তবুও ভালোবাসি

তবুও ভালোবাসি

চাকরিটা মনে হয় বেশি দিন থাকবে না। এটা নিয়ে খুব মন খারাপ। ট্রেনে বসে আছি জানালার দিকে তাকিয়ে। এখনো ছাড়ে নি ট্রেন টা।” এই যে মিস্টার রিপ্রেজেন্টেটিভ, জানালার পাশের সিটটা আমার ” । কথাটা শুনেই অবাক হলাম একটু। এখানে কে আবার চিনে আমায়। তাকিয়ে দেখি সে ডাক্তার মেয়েটা। কিছু না বলে সিটটা ছেড়ে পাশে চলে এলাম। কপাল যখন খারাপ থাকে তখন সব দিক দিয়েই খারাপ যায়। ভাবছিলাম ওখানে বসে একটু যাব। সেটাও হলো না। অন্য কেউ হলে না হয় একটু অনুরোধ করতাম। কিন্তু এই মেয়েকে করবো না।

— এভাবে চুপ করে আছেন কেন? (মেয়েটা)
— এমনি, ভালো লাগছে না।
— চেম্বারে গিয়ে তো কয়েকদিন কত কথা বলতে চাইলেন,এখন পাশে বসে আছি তবুও বলছেন না যে।
— কি আর বলবো ম্যাডাম,
— তখন যা বলতে চাইতেন, আপনার মেডিসিন নিয়ে, সেগুলাই না হয় বলেন।

কি মেয়েরে!! এ কারনেই এ মেয়ে ডাক্তার, আর আমি। ট্রেনে বসে যাচ্ছে তাও তার ওষুধ নিয়ে চিন্তা। যারা ডাক্তার হয় তারা মনে হয় এমন ই। ধ্যান জ্ঞান সাধনা সব কিছুই প্রফেশন নিয়ে।

— না ম্যাডাম, বলে আর কি লাভ?
— কেন?
— জব টাই মনে হয় আর থাকবে না। তো বলে কি হবে? সবাই কত সেল বাড়ায়,আর আমার দিন দিন শুধু কমছেই।
— হা হা হা

হাসি শুনে মনে হচ্ছে আমি কোন জোকস বলছি। কি আর করার!! আমি চুপ হয়ে গেলাম। কিছু বলছি না। মাত্র কয়েক বছর হলো ডাক্তারি পড়া শেষ করেছে। অল্প দিনের মাঝেই খুব নাম করে ফেলছে মেয়েটা। কয়েক দিন আগে তার চেম্বারে গেছিলাম। কয়েকজনের প্রেসক্রিপশন দেখার পর বুঝলাম সব গুলা নামী দামী কোম্পানির মেডিসিন। আমি কথা বলতে চাইছিলাম। কিন্তু এতো ব্যস্ত যে আমাকে সময় ই দেয় নি। তবুও আমি আমাদের কোম্পানির ওষুধ এর লিস্ট আর আমার একটা কার্ড রেখে এসেছিলাম। মনে হয় খুলেও দেখে নি। ” সাত দিন পর” মাসের শেষ। সেলারি নিতে গেলাম। মনে হয় সেলারি দেয়ার পর বলে দিবে আর চাকরিটা আর নেই। কিন্তু এ কি!! যা ভাবি নি তা-ই হয়েছে। এ কি! আমার এরিয়ায় এতো মেডিসিন সেল হয়েছে!!! । বেতন যা পাওয়ার ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি। বিক্রি বাড়ার ফলে অনেক টাকা উৎসাহ ভাতা এসেছে।

পরের দিন ম্যাডাম এর সাথে দেখা করার জন্য তার চেম্বার এ গেলাম। খুব ভিড়। তবুও আজ সে আমার সাথে কথা বললো ” কি খবর মিস্টার রিপ্রেজেন্টেটিভ? এখনো চাকরিটা চলে যাবে মনে হয়? আমি একটু হেসে বললাম ” না ম্যাডাম!! সব আপনার জন্য হয়েছে। তারপর বললো ” আমি আজকেও বাড়ি যাব,পারলে ট্রেনের সেই বগিতেই থাকবেন, দেখা হবে, তখন কথা হবে। আমার যদিও আজ বাড়ি যাবার ইচ্ছা ছিল না। তবুও যে আমার এতো বড় উপকার করলো তার জন্য হলেও যেতে হবে। সন্ধ্যা ছয়টায় ট্রেন। আমি এসে দেখি ম্যাডাম সেই আগের সিটটাতেই বসে আছেন। আমার আসা দেখেই আজ জানালার পাশের সিটটা ছেড়ে দিলেন। কিছুই বুঝলাম না। আজকাল কোন মেয়ে জানালার পাশের সিট ছেড়ে দেয় তা কখনো ভাবায় যায় না।

— কেমন আছেন ম্যাডাম?
— ম্যাডাম ম্যাডাম করছেন কেন খালি?
— তাহলে কি বলবো?
— শুধু অনামিকা বলবেন, বয়সে মনে হয় আমিই আপনার চেয়ে দুই এক বছরের ছোট হবো।
— ম্যাডাম, মানুষ বয়সে না,কর্মে বড় হয়।
— হা হা হা, তাই নাকি মিস্টার(আমার একটা নিক নেম)

কি বেপার এই মেয়ে আমার এ নাম জানলো কিভাবে? তাহলে সেদিন মনে হয় আমি আমার ডাইরিটা এখানে ফেলে গেছিলাম। সেখানে তো আমার সব কিছুই লেখা ছিল। মান সম্মান সব গেল আজ!! ভেবেই লজ্জা লাগছে।

— আমার ডাইরিটা ফিরিয়ে দেন আমাকে।
— না,এখন দিব না, পুরোটা শেষ হলে দিব। অনেকটুকু বাকি আছে। কিছু বললাম না। চুপ করে আছি।
— আজকেও মন খারাপ কেন?কিছু তো বলেন
— কি বলবো ম্যাডাম?
— আপনি জানেন
— ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার জন্য চাকরি টা বেচে গেছে।
— অন্য কিছু বলেন।

এভাবেই পরিচয় তার সাথে আমার। তবে এরপর আর কোন দিন ম্যাডাম ডাকতে দেয় নি। নাম ধরেই ডাকতে দিছে। মোটামোটি বলা চলে বন্ধুর মত হয়ে গেছি। মাঝে মাঝে যদি সময় পায় অনামিকা তখন ই ঘুরতে বের হয় আমাকে নিয়ে। তবে আমি কখনো ভাবতে পারি নি যে একজন ডাক্তার হয়েও সে মেডিসিন রিপ্রেজেন্টেটিভ এর সাথে এত ফ্রি হয়ে যাবে। এভাবেই দিন যাচ্ছিল।

ছেলেদের সমস্যাই হলো একটা। একটা মেয়ের সাথে কিছু দিন কথা বললে তার প্রেমে পড়ে যায়। আমিও মনে হয় পড়ে যাচ্ছি। তবে সেটা কোন দিন মুখে আনা যাবে না। একজন ডাক্তার বিয়ে করবে আরেকজন ডাক্তার কেই। কোন রিপ্রেজেন্টেটিভ এর সাথে তাকে মানাবে না। কল্পনাতেই এসব মেরে ফেলতে হবে। বাসায় যাচ্ছি আবারো ট্রেনে। প্রতিবার এই বগিতেই চন্দ্রা যায় কেন? এটা তো আমাদের জেলার বগি। এখানের প্রায় সব টিকিট আমাদের জেলার লোকদের দেয়া হয়। ওদের এলাকার টিকিট তো অন্য বগির। তাহলে ও কেন? ওহ হ্যা,অনামিকাকে আমি চন্দ্রা বলে ডাকি এখন।

— আচ্ছা,প্রতিবার এই বগিতে যাও কেন তুমি? তোমাদের তো এলাদা বগি।
— এমনি ভালো লাগে আমার।
— কারন?
— এমনি বুঝতে পারলাম এটা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছে না। তাই অন্য দিকে কথা নিতে হবে।
— বিয়ে করো না কেন?
— করবো না।
— কেন?
— অপেক্ষায় আছি।
— কার?
— এমন একজনের জন্য যাকে কখনো দেখি নি, সামনাসামনি কথাও বলি নি।

শুধু ভালোবেসেছি। আর তুমি জানতে চেয়েছিলা না এখানে বসি কেন আমি? আমি যাকে ভালোবাসি সে সব সময় এই ট্রেনের এই বগি দিয়ে যেত। তোমাদের জেলাতেই বাড়ি। তার সাথে যখন আগে ফোনে কথা হতো তখন বলতো এই ট্রেনের এই বগি টা তার প্রিয়। এটা দিয়েই সে বাড়ি যেত প্রতি মাসে একবার। হয়ত একদিন তাকে পেয়ে যাব এখানে।হয়ত চিনতে পারবো, নয়ত পারবো না চিনতো কখনো। তবে অপেক্ষা করে যাবো সারা জীবন।

— এখন আর কথা হয় না?
— প্রায় আট বছর ধরে হয় না।
— তবুও ভালোবাস?
— তবুও ভালোবাসি। হয়ত সে অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখে আছে।
— অপেক্ষা করা কি ঠিক?
— জানি না, তবুও করছি।
— সব কিছু নতুন করে শুরু করো। হঠাৎ করেই রেগে গেল সে। ”
—তোমাদের ছেলেদের সমস্যাই এটা । যাকেই ওর কথা বলি সে ই এমন কথা বলে। সব নতুন করে শুরু করো বলতে সবাই নিজেকে সাথে নিয়ে শুরু করতে বলে। আজ তুমি এটা বললা কালকে বলবা যে আমাকে ভালোবাসো ”

— সরি, আমি এটা ভেবে বলি নি।
— তাহলে?
— যে তকে ধোঁকা দিয়েছে তার জন্য অপেক্ষা করে কি লাভ?
— জানি না
— জীবন টা নতুন করে শুরু করে দাও। ভালো কাউকে বিয়ে করে নাও।
— পারবো না হয়ত
— তোমাকে পারতে হবে অনামিকা। নিজের জীবনটা নষ্ট করো না আর।

অনামিকা চুপ হয়ে গেল। মনে হচ্ছে কথা গুলা নিয়ে ভাবছে। এভাবে অপেক্ষা করা সত্যিই ঠিক না কথা বুঝতে পারলে ভালো হতো। এক মাস পর আজ অনামিকার বিয়ে। আমাকে খুব করে যেতে বলছে। এখনো ফোন করছে যাওয়ার জন্য। তবে আমি যেতে পারছি না। আমি বলছি যে আমি অফিসের কাজে বাইরে আসছি হঠাৎ করে। আমার মত একজন ধোঁকাবাজ কে ভালোবেসে এতো দিন কেউ অপেক্ষা করতে পারে সেটা কোনদিন ভাবতেই পারি নি।

আমি যাদের সাথে এমন করতাম ফোনে বা ফেসবুকে ভাবতাম মেয়েগুলাও মনে হয় আমার মতই। কিন্তু না। তাদের মাঝে অনামিকার মতো মেয়েরাও ছিল। বুঝতেছি না দোষটা আমার ছিল? নাকি আমার বয়সের? ইন্টার পড়ুয়া একটা ছেলের চরিত্র এমন থাকাটা তখন খুব অস্বাভাবিক ছিল কি? আচ্ছা আমার কি বলা উচিত ছিল যে ” সেই ধোঁকাবাজ টা আমি ই”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত