পিচ্চি বউ

পিচ্চি বউ

রিদিতা মন খারাপ করে বসে আছে। কারন হলো শাড়ী কিনে দেইনি। টাকা ছিলোনা এমনটা নয়। আসলে গতকালই ওকে দুইটা দামি শাড়ি কিনে দিয়েছি। পরশু একটা জামা। তার কয়েকদিন আগে এক টা নেকলেস। ওর চাওয়াগুলো এভাবে পুরন করতে থাকলে আমাকে অচিরেই ঘুষখোর উপাধি শুনতে হবে। সরকারি চাকুরী হিসেব করে চলতে হয়। রিদিতা এসব শুনতে চায় না। অবশ্য এতে ওরই বা দোষ কোথায়? মাত্র ১৪ বছর বয়স। তবে ওকে দেখলে যে কেউ ভাববে ১৮ পেরিয়েছে। আমিও তেমনটাই ভেবেছিলাম শুরুতে। কিন্তু বিয়ের সময় জানতে পারি ওর বয়স কম, আনম্যাচুরড। আর আমার বয়স ২৬ পেরিয়েছে। রিদিতার শারিরীক বিকাশ ঘটলেও মানসিক দিক দিয়ে ও এখনো পিচ্চিই রয়ে গেছে।
.
আমাদের বিয়ের প্রথম রাত্রিটা ছিলো অদ্ভুত। বিয়ের পর ও বাসরঘরে বসে আছে। আমি ওর পাশে গিয়ে বসতেই ও বললো,
– এ কি? আপনি এ ঘরে কেন?
– বিয়ের পর প্রতিটা স্বামী স্ত্রী এক ঘরেই তো থাকে।
– আপনি আমার সাথে ঘুমোবেন?
– হ্যা এমনটাই তো নিয়ম!
রিদিতা মুখ টা এমন করছে যেন খুব অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। আমি বুঝলাম। ও এখন বাসরের জন্য প্রস্তুত নয়। তাই আমি একটা বালিশ নিয়ে পাশের রুমে যাচ্ছিলাম। আমি যে বাড়িটা ভাড়া নিয়েছি ভাগ্যিস সেটাতে দুইটা রুম। এমনটা সহজে পাওয়া যায় না।
তো পাশের রুমে যাওয়ার পর আমি কেবল শুয়ে পড়েছি। সেইসময় দরজায় কড়া নড়ছে। দরজা খুলে দেখলাম রিদিতা দাড়িয়ে। আমি বললাম,
– কি হয়েছে? হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ছো যে? কিছু কি লাগবে?
– বাথরুম যাবো! বাথরুম কোনদিকে?
আমি ওকে বাথরুমে নিয়ে গেলাম। বাথরুমের ভিতরে দিয়ে বাইরে দাড়িয়ে রইলাম। পনের মিনিট পর মুখ ভালো করে ধুয়ে বের হয়ে এলো ও। তারপর আমার পিছন পিছন এসে আমার রুমটাতে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লো। আমি বললাম,
– তুমি এই রুমে থাকবে?
– হ্যাঁ!
– তাহলে আমি ওই রুমে যাবো?
– নাহ প্লিজ!
– কেন?
– ওই রুমে একা থাকতে ভয় লাগছে।
আমি হাসলাম ওর কথা শুনে। ও ইতস্তত এ পড়ে গেছে। আমি কেবল বিছানায় ওর পাশে গিয়ে শুয়েছি, ও লাফ মেরে উঠে বললো,
– এ কি? আপনি এখানে কেন?
– বা রে! তুমিই তো বললে! এই ঘরে থাকতে।
– আপনি একটা পাটি পেতে মেঝেতে ঘুমোন প্লিজ।
রিদিতার কথা অনুযায়ী আমি মেঝেতেই ঘুমোলাম।
.
এরপর থেকে আমি প্রতিটারাত এভাবে মেঝেতেই ঘুমাই।
.
তো যাই হোক, মেয়েটার মন খারাপ হলে কেমন যেন লাগে। তাই ঠিক করলাম শাড়িটা ওকে কিনে এনে দেবো। কিনে দেওয়ার পর ওর মুখে প্রচুর হাসি দেখলাম। বিয়ের এক বছরের মতো কেটে গেছে।
শাড়ী জামা গয়না এসব ছাড়া ওর তেমন কোনও চাওয়া ছিলোনা। তবে একদিন আমাকে এসে বললো,
– একটা জিনিস চাইবো। দিবেন?
– হুম বলো। কি চাও?
– আমি এস,এস,সি পরীক্ষা টা দিতে চাই।
– আচ্ছা দিও। আমার কোনও সমস্যা নেই। আমিও তাই চাই।
ও মুচকি হেসে বললো, অনেক ধন্যবাদ।
এরপর ও আবার ক্লাস নাইনে ভর্তি হলো। আমি অফিস যাওয়ার সময় ওকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আসতাম। আসার সময় ও নিজেই চলে আসতো। প্রতিদিন ওকে স্কুলে বাইকে করে নামিয়ে দেওয়ার সময় খেয়াল করতাম একজন ছেলে অপেক্ষা করতো ওর জন্য। রিদিতাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম ছেলেটার নাম রিপন। রিদিতার বেস্ট ফ্রেন্ড। তারপর আর এ ব্যপারে রিদিতাকে কিছুই বলা হয়নি।
.
একদিন সকালে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে রান্না করলাম। অবশ্য রোজ আমিই রান্না করি। রিদিতা চাইলেও ওকে রান্নাঘরে আসতে দেই না। ওকে বই পড়তে বলি বেশী বেশী। আমি রান্না ঘর থেকে রুমে গিয়ে দেখি ও ফোনে কথা বলছে। হয়তো রিপনের সাথেই কথা বলছে। আমার হৃদয়টা জ্বললেও আত্মশান্তনার জল ছিটিয়ে ঠান্ডা করে রাখি। তারপরেও রিদিতার কাছে গিয়ে স্বামীর অধিকার নিয়ে বলেই ফেললাম,
– কে ছিলো?
– রিপন।
– কি বললো?
– সব কথাই আপনাকে বলতে হবে নাকি? নাহয় আপনার সাথে বিয়ে হয়েছে আমার। তাই বলে সব বলতে হবে?
আমি অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইলাম। ওর বয়স কম। একদিন হয়তো নিজে থেকেই সব বুঝবে এই আশায় রইলাম।
দিনগুলো এভাবেই দুঃস্বপ্নের মতো কাটছিলো।
একদিন ঘুমোতে গিয়ে দেখি রিদিতা কাপছে। আমি ওর গায়ে চাদর টেনে দিতে গিয়ে খেয়াল করলাম ভীষন জ্বর। আমি ডাক্তার ডাকলাম, রিদিতা কে ওষুধ খাওয়ানো হলো। সারারাত ঘুমোইনি। রিদিতা পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগে অফিস যাইনি। সুস্থ হতে তিনদিন সময় লেগেছিলো। তারপর থেকে আস্তে আস্তে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক কে ডিঙিয়ে আমরা একে অপরের খুব ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছি।
.
দেখতে দেখতেই ওর এস,এস, সি পরীক্ষা শুরু হলো। দেখতে দেখতেই শেষ হলো। ভালো সময়গুলো দ্রুত পেরুচ্ছিলো। রিদিতার এস,এস,সির রেজাল্ট ও বেরিয়েছে। অল্পের জন্য প্লাস পায়নি 4.88 ওর রেজাল্ট।
.
ও যখন ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয়েছে, তখন ওর বাচ্চামি স্বভাবগুলো আস্তে আস্তে পরিবর্তন হচ্ছে। ও আমার সাথে এক রুমে আর ঘুমোয় না। পাশের রুমে গিয়ে ঘুমোয়। সারারাত ফোনে কথা বলে। আমি বুঝতে পারি। ওর ফোন ওয়েটিং দেখে।
.
একদিন ওর খুব মন খারাপ। আমি ওর কাছে মন খারাপের কারন জানতে চাইলাম। ও আমাকে বললো,
– আমাকে আমার ভুলের জন্য ক্ষমা করিয়েন প্লিজ! আমি আপনার স্ত্রী হয়েই সারাজীবন থাকবো কথা দিলাম।
আমি বুঝতে পারলাম, ওর ভিতরে খুব কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট পেয়েই ও এভাবে কথা বলছে। তবে কি রিপন কষ্ট দিলো?
.
আমি রিদিতার মুখ থেকে পরে জেনেছিলাম রিপনের সাথে ওর ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো। রিপন চেয়েছিলো রিদিতার সাথে রুমডেট করতে। রিদিতা রিপনকে বলেছিলো ও আমার সাথে মিলিত হয়নি। রিপন বলেছিলো এটা প্রমাণ করতে। রিপন রিদিতার সাথে রুমডেট করে প্রমাণ চেয়েছিলো রিদিতা এখনও ঠিক আছে কি না। রিদিতা রাজি হয়নি।
.
কথাটা জানার পর খুব ইচ্ছে করছিলো, রিপনকে খুন করে ফেলি। কিন্তু সংযম ধরে রেখেছি।
.
সেদিন মাঝরাতে রিদিতা বললো,
– আমার আজ একা থাকতে ভয় করছে। আমি এই রুমে থাকতে পারি?
– সে আপনার ইচ্ছে।
রিদিতা সেদিন বিছানায় শোয় নি। মেঝেতে আমার পাটির উপরে এসে শুয়ে পড়েছে। আমি ওর ভাবভঙ্গি বুঝতে পারছি, আবার পারছিনা।
শীতের রাত। রাতটা যখন পেরিয়ে গেছে সকালে উঠে দেখলাম আমি আর রিদিতা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছি। আমি সরে যেতে চাইলে ও আমাকে আরও শক্ত করে ধরে কানে কানে বললো,
– এখন উঠিও না প্লিজ!
– কেন?
– কেন আবার কি?
– হঠাৎ হাওয়া উল্টোদিকে?
– বা রে! আমি তোমার বউ নই? বউ রা তো স্বামীর বুকে এভাবে ঘুমোয়।
– তাই? আমার পিচ্চি বউটা বড় হয়ে গেছে দেখছি।
– হুম।
আমি সেদিন প্রথমবারের মতো রিদিতার কপালে একটা চুমু দিলাম। রিদিতা অনেক আগেই শাড়ী গয়না এসব চাওয়া বন্ধ করেছিলো। তবে নতুন এক চাওয়া তৈরী হয়েছে। আমি যেন প্রতিদিন আনলিমিটেড চুমু দেই ওর কপালে।
.
– সমাপ্ত –

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত