আশালতা

আশালতা

একবার নয়, দুইবার নয়, চারবার ফিরিয়ে দিয়েছি আমি শিমুকে। জানিয়ে দিয়েছি, আমার পক্ষে তাকে ভালোবাসা অসম্ভব। বারবার কারণ জানতে চেয়েও আমার কাছ থেকে যুক্তিসঙ্গত কোনো উত্তর পায়নি। আর তাই তো বারবার ফিরিয়ে দেয়ার পরও শিমু আবার প্রেম নিবেদন করে। গতকাল ফিরিয়ে দিতে আমারও খারাপ লেগেছিল। কিন্তু ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া যে আমার আর কিছুই করার নেই। শিমু অবশ্য গতকাল রাগ দেখিয়ে বলেছিল, আমি কি দেখতে অসুন্দর? আমি তোমার অযোগ্য? কাউকে ভালোবাসো তুমি? কারো সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে তোমার? তাহলে কেন ফিরিয়ে দেও আমাকে? আমি তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দেইনি। কারণ শিমুকে ভালোবাসতে না পারার কারণ এগুলোর কোনোটাই না।

আমি আর শিমু দু’জনই লেখাপড়া করি নরসিংদী সরকারী কলেজে। ছোটবেলা থেকে কখনো কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়নি আমার। কয়েকবার যে বন্ধুত্ব তৈরী হয়নি তা কিন্তু না। বন্ধুত্ব টিকে না আমার কারো সাথে। যাকে আপন ভেবে বন্ধুত্ব করি সে বন্ধুই একটা সময় আমার দুর্বল জায়গায় আঘাত করে। কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেও আমি একা একা চলার চেষ্টা করেছি দিনের পর দিন। নরসিংদী সরকারী কলেজের তমালতলা সবসময় আড্ডায় পরিপূর্ণ থাকত। আমি বসে থাকতাম অনার্স ভবনের সামনে, ঘাসে ভরা মাঠে। আমার মতো অনেকেই বসে থাকত। কিন্তু তাদের সাথে সঙ্গী, সাথী, বন্ধু-বান্ধব থাকে সবসময়। আমিই কেবল একা, খুব একা। জন্মের পর থেকেই একা।

শিমুকে যেদিন প্রথম দেখি তার সাথে বান্ধবী ছিল। অবশ্য এখনও কলেজের বেশিরভাগ সময় দুই বান্ধবী একসাথেই থাকে। অনার্স ভবনের পশ্চিম দিকে একটি গাছ। আমি গাছটির নাম জানি না। জগতে এত এত গাছ। কত গাছের নাম মানুষ জানে? কিন্তু আমার ধারণা এই গাছটি অনেকেই চিনে। কেবল আমারই চেনা হয়নি। অজানা গাছটির একটি ছায়া পড়ত। অবশ্য অনার্স ভবনের জন্য বিকেলের রোদ ততটা আঘাত করত না মাঠে থাকা শিক্ষার্থীদের। তবুও আমি গাছটির ছায়ায় বসে থাকতাম।

ছোট বেলা থেকে কেবল নানা নানীর ছায়ায় বড় হয়েছি। আর কলেজে এই গাছটির ছায়া। গাছটির নাম না জানলেও আমি তার নাম দিয়েছি আশালতা। যদিও এই গাছে কোনো লতা নেই। চার পাঁচদিন বসার পর একদিন এসে দেখি আমার জায়গায় দুটো মেয়ে বসা। আমার খুব হিংসে হলো। আশালতা শুধু আমাকে ছায়া দিবে। এত বড় মাঠ থাকতে মেয়ে দুটোর এখানে বসতে হবে কেন? মাঠে কিছুক্ষন পায়চারি করার পর দেখলাম মেয়ে দুটো উঠে গেছে। উঠার সাথে সাথে এক প্রকার দৌড়ে এসে আমি আশালতা গাছের নিচে বসে পড়লাম। মিনিট পাঁচেক পর মেয়ে দুটো ঝালমুড়ি হাতে ফিরে এলো। আমাকে দেখে মনে হয় খুশি হতে পারেনি। কিন্তু তাদের চেহারায় বিরক্তির কোনো ছাপ নেই। তবুও আমি উঠতে চাইলাম। চুলে বেণী করা মেয়েটি বলল, থাক আপনাকে উঠতে হবে না।

আমিও মনে মনে ভাবলাম, যাক ভালোই হলো। মেয়ে দুটো দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাচ্ছে। বেণী দুলানো মেয়েটি আবার বলল, জায়গাটি আপনার খুব প্রিয়, তাইনা? আমি মুচকি হাসি দিয়ে আগ্রহভরে বললাম, হ্যাঁ। এই গাছটি ও তার ছায়া আমার খুব প্রিয়। আমি তার নাম দিয়েছি আশালতা। বলে আবার আমার মুখের হাসিটা বিলীন হয়ে গেল। এতদূর বলা ঠিক হয়নি। মেয়েটি বলল, বাহ, অনেক সুন্দর নাম। আমি কৃতজ্ঞতার চোখে তাকিয়ে দেখি মেয়ে দুটো চলে যাচ্ছে। একটা অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করল। মনে হলো আমি তাদের তাড়িয়ে দিয়েছি।

এর পরেরদিনও মেয়ে দুটো এলো। আমার আশালতা গাছের নিচে বসার অনুমতি চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুন্দরী মেয়েদের অনুরোধ না রাখার মতো পুরুষ খুব কমই জন্মেছে এই পৃথিবীতে। আমিও তাদের অনুরোধ ফেলতে পারিনি। তারপর থেকে আশালতা গাছের ছায়া পাবার অংশীদার আরো দু’জন বেড়ে গেল, শিমু আর সাথী। তাদের সাথে পরিচয়টা তৃতীয় দিন। দুই বান্ধবীর বাড়ি একই সাথে। বীরপুর থেকে দুই বান্ধবী একসাথে আসে কলেজে।

প্রতিদিন কথা বলতে বলতে কখন যে আমাদের তিনজনের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরী হয়েছে আমরা জানি না। আমি কথা একটু বেশি বলতাম। আমার তো আর বন্ধু বান্ধব ছিল না। জীবনের অনেক ছোট ছোট গল্প, হাসি ঠাট্টা অনেক কিছুই করা হয়নি কারো সাথে। তাই তাদের সাথেই ছিল বন্ধুত্বের সব লেনাদেনা। তবে শিমুর প্রতি আমার আলাদা টান ছিল, এখনও আছে। আমি তা কখনো তাকে বুঝতে দেইনি। শিমু যখন একনাগারে কথা বলতে থাকে আমি অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকি। কথা বলার সময় হাত নাড়িয়ে কথা বলে মেয়েটা। যখনই আমার মন শিমুকে ভালোলাগার আসনে বসাতে চেয়েছে তখন আমিই পশ্রয় দেইনি। দূরে সরানোর চেষ্টা করেছি মন থেকে। আমার যে ভালোবাসতে মানা।
কিন্তু যখন শিমু আমাকে প্রথম দিন প্রেম নিবেদন করেছিল তখন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারিনি। শিমু সেদিন প্রথম সাথীকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে বলেছিল, তুই যা।

আমার একটি কাজ আছে। তমালতলা পুকুর ঘাটের সিড়িতে বসে দু’জনে পা ভিজিয়ে বসেছিলাম। আমার দিকে শিমু তাকিয়ে আছে। আমি দুইবার চোখ ফিরিয়ে নেবার পরও তাকিয়ে আছে। হুট করে বলে বসল, “শাকিল আমার মন বলছে আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার মনও কি আমার মতো একই কথা বলে?” আমি উঠে চলে আসার সময় বললাম, না, না। কী সব বলছ? আমরা তো ভালো বন্ধু। শিমুর চেহারায় শ্রাবণ মাসের আকাশের মতো মেঘের ঘনঘটা। এই বুঝি বৃষ্টি ঝরাবে। মাথা নিচু করে বলল, তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসো? সাথীকে বা অন্য কাউকে? আমি তখনও অস্বীকার করে বলেছি, না আমি কাউকে ভালোবাসি না আর বাসবও না।

এর পর আরো তিনবার ফিরিয়ে দিয়েছি। গতকাল শিমু শেষ পর্যন্ত কেঁদেই দিয়েছে। আজ নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে। শিমু আর সাথী ক্লাসরুমে বসে আছে। এই সময়টায় ক্লাস হয় না। আমরা আশালতা গাছের নিচে আড্ডা দেই। কিন্তু শিমু বা সাথী কেউ আসেনি আজ। নিজেকে আজ আবার খুব একা লাগছে। আশালতা গাছটির মতো একা। পকেট থেকে মোবাইল বের করে শিমুতে ফোন দিতে চেয়েও দেইনি। ছোট একটি মেসেজে লিখেছি, “সাথিকে চলে যেতে বলিও। তমালতলা নয়, আশালতার নিচে অপেক্ষা করব। অনেক কথা বলার বাকি।” দুই মিনিট পর শিমু উপস্থিত। হাসি আর লজ্জারাঙ্গা মুখ নিয়ে বলল, ‘বলো কী বলবে। আমার আর অপেক্ষা করতে ভালো লাগছে না।’

আমি নিচের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম আমার মেসেজে কতটুকু রোমান্টিকতা ছিল? শানু তো মনে হয় ভেবে বসে আছে আমি তার প্রেমে সাড়া দিয়েছি। আমি দাঁড়িয়ে শিমুর মুখোমুখি হয়ে বললাম, তুমি যা ভাবছো আমি সেরকম কিছুর জন্য থাকতে বলিনি। তুমি বিকেলে সাথিকে পাঠিয়ে দিয়ে এখানে এসো, জরুরী কথা আছে।
মূহূর্তেই শিমুর চোখ ছলছল করছে। যেন পদ্মা নদীর উছলে পড়া ঢেউ।

ক্লাস থেকে বেরিয়ে দেখি শিমু সাথীকে পাঠিয়ে দিয়ে আমার আগে এসে বসে আছে। আমি পাশে বসলাম। শিমুর দিকে তাকিয়ে দেখি আগ্রহভরে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, শিমু আমি তোমাকে আজ একটি গল্প বলব। আমার গল্প, আমার পরিবারের গল্প। শুনবে তুমি? সে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে গালে হাত দিয়ে হাঁটুর কাছে হাতের কনুইয়ে ভর দিয়ে আমার কথায় মনোযোগ দিল। আমি আমার মনে চেপে রাখা একরাশ চাপা কষ্ট বের করতে লাগলাম।

শিমু, আমার বাবা মা দু’জনই বেঁচে আছেন। কিন্তু আমি তাদের ভালোবাসা পাইনি। বাবা’কে বাবা আর মা’কে মা বলে ডাকতে পারিনা। তাদের ছুঁতে পারি না। নানীর কাছে শুনেছি, আমার বাবা আর মা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। পাশের গ্রামে বাড়ি ছিল। বাবা যখন দাদা দাদীকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন, নানা আর নানী রাজী হয়নি। রাজী না হবার কারণ আমার দাদা যে এলাকায় বসত করে সে এলাকার মানুষদের সাথে অনেকেই আত্মীয়তা করতে চায় না। তাদের অনেকে ভয় পায় আর মনে মনে ঘৃণা করে।

তারা অল্পতেই লাঠিসোটা নিয়ে মারামারি করে। কিন্তু মা যখন জানালো তারা একে অপরকে পছন্দ করে, তখন আর নানা নানী রাজী না হয়ে থাকতে পারেনি। অনেকে নানা নানীকে বলেছে, ঐ এলাকায় বিয়ে দেয় কেউ? দেখবে দুই মাস পর বাড়ি পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু দুই মাস নয়, আমার বাবা আর মায়ের ডিভোর্স হয় তিন বছর পরে। নানীর কাছে শুনেছি বাবার চেয়ে মায়ের দোষ বেশি ছিল। এমন কি আমার মা ডিভোর্সের পর নানীর কাছে কেঁদে কেঁদে দোষ স্বীকার করেছে। মায়ের দোষ ছিল তিনি অল্পতেই রাগ করতেন। পান থেকে চুল খসলেই ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতেন। পাশাপাশি এলাকা হওয়ায় একটু ঝগড়া হলেই চলে আসতেন। এই ঝগড়া শেষ অবধি তাদের বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য করেছে।

-তাহলে কী তুমি মায়ের কাছে বড় হয়েছো? মানে নানীর বাড়িতে?
-আমি নানীর বাড়িতেই বড় হয়েছি। তবে মায়ের কাছে না, নানা নানীর কাছেই।

ডিভোর্সের পাঁচ মাস পর বাবা আবার বিয়ে করেছেন। মা তখন কান্না করেছেন অনেক। নানীর কাছে নাকি বলতেন, আমার এত ঝগড়া করা ঠিক হয়নি। বাবা আমাকে উনার কাছে রাখতে চেয়েছিলেন, মা বলেছেন তিনি আমাকে দিবেন না। শেষে মা নিজেও তার কাছে আমাকে রাখতে পারেননি। তিনিও আবার বিয়ে করেন। আমি বাবা মা থেকেও হলাম এতিম। বাবা ছিলেন বাবার নতুন সংসার নিয়ে। মা চলে গেলেন তার সংসারে। আর এতিম আমি পড়ে রইলাম নানা নানীর কাছে। জানো শিমু?

দুই বছর বয়স থেকে আমি বাবা মায়ের আদর আর পাইনি। ছোট ছেলে মেয়েরা যখন তাদের মায়ের আঁচল ধরে হাঁটত, আমি ধরেছি নানীর আঁচল। নানী বলতেন, তোর মা বেড়াতে গেছে। কয়দিন পরই চলে আসবে। মা ঠিকই আসতেন, কিন্তু সাথে আরেকজনকে নিয়ে। যিনি আমাকে কখনো কোলে নেননি। মা দুইমাসে তিনমাসে একবার এসে আমাকে একটু কোলে নিতেন। আমিও এই আদরটুকু পাওয়ার জন্য অধির আগ্রহে থাকতাম। নানীকে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করতাম, নানী মা কবে আসবে?

যখন একটু বুঝতে শিখেছি। বালক কিংবা কিশোর হয়ে উঠেছি। তখন থেকে মা’কে মা বলে ডাকতে ইচ্ছে হতো না আমার। কারণ তখন এতটুকু জানতে পেরেছি, আমার মায়ের আরেকটি সংসার হয়েছে। সেখানেও একটি ছেলে আছে। মা যখন আসতেন নানীর বাড়িতে তখন সারাদিন আমি বাড়ি আসতাম না। সন্ধার পর বাড়ি ফিরেও অনেক সময় খাটের নিচে লুকিয়ে থেকেছি। বড় হয়ে বুঝেছি, সে সময়টা বাবা মায়ের প্রতি একটা ঘৃণা এসেছিল মনে। তারা তাদের নিজ নিজ সংসার বেছে নিয়েছে, কিন্তু আমার কথা কেউ চিন্তা করেনি। শিমুর ফোন বেজে উঠল। রিসিভ করে বলছে,

-মা একটু পরেই চলে আসব।
-হ্যাঁ দেখেছি সন্ধা হয়েছে। সাথীর বাড়িতে কাজ ছিল তাই চলে গেছে।
-আচ্ছা, এইতো রিক্সা নেব। ফোন রেখে বলল, তুমি বলো।

-তোমার বাড়িতে চিন্তা করছে, চলো আজ উঠি।
-বীরপুর এখান থেকে খুব দূরে নয়, তুমি বলো আঙ্কেল তোমাকে দেখতে আসতেন না?
-আমি ছোট থাকতে আসতেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে নানার কাছে ফোন দিতেন। নানা বা নানী বাবার কাছে নিয়ে যেত।

বাবা আমাকে প্রথম প্রথম দুই তিনদিন কোলে নিতেন। দোকানে নিয়ে যেতেন। চকলেট চিপস কিনে দিতেন। পরে আর কোলে নেননি কখনো। চিপস চকলেট কিনে দিলেও আমি বাড়ির বাছে এসে ফেলে দিতাম। আমার খেতে ইচ্ছে করত না। বড় হয়ে আমি দাদার বাড়ির এলাকায় কখনো যাইনি। আমার মন বলত, ঐ এলাকায় আমার যাওয়া নিষেধ। বড় হবার পর কখনো বাবার সাথে দেখা হলে শুধু জানতে চাইতেন কেমন আছি। মুখে হাসি এনে বলতাম আমি ভালো আছি। কিন্তু আমার মন জানত আমি কতটা ভালো ছিলাম বাবা মা’কে ছাড়া। বড় হবার পর বাবা একদিন আমার কাছে ক্ষমা চাইলেন। বললেন, আমি তোর বাবা হবার যোগ্য না। আমাকে আর বাবা ডাকিস না। আমাকে ক্ষমা করে দিস।উত্তরে আমি বলেছিলাম, আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। শুধু বলে দাও স্কুল কলেজ বা কেউ যদি বাবা মায়ের নাম জিজ্ঞেস করে আমি কোন নামটি বলব? আমি বাবার চোখে পানি দেখেছি, কিন্তু তিনি আমার কথার উত্তর দেননি।

আমার কখনো বন্ধু বান্ধব হয়ে উঠেনি। সবাই একসময় ঠিকই আমার অতীত, আমার বাবা মা নিয়ে কথা শুনিয়ে দিত। আমি আর দ্বিতীয়বার তাদের কাছে যেতাম না। কলেজে এসে তুমি আর সাথীই আমার বন্ধু। তোমাকে ভালো লাগে, অনেক ভালো লাগে। কিন্তু পরক্ষনেই ভাবি আমার অতীত, আমার পরিবার। আমার গল্পটি তোমাদের কাছে গোপন করে রেখেছিলাম এতদিন। আমার তো কোনো বন্ধু নেই। আমার পরিবারের কথা শোনার পর যদি মিশতে না চাও, সেজন্য গোপন করেছি। আমি তোমাকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছি। কারণ তোমার সাথে বন্ধুত্ব হবার পর নিজে উপলব্ধি করেছি তুমি কত ভালো মেয়ে। আমি তোমাকে ঠকাতে চাইনি শিমু। তাই ফিরিয়ে দিয়েছি বারবার।

শিমুর চোখভর্তি পানি। অনেক কষ্টে আটকিয়ে রাখতে চেয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। গাল বেঁয়ে নিচে নামছে। হঠাৎ উঠে গেল শিমু। বলল, কাল কথা হবে। আজ চলি, বাড়ি চিন্তা করবে। আমি দাঁড়িয়ে আছি আশালতা গাছের নিচে। শিমু হাতের উল্টো পৃষ্ঠে চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে গেল। জানিনা তার কান্নার কারণ কী? জানিনা কাল থেকে আমাদের বন্ধুত্ব থাকবে কিনা। শিমু বলেছে কাল কথা হবে। আমি বসে পড়লাম দুর্বা ঘাসে। আজ রাত করে ফিরব বাড়িতে। সকালে আসার পথে দেখে এসেছি মা এসেছে তার ছেলেকে নিয়ে। আচ্ছা আমি কার ছেলে? বাবার নাকি মায়ের?

সকালে ঘুম ভাঙ্গার পরও কিছুক্ষন চোখ বুজে থাকা আমার অভ্যেস। হঠাৎ কপালে কারো চুমোর ছোঁয়া পেয়েও চোখ খুলিনি। জানি মা চুমো দিয়েছে। এর আগেও কয়েকদিন এভাবে চুমো দিয়েছিল। আমি এমনি করে চোখ বুজেই থাকতাম। উঠতে হবে, কলেজে যেতে হবে। শিমু বলেছিল আজ কথা হবে। মেয়েটার চোখের পাতা অল্পতেই ভিজে যায়। আমার চোখেই কেবল চৈত্র মাসের খড়া। এক পশলা বৃষ্টি হলে মন্দ হতো না।

শিমুর হাতে ফুল দেখে মনে করার চেষ্টা করলাম আজ কত তারিখ? দিবস ছাড়া বাঙ্গালি ফুল নিয়ে শুধু মাত্র পার্কে যায়। প্রিয়জনদের ফুল উপহার দেয়। শিমু আমার হাত ধরে টেনে বলল, তমালতলা চলো। আজ মানুষ নেই, পুকুর ঘাটে পা ভিজাব। আমি কিছু না বলে তার সাথে সিড়ি বেঁয়ে নামলাম। পানিতে শ্যাওলা হয়নি। স্বচ্ছ পানিতে নিচের শামুক দেখা যাচ্ছে। এই শামুক চিকন চিকন। পুকুর ঘাটে বেশি হয়। শিমু আমার দিকে ফুল এগিয়ে দিয়ে বলল, “আমি তোমার পাশে থাকতে চাই। সারাজীবন একসাথে পাড়ি দিতে চাই। আজ আর ফিরিয়ে দিওনা প্লিজ। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”

বহু বছর পর আমার চোখ ভর্তি পানি এলো। চোখের পলক ফেলা মাত্র পানি গাল বেঁয়ে নেমে যাবে নিচে। ফোটা ফোটা পানি পুকুরে পড়লে কেউ আলাদা করতে পারবে না, কোন পানিটা পুকুরের আর কোনটা আমার চোখের। আমি শিমুর হাত থেকে ফুল নিয়ে মাথা নাড়িয়ে বললাম, “আমিও ভালোবাসি, অনেক বেশি।”

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত