প্রেম বাই চান্স

প্রেম বাই চান্স

“লক্ষ্মী মন আমার।তুই একবার অন্তত দেখ ছেলেটার প্রোফাইলটা।তাছাড়া শুধুই কি নেট হাতড়ে দেখা গৈরিক বলেছে তোর ইচ্ছে থাকলে একদিন আমরা সবাই মিলে শান্তিনিকেতন যাব।প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে দুজন দুজনকে চেনাটাও সহজ হবে।সেইসাথে আমাদের পরিবারটা কেমন সেটাও জানতে পারবে ছেলেটা।তবে আমার মনে হয় বাইরে কোথাও যাবার আগে তোরা সামনের রবিবার শুধু দুজন মিলে কোথাও একটা দেখা কর”; একমাত্র আদরের কন্যারত্ন মন মানে মনামির উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলেন সুরুচিদেবী সকালে খাবার টেবিলে ফলের রসের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে।

এদিকে যাকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলা সেই মনামির চোখ তখন ব্যস্ত মুঠোফোনে আসা গুরুত্বপূর্ণ মেলের উত্তর দিতে।তবে এবার কাজ বন্ধ করে ও বলে,”উফফ মা আবার শুরু করলে তুমি পাত্র দেখা?মাঝে তো বেশ কিছুদিন বন্ধ রেখেছিলে। কখন আবার ম্যাট্রিমনি সাইটে আমার প্রোফাইল নতুন করে চালু করলে? শোনো যাই স্কিম আসুক আর যাই হোক তোমার এই ছন্নছাড়া দস্যি মেয়েকে কেউ বিয়ে করবেনা।সবাই চায় ঘরের লক্ষ্মী।রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে,ফটো তুলে,সংবাদ জোগাড় করা মেয়ের জন্য আবার সুপাত্র?”

__”দেখ ঐ গৈরিক বলে ছেলেটা ইতিমধ্যে বারদুই এসছে আমাদের বাড়ি।ওর সাথে আমার কথাবার্তা বলে মনে হয়েছে বেশ অন্যরকম। তাছাড়া ছোটবেলায় নিজের মা, বাবাকে আকস্মিক দুর্ঘটনায় হারিয়েছে বেচারা। শিলিগুড়িতে এক মামা,মামীর কাছে মানুষ।বছর দশেক হল কর্মসূত্রে কলকাতায় আছে। ও বলেছে একটা নতুন পরিবার হলে খুব ভালো হবে। দিনশেষে কথা বলার,একটু যত্ন করার মানুষ কে চায়না বল?”;সুরুচিদেবী কথাচ্ছলে আবারো বোঝানোর চেষ্টা করেন মনকে।

এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা ও।মায়ের মুখের উপর ফস করে বলেই বসে,”প্লিজ মা এর আগে তিনবার পাত্রপক্ষকে বাড়িতে ডেকে,তাদের হাবভাব দেখেও তোমার শিক্ষা হলনা।সকলের সেই এক বক্তব্য।ঘরসংসার সামলে রাখতে পারবে তো, স্বামীকে ভালো রাখতে পারবে তো?আচ্ছা কোথাও একবারও শুনেছ কেউ কি এটা ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে বিয়ের পর নতুন পরিবেশে গিয়ে মেয়েটি কতটা ভালো থাকবে বা তাকে ভালো রাখার দায়িত্ব কার?তাছাড়া আমি নিজে রোজগার করি।কারুর ঘাড়ে বোঝা হয়ে তো নেই। নিজেরটা নিজে ভালোই চালিয়ে নিতে পারি। সেজেগুজে আর ইন্টারভিউ দিতে পারবনা মনামির ব্যাগে লাঞ্চবক্স ভরে দিতে দিতে ঈষৎ অভিমানী কণ্ঠে সুরুচিদেবী বলেন,”সবই বুঝি রে।তবুও মায়ের মন তো!একটা একা মেয়ের পক্ষে এই শহর এখন কতটা নিরাপদ সেই নিয়েই বড্ড দুশ্চিন্তা হয়।”

__”জোর করে আমার ঘাড়ে কিছু চাপিয়ে দিওনা তাতে দুটো জীবন নষ্ট হবে।এখন বেরোলাম।আজ জরুরি কিছু অ্যাসাইনমেন্ট আছে।আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে”এই বলে বেরিয়ে যায় মনামি ওর মায়ের সামনে দিয়ে।ওর যাবার পথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সুরুচিদেবী।শুরু হয় ওর ফেরার অপেক্ষা করা। উৎসবের আমেজ শেষে এই সময়টা কেমন জানি একটা মনখারাপ ঘিরে ধরে।তাছাড়া নভেম্বর পড়ে গেল।বাতাসে একটা শুষ্ক আমেজ জানান দিচ্ছে শীত আসছে।ঝুপ করে সন্ধেও নামছে খুব তাড়াতাড়ি।

অন্যদিকে গাড়িতে উঠে মনামির বারবার মনে হতে থাকে মায়ের কথা।আজ কি একটু বেশি খারাপ ব্যবহার করে ফেলল ও মায়ের সাথে। কিশোরীবেলায় বাবা গত হবার পর থেকে মা সুরুচিদেবীই ওর সবটুকু জুড়ে আছে।তাই বিয়ে হয়ে মাকে ছেড়ে যাবার কথা শুনলেই মনটা হুহু করে ওঠে।আচ্ছা একবার দেখাই যাক ওই গৈরিকের প্রোফাইলটা।সাইট অন করতেই ওর মেসেজ ঢোকে,”হাই মনামি আমি গৈরিক।আপনার মায়ের সাথে কথা হয়েছে আমার।একদিন দেখা হতে পারে কি?জানি আপনি খুব ব্যস্ত।তবু একবার যদি মনামি যন্ত্রের মত টাইপ করে,”চেষ্টা করব।ভালো থাকবেন।”ততক্ষণে অফিস পৌঁছে গেছে ও। এসব নিয়ে আর ভাবার সময় পায়না। কাজ, বুলেটিন এসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

সারাদিন সুরুচিদেবীরও ভালো কাটেনা।কে জানে কি করছে ওনার মন।বড় অভিমানী যে।বিয়ের কথাটা না পাড়লেই ঠিক ছিল বোধয়, পড়ন্ত সূর্যের আলোর ওনাদের ছোট্ট একফালি বাগানের গাছগুলোতে ফিরে আসা পাখিদের কলকাকলি শুনতে শুনতে উনি ভাবেন। তারপর আবার ফিরে আসেন ঘরে। এককাপ চা বানিয়ে প্রতিদিনের অভ্যাসমত টিভিটা অন করতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না উনি।

নিঃশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড় হয়।এই শহরেই একটি বাস দুর্ঘটনার জেরে অনেক মানুষের প্রাণ যাওয়াতে জনরোষ তৈরি হয়েছে।পুলিশ উন্মত্ত জনতাকে সরাতে গেলে শুরু হয়েছে খণ্ডযুদ্ধ,ভাঙচুর। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বাস। অ্যাম্বুলেন্স,মিডিয়ার ছোটাছুটি চলছে ওখানে। আচ্ছা ওনার মনামি নেই তো ওখানে?ভয়ে কেঁপে ওঠে ওনার বুক।কাঁপা কাঁপা হাতে বন্ধ করে দেন টিভি।একরাশ নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরে ওনাকে। ঘড়ির কাঁটা ধরে সময় এগিয়ে চললেও ওনার সময় থমকে যায়। অন্যদিকে রাত তখন অনেক গভীর।দুর্ঘটনাস্থল থেকে পুরো নিউজ কভার করে অফিসে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিয়ে মনামি তখন একা দাঁড়িয়ে অ্যাপ ক্যাবের অপেক্ষায়। এমনসময় ওর সামনে এসে দাঁড়ায় একটি গাড়ি।মনামি তাকিয়ে দেখে গৈরিক।

__”কি ম্যাডাম ভরসা করে একবার কি ওঠা যায় এই অধমের গাড়িতে?”বলে ও।

__”কিন্তু আপনি এখানে হটাৎ কিছু না বলেকয়ে?”; মনামি জিজ্ঞাসা করে।

__”অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখলাম খবরটা।সাথেসাথেই আপনার বাড়ি গিয়ে দেখি আন্টি ভীষণ চিন্তা করছেন আপনার জন্য।তাই ভাবলাম যদি এখানে এসে আপনার দেখা পাই একবারে নিয়ে ফিরব।” একটু অবাক হয়ে মনামি তাকায় ওর দিকে বলে কি ছেলেটা।

__”আরে উঠে আসুন।বন্ধু তো হওয়াই যায় নাকি?চিন্তা করবেন না কোনো দাবি নেই আমার কারণ আমি মনে করি মেয়েরা কারুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় বরং এই সমাজের সম্পদ।যে সম্পদ প্রতিদিন সৃষ্টি করে চলে নতুন কিছু।আর সেই সৃষ্টিকর্তাকে তুচ্ছ গণ্ডির বেড়াজালে বাঁধে কোন শক্তিমান?”মন্ত্রমুগ্ধের মত ওর কথাগুলো শুনতে শুনতে গাড়িতে উঠে বাইরে নিয়ন আলো ঢাকা শহরের দৃশ্যপটের দিকে চোখ রাখে মনামি। মৃদু হেসে গৈরিক জিজ্ঞাসা করে,”কি এত ভাবছেন আকাশপাতাল?আমার কোনো তাড়া নেই কিন্তু।ভেবে চিন্তে দেখুন।আপনার সিদ্ধান্তের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা,বিশ্বাস আছে।” লজ্জায় আরক্ত হয় মনামির মুখ।অস্ফুটে ও বলে,”ভাবছি অফিস ছুটি নিয়ে কিভাবে সামনের পূর্ণিমাতে শান্তিনিকেতন ঘুরে আসা যায়?শুনেছি পূর্ণিমার রাতে কোপাই নদীর তীর এক অদ্ভুত,অপার্থিব সৌন্দর্য খেলা করে।”

__”আপনার যা মর্জি মহারানী”,এইবলে গৈরিকের পুরুষালি আঙুল আলতো ছুঁয়ে যায় মনামির নরম, পেলব হাতের আঙুলগুলোকে।গাড়ির সাউন্ড সিস্টেমে তখন এক নামকরা রেডিও স্টেশনে দ্রিমি সুরে বাজছে বিখ্যাত এক গায়কের কণ্ঠে রবিঠাকুরের গান, “স্বপ্নস্রোতে ভিড়বি পারে বাঁধবি দুজন দুজনারে, সেই মায়াজাল হৃদয় ঘিরে ফেলতে হবে; এবার মিলন হাওয়ায় হাওয়ায় হেলতে হবে, ধরা দেবার খেলা এবার খেলতে হবে”।।।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত