রুপকথা নয়

রুপকথা নয়

সে অনেকদিন আগের কথা আরব দেশে ছিলেন এক দয়ালু বাদশাহ। দানশীলতা, দয়ালু, এবং প্রজাদের ভালবাসার জন্য খুব বিখ্যাত ছিলেন তিনি। বাদশাহ প্রায়ই মাঝরাতে একজন সঙ্গী কে নিয়ে বেড়িয়ে পড়তেন। প্রজাদের সুখ দুঃখ দেখার জন্য। সুন্দর এক পূর্ণিমা রাত। বাদশাহ পথ চলছেন। সাথে দুই বিশ্বস্ত সহচর। হঠাৎ দেখতে পেলেন এক জীর্ণ বাড়িতে এতো রাতেও প্রদীপ জ্বলছে। আর মৃদু কথা বলার শব্দ ও ভেসে আসছে। বাদশাহ জানালায় কান পাতলেন। টুকরো টুকরা কথা থেকে বোঝা যাচ্ছিলো। ঘরে দু তিনজন মেয়ে নিজেদের মধ্যে সুখ দুঃখের কথা বলছে।

প্রথমজন – এই মেজো আর এতো কষ্ট সহ্য হয়না রে.. । একটা শাদি হয়তো বেঁচে যাই। এই রাত জেগে কাজ করা। কম আয় আর ভাল লাগেনা। দ্বিতীয় জন – ঠিক বলেছিস বোন। আমার ও একই কথা। কি করবো বল, আব্বুর তো এতো টাকা নেই যে আমাদের ভাল ঘরে শাদি দিবেন। প্রথম জন – ঠিক বলেছিস। আমাদের এভাবেই এই অন্ধকার বাড়িতে পঁচে মরতে হবে। তারচে আয় আমরা নিজেদের পছন্দ অপছন্দের কথা বলি।

— তা নয় বললাম। তবে খিদে পেটে কি আর গল্প জমে রে। আহা যদি হতাম বাদশাহের খাস বাবুর্চির বউ। তবে কতো মজার মজার বাদশাহি খাবার খেতে পারতাম। বাবুর্চি সাহেব রেঁধে বেঁচে যাওয়া কিছু খাবার ও কি আমার জন্য আনতেন না…!!

— আমার কি মনে হয় জানিস! খাওয়া আমি যাই খাই। আমার পোষাক হতে হবে চমৎকার। হেরেম এর বাদশাহজাদিদের মতো। সুন্দর চকচকে ঈর্ষনীয়। আহ বাদশাহের খাস দর্জি বুঝি বিবাহিত? জানিস কিছু।

— নারে জানিনা। তবে এমন বিয়ে হলে বেশ হয়।

— এই ছোট তুই ঘুমুতে যাচ্ছিস যে…!! তোর কেমন বর পছন্দ বলনা। ছোটজন — আমার যাকে পছন্দ। তা তোদের কল্পনার ও অতীত। এসব শুনতে তোদের ভাল লাগবেনা।

সমস্বরে — আহা বলনা, একটু বল। শুনে প্রাণ কান দুটোই জুড়োই।

– তবে শোন। আমার যদি এই দেশের বাদশাহের সাথে শাদি হতো। তবে আমি নিজেকে সম্মানিতা মনে করতাম। আর বাদশাহ কে কাছে থেকে মন প্রাণ দিয়ে ভালবাসার সুযোগ পেতাম।

— বলিস কি। এসব কথা মুখে আনাও যে পাপ। যদি বাদশাহ শুনতে পান। নির্ঘাত আমাদের গর্দান যাবে।

— সে জন্যেই আমি তোদের বলতে চাইনি। জোড় করলি তাই বললাম। বলে মৃদু হেসে শুয়ে পড়লো ছোট মেয়েটি।

বাদশাহ মুচকি হেসে জানালা থেকে সরে এলেন। পরদিন সকাল, বাদশাহের ফর্মান এসেছে সেই জীর্ণ কুঁড়েঘর এ। বাদশাহ তলব পাঠিয়েছেন।এখুনি তিন বোন কে যেতে হবে। বড় দুই বোন কাঁপতে কাঁপতে রাজার দরবারে উপস্থিত হলো। ছোটবোন তমিজের সাথে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। সব বিচার কাজ শেষে বাদশাহ তাকালেন তাদের তিন বোনের দিকে।

– বলুন, বেগমজাদিরা কি বলতে চান!

— আমরা কিছু বলতে চাইনা প্রিয় বাদশাহ নামদার। আমাদের কোনো দোষ হয়ে থাকলে ক্ষমা করুন।

— আপনাদের কোনো দোষ নেই। তবে কাল রাতে আপনাদের বলা সব কথা আমার কানে এসেছে।

এখন যা বলার আমি বলবো আপনারা শুনবেন। বড় দুইবোনের তো পলক পড়েনা ভয়ে। কি হবে এবার..!! বাদশাহ হাততালি দিয়ে সিপাহী কে বললেন। বড় বাবুর্চিকে ডেকে আনো। বাবুর্চি কাঁপতে কাঁপতে হাজির হলো।

— ক্ষমা করুন হুজুর। আমি কি কোনো দোষ করেছি?

— না, তুমি খুব ভাল রাঁধো, এই নাও হাজার দিরহাম। আর এই তিন জনের বড় সাহেবজাদিকে তুমি শাদি করে নাও। আর এই দিরহাম তোমাদের বিয়ের যৌতূক। এই টাকা দিয়ে আনন্দ করো, স্ত্রীর পোশাক আর গহনা গড়িয়ে দাও।

খুশি মনে চলে গেলো বাবুর্চি। এবার বাদশাহ ডেকে পাঠালেন তার খাস দর্জি কে। বেচারা বাদশাহের কুর্তা সেলাই করছিলো। কুর্তা হাতে নিয়েই পড়ি কি মড়ি করে ছুটে এলো। বাদশাহ তাকেও হাজার দিনার দিয়ে। নির্দেশ দিলেন। মেজো মেয়েটিকে বিয়ে করতে। সে খুশি মনে মেজো মেয়েকে নিয়ে বাদশাহ কে লম্বা কুর্ণিশ করতে করতে চলে গেলো। ছোট মেয়ে এবার বাদশাহ কে সালাম জনিয়ে দরবার ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো। বাদশাহ তাকে থামতে বললেন। তারপর দরবার ছেড়ে সবাইকে চলে যেতে বললেন। ছোট মেয়েটকে কাছে ডেকে বললেন।

— আমি আপনার মনের বাসনাও পূর্ণ করতে চাই। আমি আপনাকে শাদি করে বেগম বানাবো।

— না, আমার বাদশাহ নামদার। তা হয়না। কোথায় আপনি আর কোথায় আমি। ক্ষমা করুন আমায়। বাদশাহ – আপনি ভুল বুজছেন। আমাদের এই দূরত্ব রাখবোনা। আমি শুধু আপনার বাদশাহ নামদার হয়েই থাকতে চাই।

– হেরেম ভর্তি অনেক সুন্দরি, বেগমজাদিরা আপনার অপেক্ষায় রয়েছে। তারা আমার চে অনেক সুন্দরি ও আকর্ষণীয়।

— আমার কাছে আপনিই সেরা, হে প্রিয়তমা।

— তাহলে কথা দিন। যদি কখনো মনে হয় আমি আপনার অযোগ্য। সেদিন আমায় প্রাণে মেরে ফেলবেন না। আর আমায় প্রাসাদ থেকে চলে যাবার সুযোগ দেবেন।

— অবশ্যই প্রিয় সম্মানিতা আমার। তাইই হবে।

— আর একটা কথা। যদি চলেই যেতে হয়। তখন আমার তো জীবনে আর কিছুই থাকবেনা। আপনি শুধু আমার নিজশ্ব সম্পত্তি থেকে যে কোনো একটি প্রিয় জিনিশ নিয়ে যেতে দেবেন। কথা দিন।

— দিলাম কথা । এবার তো রাজি হোন।

— প্রিয় বাদশাহ নামদার, শত কাজের ভিড়ে আপনি তো আপনার এই সম্মানিতা কে দেয়া কথা ভুলেও যেতে পারেন। দয়া করে যদি লিখে দিতেন।

বাদশাহ হাততালি দিয়ে। একজন নফর ডাকলেন। আর লিখে দিলেন। ” যদি কখনো আমার এই সম্মানিতা বেগম কে আমি চলে যেতে নির্দেশ দেই। তবে সে এই রাজপ্রাসাদ থেকে তার যে কোনো প্রিয় একটি জিনিশ নিয়ে যেতে পারবে। তাতে কেউ বাঁধা দিতে পারবেনা।এমন কি আমি নিজেও না “। এরপরে আর বাঁধা কোথায়। বাদশাহ সম্মানিতাকে বিয়ে করলেন। খুব সুখে তাদের দিন কাটতে লাগলো। বড় মধুর সেই সব দিন। বাদশাহ দরবারে বিচার কাজ শেষ করেন। নির্দেশ নামা লিখে দেন। সবার কথার গুছিয়ে উত্তর দেন। প্রজাদের সুখ দুঃখের খোঁজ খবর নেন।

তারপর মহলে ফেরেন। তার নতুন বেগম সুন্দর মনোহর শরবত করে রাখেন তার জন্য। সুন্দর ছবি এঁকে রাখেন বাদশাহের। বাদশাহ দেখেন আর মুগ্ধ হন। আর সুন্দর তুলি আর কাগজে শের লেখেন তাহমিনা। এই শের শুধু বাদশাহ না পুরো দেশের মানুষের ও প্রিয়। সবাই গুণ গায় ভাল বলে। মায়েরা অকপটে বলে। সম্মানিতা তাহমিনার মতো একটা কন্যা যদি তাদের থাকতো। বা নিজের মেয়েটি যেনো বড় হয়ে তাহমিনার মতো জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সবার বড় হয়।

বাদশাহ সব পরামর্শ করেন তাহমিনার সাথে। দেশের কি করে আরো উন্নতি করা যায়। কিভাবে রাজপ্রাসাদ এর নিয়ম আরো সুন্দর করা যায়, সব। পাশ্ববর্তী কোন দেশ জ্ঞানে গরিমা আবিষ্কারে এগিয়ে যাচ্ছে কিনা। সব দুজনের নখদর্পণ এ। এদিকে বাদশাহের মন্ত্রী আর আমত্যদের তো রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এতোবড় একটা দেশের পরামর্শদাতা কিনা একজন নারী! আর হেরেমজাদিরা ভাবে তাদের এতো রুপ আর নৃত্য গীত সব ফেলে শুধু একজনের আঁচলে বাঁধা পড়েছেন বাদশাহ। হায় হায় রব তাদের মাঝে। একজন তো একদিন বলেই বসে।

— বাদশাহ কি প্রমাণ আছে? যে তাহমিনা একজন সৎ নারী। আপনিতো শাদির আগে তাকে চিনতেন না হঠাৎ আসা কালো মেঘের মতো,বাদশাহের মনেও একদিন দানা বাঁধে সন্দেহ। রাগে উনি মহলে ঢোকেন। তাহমিনা তখন শের লিখছে। নার্গিস গোলাপ ছাঁচে ঢালা যার মনোরম কপোলখানি, চাঁদ- বদনী মুখের গড়নমিঠা রঙ যেনো আনারকলি। বাদশাহ রেগে তুলি কলম ছুঁড়ে ফেললেন। আর বললেন।

— তাহমিনা তুমি আমার রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে যাও। তোমার এই প্রেমের ভার সইতে পারছিনা আমি। জলভরা চোখে একবার বাদশাহের দিকে তাকালো তাহমিনা।

— আপনার যা ইচ্ছে বাদশাহ নামদার। বলে সালাম জানিয়ে তার নিজের মহলে চলে এলো।

রাত বাড়ছে। আর একটি বিনিদ্র রাত্রির আগাম বার্তা নিয়ে। আকুল হয়ে কাঁদছে তাহমিনা। তারপর একসময় সে প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেলো। পরদিন সকাল। বাদশাহের চোখে সুর্যের আলো লাগছে। ঘুম ভেঙে গেলো বাদশাহের। কি ব্যাপার কোনো নহবত বাজছে না। মাথার উপড়ের ঝাড় বাতিটাই বা গেলো কোথায়! বাদশাহ তো অবাক। এমন সময়ে শরবতের গ্লাস হাতে ঘরে প্রবেশ করে তাহমিনা।

— প্রিয় বাদশাহ নামদার আমার। আপনার ঘুম শেষ হয়েছে? এই নিন আঙুর ফলের রস। আর আমি গোসলের ব্যবস্থা করছি আপনার।

— এসব তুমি কি বলছো তাহমিনা। এটা তো রাজপ্রাসাদ নয়। কোথায় আমি…!!

— প্রিয় রাজন। বাদশাহ আমার। এই কাগজ টি একবার দেখুন। আমাকে বেগম করার আগে এখানে আপনি স্পষ্ট লিখে দিয়েছেন।

— যদি কখনো আমাকে আপনার ভাল না লাগে। আর আমাকে প্রাসাদ ছেড়ে আসতে হয়। তবে আমি আমার একটি প্রিয় জিনিষ প্রাসাদ থেকে নিয়ে আসতে পারবো।

–‘হ্যা অবশ্যই আমি তা বলেছি আর লিখে দিয়েছি। চোখ বড় বড় করে বললেন বাদশাহ।

— হে প্রিয় বাদশাহ আমার। শুধু প্রাসাদ কেনো এই পৃথিবীতে আল্লাহর পড়ে। আপনার চে প্রিয় আমার কে আছে। বলুন? তাই আমি আপনাকেই নিয়ে এসেছি।

তাহমিনার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। একটু আগেও যে শরবত হাতে আনন্দে ঝলমল করছিলো। সে এখন চোখের সাগরে ভাসছে। ছোট্ট শিশুদের মতো। বাদশাহের খুব অস্বস্তি লাগছে কিন্তু খুব ভালোও লাগছে। এতো বুদ্ধিমতী তার সম্মানিতা তাহমিনা। এতো আল্লাহের দেয়া বিশেষ নেয়ামত।

বাদশাহ তার হঠাৎ ভুলের জন্য লজ্জিত হলেন। তার চোখেও পানি এসে গেলো। তিনি মনে মনে পার্থনা করলেন। তাদের মহল ভরে উঠুক রাজপুত্র আর রাজকন্যায়। ভালবাসার পবিত্র অশ্রু আল্লাহ যেনো অবহেলা না করেন। সম্মানিতাকে শক্ত করে ধরে আছেন বাদশাহ। তাহমিনাও তখন বাদশাহের কানে কানে নতুন একটি শের বলছে। ” দয়িতা গো,তুমি আমি, ভাগ্যলিপি মুছি দুজন এই তুচ্ছ মাণ অভিমান, আজকে সব করি বর্জন। খণ্ড টুকরো হয়না যেন হৃদয় অন্যের দেয়া তীক্ষ্ণ বিষে শান্তি পাবো আমরা দুজন, দুজন দুজনায় ভালবেসে”।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত