এটাই বুঝি ভালোবাসা

এটাই বুঝি ভালোবাসা

মেডিকেলের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আজ। মেডিকেলে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের রোলের মাঝে তন্দ্রা নিজের রোলটাও আবিষ্কার করলো। তার মানে তন্দ্রাও মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় তন্দ্রার পরিবারের সকলের মুখেই হাসি শুধুমাত্র তন্দ্রা ছাড়া। অথচো আজকের দিনে তারই বেশী খুশি হওয়ার কথা। যার জন্য তার এই ডাক্তার হওয়া আজ সেই তার পাশে নেই।তন্দ্রার মন খালি ছটপট করতে লাগলো। আহত মন যেনো বারবার বলতিছে ইস একবার যদি এই খবরটা তাকে জানাতে পারতাম কতোই না খুশি হতো সে। তন্দ্রার যেনো ইচ্ছা করছে চিৎকার করে তাকে বলতে আমি পেরেছি,আমি পেরেছি তোমার স্বপ্ন পুরণ করতে। কিন্তু তার এই চাওয়াটা যে আর পুরণ হওয়ার নয়। ভালোবাসার মানুষকে এমন মুহূর্তে কাছে না পাওয়া যে কতোটা কষ্টের তা শুধুমাত্র তন্দ্রাই বুঝতে পারতিছে।

পরিবারের সবাইকে বিদায় দিয়ে তন্দ্রা মেডিকেলের হোস্টেলে চলে আসলো। আসার সময় দু চোঁখ যেন বারবার তার ভালোবাসার মানুষকেই খুঁজতিছিলো। মনে আফসোস নিয়েই ভাবতে লাগলো যাওয়ার আগে যদি একবার সে তার ভালোবাসার মানুষটিকে দেখতে পারতো কিন্তু ভাগ্য তাতে সায় দিলো না। মেডিকেল লাইফ সারাক্ষণ পড়া-শুনার মধ্যেই ব্যস্ত থাকে তন্দ্রা। যেটুকু সময় পায় রুম মেটের সাথে আড্ডা দেয়। হাজার ব্যস্ততার মঝে থাকলেও যখনি চোঁখের দু – পাতা বন্ধ করে তখনি তার ভালোবাসার মানুষটির চেহারা তার সামনে ভাসতে থাকে।

দেখতে দেখতে তন্দ্রা থার্ড ইয়ারে উঠলো। এমন কোনো রাত যায়নি যে ভালোবাসার মানুষটার জন্য সে চোঁখের পানি ফেলেনি। আজকে তন্দ্রার প্রথম ফরেনসিক ক্লাস। সেখানে সে ডেথ বডি(লাশ) কাটা দেখবে এবং শরীরের প্রতিটি অংশ দেখবে এবং সেইসব অংগানু গুলোর কার্যাবলী সম্পর্কে জানবে।

দেহ সম্পর্কে আরো ভালো করে বুঝার জন্য এবং পড়ার জন্য সবাই একটা করে মানুষের কংকাল কিনলো। যাতে সেইটা দেখে দেখে তারা পড়তে পারে। প্রথম প্রথম তন্দ্রা তার রুমমেটের ব্যক্তিগত ভাবে কিনা কংকাল দিয়েই পড়ে। এর কিছুদিন পরে তন্দ্রাও একটা কংকাল কিনার সিদ্ধান্ত নেয় কতোই আর মানুষেরটা দিয়ে পড়বে। বাড়ী থেকে টাকা নিয়ে একটা ডোমের (যারা লাশ কাটে) সাথে যোগাযোগ করে সেও একটা কংকাল কিনে নেয়। সারা রাত সেইটা নিয়ে পড়াশুনা করে এবং দিনের বেলা কপিনে করে বেডের নিচে রেখে দেয়।

কংকালটা কিনার পর থেকেই তন্দ্রার কেমন জানি একটা অনুভুতি হতে লাগলো। সে যখনি কংকালটার দিকে তাকাতো তখনি একটা অজানা মায়ায় জরিয়ে যেতো। যখনি সে কংকালটার সাথে থাকতো তখনি এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করতো তার। একদিন সকালে তন্দ্রা ঘুম থেকে উঠে দেখে কংকালটা তাকে জরিয়ে ধরে আছে। সেইটা দেখেই তন্দ্রা লাফ দিয়ে উঠে বসে পরক্ষনেই তার মনে হয় কাল রাতে একটু শরীর খারাপ লাগতিছিলো তাই সে কংকালটা বিছানায় নিয়েই পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়েছে বুঝতেই পারেনি। সাথে সাথেই একটা বিষয় খেয়াল করলো কংকালটা তাকে ঠিক সেইভাবে জরিয়ে ধরেছিলো যেমনটা সুইট সব সময় বলতো। হ্যা, সুইটই হলো তন্দ্রার ভালোবাসার মানুষ। যার জন্যই তন্দ্রা প্রতি রাতে চোঁখের পানি ফেলে। যার আবদারের কারনেই সে ডাক্তার হতে যাচ্ছে অথচো আজ সেই তার পাশে নেই।

সুইটের সাথে তন্দ্রার পরিচয় কলেজ লাইফে। তন্দ্রা ছিলো অনেক চঞ্চল এবং দুষ্টু টাইপের। সব সময় দুস্টামি এবং ফাজলামি নিয়েই থাকতো। এর কিছুদিন পর সুইটের সাথে তার পরিচয় হয়। পরিচয় হওয়ার পর তন্দ্রা বুঝতে পারে সুইট দুস্টামির দিক থেকে তার চেয়েও তিন ধাপ এগিয়ে। সুইট এবং তন্দ্রা দুই জনে খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায়। তাদের দুই জনের দুস্টামি তাদের পুরা ফেন্ডসার্কেলের শান্তি নষ্ট করে দিছে। তন্দ্রা আস্তে আস্তে সুইটের উপর দুর্বল হয়ে পড়ে। এর কিছুদিন পরে সুইট তন্দ্রাকে প্রপোজ করে এবং তন্দ্রা সাথে সাথে তা একসেপ্ট করে। দুই জনের দুইজনের প্রতি কেয়ার, টাইম সব মিলিয়ে ভালোই চলতে থাকে সুইট এবং তন্দ্রার দুষ্টু-মিস্টি সম্পর্কটা।

সুইট প্রায়ই বলতো বিয়ের পর আমরা এক বালিশে ঘুমাবো।তুমি বালিশে মাথা রেখে ঘুমাবা আর আমি তোমাকে জরিয়ে ধরে ঘুমাবো। তন্দ্রা মুখস্ত বিদ্যায় অনেক পারদর্শী ছিলো এবং তার প্রিয় সাবজেক্ট ছিলো জীববিজ্ঞান। যার কারনে সুইট তন্দ্রাকে সব সময় বলতো আমার কিন্তু ডাক্তার বউ চাই। ডাক্তার মেয়ের স্বামী হওয়ার পার্টই আলাদা সো তোমাকে ডাক্তার হতেই হবে। তন্দ্রা সুইটের এমন পাগলামি টাইপের কথা শুনে হাসতো আর বলতো আচ্ছা হবো যাও।

দেখতে দেখতে তাদের এইচ.এস.সি পরীক্ষা এসে যায়। পরীক্ষা শেষে সুইট তন্দ্রার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় চলে আসে। সুইট কলেজ হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করতো আর তন্দ্রার বাসা কলেজের পাশেই হওয়াতে সে বাসা থেকেই কলেজ করতো। যাওয়ার সময় তন্দ্রা অনেক কান্নাকাটি করে। সুইট তন্দ্রাকে বুঝায় আরে পাগলী আমি তো শুধুমাত্র কয়েকদিনের জন্য যাচ্ছি কিছুদিন পরেই তো আবার ফিরে আসবো। সেদিনের পর থেকে তন্দ্রা আজো সুইটের কোনো খোঁজ পায়নি।

কিরে ক্লাসে যাবি না,রুমমেটের ডাকে বাস্তবে ফিরে তন্দ্রা। তারপর কংকালটাকে যত্ন করে রেখে ক্লাসে যায় তন্দ্রা। আজ কেনো জানি কিছুতেই তন্দ্রা ক্লাসে মন বসাতে পাচ্ছে না। বারবার যেনো রুমে যেতে মন চাচ্ছে তার। কিন্তু কেনো এমন হচ্ছে, কিছুতেই সে তা বুঝতে পাচ্ছে না। ক্লাস শেষ করেই সোজা রুমে চলে আসে তন্দ্রা। কংকালটার আকৃতিও তার যেনো চেনা চেনা মনে হয়।

কিছুদিন পরে তন্দ্রা হঠাৎ সুইটকে স্বপ্নে দেখে। স্বপ্নে সুইট তন্দ্রাকে বলতিছে বাবু আমি কখনো ভাবিনি তোমার এতো কাছে থাকতে পারবো। আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসতাম। আমাকে ভুল বুঝোনা বাবু। স্বপ্নটা শেষ হওয়ার আগেই তন্দ্রা চিৎকার করে জেগে উঠে। স্বপ্নটা দেখার পর তার মধ্যে কেমন জানি একধরনের অস্থিরতা বেড়ে গেলো। তার মনে হাজারো প্রশ্ন জাগতিছে এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতিছে সে যা ভাবতিছে তা যেনো সত্যি না হয়। পরের দিন সকালে উঠেই সে বাসায় চলে আসলো। তারপর কলেজের অফিস থেকে সুইটের বাসার ঠিকানা জোগাড় করলো। কলেজ থেকে জানতে পারে সুইট কলেজের কাগজ-পত্রও তুলতে আসেনি।

ঠিকানা অনুযায়ী তন্দ্রা সুইটের বাসায় পৌঁছালো। ভিতরে ঢুকেই দেখতে পেলো একটা বৃদ্ধ বয়সী মহিলা বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে একটি মেয়ে তার সেবা করতিছে। মেয়েটিকে যখন জিজ্ঞাস করলো এটা কি সুইটের বাসা!! এতো দিন পর কারো মুখে সুইটের নাম তাও আবার অজানা-অচেনা একটি মেয়ের মুখে শুনে মেয়েটি অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। তার পর বললো জ্বি,আপনি কে,,আপিনাকে তো চিনলাম না?? আমি তন্দ্রা, আমি সুইটের বন্ধু হই। তন্দ্রা নামটি শুনেই মেয়েটি বললো আপনিই সেই তন্দ্রা,ভাইয়া সব সময় আপনার কথাই বলতো। তোমার ভাইয়া কোথায়?? তন্দ্রা লক্ষ্য করলো মেয়েটি কথা গুলা বলার সময় তার চোঁখ দিয়ে পানি পড়তিছে।

পরে তার কাছ থেকে জানতে পারে সুইট যেদিন কলেজের হোস্টেল থেকে বাসায় আসে সেদিন বাসে এক পকেটমার ভাইয়ার পকেট থেকে টাকা, মোবাইল সব চুরি করে যার ফলে ভাইয়া আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারে না।এর পরের দিন ভাইয়া মোটর সাইকেল নিয়ে নানু বাসায় যায়। কিছুক্ষন পরে আমরা খবর পাই ভাইয়া নাকি এক্সিডেন্ট করে নদীতে পড়ে যায়। আমরা অনেক খুঁজেছি কিন্তু ভাইয়ার লাশ আজো পাইনি। ভাইয়ার শোকে আম্মুও এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

কথাটা শোনার সাথে সাথেই তন্দ্রা মাথা ঘুরে পড়ে যায়। জ্ঞান ফেরার পর তন্দ্রা সেখান থেকে চলে আসে। তার মাথা যেনো কিছুতেই কাজ করতিছে না। এতোদিন তার বন্ধুরা বলতো সুইট তোকে ধোকা দিয়েছে। প্রথমে বিশ্বাস না করলেও পরে বিশ্বাস করেছে। সেটাই ভালো ছিলো তাও তো মনকে শান্তনা দিতাম যে সে আমায় ধোকা দিয়ে নিজে তো সুখে আছে এতেই আমি খুশি। কিন্তু ভালোবাসার মানুষ বেঁচে নেই এর মতো যন্ত্রনা আর কিছু নেই।

তন্দ্রা সেখান থেকে সোজা মেডিকেলের ডোমের কাছে যায়, যার কাছ থেকেই সে কংকালটা কিনেছিলো। ডোমের কাছ থেকে জানতে পারে এই লাশটা পানিতে ডুবে মারা গেছে এবং তাকে একটা নদীর পাড় থেকে উদ্ধার করা হয়। অনেক দিন হওয়ায় লাশে পঁচন ধরে যার ফলে লাশ চিন্তে পারা যায় না এবং লাশের কোনো পরিবার না মিলায় বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে মেডিকেলে চালান করা হয়। এরপরে অনেকদিন রাখার পর মেডিসিন দিয়ে শরীরের মাংসগুলা ছাড়িয়ে কংকালে পরিনত করা হয়। তারপর আপনার কাছে বিক্রি করে দেই। কথাটা শুনার পর তন্দ্রার আর বুঝতে বাকী রইলো না তার কাছে আর কেউ নয় সুইটেরই কংকাল আছে। তাছাড়া সেদিন তো স্বপ্নেও সুইট আমাকে জানিয়ে দিছে যে ও আমার অনেক কাছে আছে।

তন্দ্রা এক মুহূর্ত দেরী না করেই সোজা রুমে চলে যায়। রুমে গিয়ে দেখে তার রুমমেট সুইটের কংকাল নিয়ে পড়তিছে। তন্দ্রা এক প্রকার রাগী দৃষ্টি নিয়েই তার কাছ থেকে কংকালটা নিয়ে নেয় এবং তাকে জানিয়ে দিলো দ্বিতীয় বার যেনো এটা ধরার চেষ্টা না করে। আশ্চর্য হলেও সত্যি সুইটকে নিয়ে তার হিংসামো আজো আছে। আগে যেমন কোনো মেয়ের সাথে সুইটকে কথা বলতে দিতো না,কোনো মেয়ের সাথে মিশতে দিতো না। আজকে তার মৃত শরীরের কংকাল নিয়েও সে একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করলো। এটাই বুঝি ভালোবাসা আর এইটা শুধুমাত্র ভালোবাসাতেই সম্ভব আর কিছুতে না।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত