বেলা শেষে

বেলা শেষে

–এই ছেলে প্রতিদিন আমার পিছু পিছু ঘুরেন কেনো? ভার্সিটির কোথাও আমি শান্তি মতো থাকতে পারিনা!কি সমস্যা আপনার?

যেদিন থেকে এই ক্যামপাসে এসেছি সেদিন থেকে আপনি আমার পিছু নিছেন।এসবের মানে কি?
–আমি তোমাকে ভালোবাসি রাইসা।আমি তোমার সাথে পুরো জীবনটা কাঁটাতে চাই।
I love you.
–ও আচ্ছা ভালোবাসেন? বাব্বাহ আজকাল হঠাৎ করে দেখেই I love you বলা যায়!আচ্ছা আমার সম্পর্কে আপনি কি কি জানেন?
–কিছু জানি না।আর কিছু জানতেও চাই না।
–হাহাহা তো আপনার বাবা কি করে শুনি?
–আসলে আমার বাবা কে তা জানি না।
–বাবা কে জানেন না মানে কি?
–আমার বাবার পরিচয় আমার জানা নেই।আমার জন্ম স্টেশনের বস্তিতে।আমার মা-কে বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে মা শুধু কান্না করে।

বস্তির পাশের বাড়ির চাচি একদিন মায়ের সাথে ঝগড়া করার সময় বলেছিলেন আমি নাকি অবৈধ সন্তান।আমার পিতৃ পরিচয় নেই।

আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়তাম।সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।স্টেশনের ওভার ব্রিজে বসে খুব কেঁদেছিলামও।কেউ দেখেনি,আমার

চোখের জলও কেউ মুছে দেয়নি।আমার অসোহায় কান্না দেখে হলদে লাল সূর্য তার তাপে আমার চোখের জল গালের উপর থেকেই শুষে

নিয়েছিল বাষ্প করে। আমি তখন পড়ার পাশাপাশি শহরে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে সারাদিনে ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকা আয় করতাম।

রাতে মায়ের হাতে তুলে দিতাম টাকা।আর মা শহরের এক উকিলের বাসায় কাজ করতো।ওখানে যা পেতো তা দিয়ে মা চাল নিয়ে আসতো।

এভাবেই কষ্ট করে চলতো মা আর আমার ছোট্ট সংসার।
–ওই ফকিরের বাচ্চা থাম। তোর জন্মের তো ঠিক নাই।আর কোন সাহসে আমাকে প্রেম করার প্রস্তাব দাও?
তোর বাবার পরিচয় কি তাও জানিস না!আরে তুইতো একটা রাস্তার ছেলে,নোংরা ছেলে কোথাকার রাবিস।
কথাগুলো বলেই মেয়েটা সামনে দিয়ে হেঁটে চলে গেলো।যাওয়ার সময় এমন ভঙ্গি করলো যেনো আমি নর্দমায় জন্ম নেওয়া কীট।

পেছন ফিরে তাকায়নি।দু-টো চোখ ভীষণ অশ্রু ঝরালো।চাঁদ তো উপরে থাকে সেখানটাই আমার চোখের জল পৌছালো না।

গাল বেঁয়ে দু-ফোঁটা জল মাটিতে পড়লো।

শার্টের হাতা দিয়ে ভেজা চোখের পাতা দুটো আলতো মুছে নিয়ে ক্লাসের দিকে হাঁটা শুরু করলাম।ক্লাসে একদম মন বসলো না।ক্লাস শেষ না

করেই ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে আসলাম।খোলা রাস্তার মাঝে হাঁটছি আর ভাবছি আমি কেনো বাবার পরিচয় জানিনা? আমার কি বাবা ছিলো না!

ধুর বাবা দিয়ে কি করবো মায়েই তো আমার সকল সুখের নীড়।

কনক্রিটের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আনমনে।একটা শুকনা সেগুন পাতা গাছ থেকে বাতাসের ধাওয়াই রাস্তায় পড়লো।দু-টা ট্রাক পাশ দিয়ে প্রচন্ড

শব্দে চলে গেলো।ভার্সিটি থেকে আমার বস্তির তিন কিলোমিটার রাস্তা আজ যেনো আরো দীর্ঘ হচ্ছে!হোকনা এমনি!প্রকৃতিটা অন্ততো বেশ

ক্ষাণিক সময় উপভোগ করা যাবে।এই প্রকৃতি বোঝে আমার প্রেমের গাঢ়ত্ত্ব।সে আমার বাবার পরিচয় জানতে চায়না।নিচু ভাষায় গালিও দেয়না।

এটাই প্রকৃত ভালোবাসা।নিঃস্বার্থ এর প্রেম।

আমি মোহাম্মদ একরামুল হক আবির।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।আমার মা ইয়াসমিন বেগম।

আজ তিনি বৃদ্ধ।চোখে ঠিক মতো দেখতে পায়না।যে বাসায় কাজ করতো সে বাসার মালিক কাজ থেকে বাদ দিয়ে দিছে।বৃদ্ধ মানুষ থালা বাসন

ঠিক মতো পরিস্কার করতে পারেনা।তাই কাজ থেকে বাদ দিছে।

আমি টিউশনি করায় কয়েকটা।টিউশনির টাকা দিয়ে মায়ের আর আমার দু-বেলা ডালভাত হয় আর আমার ভার্সিটির খরচ চলে কোনো মতে।

রাতে হারিকেনের আলোর জন্য কেরোসিনটা কেনা খুব কষ্টকর হয়।কিন্তু স্টেশনের সোডিয়ামের বাতি আমার বইয়ের অক্ষরগুলো বুঝতে খুব

সাহায্য করে।তবে স্টেশনে সারারাত গোলমাল চলে যা আমার জন্য অনেক বেদনার।কোলাহলের মধ্যে পড়া-লেখা করতে খুব কষ্ট হয়।

আগের স্টেশন মাষ্টারটা আমায় খুব ভালোবাসতো।আমাকে একটা চার্জার বাতি কিনে দিয়েছিল পড়ার জন্য।আর রাতে প্রতিদিন আমাকে সাথে

নিয়ে নাস্তা করতো।মাঝে মাঝে আমাকে বলতো ‘আবির তুই একদিন অনেক বড় চাকরী করবি,তোর মায়ের সকল কষ্ট দূর করবি।

কখনো বাস্তবতার কাছে হেরে যাসনে।’

আমিও হার মানিনি বাস্তবতার কাছে।কিন্তু আশেপাশের মানুষগুলোর অবজ্ঞাতে মাঝে মাঝে নিজেকে বড্ড অসোহায় মনে হয়।

যেনো পৃথিবীতে আমি একা!তখন নীল আকাশে মেঘো থাকেনা।শুধু দক্ষিনা দমকা হাওয়া রই।সে হাওয়ার জোরে বুকের ভেতরটা ওলোট-পালোট

হয়ে যায়।কিন্তু বস্তিতে ফিরে মা যখন বুকে জড়িয়ে বলে বাজান তোর চাকরী হলেই আমাকে একখান চশমা কিনে দিস।ঐ বড় বড় মেম সাহেবদের

মতো আমিও চোখে চশমা পড়ুম বাজান।বা-জানরে আমারে কি মেম সাহেবদের মতো সুন্দর লাগবে?শুনো বাজান তখন কিন্তু প্রতিদিনের মতো

সবজি দিয়ে ভাত খাবো না আমরা।তুমি ইলিশ মাছ আনবা বাজার থেকে আর প্রতি সপ্তাহে তিন রাস্তার মোড়ে যে গরু জবাই হয় ওখান থেকে এক

কেজি করে টাটকা গস্ত আইনা দিবে। কি বাজান দিবে না?

আমার বুকটা ফেঁটে যায় যন্ত্রনায়।কবে মায়ের সব আশা পূর্ণ করতে পারবো!আমাকে যে পারতেই হবে।আমি পড়া-লেখায় মন দেই।সময় পার হতে

থাকে তড়িৎ গতিতে।বিকেলের আকাশে গৌধূলী নামে।লাল সূর্যটা পশ্চিমের আকাশে ধীরে ধীরে ডুবে যায়।সন্ধ্যা নামে সবাই ঘরে ফিরে ক্লান্তি দূর

করে বিছানের নরম তোশকে।আর আমি তখন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি গিয়ে নীজের মেধার মিষ্টি ফল অন্যদের খাওয়াই।এতে আমার ফল

কমেনা।সামাণ্য তৃপ্তি মিলে।ক-টা টাকা পেয়ে এবার ঈদে মায়ের জন্য একটা চশমা আর একটা নতুন শাড়ি কিনবো ভেবে।আশার আলোয়

আলোকিতো মন।পথের বাঁকে জ্বলে সোডিয়ামের বাতি।সে বাতির মৃদু আলোয় আমার মতো অসংখ্য ফড়িং এর নিত্যদিনের পথচলা।

তাড়তাড়ি টিউশনি শেষ করলাম।বাইরে প্রচন্ড শীত পড়ছে। ঘন কুয়াশায় শহরের পথ অচেনা লাগে।চোখের পাতায় জমানো শীত ছাড়িয়ে নিলাম

শার্টের হাতা দিয়ে।ঘড়ির দিকে তাকালাম ১১:৩৭মিনিট।দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম।আমার টিনসেটের ছোট্ট কুটিরে ঢুকলাম।মাদুর পেতে পাতলা কাঁথা

গায়ে দিয়ে মা থরথর করে কাঁপছে।টিনের উপর থেকে টপটপ করে শীত পড়ছে।কাঁথাটাও হালকা ভিজে গেছে।মায়ের কপালে হাত দিতেই বুকটা

ধকধক করে উঠলো!একি মায়ের তো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে!এতো রাতে ডাক্তার কই পাই! মায়ের মাথায় জলপট্টি দিয়ে দৌড়ে পারভীন চাচীকে ডাক

দিলাম।চাচী দ্রুত ঔষধ আনতে বললো।আমি শহরের ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল নিয়ে আসলাম চারটা।চুলোতে পাতিল দিয়ে গরম পানি করেছে

পারভীন চাচী।মা কে ঔষধ খাইয়ে দিলাম।পারভীন চাচী ঘন ঘন জলপট্টি দিতে থাকলেন কপালে।আমার টেনশনে অস্থিরতা বেড়ে গেলো।

রাতেই ডাক্তারের খোঁজে বের হলাম।কয়েকটা ডাক্তারের বাসায় গিয়ে কলিংবেল চেপে অনেক অনুরোধ করলাম আসার জন্য।নাহ কোনো

ডাক্তারের মন আমার আর্তনাদ বুঝলো না।আমার পৃথিবীতে একটাই সম্পদ সেটা আমার মা।এই মা যদি চিকিৎসার অভাবে আমাকে ছেড়ে যায়।

আমার বেঁচে থাকাটা অনর্থক!আমি যে ভীষণ একা হয়ে যাবো।আমাকে আর কেউ বলবে না বাজান আমার জন্য বাজার থেকে দু-টাকার পান

আনিওতো।,বাজান আমার না সাতমিশালি খাইতে মন চাইছে, বাজানরে তুই কবে চাকুরি করবি রে।আমার সব কষ্ট দূর হবে।
কে আছে আমাকে আঁচলে জড়িয়ে বলবে বাজান তুই একদিন অনেক বড় চাকুরি করবি।আমাকে মেম সাহেবদের মতো ঘুরতে নিয়ে যাবি।

দেখিস বাজান একদিন আমার সব আশা পূর্ণ হবে।
কাঁদতে কাঁদতে মন ভাবে মায়ের ছোট ছোট চাওয়াগুলো।অপূর্ণ স্বপ্নগুলো।কিন্তু সব যেনো ব্যর্থ!

বাড়িতে ফিরে আসি।পারভীন চাচীর সেবায় মা একটু কথা বলতে শুরু করছে।আমকে দেখেই বললো বাজান রে তুই খাইছিস? তোর জন্য অপেক্ষা

করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি বাজান– মা, আসলেই সর্বশ্রেষ্ঠ মমতাময়ী। ছেলের জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করেছে।এই সুখ অট্টলিকাতে কি থাকে?

চুলোয় ভাত গরম করে মা কে খাইয়ে দিচ্ছি। মা আমার বাঁ হাতটা ধরে বলছে বাজান তুই আমার আলো রে বাজান।মা গো, তুমি যে সে আলোর চাঁদ।

মা, ছেলের এমন ভালোবাসা রূপকথার গল্পকে পেছনে ফেলে হাজার বার।রাতের গহিনে তারাগুলো হয়তো মিটমিট করে হাসছে এ সুখের দৃশ্যে

দৃশ্যপট হয়ে।এ ভালোবাসার কাছে টিনের চালার সামণ্য শীত বরাবরই হার মানে।কষ্টের সুখে যে তৃপ্তি তা হাজার বছরের রাজত্বে নেই।সুখ যে অন্য

রকম তা কষ্টের পাশে থেকে উপলব্ধী করলে বুঝা যায়।

কয়েক দিনের মধ্যে মা সুস্থ হয়ে উঠলো।ছোট-বড় পাওয়া না পাওয়ার ইচ্ছেগুলো ঢেকে দিয়ে সামনে এগুতে থাকলাম।জীবনের জীবিকার সন্ধানে

এগুতেই হয় রঙ বেরঙের খেলায় ছুটতেই হয়।এ যে পৃথিবীর অভিন্ন নিয়ম নীতি। মানতেই হয়।না মানিলে ঘর ছাড়া বৈরাগী,কখনো বা উদাসী সন্ন্যাসী।

আমার স্নাতক শেষ করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতোকোত্তর ভর্তি হলাম।মা আরো বয়স্ক হলো। এক সময় স্নাতকোত্তর অধ্যায়নরত অবস্থায় আমি

সাতাস তম বিসিএস এ টিকে গেলাম।হলাম বিসিএস ক্যাডারভুক্ত নিয়োগ পেলাম খুলনা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদে।জীবনটা স্বপ্নের মতো,বাস্তবতা

তার রূপক।স্ব-জ্ঞানে রূপকের রূপায়ন করলে ইচ্ছেগুলো আর আড়ালে থাকেনা।রূপ ন্যায় রূপকথার ঝুলির মতো।কখনো আলাদিনের চেরাগ এর ন্যায়।

আজ বস্তিতে আসছি মা-কে সঙ্গে নিয়ে।মায়ের চোখে দামী চশমা,পরনে সাদা-কালো শাড়ী,মুখে যেনো তৃপ্তির ভূবণ ভোলানো হাসি।সে হাসির

অপেক্ষাতে আমি সংযমী। বস্তীর সবাইকে আজ দাওয়াত করা হলো। সবাইকে খাওয়ানো শেষ করে সবার হাতে আমার ভিসিটিং কার্ড দিলাম।

যে কোনো সমস্যায় পাশে থাকার জন্য আশ্বাস জানালাম সবাইকে।বস্তিতে আজ যেনো ঈদ ঈদ আনন্দ বইছে।সবার মুখে আমাদের আবির এসেছে,

অনেক বড় ম্যাজিস্ট্রেট হইছে,আরো কতো কি।সত্যি সরল মানুষগুলোর মনে একটুও ময়লা নেই।এরা হাজার খারাপ সম্পর্কেও বিপদে পাশে আসে।

আমারও দায়ীত্ব্য এদের জন্য কিছু করা।অবশ্যই করবো ইনশা-আল্লাহ্।

রাজশাহী শহরেই জায়গা কিনে খুব সাধারণ একটা দুইতলা বাড়ি দিলাম।চারদিক থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসছে। মেয়ের বাবা অমুক কোম্পানির

মালিক তমুক এলাকার অধিপতি। কিছুদিন ধরে মা বলছে বাজান সবকিছুই তো আমাকে দিলি।এখন নিজের জন্য একটু কর।একটা পরী ঘরে নিয়ে আয়।

ঘরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে!
আমি মা – কে শান্তনা দেই।আর কিছুদিন যাক তারপর।কে শুনে কার কথা।বারবার মা বলতে থাকলো সামনে শুক্রবার বউ দেখতে যাবো।মা-কে

কিছুতেই বুঝাতে পারলামনা আর কিছুদিন পর ওসব করবো।মা নাছোড়বান্দা।

শুক্রবার রাজশাহীতে আসলাম মায়ের কাছে।দুপুরের নামাজ শেষ করে মা-কে নিয়ে বউ দেখার উদ্দেশ্যে বেরুলাম।আমি নিজে ড্রাইভ করছি

পাশে মা বসে আছে।ঘটক বলেছে মেয়ে নাকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন জয়েন করেছে শিক্ষিকা হয়ে।খারাপ না,তাই দেখতে যাওয়া।

এসি চলছে গাড়ীর ভিতরে।মায়ের দিকে তাকালাম আড় চোখে।মৃদু হাসছে মা। এ হাসি প্রাপ্তির।সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং এ হাসি দেখে নিজেই খুশি হন।

তিনি হয়তো চান পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের দ্বারা এমনি ভাবে মায়ের মুখে সুখের হাসি ফুটুক। নয়তো ফকির কে আমির বানাতো না।

এ যে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিলীলা বড়ই নিদারূণ।

একটা চারতলা বাড়ির সামনে মা গাড়িটা ব্রেক করতে বললো।গাড়ি পার্ক করে নামলাম।মা হয়তো আগেই এসে মেয়ে দেখে গেছে।

মায়ের পছন্দ হয়েছে হয়তো তাই আমাকে এতো জোর করে নিয়ে এসেছে। বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম বাহির থেকে বাড়িটা যতোটা সাধারণ

ভেতরটা তার থেকেও অসাধারণ। নকশা আর কাঁরুকাজ যেনো বিলেতি ইঞ্জিনিয়ার এনে করিয়েছেন।বারান্দার প্রতিটি খুঁটি যেনো মুক্ত পাথরে

নকঁশা আঁকা।নিখুঁত তাঁর কাঁরুকাজ। যে কাউকে মুগ্ধ করার মতো শিল্পীর অঙ্কন।

এক ভদ্রলোক মা-কে সালাম দিলেন।আমিও ভদ্রলোককে সালাম দিলাম।সালাম নিয়ে উনি ঘরের ভেতরে বসতে বললেন।আসলে আজ ভীষণ

ভয় করছে।জীবনের অন্যরকম একটা অনুভূতি।এ অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা নেই।একটা মেয়ে নাস্তার ট্রে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো।

মাথা তুলে তাকালাম।

থ হয়ে গেলাম এতো রূপও কারও হয়!এ যে পদ্মার জলে ধোঁয়া ঝিনুক।দু-টো চোখ চিরচেনা।মুখের বর্ণের কোনো পরিবর্তন নেই।সে দৃষ্টি আজও

একই।তবে সে গৌরব গাম্ভীর্য কি আজও আছে? আবির কি হলো নাস্তা নে বাজান।মায়ের কথায় ভাবনার ঘোর কাটলো।একটা বিস্কুট চিবুচ্ছি মুখে

নিয়ে আর মাথাটা নিচু করে ভাবছি ‘যে তীরে আমার নৌকা ভীড়ে ছিল সখিরে নিতে,সে তীরেই আজ অপেক্ষাতে সখি গো।’

আমি মেয়ের সাথে একা কথা বলতে চাইলাম। মেয়ের পিছুপিছু ছাদে উঠলাম।বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে,মৃদু দক্ষিনা বাতাস বইছে।পাশেই পদ্মার পাড়।

এখান থেকেই জলের চিকচিক প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে।সুন্দর দৃশ্য।

–আচ্ছা কি বলবেন বলেন?
মেয়েটার প্রশ্নে ফিরে তাকালাম ওর দিকে।কতই না সুন্দর এ রূপ।
–তোমার নাম কি?
–রাইসা?
–আমার নাম জানো?
–না তো!
–আমি আবির।আমাকে চিন্তে পেরোছ?
–নাহ!
–হুম না চিনারি কথা।সেদিনকার আবির আর আজকের আবিরের মধ্যে কতই তফাৎ।আচ্ছা আমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে?
–জ্বি?
–আমার বাবার পরিচয় নিবে না?
–মানে!?
–মানে আমার বাবা কে তা যে আমি জানি না।তোমাকে বলেছিলাম অনেক আগেই।তুমি তখন অনার্স প্রথম বর্ষ শেষ করছিলা।মনে পড়ে?

মেয়েটা তাকিয়ে আছে আমার দিকে।আমি চোখ ফিরালাম দূরের পদ্মার জলে।সূর্য ডুবুডুবু নদীর বুক চিরে তলিয়ে যায় ধীরে ধীরে। আকাশে

নীলের ছাঁয়া ঢাকিয়ে লালীমা এঁকে সূর্য অবশেষে ডুবে যায় পশ্চিমের আকাশে।মেয়ের তবু ঘোর কাটেনা।থাকুক না অঘোরে।যেমনটা সে চায় বেলা শেষে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত