অমনোযোগী মেয়েটা

অমনোযোগী মেয়েটা

পার্কে বসে আছি। হঠাৎ দেখতে পেলাম, বাবার বয়সী একজন লোক কোমর দুলিয়ে ডান্স করে উঠল! আমিও ফিক করে হেসে উঠলাম।তার নৃত্য বাড়ছে,আমার হাসিও বাড়ছে আর আশেপাশে লোকজন ও বাড়ছে। সকলেই কৌতুহলী হয়ে ওনার নাচ দেখছে।কেউ আবার হাত তালিও দিচ্ছে।এমন সময় লোকটা চেঁচিয়ে বলে উঠল, খুব মজা না? একজন বিপদে পড়ছে আর আপনাদের মজা?

প্রশ্ন শুনে আমরা উৎসুক চোখে তাকালাম। লোকটা বলল,আমার জামার ভিতরে একটা তেলাপোকা ঢুকে গেছে।ওটা সারা গায়ে দৌড়াদৌড়ি করছে আর আমি হেলছি দুলছি।তাই জন্য আপ্নারা হাসবেন? এই কথা শুনে সবাই আবারো হেসে উঠল। আমি হাসি থামিয়ে এগিয়ে এসে বললাম, কাক্কু আপনি পাঞ্জাবি টা খুলে ফেলুন। লোকটা বাকা চোখে তাকিয়ে জবাব দিলো, ছিঃ ছিঃ কি নির্লজ্জ মেয়ে! আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম।এখানে নির্লজ্জতার কি হলো? ভালো কথাই তো বললাম। থাক বাবা,আর কিছু বলার দরকার নাই। মুখ বেঁকিয়ে আমি আমার বেঞ্চে এসে বসলাম।এই জায়গাটায় রোজ একবার করে এসে বসি।কদিন আগে একটা ছেলেকে দেখে বাশ খাইছিলাম।সরি বাশ নয় ক্রাশ খাইছিলাম।তাকে খুঁজার জন্য রোজ একবার এসে ঘুরে যাই।ব্যাপার টা বেশ মজার লাগে আমার কাছে!

নাহ! আজো বুঝি ক্রাশ বাবুর দেখা পাবো না।তারচেয়ে বরং চলে যাই। ওই লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখি উনি পাঞ্জাবি খুলে ঝেড়ে আবারো গায়ে পড়লেন। আহা! এখন নির্লজ্জতার কিছু হল না? আর আমি বলেছি বলে কি বিহ্যাভ টাই করলেন! আজিব! আবারো মুখ বেঁকিয়ে নিজের রাস্তায় চললাম। পার্কের এক কোণে অনেক ফুচকার দোকান। ভাবলাম এক প্লেট ফুচকা খেয়ে যাই।ফুচকা দিতে বলে চেয়ারে বসে পড়লাম। এক গ্লাস পানি নিয়ে কুলি করে দূরে ফেলে দিলাম।সর্বনাশ! পানি গুলা এক লোকের পায়ের উপর পড়েছে।ভাগ্যিস গায়ের উপর পড়েনি।মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই বাবার বয়সী নৃত্যরত লোকটার পায়ে ফেলেছি! হায় আল্লাহ! লোকটা দাত কিড়মিড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বেয়াদব মেয়ে। আমি জিহ্বায় কামড় দিয়ে বললাম, সরি।

– গুতো মেরে সরি বলা? আজকাল দিনের ছেলেমেয়েরাই এমন। যত্তসব।
– আংকেল আমি দেখি নাই।আমি তো পানি ফেলার আগে দেখলাম ওখানে কেউ নাই।আমি কি আর ভেবেছি, ওখানে পানি ফেলতেই আপনি চলে আসবেন! সরি আংকেল।
– কিসের আংকেল? আমাকে আংকেল বলবা না।শুনেছি বিদেশে যারা জুতা সেলাই করে তাদের আংকেল বলা হয়।
আমি মনে মনে হেসে উঠলাম কথাটা শুনে।এই সত্যটা আমার জানা ছিলনা। অবাক হয়ে বললাম, সরি চাচা।
– চাচা? আমি তোমার বাপের ভাই হলাম কবে?
– ওই যে একদিন আব্বু আর আপনার দেখা হল।আপনি আব্বুকে ভাই বলে ডাকলেন, সেদিন থেকে।

লোকটার রাগ কমে গেলো উত্তর শুনে।একটু নরম হয়ে বললেন, হুম ঠিকাছে।এখন থেকে ভদ্র হয়ে চলবে।এখনকার জেনারেশান টাই এমন। কথাটা বলতে বলতে উনি চলে গেলেন। আমি হাফ ছেড়ে বাচলাম। এরপর ফুচকা খেয়েদেয়ে টাকা দিয়ে পার্ক থেকে বেড়িয়ে আসছিলাম।গেটের কাছে কয়েক টা দোলনা ঝুলছে।দোলনা দেখেই ইচ্ছে করছিল একবার গিয়ে বসি। দোলনায় উঠার জন্য ছুটে আসতেই আরেক দফা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।ওই লোকটা ও একই দোলনায় ওঠার জন্য এগিয়ে এসেছেন! দোলনার সামনে দুজনে হা করে দাঁড়িয়ে আছি।আমার মনের অবস্থা করুণ। বারবার ওনার সাথে এভাবে দেখা হচ্ছে কেন! লোকটা আমাকে কি যে ভাবছেন! সে যাই হোক,এই বয়স্ক লোকটার দোলনার চড়ার এত শখ কেন? আমি জিজ্ঞেস করেই বসলাম, চাচা আমি জানতাম না আপনি ও উঠবেন। এই বয়সে তো কেউ দোলনায় উঠেনা।

– বলসে তোমারে? তুমি বুড়ি হইলে বুঝি আর দোলনায় উঠার শখ থাকবে না?

কথা সত্য।বাহ! দারুণ যুক্তি দিয়েছেন তো! আর কিছু না বলে চুপচাপ চলে আসলাম সেখান থেকে।এই ড্যান্সার লোকটার উদ্ভব কই থেকে? কি আজব!গাছের নিচে বসে পড়লাম। প্রচণ্ড রোদ।এখন একটু বসি। ফেসবুকে ঢুকে নোটিফিকেশন চেক করতে লাগলাম। গতকাল যোজন- বিয়োজন নামে একটা গল্প পোস্ট করেছিলাম। দারুণ সারা পড়েছে তোহ! আসলে বউ জামাই গল্পগুলা সবাই খুব পছন্দ করে দেখছি। নোটিফিকেশন গুলো রিপ্লে দিচ্ছিলাম মনোযোগ সহকারে।

এমন সময় হঠাৎ একটা গান এসে কানে বাজল, ভেঙে মোর ঘরের চাবি,নিয়ে যাবি কে আমারে গান শুনে আমিও হুট করেই গেয়ে উঠলাম, আগে তো নিয়ে আয় তালা অসাম সালা,অসাম সালা,অসাম সালা এরপর আমি একদম হতভম্ব! কি করলাম আমি এইটা! সেই ড্যান্সার লোকটা! আমি গান গাইতে চাইনি।মিরাক্কেলে রেগুলার গান টা শুনতাম তো,আমার খুব ফেভারিট। ওনার মুখে শুনে আমার ও মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেছে।কিন্তু উনি যে কি ভাবছেন! লোকটা চোখ বড় বড় করে বললেন, আমাকে সালা বললা? কি বেয়াদব মেয়ে।দুইদিনের মেয়ে হয়ে বাপের বয়সী লোক কে সালা বলে! কি যুগ আইলো রে।এখনকার জেনারেশান টাই এমন! আমি আর কিছু বললাম না।ওনাকেও বলার অপেক্ষায় রাখলাম না।এবার একটু বেশিই হয়ে গেলো না? উঠে রীতিমত দৌড় শুরু করলাম। এক দৌড়ে পার্ক থেকে বাইরে বের হয়ে আসলাম। মেরা আক্কেল হোগায়া! মেরা আক্কেল হোগায়া!

একদম বাসায় এসে নিজের বিছানায় গা ছেড়ে দিয়ে হাফ ছেড়ে বাচলাম।এটা দিন গেলো আজ? অদ্ভুত রকমের।কখনো এরকম ভাবে লজ্জায় পড়িনি! উফ ভাবতে পাচ্ছিনা। খাওয়াদাওয়া করে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমালে নিশ্চয় ই ব্যাপার টা ভুলে যাবো। ঘুমের মধ্যে আমার ক্রাশকে নিয়ে দারুণ একটা স্বপ্ন দেখলাম। দেখি,ও আর আমি একটা জিলিপির দোকান দিয়েছি। ও সারাক্ষণ জিলিপি ভাজে,আর আমি খাই।ইস! জিলিপি আমার এত ভালো লাগে! বুঝাতে পারবো নাহ।আমি সারাক্ষণ শুধু জিলিপি খাই।ও ভাজে আমি খাই,ও ভাজে আমি খাই,ও ভাজে আমি আম্মুর ডাকে ঘুম ভাংল আমার।স্বপ্নটা আর দেখা হল না। আম্মু বলল,আজ অনেক কাজ।দ্রুত উঠে আমাকে হেল্প কর।

– কেন? আজ কি কোনো বিশেষ দিন?
– হুম।বাসায় গেস্ট আসবে।
– ওহ আচ্ছা।
– ওহ আচ্ছা বললে হবেনা।উঠে কাজ কর আয়।তাড়াতাড়ি।

আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাত ব্রাশ করে নিলাম।তারপর কুলি করে মুখে ফেসওয়াশ লাগালাম।একি! ফেসওয়াশের সেন্ট এমন কেন,এটার কি মেয়াদ শেষ? এমন গন্ধ তো ছিল না আগে। ভাবতে ভাবতে মুখ ঘষছি।ঘষছি তো ঘষছি,ফেনা প্রচুর ফেনা উঠছে। বাহ! কি তুলতুলে ফেনা! গুলুগুলু.. হাসতে হাসতে বেসিনের দিকে তাকিয়ে দেখি,সর্বনাশ! এটা তো আমার ফেশওয়াশ নয়।এটা কি দিলাম মুখে! আব্বুর সেভিং ক্রিম! হায় হায়! দ্রুত মুখে পানি ছিটিয়ে সাবান লাগিয়ে ধুয়ে ফেললাম।এমা! তবুও গন্ধ! এরপর কাপড় কাচা লাকি বল সাবান দিয়ে মুখ ধুলাম।কি গন্ধ! তারপর গাল ফুলিয়ে রুমে আসলাম। মেজাজের তেল দারুণ গরম হয়েছে।আমার মেজাজে এখন ভুট্টা দিলে পপকর্ন হয়ে বেড়োবে। ছুটে এসে আব্বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না জুরে দিলাম। আব্বু আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,কাদেনা মা।দেখতে আসলেই কি বিয়ে হয়? শুধু তো দেখে যাবেন।আমরা তোকে এখনি বিয়ে দিবো না তো।

– বিয়ে মানে! কিসের বিয়া? কার বিয়া?
– তাইলে তুই কাদতিছিস কেন?আব্বুর কথা শুনে আমার কান্না আরো বেড়ে গেলো। বললাম,আমি এখুনি বিয়ে করবো না আব্বু।
– ঠিকাছে মা।শুধু দেখতে আসবেন। বিয়ে ফিয়ে নয়।
– আচ্ছাব্বু।আমি না তোমার সেভিং ক্রিম দিয়ে মুখ ধুয়েছিল। আমার মুখে কি দাড়ি গজাবে আব্বু? আব্বু হাসিতে ফেটে পড়ে বললেন, নারে মা।দাড়ি গজাবে না।
– যদি দাড়ি ওঠে? আমার তো আর বিয়েই হবেনা।
– হা হা হা..

আব্বু হেচকির মত সুরে হাসছেন।আমি চোখ মুছতে মুছতে রুমে আসলাম। আমাকে দেখতে আসবেন শুনে আর আম্মুর কাজে সাহায্য করলাম না।রুমেই শুয়ে রইলাম। আমার ক্রাশের কি হবে আমার বিয়ে হলে! এ হতেই পারেনাহ।

পাত্রপক্ষ আসলে আমাকে তাদের সামনে নিয়ে আসা হল।পাত্রের বাবা,মা,বড় ভাই আর ভাবি এসেছেন। আমি মাথা নিচু করে আছি।ওনাদের দিকে তাকাইনি। হঠাৎ মাথা তুলে পাত্রের বাবার দিকে তাকাতেই আমার আক্কেল গুড়ুম! সেই ড্যান্সার লোকটা! হায় আল্লাহ! আমি বেহুঁশ প্রায়।চোখে সরষে ফুল দেখছি! এই লোক কে কাল অসাম সালা গান শুনিয়েছি।তিনি কোনোভাবেই আমাকে তার পুত্রবধূ করবেন না।যাক,যা হইছে ভালোই হইছে।বিয়েটা তো হবেনা তাহলে।বাহ! দারুণ মজা তো! লোক টা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। আমি মুখ কাচুমাচু করে বসে আছি।আব্বুকে আবার গতকালের ব্যাপার টা বলে দিবেন না তো? আমার মুখ শুকিয়ে শুটকি হয়ে গেলো। দ্রুত নিজের রুমে এসে আব্বুকে এসএমএস পাঠালাম, আব্বু আমি কিন্তু বিয়ে করবো না।তুমি যেভাবে পারো ওনাদের বিদায় করো প্লিজ।

আব্বু রিপ্লে দিলো, আমি দেখছি।তুই টেনশন করিস না।আর পাত্র এসেছে।ওকে তোর রুমে পাঠালাম। আমার ছেলেটাকে খুব পছন্দ হয়েছে।তুই আগে ওর সাথে পারসোনালি কথা বল।দ্যাখ কেমন লাগে। আমি গাল ফুলিয়ে ঢোল বানালাম। ছেলে ভালো লাগলেও আমি ওনার ছেলের বউ হবোনা।আজীবন লজ্জায় লাল হয়ে থাকতে হবে ওনার সামনে।আর উনি আমাকে বেয়াদব বলে গালি দিবেন নিশ্চয় ই। এমন সময় দরজায় ঠকঠক শব্দ হল।আমি উঠে এসে দরজা খুললাম। আমার চোখ কপালে উঠে গেল! এ কি দেখছি আমি! আমার ক্রাশ! এই ছেলেকে দেখার জন্য রোজ পার্কে গিয়ে বসে থাকি।আর সে আজ আমার দরজায়!

আনন্দে লাফিয়ে উঠে ছেলেটার হাত ধরে বললাম, তুমি! জানো আমি তোমাকে কত্ত খুঁজেছি? সেদিন তোমাকে পার্কে দেখার পর রোজ গিয়ে বসে থাকতাম তোমার জন্য।তোমাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখি তুমি ভাবতেও পারবা না।আজ আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছেন। আর আজই তুমি এলে! ছেলেটা লাজুক হাসি দিয়ে বলল,আমিই পাত্র।আমিই আপনাকে দেখতে এসেছি।

– সত্যি! আমি রাজি।আমি বিয়ে করবো।

ছেলেটা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। হাসুক আর যাই করুক,আমি বিয়েটা করবো ই।কিন্তু ওর বাবা? তিনি তো আমাকে মেনে নিবেন ই না।এখন কি হবে! ছেলেটার হাত ধরে বললাম, তুমি প্লিজ তোমার আব্বুকে বলো যে মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে।আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে পারবো না।প্লিজ আমার গুলুগুলু, প্লিজ। ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল,পাগলী!

– প্লিজ ক্রাশ। প্লিজ।
– Love you too..

কথাটা বলেই ক্রাশ বেড়িয়ে গেলো। আমি খুশিতে লাফিয়ে উঠে ডান্স দিতে লাগলাম, আমার ই সব দোষ,পোষায় না উপোষ ওরে ও বাবুজি,আমায় জ্বেলে দেনা রে এখন এসেছি আমি আইটেম বোম গান শেষ হল না।ক্রাশের বাবা আমার রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে।আল্লাহ গো! আবারো বেয়াদবি করলাম! আমার বুঝি বিয়ে করা হবেনা লোক টা বললেন,এখনকার জেনারেশান টাই এমন!

– সরি আংকেল।থুক্কু,সরি চাচা।
– চাচা না,বাবা বলবা।
– আপনাকে বাবা বলবো কেন?
– বেয়াদবি করেছ।বাপ ডাকিয়েই ছাড়বো। আমাকে তো চেনোনা।

আমি ভয়ে ভয়ে ওনার দিকে তাকালাম। উনি শব্দ করে হাসতে হাসতে বললেন, পাগলী। মজা করে বললাম।তোমার এই ইনোসেন্ট স্বভাব টাই আমার ভালো লেগেছে।

– সত্যি!
– হুম।আমার মেয়ে নাই।এরকম একটা মেয়ে আমাকে বাবা বলবে,ভাবলেই আনন্দ লাগে।
আমি খুশি হয়ে বললাম, এবার আপনার পাঞ্জাবির ভিত্রে তেলাপোকা ঢুকিয়ে দিবো। আপনি তেলাপোকা ডান্স দিবেন আর আমি গাইবো, অসাম সালা,অসাম সালা। ক্রাশের বাবা বললেন, আমার সাথে বেয়াদবি। বাপ ডাকিয়ে ছাড়বো হুহ।

– আপনার ছেলেটাকে দিবেন বাবা? উনি হাসতে হাসতে বললেন,কি আজব! এখনকার জেনারেশান টাই এমন!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত