দুই অলসের সংসার

দুই অলসের সংসার

“ বিছানায় দুজন যখন রাতে ঘুমাতে যাই তখন আমার স্ত্রী জিনিয়াকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছি। কিন্তু মোবাইলের এলার্ম এর শব্দে ঘুম ভাঙার পর উঠে দেখি ওর মাথা আমার হাঁটুর পাশে, আমার মাথা ওর হাটুর পাশে।

বিছানার চাদর গায়ে দিয়ে দুজন শুয়ে আছি। অন্যদিকে গায়ে দেয়ার নকশি কাঁথা ফ্লোরে পড়ে আছে। গায়ের ও সীমানায় পাহাড়ের ওপারে, দুই অলসের বাড়ি। নিশি তো রাত্রী প্রতিধ্ববনি শুনি। কান পেতে শোনে ওরা বুঝিতে না পারে, চোখ বন্ধ করে দেখে ওরা দেখিতে না পারে, চোখ বুঝে দেখে ওরা দেখিতে না পারে!! হাজার পাহাড় ওরা ডিঙোতে না পারে এই রিংটোন টা মোবাইলে এলার্ম টোন হিসেবে সেট করে দিয়েছি সকাল ১২ঃ৩০মিনিটে উঠবো। প্রতিদিন এর এলার্ম এটা। এলার্ম এর শব্দে ঘুম  ভাঙার পর জিনিয়ার ঘুম ভেঙে দিয়ে বললাম বেবী এলার্ম টা অফ করোতো। জিনিয়া ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে বললো এতো জলদি ১ টা বেজে গেলো কিভাবে? জিনিয়া বিরক্তিভাব নিয়ে বললো, আচ্ছা বাবু এই গানটা তো আমাদের ফেবারিট তাই না? আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দিলাম।

জিনিয়া বললো তাহলে মনে করো গানটা এক নাগাড়ে বেজে চলেছে আমরা গান শুনবো আর ঘুমাবো এই বলে আমাকে ঝাপটে ধরে আবার ঘুমের রাজ্যে। আমি ওর মত এতোটা অলস না। কিন্তু যখন আমাদের বিয়ে হয় নি, তখন মনে করতাম আমিই পৃথিবীর সেরা অলস। কিন্তু বিয়ের পর জিনিয়ার অলসতা দেখে আমি একটু কর্মঠ হয়ে গিয়েছি। প্রতিদিন সকালে আমাদের খাবারের মেন্যু থাকে “বাটার বান উইথ জেলী”। সকালে উঠে রান্নার ভেজাল নেই। আমাদের কোন কাজের বুয়া রাখা নেই। আমার কোন অফিস ও নেই। আমার স্ত্রী জিনিয়াও কোন জব করে না। আমাদের বাসার সামনে আমার একটা ফার্মেসির দোকান আছে।

জিনিয়ার মাথা থেকে এই আইডিয়াটা এসেছিলো যে, ফার্মেসির দোকান নিজের হলে কম্পাউন্ডার এসে  দোকান খুলবে সকালে, সি সি ক্যামেরা লাগানো থাকবে। সে মেডিসিন ক্রয় বিক্রয় করবে, আর আমি যেনো দুপুরে হাল্কা নাস্তা করে ফার্মেসিতে গিয়ে বসে দু একটা প্যাসেন্ট যা পাই দেখবো। তার আইডিয়াটা দারুণ!! কিন্তু এতে কি সংসার চলে? জিনিয়ার বাবা আই মিন আমার শশুর আগে থেকেই জানতো আমার মেয়ে কি পরিমান অলস। যেমন আমার শশুর তার মেয়েকে বলতো মামণি আমার মোবাইল টা একটু চার্জে লাগিয়ে দিও তো। জিনিয়া উত্তরে বলতো আব্বু, এতো বড় কাজ কিভাবে করবো আমি? অবাক চোখে শশুর জিজ্ঞাসা করতো এইটা কি এমন বড় কাজ মামণি? উত্তরে জিনিয়া বলতো– এই দেখো বিছানা থেকে উঠবো আমি, তোমার চার্জার টা নিতে হবে।

মোবাইলে ঢুকাতে হবে, প্লাক টা ঢুকিয়ে দিয়ে সুইচ অন করতে হবে।মোবাইল টা ধরে আবার নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে! বলো আব্বু কত কাজ!! ভাত খাওয়ার ক্ষেত্রেও এমনটা হতো। যেমন জিনিয়া বলতো, আব্বু খাইয়ে দাও না! তাহার আব্বু বলতো মামণি তুমি বড় হয়েছো এখন তোমাকে নিজ হাতে খেতে হবে। জিনিয়া বলতো, আব্বু! ব্রেসিং য়ে গিয়ে হাত ধোয়া, তারপর চেয়ারে বসা, প্লেটে ভাত নেয়া, তরকারি নেয়া, তারপর ভাত এবং তরকারি দক্ষতার সাথে মাখানো, তারপর মুখে দেয়া, তারপর চিবানো, উফ আব্বু অনেক ভেজাল। তুমি খাইয়ে দাও সরাসরি আমি গিলে খেয়ে ফেলবো যা হবার স্টমাকে গিয়ে হবে। তো মেয়ের এইরকম কান্ড দেখে আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন মেয়ের জন্য ফিউচারে সম্পদ জমাতে হবে।

সেই ভাবনা থেকে জিনিয়ার আব্বু ১৫ লাখ টাকা বিয়ের পরে আমাকে দেয়। কিন্তু জিনিয়ার আব্বু বিয়ের কিছুদিন পরেই বুঝিতে পারে আমার মেয়ে যেমন অলস আমার জামাই ও ঠিক একই রকম। একদিন জিনিয়ার আব্বু জিজ্ঞাসা করলো আমার মেয়ের জন্য তো আমি ১৫ লাখ জমা করেছি, তোমার বাবা তোমার জন্য কিছু জমা করেনি? আমি মাথা উঁচু করে হাসি দিয়ে বললাম আমার বাবা আমাকে বিয়ের আগে ২০ লাখ টাকার সম্পদ দিয়েছেন আর বলে দিয়েছেন এই টাকা দিয়ে কি করবে আমি জানি না, তবে মনে রেখো এটাই তোমার মেইন সম্পদ। ২০+১৫ = ৩৫ লাখ ব্যাংকে জমা করে দিয়েছি। প্রতিমাসে ইন্টারেস্ট ৩১ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়েই মূলত দুজনার সংসার চলছে। জিনিয়া যে বড় মাপের অলস তা আমি সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম । বিয়ের তিনদিন পর। ওকে আমি জড়িয়ে ধরে অনেকবার বললাম—

—- আই লাভ ইউ সোনা জান বাবু। —- ‘হু’
—- লাভ ইউ সোনা।
—- ‘হু’
—- কি হলো সোনা?
—- ‘হু’
—- আজব তো হু হু করছো কেনো?
—- ‘হু’
—- বুক থেকে সরিয়ে নিয়ে বললাম বেবী তুমার জ্ঞান আছে?

সোনা জান বাবু কিছু হয়নি তো তোমার? —- আরে দুর বাবা, কিছু হয় নি। জিহহব্বা নাড়াতে কষ্ট লাগে তাই লাভ ইউ টু বলিনি। তুমি বলো আমি শুনি। আর তুমিতো জানোই আমি তোমাকে লাভ করি। — অল্পের জন্য বেহুঁশ হইনি আমি। জিনিয়া অলস হলেও তার রয়েছে অসাধারন কিছু গুণ। ক্লাস এইটে থাকাকালীন তার এক বান্ধবীর “আঙটি” হারিয়ে যায়। তার বান্ধবীটা নাকি অনেক কান্নাকাটি করেছিলো কেনোনা আঙটি হারানোর কথা তার আম্মু জানতে পারলে তাকে অনেক পিটানি দিবে। তাই জিনিয়া ক্লাসের সবার কাছ থেকে ৫০ টাকা করে চাঁদা তুলে হুবহ একটা আঙটি দিয়েছিলো। জিনিয়া আজ হঠাৎ করেই রেগে গিয়েছে আমার উপর। সে রেগে গেলে ইংরেজীতে কথা বলে।

( Do you have no knowledge? Do not know whether to cook in the afternoon? Why were you out of time? You do not know that I can not cook anything without you. I’m not allowed to serve you, because one can cook with me. Let’s cook.)

[[ তোমার কোন জ্ঞান নেই? দুপুরের রান্না করতে হবে, এটা জানো না? এতোক্ষণ বাইরে কেনো ছিলে? তুমি জানো না তুমি ছাড়া আমি কোন রান্না করতে পারি না। তোমাকে জব করতে দেয়া হয় না, কারণ একটাই আমার সাথে রান্না করবে। চলো রান্না করি। ) অবশেষে দুপুরের রান্না দুজন মিলে স্টার্ট করলাম। অলস হলেও অলস ব্যক্তিদের নিয়ে আছে নানান সুন্দর সুন্দর উক্তি। আমার স্ত্রী জিনিয়ার সেগুলো মুখস্ত। তাই সে সৃজনশীল কাজ করতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিল গেটস বলেছেন — আমি একটি কঠিন কাজ করার জন্য একজন অলস ব্যক্তিকেই পছন্দ করব, কারণ সে এই কঠিন কাজটি করার একটা সহজ উপায় বের করে নেবেই। আর একটা সুন্দর কথা আছে অলস ব্যক্তি নিয়ে — সৃজনশীল মানুষেরা সাধারণত অলস হন। এই ধরনেরমানুষরা কাজ কম করেন। কিন্তু সাধারণত তাদের মাথায় নানা রকম নিত্য নতুন সৃজনশীল ভাবনা খেলা করে।

নিয়ম করে দুপুর ১২ টায় উঠে শাওয়ার নেয়া, বিকেল হলে সে শাড়ি পড়বে আমাকে পাঞ্জাবি পড়াবে তারপর ফুটপাতে গিয়ে ফুসকা খাবে। তার সৃজনশীল কাজের মধ্যে মোটামুটি এগুলোই। তার দুজন বিছানায় এসে সে আমাকে হাসির ইমোজি দিয়ে চ্যাটে নক করবে। আমি বেডের এই পাশে সে ওই পাশে। তার পানি খাওয়ার প্রয়োজন বোধ করলে চ্যাটে জানিয়ে দিবে, জান পানি খাবো। আগামীকাল নাকি আমার স্ত্রীর বান্ধবী হিয়া এবং তার হাজবেন্ড আমাদের বাসায় বেড়াতে আসবে। তাদের যেনো ভালোভাবে আপ্যায়ন করতে পারি তার জন্য প্রিপারেশন চলছে। আমি আজ জলদি বাসায় এসেছি কেনোনা জিনিয়া আমার হেল্প ছাড়া রান্না করবে না। আর রান্না না করলে আত্বীয় স্বজনদের আপ্যায়ন করতে পারবো না। মান সম্মান সব ধূলোয় মিশিয়ে যাবে। আমি রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম জিনিয়া ঘুমাচ্ছে। বড় দুইটা কাগজে বড় বড় করে লেখা।

প্রথম কাগজে লেখা ছিলো, জান বর বাবু দরজা খোলা আছে। ভেতরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে আমার পাশে ঘুমিয়ে যেও। আমাকে ডেকো না। আর আমার বান্ধবীরা আসবে তুমি ওদের সাথে রান্নায় হেল্প করিও। ইতি — তোমার অলস বউ। দ্বিতীয় কাগজে লেখা ছিলো। প্রিয় হিয়া ও তোর খাটাস হাজবেন্ড। আমরা জানি তুই আজ আমাদের বাসায় আসবি। দরজা খোলা আছে ভেতরে চলে আসিস । তোর হাজবেন্ড কে গেস্ট রুমে বসিয়ে দিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে খেতে দিস। তারপর কিচেন রুমে যাবি সেখানে রান্নার জন্য সমস্ত উপকরণ পাবি।

যেমন — পোলোয়ার চাউল -পিঁয়াজ বেরেস্তা- আদা বাটা- রসুন বাটা- জিরা বাটা- শাহি জিরা বাটা-জায়ফল ও জয়ত্রী বাটা- ধনিয়া গুঁড়া- মরিচে গুঁড়া- গরম মসলা গুঁড়া- তেল- ঘি- চিনি -লবণ – টক দই- গরম মশলা । ফ্রিজে মাংস রাখা আছে। সুন্দর করে পরিষ্কার করে গরুর মাংসের বিরিয়ানি রান্না করবি। আর শোন তোর খাটাস হাজবেন্ড যদি স্মোকিং করে আমার ড্রেসিং টেবিল এর ভিতর বডি স্প্রে এবং এয়ার ফ্রেশনার আছে, ওটা মেরে দিস।আমার কিন্তু সিগারেট এর গন্ধ একদম সহ্য হয় না। আমার বর একদিন সিগারেট খেয়েছিলা তাকে সারারাত বেলকুনিতে রেখে দিয়েছিলাম।

বাই দ্য ওয়ে, কিভাবে রান্না করতে হবে আমি সেটাও বলে দিচ্ছি— মাংস বড় টুকরো করে কেটে নিতে হবে। তারপর টক দই, আদা- রসুন বাটা, ১/২ কাপ বেরেস্তা, জিরা বাটা, শাহী জিরা বাটা, জায়ফল- জয়ত্রী বাটা, মরিচের গুরা, ধনিয়ার গুঁড়া, কালো এলাচ-লবঙ্গ- সবুজ এলাচ- দারচিনি- কালো গোল মরিচ- কাঠ বাদাম বাটা, গরম মশলা গুঁড়া দিয়ে মাখিয়ে রাখতে হবে। তারপর তেল গরম করে আস্ত গরম মশলার ফোড়ন দিয়ে মাংস কশিয়ে অল্প পানি দিয়ে রেঁধে নিতে হবে। আলু লাল করে ভেজে সাথে দিয়ে দিতে হবে। মাংসে ঝোল থাকবে না, মাখা মাখা হয়ে তেল ভেসে উঠবে। এবার হাঁড়িতে ঘি গরম করে আবার আস্ত গরম মশলা দিতে হবে। আগে থেকে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে রাখা চাল দিয়ে দিতে হবে।

বাকি বেরেস্তা গুলো দিয়ে চাল ভালো করে ভাজতে হবে। আলু বোখারা দিতে হবে। চাল ভাজা হয়ে গন্ধ ছড়ালে ফুটন্ত গরম পানি দিয়ে দিতে হবে। এরপর মাংস ঢেলে দিয়ে নারতে হবে ভালো করে। ১৫/২০ মিনিট পর ঢাকনা সরিয়ে উলটে পালটে দিতে হবে বিরিয়ানি। কেওড়া পানি ও কাচা মরিচ ছিটিয়ে আরও ১০ মিনিট দম দিয়ে পরিবেশন করতে হবে গরম গরম। তারপর রান্না হলে খাবার টেবিলে খাবার রেখে আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে দিস। তারপর মজা করে সবাই একসাথে খাবো। ইতি— তোর ID ( intelligent Devil) পুরো লেখা পড়ে আমি ওয়াশরুমে গেলাম মাথায় পানি নিবো। তারপর ওয়াশরুম থেকে এসে কাগজের নিচে খালি জায়গায় আমি একটু লিখে দিলাম

— আপু আমাকে ডাকবেন না। আপনারা রান্না করে সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া শেষ করে কিছু খাবার টেবিলে রেখে দিয়েন, ঘুম ভাঙলে খেয়ে নিবো।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত