অপরিচিতা

অপরিচিতা

অপরিচিত ঘরের বিছানায় বসে আছি। এই বিছানাকে এখন পরিচিত করাতে হবে। কয়েক ঘন্টা আগেও আমি আমার পরিচিত ঘরে ছিলাম। আমার বান্ধবী শোভা আর শারমিন মিলে আমাকে জোর করে সাজালো। আমি কোন দিনও সাজসজ্জা পছন্দ করতাম না। কিন্তু আজকের দিনে নাকি সাজতেই হবে। সেজে গুছে বসে আছি খাটে। রাত ১১ টা বাজে। এমন সময় দরজা খুলে এক অপরিচিত লোক ভেতরে ঢুকলো। আমি একটু নড়ে চড়ে বসলাম। অনেকক্ষণ থেকেই পুতুল সেজে বসে আছি। একটু মানুষের মতো নড়াচড়া করার ইচ্ছা হলো।

লোকটার ছবি দেখেছি। যেদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিলো দু ঝলক দেখেছি বটে। তবে কথা তো বলি নি। এতক্ষণ পর নিশ্চয় জেনে গেছো যে আমার বিয়ে হয়েছে। ছোট বেলার থেকে যেই মেয়েটা প্রেমের গল্প পড়ে বড় হয়েছে আজ তার প্রেম না করেই বিয়ে হয়ে গেছে। কথাটা ভাবতে গেলে কেমন জানি লাগে। অবাক বা কষ্ট? ছেলেটা লম্বাই আমার থেকে বড় হয়। আমি তার গলা পর্যন্ত। দেখতে মোটা মুটি। দুই পাশের গাল দেখে মনে হয় কেউ খেয়ে গিয়েছে। গায়ের রং ফরসা। ভেতরে ঢুকে খাটের অপর প্রান্তে বসলো। আমার থেকে বেশ খানিকটা দূর।

” তোমার নাম নওরিন?” লোকটি জিজ্ঞাসা করল।
” জি।”

ইচ্ছা হলো তাকেও একটা পালটা প্রশ্ন করতে : আপনার নাম খালিদ? তবে লোকটা আমার বন্ধু না। তাই দমে গেলাম আর চুপ করে বসে রইলাম।

” খুব ক্লান্ত তো। অনেক পথ আসতে হয়েছ, ” খালিদ বলল। ” জি ” আমার উত্তর এতো ছোট কেনো বুঝলাম না। অন্য সময় বান্ধবীদের সাথে প্রচুর কথা বলতে পারি। লোকটার কথা শুনে মনে হচ্ছে আজ বাসর রাত বলে কিছু নেই। লোকটার এসবের প্রতি আগ্রহ নেই। প্রেম না করা বিয়েতে হয়ত এমনি হয়।

” এখন তাহলে ঘুমিয়ে পড়ো,” খালিদ বলল।

গল্প করা যেতো। খালিদের যখন কোনো আগ্রহ নেই আমার কি বা করার আছে। স্বামির নাম মুখে নিতে নেই জানি, এটা গল্প বলার স্বার্থে লিখেছি। আমি ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম। আমার গায়ে গয়না পরাই ছিলো। আর মুখে শারমিন আর শোমার অত্যাচারের ছাপ অর্থাৎ মেক আপ।

” তুমি এই অবস্থায় ঘুমাবে?” খালিদ বলল। আমি অবাক হলাম। ভেবেছিলাম খালিদ আর কথা না বাড়িয়ে ঘুমাবে।
” যাও ওদিকে বাথরুম আছে। ফ্রেশ হয়ে আসো,” খালিদ বলল।

আমি তার কথা মতো রুমের সাথে যেই বাথরুম ছিলো সেখানে গেলাম। সাথে জামা পায়জামা নিলাম। নিজের চেহারা আয়নায় দেখে চমকে উঠলাম। এলিয়েন মনে হচ্ছিলো। মেক আপ করে মুখ পুরো মরা মানুষের মতো সাদা করে দিয়েছে। ভাবলাম যখন ভেতরে এসেই পড়েছি গোসল করেই বের হবো। সমস্ত গয়না আর মেক আপ ছাড়া গোসলের পর নিজের চেহারা আয়নায় দেখলাম। মনে সন্তুষ্টি আসলো। বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখি খালিদ এখনো ঘুমোয় নি। একটা বই পড়ছে। বাথরুমে দরজা খোলার শব্দে হয়তো আমার দিকে দৃষ্টি পড়েছে। ” Sorry,” ভাবলাম খালিদের পড়ায় ডিস্টার্ব হয়েছে তাই তাকে বললাম।

খালিদ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমি সব গয়না ঠিক মতো গুছিয়ে রাখছিলাম। খালিদের চোখ পুরোটা সময় আমার দিকে ছিলো। আমার খারাপ লাগছিলো। বেটার ওপর বিরক্ত এসে গেলো। রাগে মনে মনে গালি দেবো এমন সময় মনে পড়ল আমার স্বামি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে পড়ে গেলো খালিদ এখন আমার বর। তাই বলে এমনভাবে তাকাবে কেনো?

” কিছু হয়েছে?” আমি রেগে গিয়ে বললাম।
” হুম, নাতো,” খালিদ জবাব দিলো।

তাহলে অমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছো কেনো? কথাটা বলা গেলো না। অপরিচিত লোক তাই। আমি কাজ সেরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আসলেই ক্লান্ত ছিলাম। খালিদ কতক্ষণ ভুতের মতো তাকিয়ে ছিলো জানি না। ঘুমটা ছিলো গভীর। সকালে উঠতে ভাবলাম দেরী হয়ে গেছে। কিন্তু খালিদ যে দেরী করে উঠতে আমাকেও মাথ দিয়ে দেবে জানতাম না। আমি মনে মনে খালিদের চেয়ে আগে উঠে খুশি হলাম। রান্নাঘরে যাওয়া নতুন বউ এর কর্তব্য। তাই ফ্রেশ হয়ে সোজা রান্নাঘরে গেলাম। শাশুড়ি ইয়াং বলা যায়। দিব্যি নিজ মনে কাজ করে যাচ্ছে। আমার কিছু করা লাগবে কিনা তাকে জিজ্ঞাসা করলে বলল বসে গল্প করতে। এই অপরিচিত বাড়িতে শাশুড়িইই আমার প্রথম বান্ধবী ও আপন ব্যাক্তি যার নাম নিলীমা। নামটা যেমন সুন্দর তেমন মানুষটাও সুন্দর। অনেক গল্প আর হাসির মাধ্যমে নিলীমা মাকে আপন করে নিলাম। তিনি আদেশ দিলেন বলা যায়, খালিদকে ডেকে তুলতে।

তার কথা মতো আমি ঘরে গিয়ে দেখি ঘুমাচ্ছে। প্রথমে দু একবার তাকে নম্র শুরে ডাকলাম। একটুও দেহ নড়লো না। রাতে ভুতের মতো তাকিয়ে ছিলো আর এখন মরা মানুষের মতো পড়ে আছে। মানুষ কিনা আমার সন্দেহ আছে? আমি জোরে জোরে, এই যে শুনছেন বললাম। তারপর বাধ্য হয়ে নাম ধরে ডাকাডাকি করলাম। কিছু হলো না। গায়ে হাত দিতে আমার আপত্তি ছিলো। ব্যর্থতা আমি মানি না। নিলীমা মা যে কাজ বলেছে করতেই হবে। রান্নাঘরের কাজ না করিয়ে এই ঘুম দানবকে তুলতে বলেছে। আমাকে পারতেই হবে।

কি করা যায় বলে ঘরে পায়চারি করছি। এমন সময় মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি আসলো। ঘর থেকে খুঁজে খালিদের মোজা একটা কলমের মাথায় ধরলাম। নিজের নাক বন্ধ করে মোজাটা খালিদের নাকের কাছে অতি সাবধানে ধরলাম। খালিদ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এপাশ ফিরে নড়াচড়া করল। যেই পাশে সে মুখ ঘুরাই আমি সেই পাশে মোজা ধরি। এক সময় সফলতার সাথে খালিদ ছটফট করে ঘুম থেকে উঠে পড়ে। আমি খালিদের দেখার আগেই মোজাটা লুকিয়ে ফেলি। হাসি মুখে তাকে good morning বলি। রান্নাঘর এ তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে দেখে নিলীমা মা অবাক। আমি তার কানে কানে খালিদকে ওঠানোর গোপন রহস্য জানিয়ে দিলাম। নিলীমা মা অনেকক্ষণ কাজকর্ম ফেলে হাসলেন। খালিদ রিতীমত এসে জিজ্ঞাস করলো, “কি ব্যপার?”

কথাটা গোপনীয় যা খালিদকে জানানো হুমকিস্বরূপ। নিলীমা মা আর আমি চেপে গেলাম। খালিদ অফিসে যাওয়ার পর নিলীমা মা এর সাথে অনেক কথা বললাম। নিলীমা নামটা বড় তাই নিলামা বলে ডাকাটা পছন্দ করে নিলাম। আড্ডাই জানতে পারলাম আমার শশুর, যিনি মারা গেছেন অনেক বছর আগে, ভাল লোক ছিলেন না। আমার খালিদের ব্যপারে জানতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু নিলামা খালিদকে নিজে থেকে জিজ্ঞেস করতে বলল। আজ রাতে তাই ঠিক করলাম গল্প করব। খালিদ রাতে আগের দিনের মতো বই নিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি সারাদিন বসে বসে কি কি প্রশ্ন করব তাই ভেবে নিয়েছিলাম।

” আচ্ছা, তোমার পছন্দের রং কি?”
” কালো।” হুম, আশা বেশি ছিলো না। তাও প্রশ্ন করতে থাকলাম।

” বিড়াল পছন্দ না কুকুর?”
” কুকুর।” আমি বিড়াল নিজের বাচ্চার মতো ভালোবেসেছি সারা জীবন। ইনি বলেন তার পছন্দ না।

” বিড়াল পছন্দ না কেন?”
” এক বিড়াল আমাকে কামড়িয়েছিল।”
” বিড়াল আমার খুব প্রিয়।”
” বিড়ালের চেয়ে কুকুর বেশি উপকারী। ”
” ভালোবাসা উপকারিতা দেখে হয় না।”

খালিদ আর কিছু বলল না। আমি রাজ্যের গল্প জুড়ে দিলাম। নিজের পুরনো দুঃখ যাবতীয় যা যা ছিলো সব বললাম। উত্তরে খালিদ শুধু ‘ হুম ‘ ছাড়া বেশি কিছু বলল না। আমার কথার জন্য খালিদের বই পড়া আর হলো না। রাত ১ টার দিকে কথা বলে হাপিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। পরের দিন সকালে উঠলাম। বাসর রাতের সকালে যত দেরীতে উঠেছিলাম তার কিছু আগেই ঘুম ভাঙলো। নিলামা কাজ করতে দিতে না চাইলেও আজ জোর করে কিছু করলাম। অপরিত ঘরটা আজ নিজের হয়ে উঠেছে। তো নিজের ঘরে ঢুকে সেই ঘুম দানবের দিকে নজর পড়লো।

আগের দিনের মতো মোজা দিয়ে কাজ হবে না। প্রতিদিন একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হুমকিস্বরুপ। আজ ঠিক করলাম খালিদের নাক বন্ধ করে দেবো। ব্যপারটা রিস্কি তাই ১ মিনিট নাক আটকিয়ে ছেড়ে দেবো। কথা মতো খালিদ ছটফট করে উঠে পড়লো ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে। বিজয়ের হাসি হেসে খালিদকে good morning বললাম। ঘরে বসে আমি খালিদের বিভিন্ন বই পড়ি। বই পড়তে গিয়ে মনে হয় যে খালিদের ব্যপারে তেমন কিছুই জানা হয় নি। তাই সেই রাতে খালিদের ইতিহাস জানলাম। এরপর থেকে প্রতিরাতে খালিদের সাথে আমার গল্প হয়। বিয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই অপরিচিত লোকটি আমার বন্ধু হয়ে গেলো। এমনই এক রাতে খালিদ বাসর রাতে তার অনুভুতি শেয়ার করলো আমার সাথে।

” ঘরে ঢুকে দেখি এক সাদা মেয়ে বসে আছে। যার চেহারা, হাতের চেয়ে বেশি সাদা। আমার তো পাশে বসতেই কেমন লাগছিলো। ফ্রেশ হয়ে আসতে বলার বাহানায় বিছানায় বই নিয়ে শুয়ে পড়লাম। মেয়েটা হয়ত গোসল করে আসলো। মুখের সাদা রং কেটে গেছে আর এক সুন্দরি মেয়ে আমার সামনে তার ভেজা চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হলো খুব। ইচ্ছে হয়েছে তাই তাকাবো ঠিক করলাম। পাশের বাসার কোনো মেয়ে না, আমার বউ। মেয়েটা হয়ত রেগে গেলো আমার তাকানোতে। তাই চোখ সরিয়ে নিলাম। রাগ করলে তাকে আরো সুন্দর লাগলো আমার কাছে। যখন আমার পাশে এসে ঘুমালো আমার মিষ্টি মেয়ের মতো লাগলো। ভেজা চুলে তাকে প্রথম দেখে আমি তার প্রেমে পড়ি। ” খালিদ আমাকে এত দিন মনে মনে ভালোবেসেছে জানতে পেরে খুব ভালো লাগলো। অবশেষে অপরিচিত লোকটার প্রেমে আমাকে পড়তেই হলো। এখন আমার কাছে তার তাকানো খুব ভালোই লাগে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত