ভালবাসা

ভালবাসা

আমার আর হিমার বিয়েটা ঠিক হয় পারিবারিক ভাবেই কিন্তু স্ত্রী হিসেবে হিমাকে তেমন পছন্দ হয়নি আমার। বাবা-মা আর বড় বোনসহ অন্যরা মিলে পছন্দ করেছে ওরে। কেন যে তারা আমার মতো ফর্সা ছেলের জন্য এমন শ্যামলা একটা মেয়ে পছন্দ করলো তাই বোধগম্য হয়নি আমার। বাসর ঘরে ঢুকে দেখি জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে হিমা। আমার উপস্থিতি টের পেতেই পিছে ফিরে তাকালো আর আমার দিকে এসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম জানাবে আমায় সময় আমি শুধু বলেছিলাম “থাক থাক সালাম করতে হবে না” বলেই প্রস্থান করলাম ওর সামনে থেকে। ও মিনিট খানেক ওইভাবেই বসেছিল জানিনা কেন! তারপর উঠে গিয়ে বিছানায় বসলো।

আমার মনে হল হয়তো ওর সামনে থেকে এভাবে চলে আসায় সে একটু কষ্ট পেয়েছে। পরক্ষণেই আবার ভাবলাম “কষ্ট পেলে পাক তাতে আমার কি!” আমি রাতে আর তেমন কোনো কথা বলিনি, বলার মধ্যে শুধু বলেছি “আমার পরিবার আপনাকে পছন্দ করে এই বাড়িতে এনেছে, তাদের কখনো কষ্ট হয় এমন কিছু করবেন না” উত্তরে সে সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়েছিল। বাসর রাতে এটাই ছিল আমার একমাত্র কথা ওর সাথে আমি ছাড়া পরিবারের সবার সাথেই হিমার বেশ বনিবনা রয়েছে কিন্তু কেন জানিনা ওরে আমার সহ্য হয় না।

পরিবারের মুখ রাখতে সব কিছুতেই ওর পাশে থাকতে হয় আমার। সেদিন সবাই জোরপূর্বক ওরে নিয়ে বের হতে বলায় একটু ঘুরতে বের হয়েছিলাম আমি আর তাতে বাজলো আর এক বিপত্তি।ওরে বাসায় দিয়ে যখন আবার বের হলাম বন্ধুদের সাথে তখন সবাই আমাকে হাসি ঠাট্টা করে বলছে, “দেখ দোস্ত আজকাল ভুড়িওয়ালা কাক্কুরা খুব সুন্দরী বউ পায় আর তোর কপালে জুটলো এই মেয়ে!” কথাটা শুনে হেসেছিলাম বটে। কিন্তু বিষয়টা নিতে পারিনি আমি আর এজন্যই প্রথম রাগারাগি বেজেছিল হিমার সাথে বিয়ের মাত্র সপ্তম দিনে।

করা ভাবে বলেছিলাম, “আমার সাথে আর কখনো এভাবে পর্দা ছাড়া বের হওয়ার কথা ভাববেন না! বের না হলেই বেশি খুশি হবো” হিমা আমার কথায় আজও কোনো আলাদা উত্তর দেয়নি, শুধু সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে ছিল। ইদানীং আমার কিছুই ভাল লাগে না। বিয়ের আগে কত স্বপ্ন বুনেছি বউ নিয়ে ঘুরবো, বউয়ের সাথে দুস্টামি করবো, ওরে রাগাবো কষ্ট দিবো আর কষ্ট পেয়ে যখন কাদবে তারপর জড়িয়ে ধরে বলবো, “ধুর বোকা! আমিতো ইচ্ছে করে এটা বলেছি যাতে কষ্ট পাও আর জড়িয়ে ধরে সেটা মুছে দিতে পারি” হ্যাঁ ছেলেরাও স্বপ্ন বুনতে পারে এর বাস্তব প্রমাণ আমিই। কিন্তু এখন ওরে অপছন্দ হওয়ার পর থেকে আমার স্বপ্ন গুলো আমাকেই নিরাশ করে দিল যেনো। কতোভাবেই না খুনসুটি করার পরিকল্পনা করে রেখেছি অর্ধাঙ্গিনীর জন্য, যার জন্য কোনো প্রেম করিনি বিয়ের আগে আর সে এমন একজন হলো যাকে আমার পছন্দই হলো নাহ।

ওর হাতের রান্নাটাও আমার ভাল লাগে না খেতে, ও রান্না করে আনলেই আমি আম্মুরে জিজ্ঞেস করি “মা তুমি কেন রান্না করলে না?” একটু জোর গলাতেই জিজ্ঞেস করায় আম্মু বকা দিয়ে বলে বউয়ের হাতের রান্না খেতে অভ্যাস করতে বুঝিনা কিভাবে ওরে নিয়ে আমি সারাজীবন পারি দিবো! পরিবার ওরে এতো পছন্দ কিভাবে করে আমি তাও বুঝিনা। চুপ করে সহ্য করছি মায়ের দিকে তাকিয়ে কারণ মাকে আগেই বলা, বিয়ে করবো তার পছন্দেই।

হিমা নিজেও হয়তো বুঝতে পারে যে ওরে আমার পছন্দ না। তাই সেও যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলে আমার থেকে কারণ ও ঘরে আসলেই আমি চলে যাই অন্য ঘরে, ও কিছু বলতে আসলেই আমি ব্যস্ততা দেখাই। এই বিষয় গুলো ও বেশ বোঝে কিন্তু আর পাঁচটা মেয়ের মতো এসব নিয়ে সে মোটেই কোনো রকম অভিযোগ করেনা। আমার অবহেলা, দূরত্ব, অপছন্দতা সে মাথা পেতে মেনে নিচ্ছে কোনো শর্তছাড়া আর এই বিষয়টাই আমাকে ভাবায়।
আমি বুঝতে পারি না সে বিনা দ্বিধায় কিভাবে আমার এতো অবহেলা মেনে নিচ্ছে! শ্বশুর বাড়ির মানুষ যতোই আপন হোক, স্ত্রীর প্রথম চাওয়া হচ্ছে তার স্বামী তার পাশে থাকবে। কিন্তু হিমাকে আমি এতো দূরে রেখেছি যে আমাদের বিয়ের আনুমানিক দু’মাস হতে চললো এখনো ওরে স্পর্শ করা তো দূরের কথা ঠিক মতো কথাই বলিনি শুধু প্রয়োজন ছাড়া। আর স্পর্শ? ভুল করে দু’একবার গায়ে গা লেগে গেলেও বলতাম সরি!

এতো অবহেলা সে হাসি মুখে মেনে নিচ্ছে কেমন করে এটাই আমার বোধগম্য হয়নাহ। আর এই ভাবনা নিয়েই মূলত ওর প্রতি মায়া জন্মায় আমার একা থাকলে আনমনে ওর কথাই মনে পড়ে বারেবার। কেন ও আমার অবহেলা আর দূরত্ব মুখ বুঝে সহ্য করে এটাই ভাবতে থাকি আর পরক্ষণেই ওর কষ্টের এহেন পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে নিজের ভেতরে কেমন একটা অজানা কষ্টের অনুভব করি আমি।

কিন্তু আমার হয়তো এই মায়া জন্মাতে বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেলো! ইদানিং খেয়াল করলাম আম্মুও হিমার সাথে তেমন ভাবে কথা বলে না আগের মতো। আগে আম্মু রান্না করতে গেলেই ওরে ডাকতেন আর জিজ্ঞেস করতেন ও কি কি পারে রান্না তারপর ও যা না পারে ওগুলো বলে বলে মা শিখিয়ে দিতেন, দুজন মিলে হাসিঠাট্টাও করতেন রান্নাঘরে। বাসায় থাকলে বেশ ভালভাবেই শুনতাম এসব আর নিজেও একটু হেসে ফেলতাম তাদের কথা শুনে।
এখন আর মা ওরে ডাকে না, কয়েকদিন ধরেই খেয়াল করছি হিমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে একা একা বাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকে আর আমি ঘরে ঢুকে যখন শুকনো কাশি দেই ওমনি দেখি সে চোখের পানি আড়াল করে।

বাসায় ওর সাথে কেমন আচরণ করছে তা আমি জানিনা কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না তবে মনে হচ্ছে আমার অপছন্দের জন্যই হচ্ছে এসব। ওর চোখের পানি দেখলে সহ্য হয় না আমার! তখন বড্ড বেশি খারাপ লাগে। নিজে অবহেলা করতাম তখন তেমন কষ্ট হয়নি যা এখন আমার পরিবার ওরে অবহেলা করায় হচ্ছে! হ্যাঁ বড্ড আঘাত লাগছে বুকে, কেন আম্মু ওর সাথে এমন করছে! এতোদিন নিজে অবহেলা করেছি বেশ ভালভাবেই কিন্তু অন্যকেউ অবহেলা করতেই কেন এতো খারাপ লাগছে আমার সে প্রশ্নের উত্তর ও জানা নেই আমার। হয়তো আমার অপছন্দের জন্যই এটা হচ্ছে কিন্তু কি করে মাকে বলবো যে তার পছন্দ এতো নিখুঁত ছিল যে আমার মতো শক্ত মনের মানুষও তা ভালবেসে ফেলেছে অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছি আমি। হ্যাঁ অনেক বেশি দেরি হয়ে গেলো আমার কারণ মা আমাকে বলছে,

মাঃ তোর যে এতোদিনেও মেয়ে পছন্দ হবে না তা বুঝতে পারিনি খোকা। কি করবো বল! বিয়েটা কি ভেঙে দিবো?

আমিঃ কি বলছো তুমি? বিয়ে ভাঙবা মানে? এটা কি কোনো পুতুল খেলা নাকি?

মাঃ তাইলে কি করবো বল? তুই চোখের সামনে এমন নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছিস তোর মুখের আগের হাসি হারিয়ে যাচ্ছে কিছুই তো ভাল হচ্ছে না।

আমিঃ হবে হবে ধীরে ধীরে হবে।

মাঃ কি করে হবে রে! তুই তো পছন্দ করতেই পারলি না ভালবাসবি কিভাবে? তার চেয়ে ভেঙেই দেই।

আমিঃ মা তোমাকে কিভাবে বুঝাবো যে, আমি এতোদিনে ওরে ভালবেসে ফেলেছি শুধু বুঝাতে আর বলতে পারছি নাহ। ওর কান্না আমি দেখেছি মা, মোটেই সহ্য করতে পারিনি আমি। তোমার বিয়ে ভাঙতে হবে না আমি সব ঠিক করে নিবো।(এক নিশ্বাসে বেশ জোরেই বলে ফেললাম কথাটা)

মাঃ (হেসে দিয়ে) থাক আর বুঝাতে বা বলতে হবে না।

আমিঃ হ্যাঁ? মানে বুঝলাম নাহ মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি সে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে, আমিও তাকিয়ে দেখি হিমা দাঁড়িয়ে কাদছে আবার হাসছে। মা হিমার উদ্দেশ্যে বলছে, “বলেছিলাম না আমার ছেলে কেমন? এখন দেখলি তো পাগলি মেয়ে?” এখন বুঝলাম এইকয়দিন যা হচ্ছিলো তা আমার মা জননী ইচ্ছে করেই ফন্দি এটেঁছেন যেনো আমি হিমার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করি…

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত