পরিবার

পরিবার

আজ সকালে যখন বাসে করে ফিরছি তখন কেন জানি সেই অতীতের কথাগুলা খুব মনে পড়ছিল। সেই রোমাঞ্চকর অতীত আমার স্বপ্নের, আমার অভিমানের অতীত, আমার প্রিয় অতীত। যে অতীতে মিশে ছিলো আমার সব ভালো লাগা আমার একটু একটু করে গুছিয়ে রাখা ইচ্ছাগুলো। যে অতীতে আমার পুরোটা ছিলো আমার মতো। আমার জীবনের অর্ধেক কেটে গেছে মায়ের আঁচলের তলে থেকে। আর অর্ধেক কেটেছে বদ্ধঘরে শুয়ে। আর এখন অবশিষ্ট যা আছে তা নিয়েই আমার এই গল্প। সব গল্পে নায়িকা অনেক রূপের মহিমা নিয়ে আসেনা। কিছু গল্পে একজন নায়কের ব্যর্থতার অপ্রকাশিত কথামালাও থাকে।

আমি ছোটবেলা থেকেই বড় হয়েছি একা থেকে। আমাদের গ্রাম টা ছিলো অজপাড়া একদম। এখানকার অধিকাংশ মানুষ মূর্খ। তবে এরা প্রচণ্ড চালাক। মানুষকে ঠকিয়ে নিজেরা বুদ্ধিমান হতে এরা অদ্বিতীয়। আমার সমবয়সী যারা ছিলো সবায় ছোটথেকে মাঠে কাজ করতো সকালে যেতো আর বিকালে ফিরত! তারপর রাতে গ্রামের এক দোকানে বসে কেরাম আর তাশ খেলত মুখে সবসময় সিগারেট থাকতোই বাপ-চাচা মানার প্রয়োজন মনে করতো নাহ। এই দৃশ্য আমার বাবাকে বড়ই ব্যথিত করতো। বাবা গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন আর জমিজমা দেখাশুনো করেন। আর আমার আম্মা হচ্ছেন আরেক রকম মানুষ তার প্রিয় কাজ হচ্ছে হাস মুরগী পালা ছাগল পালা আর বসেবসে কাঁথা সেলাই করা। এই যদিও আম্মা ব্যথার রোগী এজন্য বেশি কাজ উনি করতে পারেননা। আর আমার ভাইয়া যিনি একজন সরকারি চাকরিজীবী। বাসায় খুব কম আসে বাবাও বাসায় থাকেনা। আম্মা আর আমিই বাসায় থাকি।

মানে হচ্ছে আমাদের চার জনের মাঝেও আমাদের দুইজনের আরেকটা পরিবার হয়ে গেছে এখন। আম্মা সবসময় উঠানে বসে কাঁথা সেলাই করে আর আমি তার পাশে বসে রাজ্যের গল্প করি। আমাদের গ্রামে কোথাও কিছু হলে আম্মা আমাকে সেখানে যেতে দেয়না কী হয়েছে আম্মা এসে আমাকে জানায়। বাবার এক কথা আমার ছেলে হয়ে কখনওই আজেবাজে কাজ করা যাবেনা। সবসময় মাথানিচু করে চলতে হবে। সবায় কে সালাম দিতে হবে। মসজিদে যেয়ে নামায পড়তে হবে। একরকম বাসা থেকে বের হওয়া যাবেনা এমন নিয়ম। প্রথমদিকে রাগ হতো আমি কেন এমন ভেবে তবে এখন একদম মানিয়ে নিয়েছি। এখন আমার অন্ধকার বেশি প্রিয়। আমার নির্জনতা বেশি প্রিয়। মানুষের গায়ের গন্ধ, মানুষের কথাবার্তা আমার অপ্রিয়।

আমার ঘরে একটা টেবিল আছে তাতে কিছু বই আর একটা র্যাঁক আছে, একটা আয়না একটা আলনা, ৪টা চেয়ার এই নিয়েই আমার পরিবার। আমার পরিবারে সবায় নৈঃশব্দ্য উদযাপন করে। কেউ কোন কথা বলেনা। আমার ঘরের জানলা দোরজা সবসময় আটকানো থাকে। ইটের ফাক দিয়ে যতটুকু আলো আসে ওই ওতটুকুই তার বাইরে কোন আলোর রেখা ঘরে আসেনা। আমার পরিবারে আলোর কোন প্রয়োজন নেই। আমার আম্মা বড়ই নিশ্চুপ সে নিজেও কারও বাসায় যায়না। বেশি বকবক করা তার অপছন্দ। সে চুপচাপ থাকে আর ভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমরা মধ্যবিত্ত এজন্য অভাব আমাদের চারপাশে সবসময়। এজন্য অনেক বড় হবার স্বপ্ন নেই। আছে একটু বেঁচে থাকার জন্য আয় রোজগার।

একটা সময় অনার্সে আসার পর আমি বাসা থেকে মেসে উঠি, মেসে আসার পর জীবন কেমন যেন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে এখানকার মানুষের কথাবার্তা, হৈহুল্লো, চিল্লাপাল্লা সবকিছু আমাকে রাগী বানিয়ে দিচ্ছিলো। তারপর একদিন মেস থেকে বেরিয়ে পড়লাম একটা দুই রুমের বাসা নিলাম। তারপর কলেজ করতাম আমি সেখান থেকে। কলেজে যেতাম সেখানকার সবার থেকে আলাদা থাকতাম। বলা চলে আমি একাই বসতাম সবসময়। আমারি মতো আরেকটা ছেলে কে দেখতাম আমার কাছেই বসতো। ওর হাতে অধিকাংশ সময় গল্পের বই বা কবিতার বই থাকতো। নাম জানতাম না। আর আমার এদিকে একা বাসা বেশ ভালো লাগছিলো।

ছাদে কিছু ফুলগাছ ছিলো রাতে আমি বসে সেসব দেখতাম। রাতের চাঁদ যেন আমার সঙ্গী হতো এসবি হয়েছিল আমার আরেক পরিবার। তবে একদিন আমি সেই ছেলের সাথে কথা বলেছিলাম। একটা সময় ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়। ওর নাম কাব্য, লেখালেখির নেশা আছে। স্থানিও পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে ওর লেখা প্রকাশিত হয়। কাব্য আমারি মতো বেশি হৈহুল্লো পছন্দ করেনা। একদিন আমিই আমার বাসায় ওরে আসতে বললাম কফি খেতে। তখন আমাদের বন্ধুত্ব ২ মাস চলছিলো। এরপর কাব্য আমার বাসায় আসে আর আমরা দুজন একসাথে থাকা শুরু করি। কাব্যের সাথে আমার সবকিছু মিলে যেতো এজন্য আর কোন বিষয় নিয়ে ঝগড়া লাগেনি কখনওই। আমাদের বাসায় থাকার মেয়াদ যখন ৩ বছর তখন আমাদের বন্ধুত্ব অনেক গভীর হয়ে যায়।

দুজন মিলে বসে নানান গল্প করি। একজন অন্যজন কে ছাড়া কিছুই করিনা। দুজনি বেশ নামাযী। আমরা একসাথে নামাযে যায় তারপর আমি বসে বই পড়ি আর কাব্য রাতে কবিতা লেখে। কাব্য অনেক সুন্দর কবিতা লেখে। আর এজন্য ওর কবিতা গুলোর প্রশংসা থাকে অনেক। একদিন আমি কাব্য কে বললাম “তুমি চাইলে বই প্রকাশ করতে পারো কারণ তোমার পাঠকবর্গ বেশ বড়সড়” কাব্য শোনে আর হাসে তারপর আবার কবিতাতে মন দেয়। আমার অবশ্য এখন একটা ভালো লাগার নাম কাব্য। কাব্য এখন আমার একটা পরিবার। আমার এই পরিবারে কাব্য আর আমি দুজন মিলে বসে বাস করি। দুজনি বেস সুন্দর করে কাটিয়ে নেয় আমাদের সময়। আমাদের এই পরিবারে কাব্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

আর মাঝেমাঝে আম্মার কথা খুব মনে পরে। তখন ছিলো আম্মার সাথে আমার একটা পরিবার আর এখন আমার সাথে কাব্যের পরিবার। আমি যখন ছাদে বসে রাতের তারা দেখি কাব্য আমাকে দুলাইন কবিতা শুনিয়ে বসে। ছেলেটার কণ্ঠ অনেক চিকণ এজন্য মায়াবী লাগে। আমার অবশ্য তাতে আফসোস নেই কারণ সবার কণ্ঠ একরকম হয়না। যেমন কাব্যের কণ্ঠে কবিতা দারুণ মানায়। যদিও আমাকে দিয়ে তেমন কিছুই হয়না। তবুও আমার এই পরিবারে কাব্যের মতো এতো প্রতিভাবান ছেলে থাকতে আর কী লাগে?? আমি আবার ভালো কফি বানাতে পারি। যখন কাব্যের জন্য কফি বানিয়ে দেয় কাব্য চুমুক দিয়ে বলে “বাহ কতই চমৎকার তোমার ওই যাদুর হাতের ছোঁয়া” আমি তখন মৃদ্যু হাসি। বেশ ভালো লাগে কাব্য যখন খুব মনোযোগ দিয়ে জানালার ওপারে তাকিয়ে কবিতা ভাবে তখন। কাব্য ভালো মাংস রান্না করতে পারে। কারণ আমি অন্যের হাতের মাংসের চেয়ে কাব্যের হাতের মাংসে বেশি স্বাদ পাই।

একদিন কাব্য আমাকে বলল “ইশ যদি দুজনি এভাবে থাকতে পারতাম আমাদের এই পরিবার নিয়ে তবে কতই সুন্দর হতো আমাদের দিনগুলো বলো” আমি হেসে বলি “তা তুমি মন্দ বলোনি এভাবে কাটছে ভালোই খারাপ কী বলো” দিনগুলো কিভাবে যেন কেটে গেলো। আমার জীবনে একটা অদ্ভুত রস এলো। মানে একটা মেয়েকে আমার মনে ধরলো বেশি সুন্দরি নাহ। তবে অনেক মায়াবতী বেশি সাজুগুজু না করলেও যতটুকু করতো ওতটুকু তেই আমার পাগল হবার দশা। কারণ মেয়েটা অনেক সুন্দর করে চোখে কাজল নিতো যা আমাকে অনেকবার তাকাতে বাধ্য করতো। পরিচয় এক যাত্রী ছাউনিতে তারপর দুমাস আমরা বন্ধু ছিলাম। এরপর একদিন তার হাতে হাত রেখে বললাম “এই হাতটা আমার পাশে সারাজীবন চাই” ব্যাচ হয়ে গেলো। এতবছর একজন কবির সাথে থেকে এতটুকু যদি না পারি তবে আর কী?? আমার অনার্স ততদিনে শেষের পথে। কাব্য গ্রামে গেলেও আমি যেতে পারছিলাম নাহ।

আমার মনে কেবল বাসা বেঁধেছিলো কোন এক চিরচেনা অপ্সরী। তাকে নিয়ে আমার ভালোলাগা আমার জল্পনা কল্পনা। আমার সবকিছু! একটা সময় আমাদের ভালোবাসা গভীর হতে থাকে। তখনো আমি চুপচাপ ততবেশি কথা বলা হচ্ছিল না আমার। তখন আমার পরিবারে ছায়া হয়ে থাকে মেয়েটা। কেবল আমার জীবনের মাঝে সে মিশে যেতে থাকে। আমাকে স্বপ্ন দেখাই। আমাকে ভাবাই। আমাকে কত ভালো দেখাতো। দুজন মিলে স্বপ্ন দেখতাম আমাদের এটা হবে ওটা হবে।

মেয়েটা আমাকে কতই না ভালোবাসতো। আর আমিও কম কিসে। এক রাতে মেয়েটা আমাকে দেখার জন্য কান্নাজুড়ে দিলো সেদিন বুঝিনি ভালোবাসা কী। এরপর একদিন সে বলল “মেঘ আমাকে তুমি মাফ করে দিও বাবার ইচ্ছাতে তার পছন্দের ছেলেকে আমি বিয়ে করে নিয়েছি” তারপর আর তার কোন খোজ জানিনা। সে আমাকে রেখে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। আর এরপরে আমার একাকী হবার গল্প আবার শুরু হয়। তখন বেশ চাপা কষ্ট হতো আমার। আর আমি আমার পরিবারে আমার নিশ্চুপ হয়ে যায়। আমার ওই পরিবারে কষ্ট দিয়েছে মেয়েটা। তবে আমার এই পরিবারে আর কেউ কষ্ট দিতে পারেনি।

একটা সময় জব শুরু করলাম, মেসের পরে আর কাব্য কে খুঁজে পাইনি! কারণ কাব্য কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অনেক খোজ নিয়েছি কেউ আর কাব্যের খোজ দিতে পারেনি। শেষ একদিন জানতে পারি কাব্য আমার স্বাবেক প্রেমিকা কে বিয়ে করে নেয় আর সেই লজ্জাতে আর দেখা করেনি আমার সাথে। জানিনা কাব্য কেন এমন ভেবেছিলো আর করেছিলো বুঝতে পারিনি। আম্মা আজকাল অনেক বেশি বলে চলেছে “মেঘ বাপ আমার বিয়ে কর, বিয়ে কর” প্রতিদিন কথাটা শোনার পর একদিন বেশ রাগ নিয়েই বিয়ের কাজ টা শেরে ফেললাম। মেয়েটার নাম মায়া। এখন আমার পরিবারে এই মেয়েটার সাথে থাকা। এই মেয়েটার সাথে আমাকে মানিয়ে নেওয়া। মেয়েটাও আমার সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নিজে থেকে আমার জন্য সবকিছু বানিয়ে রাখে। আমার কিছু লাগবে ভেবে মেয়েটা আমার দিকে তাকিতে থাকে।

আমার চুপচাপ স্বভাব দেখে তার মাঝে একটা অনুরাগ থাকলেও আমি কখনওই তার চোখে ক্রোধ দেখিনি। সবসময় একটা হাসিহাসি মুখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। আমার সাথে তার আর আমি তার সাথে মানিয়ে নেবার চেষ্টা। কারণ এটাও একটা পরিবার। আর এইই পরিবারেও আমরা দুজন। একটা সময় আমি বুঝলাম যে জীবনে অনেকে আসে, অনেকের সাথে আমাদের জীবনপথ শুরু হয় অনেকে আমাদের পরিবার হয়ে ওঠে কিন্তু সবার সাথে সংসার হয়ে ওঠেনা। কারণ সংসার কেবল আপন মানুষ গুলোর সাথে হয় দুদিনের দেখার পর হুট করে চলে যাওয়া মানুষ গুলোর সাথে নাহ। একটা মানুষ যখন বলে আমার কণ্ঠ অনেক মিষ্টি আমার তখন আফসোস হয়না কারণ আমারো আছে। একটা মানুষ যখন বলে আমি দেখতে অনেক সুন্দর আমার আফসোস হয়না কারণ আমিও কম নই।

একটা মানুষ যখন বলে আমার চোখ অনেক মায়াবী, আমার হাসি অনেক সুন্দর, আমি মিষ্টভাষী তখনো আমার আফসোস হয়না কারণ ওসব আমারো আছে। একটা মানুষ যখন বলে আমার অনেক টাকা আছে তখনো আমার আফসোস হয়না কারণ আমারো কিছু আছে?? একটা আদর্শবান পুরুষের যা যা দরকার সব আমার আছে এরপরেও আমার মনে সুখ ছিলোনা। আমার কাছে শান্তি ছিলোনা। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমার ভেতরের প্রাণ টা মরে যায়। আর সেই প্রাণহীন দেহ এতবছর বয়ে বেড়ানো।

আমার ভেতর যে আমি বলে একটা মন আছে সেই মনটা ছোটবেলা থেকেই মরে ফেলা হয়। আমার মাঝে আমার স্বাধীনতা শব্দটা কোথায় যেন হারিয়ে যায় এজন্য আমি আর প্রাণখুলে কথা বলতে পারিনি, হাসতে পারিনি, কেবল গম্ভীর হয়ে থেকেছি। আমি কিছু করলে কে না কে বাবাকে কিসব বলবে আমার বাবা না জানি কতই কষ্ট পাবে এসব ভেবে আর নিজের মতো চলতে পারিনি। এতকিছু বিবেচনা করতে করতে নিজের সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়েছি। কিসে আমি খুশি কী করলে আমার ভালো লাগে এসব কিছু এখন আমি ভুলে গেছি। এখন আমার যে পরিবার আছে সেই পরিবারের মাঝে আমি আমার পরিবার টাকে হারিয়ে ফেলেছি। আমার একান্ত একটা পরিবার ছিলো। যেই পরিবারে কোন শব্দ ছিলোনা! কেবল ছিলো চুপচাপ একটা নৈঃশব্দ্য।

প্রতিটা শিশুর একটা পরিবার থাকে! আপনি যখন বাবা/মা আপনি কখনওই আপনার সন্তান কে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেননা। ওই সন্তানের যে একটা পরিবার আছে, তাকে সেই পরিবার নিয়েই বাঁচতে দিন। তাহলে সে অনেক ভালো করবে, অনেক ভালো থাকবে। ছবি তোলার জন্য হাসি আর প্রাণ খুলে মিষ্টি হাসি এক জিনিস নয় এটা সারাজীবন মনে রাখতে হবে। আমি আমার সেই পরিবারের মাঝে আমার একান্ত পরিবার টা খুঁজি। ভাবছিলাম এসব বাসে বসে! আজ অনেকদিন পর গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি! আম্মার শরিরটা ভালো যাচ্ছেনা অনেকদিন। আমি চাইনা আমার পরিবার থেকে হারিয়ে যাক কোন সদস্য। আমার এই ছোট্ট পরিবারে মানুষ খুবই কম। আমি ভালোবাসি আমার এই পরিবার কে। আর ভালোবাসি এই পরিবারের মানুষগুলোকে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত