আমার বিয়ে

আমার বিয়ে

আজ আমার বিয়ে। পার্লার থেকে একটু আগেই আমাকে সাজিয়ে এনেছে সবাই। সাজটা ভালই হয়েছে। নিজেকে দেখতে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের লাগছে। আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে দেখতে মাঝে নাঝে আমি ভুলেই যাই আমার সাথে কি হয়েছে বা কি হতে যাচ্ছে।

চার বছরের প্রেম ছিল রাকিবের সাথে। কত স্বপ্ন ছিল আমাদের। দুজনে এক সাথে থাকবো। এক সাথে ঘুরবো। ছোট্ট একটা সংসার হবে আমাদের। কিউট কিউট দুইটা জমজ মেয়ে হবে। জমজ মেয়ের কথা বললেই রাকিব রেগে যেত। কারন রাকিবের জমজ মেয়ে পছন্দ ছিল না। কত কিছুই না ভেবেছিলাম। রাকিবের খুব অদ্ভুত একটা ইচ্ছা ছিল। ছোট বেলা থেকেই ওর কেন যেন লুকিয়ে বিয়ে করতে ইচ্ছা করত। আমাদের সম্পর্ক শুরু হবার দুই মাস পর থেকেই রাকিব বার বার বলত চলো আমরা দুজন লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলি। আমি কখনই রাজি হতাম না। কারন আমি আমার পরিবার আর রাকিবের পরিবার কে কষ্ট দিতে চাইনি কখনই।

আমাদের সম্পর্কের যখন দুই বছর চার মাস তখন রাকিব খুব ভাল একটা জব পায়। ৩০,০০০ টাকা বেতন ছিল শুরুতেই। রাকিব চাইলেই তখন আমার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে পারত। কিন্তু আমি চাইনি এত তারাতারি আমার বিয়ে হোক। আমি চেয়েছিলাম আমার পড়া-শুনা টা শেষ করতে। রাকিব ও কখনো আমকে বাধা দেয়নি।

আমাদের সম্পর্কের তিন বছর যেদিন পুরোন হল, সেদিন আমরা লুকিয়ে বিয়ে করি। আমি রাজি ছিলাম না। অনেক না না করেছি তার পরও রাকিব এক প্রকার আমাকে বাদ্ধ করে রাজি করায়। আমি খুব মন খারাপ করি। কান্না কাটিও করে। কিন্তু বিয়ের সময় কেন যেন বিয়েটাকে অত বেশি জটিল মনে হয়নি। শুধু তিন বার কবুল বলতেই বিয়ে হয়ে গেল। আর একটা সিগ্নেচার।

বিয়ের দিন আমি আর রাকিব রাকিবের এক বন্ধুর বাসায় থাকি। রাত ১০ টা পর্যন্ত রাকিবের সাথে থেকে বাসায় চলে আসি। সেদিন অবশ্য আমাদের ভিতর তেমন কিছু হয়নি। বিয়ের ঠিক ৬ মাস পরে রাকিব ওর বাবা কে আমাদের বাসায় পাঠায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তখনো কেউ জানেনা আমরা দুজন লুকিয়ে লুকিয়ে আগেই বিয়ে করেছি। আমরা জানাতেও চাইনি কখনো।

আমার বসায় প্রথমে রাজি না হলেও পরে আমার সুখের কথা ভেবে রাজি হয়ে যায়। আমরা দুজন ঠিক করলাম আমরা আমাদের বিয়ের দিনই আবার বিয়ে করবো। রাকিব খুব কষ্টে সবাই কে ম্যানেজ করল ওই দিনেই বিয়ের ডেট ফেলতে। বাসার সবাই যখন রাজি হল আমি যে কি খুসি হয়েছিলাম।

বিয়ের ঠিক দুই মাস আগে রাকিবকে অফিসের কাজে বাংলাদেশের বাহিরে যেতে হয়েছিল। রাকিব সেই যে গেল আর বাংলাদেশে ফিরতে পারল না। ওখানেই গাড়ি এক্সিডেন্ট করে মারা গেল। ওর লাশ টা অবশ্য আনা হয়েছিল। কিন্তু আমি ওর লাশ টা পর্যন্ত দেখতে পারিনি। রাকিবের মৃত্যু খবর শুনেই আমি নিজেকে শেষ করে দেবার জন্য নিজের গলায় দড়ি দেই। ফ্যানের সাথে দড়ি বেধে ঝুলে ছিলাম বেশ কিছু ক্ষন। খুব কষ্ট হচ্ছিল তখন। আস্তে আস্তে আশ-পাশটা অন্ধকার হয়ে আসছিল। আমার ঠিক মনে নেই কিন্তু কেউ একজন আসে আমার পা ধরে আমাকে উচু করে ধরল। তারপর হয়তো আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফিয়ে দেখি আমি হাসপাতালে। আমার সাথে আমার মা। জ্ঞান ফিরার পর আমার মা আমার দিকে এমন অদ্ভুত ভাবে তাকাল, মনে হল যেন আমি খুব পাপ একটা কাজ করে ফেলেছি। শুধু একটা কথাই বলল- “আমাদের মান সম্মান আর রইল না। তুই মরে দেলেও ভাল হত। কেন যে বাঁচাতে গেলাম।”

মায়ের কথা টা শুনে আমি যে কিছু বলবো সেই শক্তি আমার ছিল না। কিছু ক্ষন পরে আমি আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার জ্ঞান ফিরে দুইদিন পর। জ্ঞান ফিরার পর জানতে পারলাম রাকিবের সাথে আমার যেদিন বিয়ে হবার কথা ছিল সেই দিনই আমার বিয়ে হবে। আমার দূর সম্পর্কের খালাতো ভাইয়ের সাথে। আমি বাধা দিতে অনেক চেষ্টা করি কিন্তু কেউ আমার বাধা মানলো না। বাবা মা কে দেখে তখন মনে হত যেন এটা আমার আপন বাবা মা না। আমি কিছু বললেই মা শুধু একটা কথাই বলতো সম্মান যা ডুবানোর ডুবিয়েছিস আর না। যে টুকু সম্মান আছে সেটা নিয়ে অন্তত বাঁচতে দে। কথা গুলো শুনে আমার কেন যেন মনে হত হয়তো আমরা লুকিয়ে বিয়ে করেছিলাম সেটা তারা জানতে পেরেছে। জানলে জেনেছে তাই বলে এমন আচারন করবে তারা!!! কেন!!! বিয়েই তো করেছি। পাপ কিছু তো করিনি!!!

আজ আবার আমার বিয়ে। রাকিবের সাথে বিয়ে টা হবার কথা ছিল। কিন্তু….!!!! বাবা মার কথা শুনে আমি ডিসিশন নিয়েছিলাম আমি বিয়ের দিন বিষ খাবো। গত সাপ্তাহে বিষও জোগাড় করেছি। এখনও বিষের শিশি টা আমার সাথে আছে। কিন্তু গত পরশু দিন আমার সব চিন্তা সব ডিসিশন পালটে গেছে।

কারন আমি গত পরশু দিন শুনেছি আমার গর্ভে রাকিবের সন্তান। যখন রাকিব মারা যায় তখন নাকি দুই সাপ্তাহ তিন দিন পূর্ণ হয়েছে। আমার গর্ভে রাকিবের সন্তান এটা ভাবতে যেমন ভাল লাগছে আবার অন্য একজন কে ধোকা দিচ্ছি নিজের স্বার্থের জন্য এটা ভেবে খারাপ লাগছে। আমার কি বিয়ে টা করা উচিৎ??? আমি বুঝতে পারছি না!!! মনে হয় করা উচিৎ!!! কারন এই সমাজ আমার সন্তান কে মেনে নিবে না। সবাই ওকে জারজ সন্তান বলে গালি দিবে। যদিও আমি বলি আমাদের বিয়ে হয়েছিল। তার প্রামান দেখালেও এখন কেউ বিশ্বাস করবে না। ভাববে সব কিছু মিথ্যা আর বানানো। এখন তো এই সব কাবিন নামা বানানো কোন ব্যাপারি না। কিছু টাকা খরচ করলেই বানানো যায়।

বাহিরে চিল্লা চিল্লির শব্দ শুনা যাচ্ছে। বর যাত্রী আসছে, বর যাত্রী আসছে, বর যাত্রি আসছে। এই তো বর যাত্রি আসে গেছে। একটু পরেই হয়তো বিয়ে হয়ে যাবে। এবারো শুধু তিন বার কবুল বলতে হবে। মনে হয় এবার জিনিস টা আমার জন্য সহজ হবে। আগের অভ্যাস আসে তো। খুব হাসি পাচ্ছে আবার চোখ দিয়ে পানিও পরছে!!! কি অদ্ভুত জীবন টা!!! যেটা কখনই ভাবিনি সেটা আজ আমাকে করতে হচ্ছে!!!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত