জোৎস্না

জোৎস্না

“অদ্ভূত একটা বাসা। আজ আমার গায়ে হলুদ অথচ সবাই যে যার ঘরে নিজের মত করে মজা করছে। এর কোন মানে হয়? আমি একা ঘরে বসে আছি। কিসব কুসংস্কার সবার। আমি নাকি হলুদ গায়ে বের হতে পারবো না আজ। কিন্তু বাহিরে কি সুন্দর জোৎস্না। বাড়ির পিছনের পুকুরে কি সুন্দর চাঁদের আলো পড়েছে। লোভ ধরে আসছে আমার। একটু যদি পানিতে পা ভিজিয়ে গান গাইতে পারতাম”। তনু তার ঘরে বসে জানালা দিয়ে আকাশ বাতাস দেখছে আর মনে মনে ভাবছে।

ডানে বামে তাকিয়ে দেখলো মুরুব্বিরা এক ঘরে আড্ডা দিচ্ছে। মধ্যবয়স্করা পাড়ার এর ওর বাড়ির নাম দুর্নামে ব্যস্ত। আর যেগুলো জোয়ান ছেলেমেয়ে তারা একটা বাড়ির উঠানে গানের কলি খেলছে। আর গুড়াগাড়া পোলাপান গুলো কেউ ঘুমাচ্ছে। কেউ তার মা কে জ্বালাচ্ছে। বাড়ির চারপাশ মরিচবাতি দিয়ে সাজানো। আলো গুলো নিভিয়ে দিলে বেশি সুন্দর লাগতো। বাহিরে আজ এমনেই ভীষন আলো। চাঁদের আলো।

আহা কি সুন্দর!! তনু কোন কিছু কে পাত্তা না দিয়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে খুব আস্তে আস্তে নেমে গেলো। এই লোভ সে আর ধরে রাখতে পারলো না। কাল থেকে এই বাড়িতে আর থাকা হবে না। কাল থেকে সে নতুন পরিবেশে পা রাখবে। সেখানে ইচ্ছা হলেও সে বাইরে গিয়ে চাঁদের আলো ধরতে পারবে না। এই আফসোস তাকে একেবারেই ভেতরে ভেতরে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া যার সাথে তার বিয়ে হচ্ছে এই ভদ্রলোককে সে ঠিকমত চেনেও না। জানেও না। সে কেমন? সে কি পছন্দ অপছন্দ করে তনুর তা জানা নাই। বাবা মা ই পছন্দ করেছে ছেলেটাকে। ভাইয়ার অফিসে চাকরি করে ছেলেটা। ঢাকায় থাকে। একা একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে। শ্বশুর শ্বাশুড়ির ঝামেলাও নাই। তবুও তনুর ভয় করছে।

মনের অজান্তে খালি পায়ে হাটতে হাটতে তনু পুকুর পাড়ে চলে আসলো। পরনে হলুদ লাল পারের শাড়ি , গায়ে হলুদ মাখা। দু হাত ভরা চুড়ি, মাথার চুল গুলো খোলা। শীতকালের কুয়াশা তনুর আলতা মাখা পায়ের ছাপ ফেলে যাচ্ছে প্রতিটা পায়ের কদমে। ঠান্ডা কুয়াশাতে তার শরীর শীতল হয়ে যাচ্ছে। এতক্ষণে তার মনে হচ্ছে গায়ে একটা শাল দিয়ে আসলে ভালো হতো। পুকুরের পাড়ে গিয়ে পানিতে পা চুবানোর সাহস তনুর হচ্ছে না। এমনেই যেই শীত লাগছে। পানিতে পা দিলে তো সেই পা বরফ হয়ে যাবে। খুব আস্তে আস্তে সে পানিতে পা দিলো। পানি যতটা ঠান্ডা সে ভেবেছিলো ততটা ঠান্ডা আসলে না। পুকুরের পানি গরম। পা চুবিয়ে বসে পড়লো তনু। জোৎস্না , কুয়াশা , আর শীতের কাঁপাকাঁপি বেশ লাগছে তনুর। মনটা মুহূর্তে খারাপ হয়ে গেলো। আহারে কাল থেকে আর এখানে চাইলেই আসতে পারবে না সে। এ জায়গাটা তার কত পছন্দ একমাত্র সে আর তার মা ই জানে। বাড়ি থেকে গানের আওয়াজ ভেসে আসছে। ভালোই লাগছে তনুর। একটু পায়ের শব্দ পেয়ে তনু নড়েচড়ে উঠলো। বাড়ির কেউ হলে তো মেরেই ফেলবে।

– কে ? কে ঐখানে? তনু একটু উঠে দাড়ালো। এত অল্প আলো নদীর পারে যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

– এই কে ঐখানে? কথা বলে না কেন? সামনে থেকে একটা কন্ঠ ভেসে আসলো

– কি রে এত রাতে তুই এখানে কেন?
– ও তুই? আরে আল্লাহ আমি তো ভয় পায়া গেসিলাম রে..
– তুই ভয়ও পাস?
– হ্যাঁ পাই তো।
– আর কি পাস?
– অনেক কিছু।
– এখন বল এত রাতে এখানে কি করছিস?
– বাসার সবাই যে যার মত ব্যস্ত। এমন একটা রাতে যদি পুকুর পারে বসে পা না ভিজাতাম তাহলে মরেও আমার আত্মা শান্তি পেত না রে।

– তুই মরবি না।
– কেন?
– শয়তান এত তাড়াতাড়ি মরে না।
– দেখ ইফতি আমাকে জ্বালাইস না। কাল থেকে আমাকে আর পাবি না। তখন ঠিকই আফসোস করবি।
– হুম করবো। আফসোস

ইফতি তনুর ছোটকালের খেলার বন্ধু। তবে বয়সে ইফতি তনু থেকে কিছুটা বড়। সে এখন ঢাকায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। পাশাপাশি একটা কোচিং এর টিচার সে। তনুর বিয়ে শুনে সে এসেছে। ভালো ছেলে খুব। একেবারে শান্ত শিষ্ট একটা মানুষ। বাবা মায়ের একটা মাত্র ছেলে। ওর মা ঘরে পরে আছে ৪ বছর যাবৎ। প্যারালাইসিস হয়ে বিছানায় শোয়া সে । বাপ ছেলে মিলে টাকা উপার্জন করছে তার চিকিৎসার জন্য। ইফতিও তনুর পাশে গিয়ে পানিতে পা চুবিয়ে বসলো।

– ওরে কি ঠান্ডা রে। এর মধ্যে কেমন করে বসে আছিস? এ কেমন পাগলামী?
– হাহাহাহা ধুর বেক্কল। তুই এসব বুঝবি না।
– আচ্ছা বুঝলাম না।
– খালা কেমন আছে রে?
– আছে কোনরকমে।
– তুই এক কাজ কর। বিয়ে করে ঘরে বৌ নিয়ে আয়।খালাকে দেখাশোনা করবে। ভালো হবে।
– সময় হোক করবো। এই বলে ইফতি একটা নিশ্বাস ছাড়লো।

– কি রে তুই ঠিক আছিস তো?
– হুম ঠিক আছি। এখন পানিটা আগের মত ঠান্ডা লাগছে না। তোর গায়ে তো একটা শাল জড়াতে পারতি। শীত টীত লাগেনা নাকি?

– লাগে তো। কিন্তু এখানে এত শীত তা তো বুঝি নাই।
– তোর ভয় করে না ? এত রাতে এখানে যে বসে ছিলি যদি কোন সমস্যা হতো।
– ধুর বেক্কল কি সমস্যা হবে? হাহাহাহাহা
– তনু শোন।
– কি?
– আমি তোর “বেক্কল” ডাকটা খুব মিস করবো।

– এভাবে বলিস না। আমি তোকে প্রতিদিন একবার করে ফোন করে “বেক্কল” বলে ডাকবো।
– সেটার প্রয়োজন হবে না। তাছাড়া তুই আমাকে ভুলেই যাবি।
– আজাইরা কথা বলিস না তো। একদম ভালো লাগে না।
– আচ্ছা বলব না। ( এই বলে ইফতি তার গায়ের শাল নিয়ে তনুর গায়ে দিয়ে দিলো)
– আরে তোর শীত করবে তো। করবে না।
– কেন করবে না?
– ভিতরে আগুন জ্বলছে। তাই।
– ভিতরে আগুন জ্বলছে মানে?
– তনু তোর হাতটা ধরি?
– এর আগে তো কখনো অনুমতি চাস নাই। আজকে এত ভদ্রতা কেন? হুম? হাহাহাহাহা

ইফতি হাতটা বাড়িয়ে তনুর হাতটা ধরলো। তনু খেয়াল করলো এর আগের হাত ধরা এবুং আজকের হাত ধরার মধ্যে রাত দিন তফাৎ। আজকের হাত ধরায় মায়া আছে। কেমন যেন একটা টান আছে।

– তোর কথা খুব মনে পড়বে রে তনু।
– আমারো তোর কথা খুব মনে পড়বে। এখন মোবাইলের যুগ। যখন ইচ্ছা ফোন করবি। কোন কিছু ভেবে ফোন করা লাগবে না। মন চাইলেই ফোন করবি।
– তা কি আর হয়? জোৎস্নার আলোয় মনে হচ্ছে ইফতির চোখ ছলছল করছে।

– এই কিরে ? কি হইসে তোর?
– কিছুনা। একটা জিনিস শুনবি?
– শুনবো তবে আগে বল কি হইসে?
– কিছুনা। দাড়া শুনাচ্ছি।

ইফতি পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল আর হেডফোনটা বের করলো। তনুর কানে হেডফোন দিয়ে কিছু একটা বাজালো তনু। অনেক্ষণ হয়ে গেলো। তনু শুনছে। তনু স্তব্দ হয়ে শুনছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ৩৮ মিনিটের একটা অডিও রেকরডিং যাতে তনু ইফতি কথা বলছিলো। ইফতি তনুকে কিছু বলবে বলে শুরু করার অনেক্ষণ পর তনু কোন সাড়া শব্দ করে নি বলে ইফতি ফোনের লাইনটা কেটে দিয়েছিলো। যেখানে ইফতি বলছিলো “ তোকে অনেক ভালোবাসি রে। কিছুদিন অপেক্ষা করিস আমার জন্য। একটু কষ্ট হবে তবে কথা দিচ্ছি তোকে ভালো রাখবো”। আরো অনেক কথা।

কি আফসোসের বিষয় ইফতি ভেবেছে তনু তাকে ভালোবাসে না বিধায় ফোনের ওপাশ থেকে কিছু বলে নি। অথচ তনু এর একটা কথাও সেদিন শুনে নি। সে ফোনের ওপাশে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। আজ এতদিন পর এমন কথাগুলো শুনবে তা তনু কল্পনাও করে নি। তনুর কান থেকে হেডফোন সরিয়ে ইফতি বলল

– ভালোই করেসিস। আমার জন্য অপেক্ষা না করে। কি হত অপেক্ষা করে? চোখ মুছে ফেল। এই একটা রেকর্ডিং আমি আজীবন শুনবো। তোর আরো কিছু গান আছে আমার কাছে রেকর্ড করা। কথা দিচ্ছি কখনো কাউকে বলব না

– আমি তোকে ভালোবাসি। তনু তোর কাঁধে একটু মাথা রাখি? তনু কোন আওয়াজ করলো না। মাথা হালকা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি দিলো। ইফতি কিচ্ছুটা পাশে এসে বসলো। তনুর কাঁধে মাথা রেখে সে বলল

– যেখানেই থাক তুই ভালো থাক। আমি কাল চলে যাবো। এরপর আর এই গ্রামে ফিরবো না। বাবা আর মাকে নিয়ে কাল যাচ্ছি ঢাকায়। মায়ের চিকিৎসাটা মামা তার বাসায় রেখে তার খরচে করবেন। আমিও ভেবেছি আর এখানে ফিরবো নারে। এখানে আমার আর থাকার আসার কোন কারণই রইলো না রে।

– কেন? ইফতি তনুর ঘাড় থেকে নিজের মাথাটা হালকা তুলে বলল

– এখানে আর তুই থাকবি না। এখানে আমার আর কিছুই থাকলো না রে। তনুর গা শিরশির করছে। শীতে না। অশান্তিতে ।। রাত পোহালে তার বিয়ে। সে এত রাতে ইফতির পাশে বসে আছে।

– ইফতি তুই ইফতি তনুর মুখে হাত চেপে বলল

– কিছু বলিস না। সুখে থাকিস। অনেক রাতে হইসে বাড়িতে যা। আমি কিছুক্ষণ এখানে বসে থাকবো। প্লিজ যা।। তনু উঠে দাঁড়ালো। ইফতি বসে আছে ঘাটে পা চুবিয়ে।

– ইফতি শোন।
– না কিছু শুনবো না। তনু পিছনের দিকে পা বাড়াচ্ছিলো। এমন সময় ইফতি বলে উঠলো

– একটু দাঁড়া।

তনু দাঁড়িয়ে গেল মূর্তির মত করে। ইফতির চোখ চিকচিক করছে। ও কাঁদছে। বিয়ে বাড়ির মরিচ বাতিগুলো নিভে গেলো। পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গিয়েছে। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যারা গানের কলি খেলছিলো তাদের গানের আওয়াজ এখন আগের চাইতেও পরিষ্কার। ইফতি তনুর সামনে এসে বলল –

– তোরে একটু জড়ায়া ধরলে কি পাপ হবে ?

তনু কোন আওয়াজ না করে ইফতি কে জড়িয়ে ধরলো। বাড়ির ভেতর থেকে গানের আওয়াজ আসছে “ ও আমি যদি ডুইবা মরি। কলঙ্ক তোমার হবে ফুপিয়ে কান্নার কোন আওয়াজ হয় না। কিন্তু বুক ভার হয়ে আসে। তনু ফোঁপাচ্ছে। শীতের বিন্দু পরিমান আভা তাদের মধ্যকার দূরত্বের মধ্যে যেতে পারছে না। এতটা পাশ থেকে ইফতিকে তনু এই প্রথমবার ধরে কাঁদছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় হয়ত বাড়ির ভেতরের মানুষের মনে এসেছে তনু বাড়িতে নেই। বাড়ির ভেতর থেকে কয়েকটা গলা শোনা যাচ্ছে যারা তনুর নাম ধরে ডাকছে। ইফতির চোখ এতক্ষণ বন্ধ ছিলো। সে চোখ মেলল

– তনু বাড়িতে তোকে খুঁজছে। চোখটা মুছে বাড়িতে যা। তনু আরো জোরে ইফতিকে জড়িয়ে ধরলো। যেনো সে তার জীবনকে বাঁচাচ্ছে অক্সিজেনের মাধ্যমে। বাড়ি থেকে কেউ বেরিয়ে আসার আগে ইফতি তনুকে ছাড়িয়ে দিলো। কপালে হালকা করে তাকে আদর করে বলল

– বাড়ি যা। ভালো থাকিস। বেকুব তোকে অনেক ভালোবাসত রে।

অন্ধকারে ইফতি মিলিয়ে গেলো। তনু এপাশ ওপাশ হেটেও আর ইফতিকে পেলো না। বাড়ি থেকে অনবরত সবাই খুঁজেই চলেছে। আর তনু ইফতিকে। রাত পোহালে যে অন্য কারো ঘরের স্ত্রী হবে সে আজ অন্য কাউকে খুঁজছে। অন্ধকারে এপাশ থেকে ওপাশে হাতরিয়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ইফতিকে। অশান্ত হয়ে যাচ্ছে তনু। জোৎস্নার আলোটাও কমে এসেছে। কুয়াশায় চারিদিক ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছে। বাচ্চাদের মত নাক মুছতে মুছতে তনু আস্তে আস্তে ডাকছে যাতে অন্য কেউ না শোনে।

তনুর এভাবে কেন খুঁজছে ইফতিকে? কিছুক্ষণ আগেও তো সব ঠিক ছিলো। কালকে বিয়ে হবে। এরপর সে আবার বিয়ের পর পড়াশোনা শুরু করবে ঢাকায় গিয়ে । স্বামীর নতুন বাসায় অনেক গুলো ফুলগাছ লাগাবে। আর থাকবে হরেক রকমের পাখি। যাদের কানে কানে তনুর অনেক কিছু বললেও তারা কাউকে বলবে না। যেই পাখিদের সে বলবে তার ছোটকালের বন্ধুকে ভালোবাসার গল্প যেটা সে তাকে আজও বলতে পারলো না।

হ্যাঁ সে ও অত্যাধিক পরিমানে ভালোবাসে এই ইফতিকে। যার মাসে একবার ঢাকা থেকে ফেরার অপেক্ষায় তনু স্টেশনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ইফতিকে জানিয়েছিলো তনু তার বিয়ের কথা। ছেলেটা তো তখনও কিছু বলল না। আরো হেসে হেসে বলল “ যা বাবা এবার অন্য কারো মাথা খা। আর কতদিন আমারটা খাবি”? তার মানে হলো ইফতিও তনুকে ভালোবাসতো। অথচ কোনদিন বলতে পারে নি। তনু হন্য হয়ে খুঁজে যখন ব্যর্থ তখন পিছন থেকে কেউ একজন এসে ওর গায়ে হাত দিলো

– কি ব্যাপার? এত রাতে এইখানে কি করসিস? তনু নাক টানতে টানতে বলল

– বুবু এদিক কাউকে যেতে দেখেছো?
– না। কাকে? কি হইসে? কাঁদতেসিস কেন? ঐ তনু কি হইসে রে?

তনু তার বড় বোনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো। বাড়ির সবাই তনুর কান্না দেখে ভয় পাচ্ছে। সে কিছু বলছেও না যেটা শুনে তারা একটু মন শান্ত করবে। শতবার জিজ্ঞাসা করার পরও সে কোন উত্তর দিলো না শুধু কেঁদে যাচ্ছে। ঘরে গিয়ে নিজের মোবাইল হাতে নিয়ে ফোন করে যাচ্ছে ইফতিকে। ফোন বন্ধ। এত রাতে ওর বাড়ির বাইরে বের হওয়াও সম্ভব না। দু চারজন মুরুব্বি তো মুখের উপর বলেই ফেলল “ অনেক অশুভ একটা কাজ করে ফেলসিস লো মাথারি। এই পোশাকে বাইরে তাও আবার পুকুর পারে গিয়ে আসসিস এত রাতে। অনেক বড় কোন ভিপদ হবে” তনু তাদের বুঝিয়ে বলতে পারবে না। তার অনেক বড় বিপদই হয়ে গিয়েছে। ইফতি বোধহয় হারিয়ে গিয়েছে।

সকাল হয়ে গেলো। কিন্তু তনুর কান্না থামলো না। ইফতির শাল গায়ে পেঁচিয়ে সে ইফতির জন্য কাঁদছে। বাদ জুম্মা বরপক্ষ আসবে। সবাই সেই প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, পাশাপাশি ব্যস্ত তনুর কান্না নিয়ে। কি এমন ঘটেছে যার কারণে এভাবে কেঁদেই যাচ্ছে তনু। তনুকে গোসল করানো হলো। এর মধ্যে মামাত ভাইকে ইফতির বাড়িতে পাঠিয়ে জানা গেলো তারা সবাই ঢাকার উদ্দ্যেশ্যে রওনা হয়েছে খুব ভোরে। বাড়ির মূল দরজায় ঝুলছে তালা। খুব বিপদ হয়ে গেলো। তনুকে বিয়ের শাড়ি পড়ানো হচ্ছে। বৌ সাজানোর জন্য লোক এসেছে বাড়িতে। তনুর কান্না বন্ধ হয়ে গিয়েছে তবে স্থির হয়ে আছে সে। কোন কথা বলছে না। তনুর বাবা এসে বললেন “এই শুনো তাড়াতাড়ি করো তোমরা। ওরা তো রওনা হয়ে গিয়েছে”।

বুকের ধরফর টা আরও বেড়ে গেলো। আহারে এই কথাগুলো যদি আর কয়টাদিন আগে সে জানতে পারতো। কাল রাতেও যদি ইফতি তনুর হাত জড়িয়ে বলত “ চল পালাই”। তনু মানা করতো না। আজ সে বুকে আগুন জ্বালিয়ে চলে গিয়েছে। হৈ চৈ হচ্ছে বিয়ে বাড়িতে। আর কিছুক্ষণ পর বিয়ে। যেখানে বিয়ে হবে শরীরের সাথে, যেখানে মনের কোন বসবাস হবে না। ইফতির ফোনটা বন্ধ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তনু প্রস্তুত তার শরীরকে অন্যের নামে করতে। বিয়েটা কিছুক্ষণপর।

তনু বিয়ের জন্য প্রস্তুত। কিছুক্ষণ পর হয়ত তার ঘররে কাজী সাহেব আসবে তার মুখ থেকে “ আলহামদুলিল্লাহ কবুল” শুনতে। মনের বিরুদ্ধে একটা বিয়ে নিশ্চয়ই পাপই হবে। যেখানে স্বামীর সাথে এক বিছানায় রাত পার করেও সে অন্য কারো কথাই ভাববে। চারিদিকে গান বাজনার আওয়াজে কিছুই শোনা যাচ্ছে না। তবে হৈ চৈ হচ্ছে নিচে তা বোঝা যাচ্ছে। হয়ত বর পক্ষ চলে এসেছে। তনুর ঘরের দরজায় কেউ এসেছে। তনুর চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। সে শ্বাস নিতে পারছে না। বুকটা হাহা করছে। একটা নিশ্বাস ছেড়ে সে তার চোখ বন্ধ করে নিলো।

আজও তনুর সেই দিনের কথা মনে পড়লে দম বন্ধ হয়ে আসে। জীবন থেকে আঠারোটা বছর কেটে গিয়েছে। তনু সিএনজি তে বসে কাপড়ের আঁচল দিয়ে চোখ মুছে চলছে। মেয়ের কলেজে আজ অভিভাবক দিবস। সেখানে তাকে থাকতে হবে। মেয়েটা চোখের সামনে বড় হয়ে গিয়েছে। সেদিনের কথা জোৎস্নাকে প্রথম কোলে নিয়ে তনু জড়িয়ে ধরে বলেছিলো “ তুই ই আমার একমাত্র বেঁচে থাকার সম্বল হবি মা” সময় কত তাড়াতাড়ি চলে যায়। এই আঠারো বছরে তনু দিনে আঠারো বার বিয়ের দিনের কথা মনে করে কেঁদেছে। কলেজের গেইটে চলে এসেছে সিএনজি। ভাড়া দিয়ে চোখের চশমাটা খুলে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে চোখে পড়ে নিলো তনু। দু একটা চুলও পেকে গিয়েছে তার। আগের মত প্রাণবন্ত সে নাই। দরজা দিয়ে ঢুকতেই জোৎস্না কোত্থেকে যেনো উড়ে এসে মা কে জড়িয়ে ধরে বলল

– উফ মা ইউ আর অলয়েজ লেট। প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গিয়েছে।
– স্যরি রে। রাস্তায় জ্যাম ছিলো।
– হুম বুঝেছি। আসতে আসতে আবার কেঁদেছো না?
– কই না তো।

– দেখো মা মিথ্যা বলবা না আমাকে। আর আরেকটা কথা তুমি কিন্তু আমাকে সবার সামনে জোৎস্না জোৎস্না বলে ডাকবা না। আমার ক্লাসমেটরা এই নাম শুনলে আমাকে খেপাবে। তুমি আমার ভালো নাম ধরে ডাকবা। ইফতিয়ারা মেহনাজ। এটাই সুন্দর।

– হাহাহাহা। আচ্ছা রে বাবা।
– মা আসো আসো। তোমাকে অনেকের সাথে পরিচয় করানোর আছে। আমার বান্ধবী। তাদের মা। আর আমার প্রিয় টিচারগুলোর সাথেও আজ তোমার পরিচয় করিয়ে দিবো।
– আচ্ছা।

জোৎস্না মায়ের হাত টেনে নিয়ে গেলো কলেজের ভেতরে। কত মানুষ সেখানে। তনু এত মানুষের মাঝে গেলে ঘাবড়ে যায়। তনুকে একটা জায়গায় বসিয়ে জোৎস্না স্টেজের কাছে চলে গেলো। কিছুক্ষনপর পর এসে একেক জনের সাথে পরিচয় করিয়ে আবার হারিয়ে যায় মেয়েটা। মাঠের ধুলো এসে বারবার তনুর চশমা ঘোলা করে দিচ্ছে। চশমাটা হাতে নিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে চশমা মুছা অবস্থায় জোৎস্না নিয়ে আসলো তার এক শিক্ষককে। সালাম দিয়ে তনু চোখে চশমা পড়তেই থমকে গেলো। চারিদিক যেন শব্দশূণ্য পরিস্থিতি। বড় বড় মাইকের আওয়াজও তনুর কানে যাচ্ছে না। যাচ্ছে না জোৎস্নার বকবক।

তনুর চোখ গড়িয়ে পানি বের হতে চাইছে। কিন্তু লোকলজ্জায় তাও আজ স্থির হয়ে আছে। আঠারো বছর আগে সেই জোৎস্না রাতে যাকে তনু শেষবার দেখেছিলো। হ্যাঁ সে। ইফতি…জোৎস্নার শিক্ষক। উভয় পক্ষই খুব চুপ। যেনো ঝড়ের পূরবে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতর। পাজর ভেঙ্গে যাওয়ার ব্যাথা কেমন তা তনু জানেনা। তবে আজ মনে হচ্ছে সেই ব্যাথাও কমই হবে। অন্তত শ্বাস বন্ধ হবে না। তনুর শ্বাস টান শুরু হলো। জোৎস্না ভয় পেয়ে গেলো এই অবস্থা দেখে। সে তনুর ব্যাগ থেকে ইনহিলার বের করে তনুর মুখে দিয়ে পাম্প করছে।

– মা কি হইসে তোমার? জোৎস্নার মুখে মা ডাকটা শুনে ইফতিরও যেনো দম টা থেমেই যাচ্ছে। সেও তনুর এই অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হয়ে গেলো। দৌড়ে পানি নিয়ে আসলো তনুর জন্য। পানির গ্লাস সামনে বাড়িয়ে বলল

– নেন পানিটা খেয়ে নেন। তনু কাঁপাকাঁপা হাতে গ্লাস নিয়ে বলল

– ধন্যবাদ।

জোৎস্না তার মায়ের এই অবস্থা দেখে আর অনুশঠানে রইলো না। স্যারের কাছে অনুমতি নিয়ে মা কে নিয়ে চলে গেলো সোজা বাসায়। সন্ধ্যায় সে কিছুটা সুস্থ বোধ করছে। সেই রাতে তনুর ঘুম হলো না। সারা রাত তার ভাবনা ছিলো “ ইফতির নিজের একটা জগৎ আছে। সেখানে সে হয়ত বৌ বাচ্চা নিয়ে ভালোই আছে। চোখ লুকিয়ে নিচ্ছিলো সে। নিশ্চয়ই তনুকেও ভুলে গিয়েছে সে এতটা বছরে”।

কষ্ট হচ্ছে তনুর খুব কষ্ট হচ্ছে। তার যখন খুব কষ্ট হয় তখন সে ডায়েরি লিখে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। জোৎস্না লুকিয়ে লুকিয়ে সে ডায়েরি পড়ে যেটা তনু জানে না। প্রতিবারের মত মায়ের ডায়েরি পড়াটা সে মিস করেনি। সকাল বেলা যখন তনু হাটতে যায় তখন সে লুকিয়ে তার ডায়েরি পড়ে। সেই সুবাদে তনুর বিগত আঠারো বছরের পেয়ে আসা কষ্ট সম্পর্কে তার সব জানা আছে। আজকের ডায়েরি পড়াটা তার প্রয়োজন ছিলো। শুধু পড়া না সেটাকে কারো কাছে পৌঁছে দেওয়াও তার প্রয়োজন। তনু বাসায় ফেরার আগেই জোৎস্না টুপ করে কলেজের ব্যাগে ডায়েরি টা ভরে ফেলল। কলেজের জন্য যখন সে রওনা হবে তখন তনু বলে উঠলো

– কিরে শরীর খারাপ?
– না মা ঠিক আছি।
– এমন দেখাচ্ছে কেন? রাতে ঘুমাস নাই?
– ঘুমাইসি। আজকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা আছে মা। দোয়া কইরো।
– এটা কি আবার বলে দিতে হয় রে?
– আসি মা।
– আল্লাহ হাফেজ। তাড়াতাড়ি চলে আসিস।
– আচ্ছা।

কলেজের গেইটে ঢুকেই সে টিচার্স রুমে কাউকে খুঁজছে কিন্তু সে নাই। কি আশ্চর্য যাকে সে খুঁজে চলেছে সে ই তনুর শ্রেনীকক্ষের বাইরে অপেক্ষা করছে। ইফতি অপেক্ষা করছে। জোৎস্নাকে দেখেই সে এগিয়ে এসে বলল

– তোমার মায়ের শরীর কেমন এখন?
– ভালো নাই।
– কি বলো? ডাক্তার দেখিয়েছো?
– না স্যার।
– কেনো?
– মায়ের এমন প্রায়ই হয়। আঠারো বছর আগের ঘা এখনো শুকায় নাই। বুকের মধ্যে জ্বালাপোড়া দিয়ে উঠে। ইফতির গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেলো। সে বুঝতে পারলো জোৎস্না সব জানে।

– স্যার এই ডায়েরি টা সময় হলে পড়ে নিবেন। ভেতরে একটা চিঠি আছে। সেটা আমার লেখা। সেটাও পড়ে নিবেন প্লিজ।
– কার ডায়েরি?
– আমার মায়ের।

ডায়েরি হাতে ধরিয়ে জোৎস্না ক্লাশে ঢুকে গেলো। ইফতি কিছুক্ষণ হাতিয়ে নিজের টেবিলে চলে গেলো। এর পরে প্রায় ২/৩ টা ক্লাশ সে নিলো না। ডায়েরি পরে তনুর গত আঠারো বছরের প্রতিটা প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো। ডায়েরি পড়া শেষে ইফতি চোখ মুছতে মুছতে জোৎস্নার দেওয়া চিঠিটা হাতে নিলো। “ স্যার,

আসসালামু আলাইকুম। আপনার নাম নিজের সাথে জড়িয়ে আছি বিগত ১৭ বছরের বেশি ধরে। কখনো বুঝি নাই আমার নামটা রাখার পিছনের মানুষটা আপনি। আমার মা আপনাকে অনেক ভালোবাসতেন। সেটা হয়ত এই ডায়েরি পড়ে বুঝতে পেরেছেন। তবে অনেক কথাই এখানে লেখা নাই স্যার। আমার মা সে আসলে আমার মা না। আমাকে জন্ম দেয় নি তিনি। যেদিন মায়ের বিয়ে ছিলো সেদিন বরপক্ষকে আনতে আমার বাবা স্টেশনে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে রাস্তায় তাদের গাড়িটা দুর্ঘটনায় দুমড়ে মচড়ে যায়। সাথে আমার বাবার লাশ টাও। বাড়িতে নেমে আসে শোক। আমার মা তখন অন্তঃসত্ত্বা।

গ্রামের মানুষের ভাষ্য অনুযায়ী বিয়ের আগের রাতে মেয়ে জোৎস্না দেখতে গিয়েছিলো বলেই এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। সবাই তনু মা কে দোষ দিচ্ছিলো। আমার মা তখন স্বামী হারানোর শোকে পাগল প্রায়। বাড়ির সবাই তখন তনু মাকে দোষ দেওয়ায় ব্যস্ত। বিয়ের স্বামী মরা মেয়েকে আর কেউ বিয়েও করবে না এই কষ্টে সবাই যেমন ছিলো চিন্তিত ঠিক সেসময় তনু মা ছিলো খুশি। কারণ তাকে অন্য কারো হতে হয় নি। আমার মা আমাকে যেদিন জন্ম দেন সেদিনই আমাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর তনু মা ই আমাকে মানুষ করেছে। সময়ে অসময়ে সব ইচ্ছা পূরণ করেছে।

আমার ভালো পড়াশোনা করার জন্য সে ঢাকায় এসেছে। আমাদের এখানের খরচ আমার দাদা ভাই ই চালান। মা ভাবেন আমি জানিনা এই ঘটনা। তিনি আমাকে বাবার কথা জিজ্ঞেস করলেই বলে – সে সড়ক দুরঘটনায় মারা গিয়েছে। বাবার সম্পর্কে বেশি জানতে চাইলে তা আর বলেন না। আমি তনু মায়ের বড় ভাইয়ের মেয়ে। আমার বাবা তার ভাই ছিলো। একটা কথা ছিলো স্যার আপনার কি এই ১৮ বছরে একবারো তনুর মায়ের খোঁজ নিতে ইচ্ছা করে নি? পারলে উত্তর দিবেন। হয়ত আপনার একটা সুখের সংসার আছে। কিন্তু আমার মা তো কিছুই পেলো না। সবই হারালো। জীবন যৌবন সব। কেন সেদিন অপেক্ষা করলেন না? কেন জোৎস্নার রাতে আমাবস্যার মত আড়াল হয়ে গেলেন? অনেক প্রশ্ন আমার আপনার কাছে। জানি উত্তর দিবেন না। একটা কথা বলে রাখি স্যার “ আমার মা ভালো নাই একেবারেই না”

ইতি

ইফতিয়ারা জোৎস্না।

ইফতিরও অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করছে আজ। বলতে ইচ্ছা করছে সেও বিয়ে করে নি। সে আজও তনুর স্থানে আর কাউকে ভালোবাসতে অথবা ভাবতে পারে নি। তনুর বিয়ের পরে একবারো তার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে নি। কেউ তার সামনে তনু বলে উচ্চারণ করলেই সে বলে উঠতো “ কথা বলার কি আর কিছু নাই?”। একটা বার যদি কারো কথা সে শুনতো তাহলে এতটা বছর দুইজনকে আলাদা থাকতে হত না। সে এখনো তনুকেই ভালোবাসে। ছুটির সময় হয়ে এসেছে। জোৎস্না বের হওয়ার সময় ইফতি তার হাতে ডায়েরি বুঝিয়ে দিলো। সাথে বলল

– আজ রাতের ট্রেনে তোমার মা কে নিয়ে গ্রামের বাড়ি আসতে পারবে?
– কেন স্যার?
– যেই জোৎস্নায় হারিয়েছিলাম সেই জোৎস্নায় তোমার মাকে আমার হাতে তুলে দিবে? জোৎস্না কেঁদে উঠলো।

– আমার মা কে আপনি।। এত বছর পর
– হ্যাঁ এত বছরে আমিও বিয়ে করি নাই।
– স্যার !!
– আমাকে বাবা ডাকবে জোৎস্না?

জোৎস্না আর কিছুই বলতে পারলো না। সে বাসায় গিয়ে মায়ের কাছে বায়না ধরলো আজই দাদার বাড়ি যেতে হবে। মা এত শীতে যেতে রাজি না। এক মুহূর্তে যখন জোৎস্না কেঁদে উঠলো তখন সে রাজি হলো। ট্রেনের টিকিট না পেয়ে পরদিন সকালে বাসে রওনা হলো দুজন। বাড়ি গিয়ে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে গেলো। খাওয়া দাওয়া সেড়ে জোৎস্না খুব করে জোর করলো তনুকে সে আজ পুকুর পারে গিয়ে জোৎস্না দেখবে। তনু এই শীতে কোনভাবেই রাজি না। কিন্তু মেয়ের কথা তো শুনতেই হবে। এই বায়না সে ফিরাতে পারে না। অবশেষে দুই মা মেয়ে রাতে পুকুর পারে গিয়ে বসলো। জোৎস্না পুকুরে পা চুবিয়ে বসতেই তনু বল

– এ কি? এত শীতে পা চুবিয়ে বসেছিস পানিতে? জ্বর আসবে তো।
– না মা আসবে না। ওমা তুমি শাল গায়ে দেও নি কেন?
– আমার শালটা ভুলে ঢাকায় রেখে এসেছি মনে হয় রে। ব্যাগে অনেক খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না।
– সে কি তাই বলে এমনে থাকবা? তুমি বসো। আমি বাড়ি থেকে আরেকটা শাল নিয়ে আসি।
– অন্ধকারে যেতে পারবি একা?
– অন্ধকার কই মা? জোৎস্না আজকে। কত আলো দেখো।

জোৎস্না তনুকে বসিয়ে বাড়ির ভেতর গেলো। তনু কিছুক্ষনপর নিজেও পানিতে পা চুবিয়ে আঠারো বছর আগে ফিরে যেতে চাইলো। আহা সেই রাত। আহা সে জোৎস্না।। কত কি হারিয়ে ফেলল। ইফতিকে, ভাইয়াকে , ভাবীকে আর এক হতভাগাকে যে তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো। একটা নিশ্বাস ফেলে সে পা দুলাচ্ছে। ঠিক সে সময় পিছন থেকে কেউ তার শরীরে শাল পেঁচিয়ে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে।

– কিরে জোৎস্না এভাবে জড়িয়ে ধরেছিস কেন? তনুর ঘাড়ের পাশে কেউ বলছে

– তোর ঘাড়ে একটু মাথা রাখি?

তনুর ঘুরে দেখতে ইচ্ছা করছে না। এটা তার স্বপ্ন হলে সে চায় এই স্বপ্ন না ভাঙ্গুক। সে কোন উত্তর দিলো না। ইফতি আবারো বললো

– আমাকে মাফ করবি? এই আঠারো বছর আমিও মরার মতই বেঁচে ছিলাম। বাকীটা জীবন আমার সাথে আমার বৌ হয়ে থাকবি? কথা দিচ্ছি জোৎস্নাকে তোর মতই ভালোবাসবো। ও হবে আমাদের বাকী জীবনের ভিত্তি।

এইবার তনু ফোঁপাচ্ছে। সে নিশ্চিত এটা স্বপ্ন না। সে ইফতির দিকে ঘুরে তাকে জড়িয়ে ধরলো। সে কাঁদছে। অনেক প্রশ্ন ছিলো কিন্তু করা হলো না। অনেক কিছু জানার ছিলো যা ইফতি মাত্র দু লাইনে বলে ফেলেছে। খুব দূর থেকে জোৎস্না পুকুর পারে ঘটে যাওয়া একটা প্রাণবন্ত ভালোবাসা দেখছে। চারিদিক নিশ্চুপ কিন্তু তারা নিশ্চুপ থেকেও একে অপরের বুকে আশ্রয় নিয়ে বলে যাচ্ছে ঘটে যাওয়া ১৮ বছরের কষ্ট। কি সুন্দর জোৎস্না আজ। চারিদিক পরিপূর্ণ।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত