। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি শ্রাবণী আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে বললাম,

— রিনা আন্টির জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে গো আমার কান্না দেখে শ্রাবণী তখন বললো,
– কষ্টটা কি আদৌ রিনা আন্টির জন্য হচ্ছে না কি অন্য কিছুর জন্য? শ্রাবণীর কথা শুনে আমি মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে ভাবতে লাগলাম, এখন যদি তোমায় বলি তোমার ১০ মাসের বাচ্চাকে সামলাতে গিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে তাহলে পৃথিবীর সমস্ত বাবার মাথা নিচু হয়ে যাবে।আমি চোখের জল মুচতে মুচতে বললাম,

— সত্যিই রিনা আন্টির জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে শ্রাবণী নাযাহাকে যখন আমার কোল থেকে ওর কোলে নেয় আমি তখন তখন ওর হাতটা ধরে বললাম,

— আজকের পর থেকে আমি আধপোড়া রুটিটা তৃপ্তি সহকারে খেতে পারবো। দরজার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা হাসিমুখে দাঁড়িয়েও থাকতে পারবো, তোমায় সাথে নিয়ে সেই সময়ে ফিরে যেতে পারবো যে সময়টাতে শুধু আমাদের মাঝে ৩টা জিনিস ছিলো,

১) ভালোবাসা
২) ভালোবাসা
৩)ভালোবাসা

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত