আজও পারিনি

আজও পারিনি

তিনবছর পর হেমায়েত সাহেবকে দেখে প্রিয়তা ভেজাকণ্ঠে বললো,”আমি নষ্টামি করিনি। সেদিন ঘটনাটা এভাবে না ঘটালেও পারতেন।” কথাটা বলেই জামার হাতায় চোখ মুছে সামনের দিকে পা বাড়ালো প্রিয়তা।যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো হেমায়েত সাহেব। প্রিয়তা পিছনে ফিরে দেখে হেমায়েত সাহেব এখনো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে হেমায়েত সাহেবের।সত্যি ঘটনাটা এমন না ঘটালেও পারতো।মেয়েটাকে নষ্টা বলে সমাজে লাঞ্চিত না করলেও পারতো। মেয়েটা তো শুধু তার ছেলেকে ভালোবেসেছিলো। হেমায়েত সাহেবের ছেলে সাম্য। প্রিয়তা আর সাম্য জড়িয়ে ছিলো প্রেম নামক অসুখে। একদিন প্রিয়তা কলেজ থেকে ফেরে।মুশুল ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল।সিড়ি দিয়ে যখন প্রিয়তা উঠছিলো তখন সাম্য এসে দাঁড়ায়।সাম্যকে দেখে প্রিয়তার মুখে হাসির ঝলকানি দেখা যায়।

সাম্য প্রিয়তার কাছে এসে ওর ভেজা চুল গুলো ঝাঁকালো।প্রিয়তা দু কদম পিছিয়ে গেল।সাম্য ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে প্রিয়তাকে। তারপর প্রিয়তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেলো। প্রিয়তা জড়তা নিয়ে বললো,”সাম্য কেউ চলে আসবে?” সাম্য ওর কথায় কর্ণপাত না করে বললো,”বৃষ্টিতে ভিজবো চলো।” প্রিয়তা বললো,”আজ ভিজবো না।অন্যকোনো দিন।” সাম্য প্রিয়তার ঘাড়ে থুতনি রেখে বললো,”এরকম মুহূর্ত আসবে না।না এরকম বৃষ্টি আসবে।সো,আজ ভিজবো।” প্রিয়তা হেসে বললো, “বর্ষাকাল মশাই।এখন মুশুল ধারার বৃষ্টি হতেই থাকবে।” সাম্য প্রিয়তাকে ছেড়ে দিয়ে বললো, “উহুম।আজ ভিজবো।কাল অফিস আছে।” প্রিয়তা হেসে বললো,”তুমি তো জানো একটু বেশি ভিজলে আমার জ্বর আসে। ” সাম্য বললো,”জ্বরে সেবা করার জন্য তো আমি আছি।” প্রিয়তা বললো, “ইশ!সারাজীবন যদি জ্বর থাকতো।”

সাম্য হেসে বললো,”এহ শখ কত!রাতে আমার ঘুম হয় না।জানো তোমার জ্বর এলে কত লুকিয়ে-চুরিয়ে তোমার বাসায় যেতে হয়।” প্রিয়তা বললো, “হু জানি।ব্যাগ রেখে ছাদে যাচ্ছি। তুমি ছাদে যাও।” প্রিয়তাকে জড়িয়ে ধরলো সাম্য।কপালে একটা চুমু দিয়ে ছেড়ে দিলো।তখনি আগমন ঘটে হেমায়েত সাহেবের।প্রিয়তা হেমায়েত সাহেবকে সালাম দিয়ে বাসার ভেতরে চলে গেল। সাম্য ছাদে চলে গেল।হেমায়েত সাহেব সন্দেহ নিয়ে ওপরে চলে গেলেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ভিজে একাকার হয়ে গেল সাম্য। প্রিয়তার কথা ভাবছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। তুমি মোর জীবনের ভাবনা; হৃদয়ের সুখের দোলা, নিজেকে আমি ভুলতে পারি; তোমাকে যাবে না ভোলা। গান গাইছে সাম্য।

“সে মনে রেখো।আমি বাপু কাউকে মনে রাখতে পারবো না।” দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কথাটা বললো প্রিয়তা।
“এতো ভালোবাসবো যে তুমি ভুলতেও পারবে না আমায়।”
“চাইও না ভুলতে তোমায়।”
“ওকে কাম।”

সাম্য হাত বাড়িয়ে দিলো। প্রিয়তার হাত ধরে ছাদের মাঝখানে এনে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলো। ঘন্টা খানেক ভিজে নিচে নেমে আসতে নিলে সাম্য প্রিয়তাকে বললো,”ভালোবাসি।” প্রিয়তা হেসে নিচে নেমে যেতে নিলে সাম্য হাত ধরে আটকায়।প্রিয়তা সাম্যের দিকে তাকালো।

“রিটার্ন জবাব দিবে না?”
“উহুম।”
“কেনো?”
“চোখের দিকে তাকাও।জবাব পেয়ে যাবে।”
“আটকে যাবো।”
“বারন করেছে কে?”
“ভুল হয়ে যাবে।তুমি পবিত্র,আমার ভালোবাসাটাও পবিত্র, নিচে যাও।”

প্রিয়তা হেসে দু কদম এগিয়ে গিয়ে আবার যেখানে ছিল সেখানে ফিরে এলো।সাম্য ভ্রু কুঁচকে বললো,”কি হলো?”
প্রিয়তা কিছু না বলে সাম্যের গালে চুমু দিয়ে চলে গেল।একবারের জন্য পিছন চেয়ে দেখেনি। সাম্য হালকা হাসলো। “তোমার এইচএসসি শেষ হলেই নিয়ে আসবো। শুধু পরিক্ষার অপেক্ষা।” রাত একটায় শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এলো প্রিয়তার। যতটুকু পারলো নিজেরটা নিজেই জলপট্টি দিলো।প্রিয়তার আম্মুকে বললে বকবে।আর রাত অনেক হয়েছে তাই আর ডাকলো না প্রিয়তা। সকালে কারো হাতের স্পর্শে ঘুম ভাঙ্গে প্রিয়তার।

“তোমায় অনেক মিস করেছি।” হালকা হেসে বললো প্রিয়তা।
“জ্বর এসেছে সেবা করতে চলে এলাম।”
“রাতে তোমাকে খুব প্রয়োজন ছিল।”
“এখন নেই?”
“আছে।কিন্তু তুমি এখন অফিস যাবে।”
“যাবো।আগে স্যুপ খেয়ে নাও।”
“রেখে যাও খেয়ে নিবো।”
“আন্টি স্যুপ দেখলে কি বলবা?দেখি হা করো।”

ব্রাশ না করেই সাম্যের হাতে স্যুপ খেল প্রিয়তা।সাম্য স্যুপ খাওয়া শেষে জ্বরের ওষুধ খাইয়ে দিলো।(সাম্য সাথে ওষুধ নিয়ে এসেছিল)তারপর কপালে চুমু দিয়ে চলে গেল সাম্য।(দরজা না বারান্দা দিয়ে গিয়েছে সাম্য।সাম্যের আনাগোনা বারান্দা দিয়ে।)

বৃষ্টি হচ্ছিল জানালা দিয়ে পাশে বসেছিল প্রিয়তা।বৃষ্টি দেখছিল।হঠাৎ বারান্দায় শব্দ শুনে প্রিয়তা বারান্দায় গেল।গিয়ে দেখে কে যেন বারান্দায় কাঁপছে। “কে আপনি?”–প্রশ্ন করলো প্রিয়তা। কোনো উত্তর দিলো না। ” আপনি এখানে এসেছেন কিভাবে?” কোনো উত্তর নেই। লোকটি মধ্য বয়স্ক।বৃষ্টিতে ভিজে একাকার অবস্থা লোকটার।প্রিয়তা মানবতার খাতিরে একটা তাওয়াল এনে দিলো।লোকটা মাথা মুছতে লাগলো। এরই মধ্যে হেমায়েত সাহেব এবং প্রিয়তার আব্বু-আম্মু রুমে এলো। “ছিঃ ছিঃ বাবার বয়সী একটা লোকের সাথে নষ্টামি?আমি আপনাদের আগেই বলেছিলাম আপনাদের মেয়ের ওপর আমার সন্দেহ হয়।এখন তো হাতে নাতে প্রমান দিলাম।এখনো বিশ্বাস করবেন না!আপনারা আজকের মধ্যে বাসা ছেড়ে চলে যাবেন।”

হেমায়েত সাহেব উচ্চস্বরে কথা গুলো বললো। “আর আপনি এখুনি বাসা থেকে বের হয়ে যান।” লোকটা হুরহুর করে চলে গেল।হেমায়েত সাহেব নাক সিটকে চলে গেল। প্রিয়তার আব্বু প্রিয়তাকে দুইটা থাপ্পড় দিলো। তারপর জিনিসপত্র না নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেলেন। খারাপ কথা বাতাসে আগে রটে।গ্রামেও কিভাবে যেন পৌঁছে গেল,”প্রিয়তা দেহ ব্যবসায় করে।” ব্যাস গ্রামের মহিলাদের কটুকথা আর কুকুরের ন্যায় পুরুষদের আনাগোনা শুরু হলো।তাদের একটাই কথা যেটা শহরে করতে পারো সেটা গ্রামে করলে দোষ কি? উড়ন্ত খবর এলো হেমায়েত সাহেব সাম্যকে ঘরে তালাবন্দী করে রেখেছেন।

গ্রামে শালিসি ডাকা হলো।বিচার মানি তাল গাছ আমার।তেমনি প্রিয়তাকে গ্রাম ছাড়ার কথা বলা হলো।প্রিয়তার আব্বু-আম্মুও যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে। “এবার আমাদের মুক্তি দে।” আম্মু কেঁদে প্রিয়তার কাছে হাত জোরপ করে বললো।প্রিয়তার আব্বু সারাজীবন মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে এগ্রামে ছিলেন আর তার মেয়ে পুরো গ্রামের সামনে তার সম্মান ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। প্রিয়তার আব্বু-আম্মুকে নিয়ে চলে গেল কুমিল্লা। এখানে কোনো আত্মীয়স্বজন নেই।শত হলেও প্রিয়তা তাদের মেয়ে তাকে ফেলতে পারবে না।

তিনবছর পর বাসস্ট্যান্ডে হেমায়েত সাহেবের সাথে দেখা।ব্যাস তাকে কথাগুলো বলে গুলো চলে এলো প্রিয়তা।এইচএসসি-তে পাশ করার পর একটা কোম্পানিতে ছোট জব করে।প্রিয়তার আব্বু মারা গেছে।প্রিয়তার আব্বুকে কুমিল্লাতে মাটি দিয়েছি।ওর আম্মু ওকে সম্পূর্ণ বোঝে।তিন বছর আগে ওটা সাজানো এক নাটক ছিল সেটা আম্মুর কাছে জলের মতো সচ্ছ পরিষ্কার করে হয়ে গেছে।কোনো অভিযোগ নেই তার প্রিয়তার বিরুদ্ধে। প্রিয়তা আর ওর আম্মু ক্ষমা করতে পারেনি হেমায়েত সাহেবকে।উনি ঘটনাটা এভাবে না ঘটালেও পারতেন। চট্টগ্রাম যাবো বাসে উঠেছে।এক ভদ্রমহিলা প্রিয়তার দিকে তাকালো।প্রিয়তা বইয়ে মুখ গুজে পড়ছে।তখনি মহিলা তার ছেলেদের বলছে,”প্রাণ আব্বু এরকম করে না।তোমার বাবাই চলে আসবে।পরশ ভাইকে চিপস দাও।”

নামগুলো শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।প্রিয়তা যে আজও সাম্যকে ভুলতে পারেনি।এই নাম গুলো প্রিয়তা আর সাম্য ভেবে রেখেছিল তাদের ছেলেদের জন্য।কয়েক মাস পরেই এইচএসসি দিতো প্রিয়তা তারপর প্রিয়তা আর সাম্যের বিয়ে হতো। ভদ্র মহিলা বললো,”এক্সকিউজ মি!” আমি স্বভাবসুলভ বললাম,”কিছু বলবেন?” ভদ্রমহিলা ইতস্তত করে বললো,”আমার ফোন বন্ধ হয়ে গেছে।আমি কি আপনার ফোন থেকে আমার হাজবেন্ড কে ফোন করতে পারি?” আমি বললাম,”নিন।” কিছুক্ষণ পর ভদ্রমহিলা ফোন দিয়ে একটা কৃতজ্ঞতার হাসি দিলো।পুরো জার্নিতে প্রিয়তার বই সাথে হেডফোন নিয়ে কেটে গেল। রাত বারোটা একটা নাম্বার থেকে ফোন এলো।

“আসসালামু-আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম-আসসালাম।”
“সাম্য তুমি!”
“কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।তুমি?”
“যেমন রেখে গিয়েছিলে তেমনটা নেই।”
“বিয়ে করেছো?”
“হুম।দুইটা জমজ ছেলে আছে।”
“ভালো।আমি তোমার ছেলেদের দেখেছি।তোমার মতো হয়েছে।ইচ্ছে করছিল আদর করি।সব ইচ্ছে পূরণ করতে নেই।তাই করতে চেয়েও করিনি।”

“জিজ্ঞেস করবে না ফোন নাম্বার কোথায় পেয়েছি?”
“তোমার বউ দিয়েছে।আমার ধারণা না বিশ্বাস।”
“হুম।”ওই তোমার ফোন নাম্বারটা দিয়েছে।”
“সাম্য আমি রাখি ভালো থাকবা।”
“বিয়ে করেছো?”
“করার কথা ছিলো।”
“প্রিয়তা কাঁদছো তুমি!”
“রাখছি।”
“প্রিয়তা?”
“হু।”
“ভালোবাসি।”

প্রিয়তা মুহুর্তেই ফোনটা কেটে দিলো।টি-টেবিলটাকে লাথি দিলো।চুল গুলো মুঠো করে হাটু গেড়ে বসে পরলো।আজও বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ভেজার মতো প্রিয়তার পাশে কেউ নেই।কাঁদতে কাঁদতে বললো,,,, “কেনো ফিরে এলে?আজও পারিনি তোমার বাবাকে ক্ষমা করতে।আমি যে আজও পারিনি তোমায় ভুলতে।ভালোবাসি।বড্ড ভালোবাসি সাম্য।খুবের চেয়েও ভীষণ ভালোবাসি।”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত