অনুভূতির নীল পদ্ম

অনুভূতির নীল পদ্ম

নীলু কেমন আছো? হঠাৎ কারো ডাকে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি। এক ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয় আছে। ঠিক চিনতে পারছি না। চশমাটা খুলে ভালো করে মুছে। খেয়াল করে দেখলাম এতো সমুদ্র। এতো বছর পর তাকে দেখবো ভাবতেও পারি নি। কি হলো নীলু চিনতে পারলে? তা ছাড়া না চিনারই কথা অনেক বছর পর দেখা। আর আমিও পরিবর্তন হয়েছি অনেক তাই না?। কি হলো কথা বলছো না যে, ভূত দেখছো নাকি? আচ্ছা পরিচর দিছি তাহলে। না তার দরকার নেই! সমুদ্রই তোঁ আপনি। চিনেছি আমি। আমি এইতো আছি আলহামদুলিল্লাহ! আপনি কেমন আছেন?আর এখানে? যাক চিনলে তাহলে! এখানে এইতো ঘুরতে আসা অবসর সময় কাটানো বলতে পারো। তোঁ তুমি এখানে? আমিও এইতো ঘুরতেই এসেছি। ও! আচ্ছা। তোঁ চলো ঐদিকটায় বসে কথা বলি। এখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনা বেশিক্ষণ। পা ব্যাথা সুরু হয়ে যায়।

আচ্ছা! চলুন বসা যাক নদীর ঐদিক টায়। নীলু। হ্যা!বলুন। তুমি আমাকে চিনতে পেরেছো তা ভেবে খুব ভালো লাগছে। আপনাকে কি করে ভুলবো? এতটা বছর ধরে তোঁ হৃদয়ের একটা কোন ঝুরে রয়ে আছেন । (মনে মনে) আসলে স্কুলের সবাই আমাকে নীলু বলে ডাকতো শুধু। এরপর আর কোথাও কেও এই নামে ডাকে নি তোঁ তাই এত সহজে চিনতে পারা। আপনি তোঁ ততটা পরিবর্তন হন নি এতবছরেও এটাও একটা কারনে সহজে চিনার। ও! আচ্ছা। হুমমম!আপনিও তোঁ আমাকে চিনে ফেলেছেন। আমি তোঁ অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছি। আগের মতো তেমন কিছুই নেই। তোঁ আপনি কি করে চিনলেন? আর এত নিশ্চিত কি করে হলেন এটাই আমি?

তোমাকে ভুলে যাবো নীলু? এটা কি সম্ভব্য? তুমি যেমনই হয়ে যাও যতো পরিবর্তনই হও। তুমি আশেপাশে থাকলে আজ সেই অনুভূতি জীবিত হয়ে যায়। সে অনুভূতি দিয়েই বুঝে নিয়েছি গোঁ। আর এই মুঁখ এই চোঁখ যা আজও মনে করে মাঝেমধ্যে বুকটা ভরে যায় কেমন যেন এক কষ্টে। এই কষ্ট ভালো লাগার। তোমার অনুভূতির নীলু। তা কি করে ভুলি বলো? (মনে মনে) আরে আমার স্কুল লাইফের আমাদের ক্লাসের এখনো সবাইকে মনে আছে। আর তুমি তোঁ জানই আমার ব্রেন সম্পর্কে। হা হা হা! এত সহজে কিছু ভুলি নাই। তাই আর কি তেমন কিছুনা। তোঁ তোমার মনে আছে সবাইকে? নাকি ভুলে গেছো? (সমুদ্র)

হ্যা!আমারও মনে আছে সবাইকে। জানেন খুব মনে পরে সেইদিন গুলো। খুব ইচ্ছে করে জানেন সবাইকে এক সাথে আবার দেখার। কিন্তুু তা তোঁ আর কোনদিন হবে মনে করতেই বুকটা হঠাৎ কেপে উঠে। আর স্কুল জীবন অনেক আগে হয়তবা শেষ হয়ে গেছে অনেক বছর আগে। কিন্তুু এখনো আমার চোখে সবাই চেহারা ভাসে। সেই বয়সের চেহারা কার কেমন ছিলো সব মনে আছে। জানেন এমন মনে হয় যেন এইতো সেদিন স্কুলে ছিলাম সবাই। (নিলু) হা হা হা! তাই নাকি? আমারো মাঝেমধ্যে মনে হয় সবাইকে দেখার। কিন্তুু কি করার বলো? এখন কি আমাদের বয়স আছে? আর যে যার মতো এক একজন এক এক যায়গায় আছে। (সমুদ্র)

হুমমম! আচ্ছা আমাদের স্কুলের কোন স্যারই তোঁ আর নেই মনে হয় তাই না? জানেন শরীফ স্যার কে আজ মনে পরে। এরকম ভালো মানুষ খুব কম দেখেছি এই এতদিনে জীবনে। কত সহজে মিশতো সবার সাথে, ইমন স্যার তার ক্লাস গুলো মনে করে এখনো হাসি পায়। কারো কোন কথা শুনার আগেই সবাইকে এক সাথে মারতো। হা হা হা!অবশ ছেলেরা বেশি মার খেতো। কথায় কথায় বাড়ি দিতো হা হা! আমাদের ক্লাসের রুল এক কি জেন নাম ছিলো। হ্যা! ইমন হা হা হা! তার কথা মনে পরলে এখনো হাসি পায়। এতো পিটানি খেতো কিন্তুু তার বকবক স্যারদের সাথে সাথে কথা বলা বন্ধ হতো না। সবচেয়ে ক্লাসে বেশি বিরক্ত করতো সে। তখন কতো বিরক্তই না হতাম আর এখন ঐগুলাই খুব মিস করি। আচ্ছা! সমুদ্র দা ইমন কি আছে এখনো? (নীলু) না! ও তোঁ ৪ বছর আগেই মারা গেছে। অনেকেই চলে গেছে উপারে। বয়সতো আর কম হলো না আর কতদিন বা থাকবে।

কথাগুলা বলেই বড় একটা নিশ্বাস নিয়ে চুপ হয়ে গেলো সমুদ্র দা। আমি আর সমুদ্র দা চুপচাপ অনেকক্ষণ কোন কথা ছাড়া নদীর দিকে তাকিয়ে আছি। মনে পরছে স্কুল জীবনের সেইদিন গুলো। এই মানুষটার জন্য কেমন জানি একটা অনুভূতি কাজ করতো আমার। সে আশেপাশে থাকলেই বুঝে যেতাম সে আছে। কেন এমন হতো জানা নেই আমার আজো। একি ক্লাসে ছিলাম কিন্তুু কোনদিন কথা হয়নি আমাদের মাঝে কোনদিন। আমি ছেলেদের সাথে কথা বলতাম না। কোন বন্ধু ছিলো না ছেলে। খুব চুপচাপ আর ভদ্র ছাএী থাকায় কারনে কথা দরকার ছাড়া একটাও বের হতো না আমার মুখ দিয়ে। সমুদ্র দাও ছিলো এমন মেয়েদের সাথে তেমন কথা বলতেন না। কিন্তুু পরে এসে বলতো অনেকের সাথে কথা কিন্তুু আমার সাথে হয়নি কোনদিন। সে যেই দিক দিয়ে আসতো আমি তার অন্য পথ দিয়ে যেতাম।সব সময় দূরে দূরেই থাকতে চাইতাম।

চাইতাম তাকে যেন না দেখি। কিন্তুু সব সময় তার উল্টটাই হতো না চাইতেও সামনে চলে আসতো সব সময়। কোন না কোনভাবে সে আমার সামনে পরে যেতই। ক্লাসেও তেমনটা হতো আমি যেদিক টায় বসতাম সেও ঐদিকটায় মুখামুখি বসতো। তখন আমি আবার এমন ভাবে বসতাম যাতে তাকে না দেখা যায় বা আমাকে না দেখে। লাগতো যদি চোখে চোখ পরে যায়। আমারর তার প্রতি যে অনুভূতি কাজ করে তা যেন না বাড়ে সেই চেষ্টাই করতাম সব সময়। আমিও জানতাম তারও আমার জন্য একি অনুভূতি কাজ করে। হ্যাঁ! সে বলে নি মুখে কোনদিন কিন্তুু আমি বুঝতাম। সে যে আমাকে দেখতো সুযোগ পেলেই তা আমি বুঝতে পারতাম। হা হা হা!অনেকের মনে হবে এসব ছবিতে হয়। আরে না বাস্তব্যেওও হয়। সে অনেক সময় ইচ্ছা করে হঠাৎ করে আমার সামনে চলে আসতো। মাঝেমধ্যে এতবড় রাস্তা রেখে দেখছে আমি যেদিক দিয়ে আসছি একদম আমার বরাবর বা একদম পাশদিয়ে যেতো।

আমি তার দূরে দূরে যতো থাকতে বা লুকিয়ে থাকতে চাইতাম সে ততো সামনে আসতো। তখনকার এইসব অনুভূতি সব আবেগ বা এটা বড় হলে আর থাকবে না না। এইসব চিন্তা করে চাইতাম সব সময় কখন স্কুল শেষ করবো।কারন তার প্রতি আমার এমন অনুভূতি নাম জানা নেই। আর হলেও এইসব আবেগ তার নাম দেওয়া সম্ভব্য না কোনদিন। আর বাস্তবতা চিন্তা করে ভবিষ্যতে কি হতে পারে এইসব চিন্তা করে নিজেকে নিজেই বুঝাতাম। আর সেও এইসব দিক চিন্তা করে বাস্তবতা চিনা করে ভবিষ্য চিন্তা করেই আমাকে কিছু বলে নি এটাও আমি জানি। হতে পারে তার সাথে কথা হয়নি কিন্তুু তার নির্বতা ভাষাও কি করে যেন জানতাম আমি। এইতো এমন করেই স্কুল জীবন শেষ হয়ে গেলো। এরপর কোনদিন আর কারো সাথে কারো দেখা হয়নি। মাঝেমধ্যে মনে চাইতো দেখার। ঐ স্কুলের রাস্তা দিয়ে কখনো আসাযাওয়া করলেই মনে হতো যদি হুট করে তার দেখা পেতাম। কিন্তুু কোনদিনও আর দেখা হয়নি।

মজা বিষয় হলো এত বছরে কতকিছু হলো কিন্তুু তার প্রতি সে অনুভূতি আজও রয়ে গেছে। হ্যা! হয়তো সে অনুভূতিতে কোন যত্ন নেই কিন্তুু মুছেও যায় নি। আর আজ যখন তাকে প্রথম দেখলাম। আর এখন পাশে আছে ঠিক ঐস্কুলে তাকে দেখলে যে অনুভূতি অনুভব করতাম তা করছি এখন। হা হা হা! কি আজব মানুষ বয়স্ক হয় কিন্তুু অনুভূতি একি কী করে থাকতে পারে! আমি জানি সেও একি অনুভব করছে এখন কিন্তুু তবুও জানতে ইচ্ছে করছে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করছে। সমুদ্র দা আমি যা অনুভব করছি তুমিও তাই করছো তাই না? কিন্তুু না বলবো না থাক না বলাই থাক। কি নীলু? তুমি তোঁ সেই আগের মতই আছো দেখছি। এখনো চুপচাপ আনমনে কি যেন ভাবো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। ( সমুদ্র)

যাক সে যে তাকিয়ে থাকতো আগে তা প্রমাণ হলো তাহলে। ইসস! কি সুন্দর লাগছে নীল পদ্মটা। কতো শখ ছিলো কেও একজন কোন একদিন। শতশতো পদ্মের মাঝ থেকে নিল পদ্ম এনে বলবে। নীলু তোমার নীল শাড়ি,নীল চুড়ি,নীল টিপ, কালো কাজল আর এই নীল পদ্ম কে সাক্ষী রেখে বলছি। ভালোবাসি, ভালোবাসি। কিন্তুু না তা কোনদিন হলো হয় নি!! নানুভাই তুমি এখানে ঐদিকে আম্মু মামা তোমাকে খুঁজতেছে। চলো তারতারি বাস ছেড়ে দিবে কিছুক্ষণ পর। (ইরা) হ্যাঁ তুমি যাও আমি আসছি। সবাইকে বলো গিয়ে নানু আসছে চিন্তা না করতে। আচ্ছা! (ইরা)

এটা কে নীলু? তোমার মতো দেখতে অনেকটা। (সমুদ্র) এটা আমার ছোট মেয়ের ঘরে নাতনী ইরা। আচ্ছা! উঠি তাহলে আমি । আমরা আবার আজই ঢাকায় চলে যাচ্ছি। বাস ছেড়ে দিবে মনে হয় কিছুক্ষণ পর। নিজের প্রতি যত্ন নিয়েন সমুদ্র দা। আর কোনদিন হয়তো দেখা হবে না। ভালো থাকেন সেই কামনা রইলো। হুমমমম!আমরাও চলে যাবো কিন্তুু বিকাল এর দিকে। বড় ছেলের কি কাজে যেন একটু দেড়ি হবে তাই আরকি। আচ্ছা! তুমিও ভালো থেকো নীলু।(সমুদ্র) অনেকটা দূর চলে এসেছি হেটে হঠাৎ পিছন থেকে সমুদ্র দা জোরে নীলু বলে ডাক দিয়ে দাঁড়াতে বললো। দাঁড়ালাম সে অনেক জোরে হেটে আসতে চেষ্টা করছে কি বলাবে কে জানে। কি সমুদ্র দা ডাকলেন কেন কিছু বলবেন?
নীলু এইগুলা ধরো।

আমি আবাক হয়ে গেলাম সে আমার হাতে ৩টা নীল পদ্ম দিলো। আমি এতক্ষণ খেয়াল করিনি তার হাতে কি ছিলো ভালো করে। তার কমর পর্যন্ত ভিজে আছে। কি বলবো আমি তাকে ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না নির্বাক হয়ে আছি। ফুলগুলো নিয়ে হাটা দিলাম চোঁখ দুটো ভিজে যাচ্ছে । আবার ডাকলো পিছন থেকে সে নীলু!! আমি চোঁখ মুছে পিছন ফিরে চাইলাম। হুমমম!বলুন। না কিছুনা।(সমুদ্র) হুমমমম! আসি তাহলে।

তার চোখে মুখে এখন তৃপ্তির হাসি। থাকবে নাই বা কেন। তার এতদিনের এতবছর আগের না বলা কথাটা সে আজ বলতে পেরেছে। হ্যাঁ!যখন পদ্ম গুলো আমার হাতে দিলো। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সে বলছে নীলু তোমার এই নীল পদ্মটাও জানে তোমায় ভালোবাসি, ভালোবাসি!!!!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত