অন্যজন

অন্যজন

শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি একটা সময়ে পরীর বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের দিন ছিল তুমুল বর্ষণ। বাড়ির উঠোনে হাঁটু সমান পানি জমে গেল। ‘বিয়ের দিন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে’ – এই ব্যাপারটায় অন্য কোন মেয়ে হলে নিশ্চই খুব হতাশ হতো। পরী সেরকম টা হল না বরং আনন্দিত হল। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা বৃষ্টি দেখে অভিভূত হয়। পরী সেই দলে। তার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হল। সে তার বড় মামি কে গিয়ে বলল, মামি বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে! মামি এ কথা শুনে চোখ বড় বড় করে বললেন, কন্যার কথা শুনো! আজকে তোমার বিবাহ৷ বাড়ি ভর্তি অতিথি গিজ গিজ করছে। দশ জন দশ কথা বলবে। এর কোন মানে আছে? বিবাহের দিন কনে থাকবে মন খারাপ করে, সে কি না মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজছে?

মামির কথায় যথেষ্ট যুক্তি আছে৷ আজকে বিশেষ দিন, চাইলেই মনের ইচ্ছায় কিছু করে ফেলা যাবে না। মামি মাথায় হাত রেখে একটু লাজুক হেসে বললেন, বিবাহের পরে জামাই কে নিয়ে যত ইচ্ছা বৃষ্টিতে ভিজবা! কোন সমস্যা নাই।
জামাই প্রসঙ্গ আসতেই পরীর মনটা ভারী হয়ে গেল। তার বিয়ে হচ্ছে মাঝবয়সী এক লোকের সাথে। দেহের গড়ন মাঝারি, দেখতে কুচকুচে কালো। লোকটির আগেও একবার বিয়ে হয়েছিল। আগের স্ত্রী মারা গিয়েছেন। এরকম একটা লোকের সাথে পরীর বিয়ে হচ্ছে ভেবেই তার বুকের ভেতরে হু হু করে উঠল।

পরী বড় হয়েছে তার বড় মামার পরিবারে। খুব ছোট বেলায় তার বাবা মায়ের মৃত্যুর পর; বড় মামাই তাকে মানুষ করেছেন। আজ নিজ খরচে ধুম ধাম করে বিয়ে দিচ্ছেন। মামি তার গহনা থেকে গহনা দিয়েছেন। বেনারসি শাড়ি দিয়েছেন। নতুন সংসারের জন্য যা যা লাগে সব দিয়েছেন। তারা যা ভাল বুঝেছেন তাই করেছেন। এই সমাজে বাবা মা হারা কোন মেয়ে এত ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না। সে জন্মেছে। এটা ভেবেই তার সুখ হতে লাগল। কিন্তু এরকম একজন মানুষকে নিয়ে একসাথে বৃষ্টি ভেজার কথা সে ভাবতেও পারছে না। লোকটা বেশ গম্ভীর এবং রাশভারী। মেপে মেপে কথা বলেন। উত্তর দেন খুব সংক্ষিপ্ত কথায়। এরকম একজন মানুষ ঠোঁটে সিগারেট চেপে পত্রিকা পড়তে পারেন। কম বয়সী কোন মেয়ের সাথে বৃষ্টিতে ভিজবেন না। রাতে তারা কিভাবে একসাথে পাশাপাশি ঘুমাবে? এটা ভেবেই পরীর গা গুলাতে লাগল।

বিয়েতে পরীর ছোট খালা শরীফা বেগম উপস্থিত ছিলেন। পরীকে তিনি অসম্ভব ভালবাসেন। তিনি নিজের বিয়ের বালা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। পরীকে পরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মা গো! তোমার জন্মের সময় আমি বুবুর পাশেই ছিলাম। তুমি যখন পৃথিবীতে আসলা, তোমারে দেইখা আমরা কেউই বিশ্বাস করতে পারতেছিলাম না যে, তুমি মনুষ্য সন্তান! এত সুন্দর চেহারা নিয়ে তুমি জন্মাইছিলা। তোমার বাবা তো দেইখাই নাম রাখল পরী! আহারে! তোমার আজকে বিবাহ। বুবু পাশে নাই। কোন কিছুতে মনে কষ্ট নিও না গো মা! আল্লাহ তোমারে সুখী করবো। এত ভাল একটা মেয়ে কোন দিন অসুখী হইতে পারে না’, বলেই শরীফা বেগম পরীকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। পরীর চোখও ভিজে আসল। এত ভালবাসা সে কোথায় রাখবে? তার এত জায়গা কোথায়? বর্ষার প্রথম বৃষ্টিজল মাথায় নিয়েই সে গিয়ে উঠল নতুন সংসারে। তার ধারণা হল, নতুন জীবনের প্রারম্ভিকা টা প্রকৃতি বেশ দায়িত্ব নিয়েই করে দিল। আলবার্ট আইনস্টাইনের একটা কথা তার মনে পড়ে গেল, ‘Look deep into nature and then you will understand everything better.’ প্রকৃতি বড় অদ্ভুত, বড় বিচিত্র।

পরীর যার সাথে বিয়ে হয়েছে তার নাম একরামুল হাসান। ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তিনি। বাসর রাতে ঘরের বাতি নিভিয়ে যখন তিনি পরীর কাছে এলেন, পরী তখন ভয়ে চুপসে গেছে। বিছানার এক কোণায় সে বসে আসে জুবুথুবু হয়ে। একরাম সাহেব বুঝতে পারছিলেন পরীর মনের অবস্থা। তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন। কয়েকবার খুক খুক করে কাশলেন৷ নরম গলায় ডাকলেন, পরী! পরী আচমকা কেঁপে উঠল ডাক শুনে৷ ঘোমটা নামিয়ে সে বসে আছে। ঘোমটা তুলে তাকানোর সাহস তার হল না। সে মাথা নিচু করেই বসে রইল। ডাক না শুনলে বেয়াদবী হবে ভেবে বলল, জি! একরাম সাহেব বললেন, একবার তাকাও আমার দিকে। পরী এবারো মাথা নিচু করে বসে রইল। একরাম সাহেব একটু এগিয়ে গিয়ে নিজ হাতে পরীর ঘোমটা তুলে দিলেন। পরী আবারো কেঁপে উঠল। তিনি বললেন, ভয় পাচ্ছ কেন পরী? তাকাও আমার দিকে।

পরী ভয়ে ভয়ে মাথা তুলল। টেবিল ল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয় সে চোখ মেলে তাকাল একরাম সাহেবের দিকে। এত কালো মানুষ সে আগে কখনো দেখে নি। সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। চোখ নামিয়ে ফেলল। একরাম সাহেব বললেন, আমি কি বাতি জ্বালিয়ে দেব পরী? পরী চুপ করে বসে রইল। একরাম সাহেব উঠে ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দিলেন। ঘর ঝলমল করে উঠল। বাসর ঘরটা যে এত সুন্দর করে সাজানো পরী ঘরে ঢোকার সময় লক্ষ্য করে নি। বিছানায় মাথা নিচু করেই সে বসে ছিল। এই ঘর দেখে যে সে অভিভূত হবে; সেই সময়টাই পেল না। একরাম সাহেব আবার তার পাশে এসে বসেছেন। একরাম সাহেব বললেন, পরী তুমি কেমন আছো? পরী বলল, আমি ভাল আছি। আপনি? আমিও ভাল আছি। তোমার ভয় কেটেছে? কিসের ভয়? আমার মত কালো কাউকে দেখলে যে কেউই একটু আধটু ভয় পাবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই না?

পরী এবার চোখ তুলে কিছুক্ষণ একরাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে থাকল। একদৃষ্টিতে কোন কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকলে কেমন একটা ঘোর তৈরি হয়। পরীও সেই ঘোরে তলিয়ে গেল। গায়ের রঙ কালো এমন মানুষদের চেহারায় তীব্র মায়া থাকে। একরাম সাহেবের চেহারায় কেন যেন সেই মায়া ভীষণ ভাবে তীব্র। পৃথিবীর সকল ভালবাসা মায়া থেকেই সৃষ্টি হয়। পরী মুহূর্তেই সেই মায়ায় জড়িয়ে গেল। এই মানুষটা কে সে বিয়ে করেছে, তার সকল ভালবাসা তো এই মানুষটার জন্যেই। এই মানুষটাই তার সাথে বৃষ্টিতে ভেজার সঙ্গী। এই মানুষটার সাথেই তো সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে হবে। একরাম সাহেব বললেন, এই পরী! পরী বলল, জি বলুন। তুমি ঠিক আছো তো? হুঁ। ঠিক আছি। একরাম সাহেব বললেন, তোমার কি মন খারাপ করছে? পরী বলল, না। বাড়ির কথা কি মনে পড়ছে? হুঁ পড়ছে। তুমি বরং আজ ঘুমিয়ে পড়। আমিও ঘুমিয়ে পড়ি।

পরী স্বাভাবিক গলায় বলল, বাসর রাত কি কেউ ঘুমিয়ে কাটায়? চলুন বারান্দায় গিয়ে গল্প করি। একরাম সাহেব এই কথায় অভিভূত হয়ে গেলেন। তিনি হেসে ফেললেন। পরী মনে মনে ভাবল, একটা মানুষ এত সুন্দর করে কিভাবে হাসতে পারে? সে নিজেই তো এত সুন্দর করে হাসতে পারে না। বারান্দায় টেবিল চেয়ার পাতা ছিল। বিশাল বাড়িতে সব কিছুই গুছানো। একরাম সাহেবের আগের স্ত্রী বেশ গুছানো মানুষ ছিলেন। এত সুন্দর বাড়িটার প্রতি টি অংশ তার হাতের ছাপ বহন করে চলেছে। পাখি উড়ে গেলেও তার পালক রেখে যায়। অন্য কোন পাখি সেখানে এসে পালক দেখেই বুঝতে পারে এখানে কেউ ছিল। পরীও বুঝতে পারল। সেও তার নিজের মত করে সাজাবে এই ঘর সংসার। ভালবাসা দিয়ে সে পরিপূর্ণ করে রাখবে পুরো বাড়িটা। বারান্দায় চেয়ারে বসে পরী একরাম সাহেব কে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসল। সে বলল, আপনার আগের স্ত্রীর নাম কি ছিল?

একরাম সাহেব একটু অবাক হলেন। কিন্তু প্রকাশ করলেন না। প্রশ্ন করতেই পারে। এই প্রশ্ন করার অধিকার নিয়েই সে এই ঘরে প্রবেশ করেছে। একরাম সাহেব বললেন, শোভা। বাহ! বেশ সুন্দর নাম তো। হ্যাঁ। আচ্ছা তার কোন ছবি আছে? দেখাতে পারবেন? হ্যাঁ পারব। এখনই দেখবে? পরী উপর নিচে মাথা নাড়ল। একরাম সাহেব ঘরের ভেতর ঢুকে একটা ফ্রেম নিয়ে আসলেন। ফ্রেম টা পরীর হাতে দিলেন। পরী এক মুহূর্ত সেটা দেখে টেবিলের উপর রেখে দিল। শোভাকে কেমন দেখলে পরী? হুঁ, অনেক সুন্দর ছিলেন তিনি। আচ্ছা পরী শোভার সাথে তোমার কোথায় মিল আছে বলতে পারো? পরী বলল, চোখে। আমার চোখ হুবহু উনার মত। একরাম সাহেব বললেন, তুমি বেশ বুদ্ধিমতী। শোভাও অনেক বুদ্ধিমতী মেয়ে ছিল। যাই হোক, সেসব কথা। একটা কথা সত্যি করে বলবে পরী? কি কথা বলুন? আমি এত কালো একটা মানুষ, আমাকে বিয়ে করে কোন আক্ষেপ নেই তো তোমার?

লোকটাকে নিয়ে সে যে এরকম ভেবে এসেছে, লোকটা মোটেও সেরকম নয়। পরীর চোখদুটো ভিজে এল। নিজের কাছেই লজ্জিত বোধ হতে লাগল। শোভার ছবি দেখে সে বুঝতে পেরেছে, শোভা তারচেয়েও অনেক বেশি সুন্দর ছিল দেখতে। সেই সৌন্দর্যের কাছে সে কিছুই না। পরী বলল, মোটেও না। আমি অনেক ভাগ্যবতী আপনার মত কাউকে আমার জীবনে পেয়েছি। একরাম সাহেব বললেন, শুনে খুব ভাল লাগল পরী৷ আমি আজ সারাক্ষণ এই ব্যাপারটা নিয়েই ভাবছিলাম। পরী বলল, এখন কি মনে হচ্ছে আপনার? একরাম সাহেব বললেন, এখন খুব হালকা লাগছে। একধরনের অপরাধ বোধও কাজ করছিল আমার। পরী বলল, কি ধরণের অপরাধ বোধ? আমি তোমার চেয়ে বয়সেও অনেকটা বড়। আমাদের এডজাস্ট হবে কি না? এছাড়া আমার আগেও একটা বিয়ে হয়েছিল। তুমিই বা ব্যাপারটা কে সহজ ভাবে নিতে পারো কি না? এইসব আর কি!

পরী বলল, দেখুন আমি তো সব মেনে নিয়েই বিয়েতে রাজি হয়েছি। তাই না? আমি সবকিছুই জানতাম আপনার সম্পর্কে। বড় মামা আমার কাছে পিতৃতুল্য। তিনিই আমাকে বড় করেছেন। তিনি যখন আপনাকে আমার জন্যে পছন্দ করেছেন, সেখানে আমার বলার তেমন কিছুই থাকে না। আপনাকে আমার বেশ ভাল লেগেছে। কাউকে ভাল লাগার জন্য যে খুব বেশি সময় লাগতে হবে, তা কিন্তু না। একরাম সাহেব মন দিয়ে কথা গুলো শুনছিলেন। পরীর কথা শেষ হলেই তিনি বললেন, পরী তুমি বসো। আমি ঘর থেকে আসছি। পরী বলল, আচ্ছা। একরাম সাহেব ঘর থেকে একটা গহনার বাক্স নিয়ে বারান্দায় আসলেন। পরীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এটা তোমার জন্যে। যখন বিয়ের কথাবার্তা চলছিল, তখনই বানিয়ে রেখেছিলাম।

পরী গহনার বাক্সটা খুলে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল। সে বলল, এত গহনা দিয়ে আমি কি করব? একরাম সাহেব বললেন, পরবে। তোমার নাম হলো পরী। আমি তোমাকে পরীর মতো সাজিয়ে দিতে চাই। আমার ঘরে থাকবে পরী। সে হাঁটবে, চলবে, কথা বলবে। আর আমি সেগুলো দেখব। হাহাহা একটা মানুষ এরকমও হয়? পরী কিসব ভেবে রেখেছিল এই মানুষটা সম্পর্কে! এই মুহূর্তে সে নিজেকে পৃথিবীর সবচে সুখী মানুষ বলে মনে করছে। শরীফা খালার কথাই ঠিক হল। পরী ভাবল সে হয়তো স্বপ্ন দেখছে৷ এত সুখ একসাথে সবার কপালে জোটে না। কিন্তু তার বেলায় এটা হচ্ছে। নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না সে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি তার ঘুম ভেঙে যাবে৷ বড় মামি হয়তো ডেকে বলবেন, পরী! এদিকে আয়তো মা। মাছগুলো কুটে দিয়ে যা৷ আমার হাতে রাজ্যের কাজ।

একরাম সাহেব বললেন, কি ভাবছ পরী? পরী বলল, না কিছু না। রাত বাড়ছে। ঘুমাবে না? হুঁ। তবে? তবে কি? আমি একবার আপনাকে জড়িয়ে ধরতে চাই। আপনি কি কিছু মনে করবেন? একরাম সাহেব কিছু বলার সময় পেলেন না। পরী তাকে জড়িয়ে ধরেছে খুব শক্ত করে। কোন শক্তিই এই বাঁধন ছিন্ন করতে পারবে না। একরাম সাহেবের চোখেও জল ছলছল করছে। তিনি মনে মনে শোভার কথা ভাবলেন। শোভাও বাসর রাতে এরকম তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। এরকম সময় আকাশ কাঁপিয়ে বিদ্যুৎ চমকাল। আচমকা আলোকিত হয়ে গেল চার পাশ। ঝুম করে নেমে গেল শ্রাবণের জলধারা। সারা শহর বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল।

একরামুল হাসানের ছুটি শেষ হয়ে গেল কিছুদিনের মধ্যেই। তিনি ব্যস্ত হয়ে গেলেন তার কাজে৷ সকাল দশটায় অফিসে যান, সন্ধ্যের আগ দিয়ে বাসায় ফেরেন। পরী তার নতুন জীবনের সাথে খুব ভালভাবেই মানিয়ে নিয়েছে। সারাদিন এ ঘর থেকে ও ঘরে যায়। কাঁচের জিনিসপত্র গুলো নরম কাপড় দিয়ে খুব যত্ন করে মোছে। গোছানো জিনিসই নতুন করে গুছিয়ে রাখে। সময় কাটে না। ঘরে টিভি আছে। কিন্তু টিভি দেখা তার পছন্দ না। তার পছন্দ বই পড়া। একরামুল হাসান তার জন্য অনেক বইপত্র কিনে এনেছেন। বুক শেল্ফ কিনেছেন। বইগুলো খুব সুন্দর করে বুক শেল্ফে সাজানো রয়েছে। সব সময় বই পড়তেও তার ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে পড়ে৷ পড়া শেষ হলে আবার যথা স্থানে বইটা রেখে দেয়।

পরীদের বাড়িটা তিন তলা। ছাদটা বেশ সুন্দর। বড় বড় কয়েকটা আমগাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। তার শাখা প্রশাখা ছাদের রেলিং এর উপর এসে পড়েছে। ছাদের এই দিকটা পরীর খুব পছন্দ। বিকালবেলা সে প্রায়ই ছাদে আসে। সাথে থাকে চায়ের কাপ আর টোস্ট বিস্কিট। সময়টা খারাপ কাটে না। একরামুল হাসান অবশ্য বলেছিলেন, পরীর কাজে সাহায্য করার জন্য গ্রাম থেকে ফিরোজা খালাকে আনবেন। পরী না করে দিয়েছে। সে বলল, দু’জনের সংসার। কি এমন কাজ বলতো? আমি একাই তো করছি। আমি একাই পারবো। পরে কখনো প্রয়োজন হলে তখন দেখা যাবে।

বিয়ের তিন মাসের মাথায় পরী লক্ষ্য করল তার হঠাৎ হঠাৎ বমি বমি ভাব হচ্ছে। মাথা ঘোরাচ্ছে। কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। সে লজ্জায় একরাম সাহেব কে কিছু জানাতে পারল না। অথচ কাউকে না কাউকে তো বলা দরকার। সে ভেবে পেল না কাকে বলবে। দু এক দিন এভাবেই কেটে গেল। বড় মামি কে একটা টেলিফোন করা যেতে পারে। কিন্তু সে করল না। হুলুস্থুল পড়ে যাবে। তাকে নেয়ার জন্য বড় মামা এসে হাজির হবেন৷ এই ব্যাপারটা তার ভাল লাগল না। নতুন সংসার ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। হঠাৎ মনে হল, শরীফা খালাকে একটা টেলিফোন করা যায়।
সে বসার ঘরে সোফায় এসে বসল। পাশেই টেলিফোন রাখা আছে৷ সে রিসিভার কানে তুলে বোতাম চাপল।
ফোন বাজছে। শরীফা খালাকে পাওয়া গেল না। তিনি গিয়েছেন পাশের বাসায়। পরী একটু অপেক্ষা করে আবার ফোন করল। এবার তাকে পাওয়া গেল। শরীফা বেগম বললেন, কেমন আছো গো মা? পরী বলল, জি খালা বেশ ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন? আমিও ভালাই আছি।

পরী খুব সংক্ষিপ্ত করে তার ব্যাপারটা খুলে বলল। শরীফা খালা শুনে আনন্দে আহ্লাদিত হলেন। পরী বলে দিয়েছে ব্যাপারটা কাউকে না জানাতে৷ সময় হলে সে নিজেই সবাই কে জানাবে। পরী বলল, খালা আপনি এসে কয়েকটা দিন বেড়িয়ে যান আমাদের বাসায়। সারাদিন একা একা থাকি। আপনি এলে খুব খুশি হব। শরীফা বেগম বললেন, আচ্ছা আসব মা। খুব শীঘ্রই আসব। রাতে একরাম সাহেব কে সে ব্যাপার টা না বলে থাকতে পারল না। বলতে বলতে সে লজ্জায় বেগুনী হয়ে গেল! একরাম সাহেব মুগ্ধ হয়ে পরীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার মনে হল মেয়েটা হঠাৎ করে আগের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর হয়ে গিয়েছে। সম্পূর্ণ অচেনা লাগছে তাকে। একরাম সাহেব বললেন, পরী তুমি আমার কাছে কি চাও? কিছু একটা চাইতেই হবে। বল কি চাও?

পরী বলল, কি চাইব আমি? আমার কোন কিছুরই অভাব নেই। আমি কিছুই চাই না। একরাম সাহেব বললেন, না না, বলতেই হবে তোমাকে। বল কি চাও? পরী বলল, চলুন আজ রাতে বৃষ্টিতে ভিজি একসাথে। আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি হলেও হতে পারে। একরাম সাহেব বললেন, এটা কোন চাওয়া হলো? তুমি বললে আমি এমনিতেই ভিজতে রাজি হতাম। এটাতে হবে না। অন্য কিছু চাইতে হবে। পরী বলল, এটাই আমার সবচে বড় চাওয়া আপনার কাছে৷ এর বেশি আমি কিছুই চাই না। চাইতে জানিও না। একরাম সাহেব এর চোখ টলমল করছে। মেয়েটা এত সরল হল কিভাবে? পরী কি এই ভূবনের কেউ? নাকি তার বাস অন্য কোন ভূবনে? যে ভূবনে জাগতিক কোন চাওয়া পাওয়া নেই। আছে শুধুই ভালবাসার অদম্য স্পৃহা!

এক বিকেলে চায়ের কাপ হাতে পরী ছাদে গিয়েছে। ছাদের যেদিকটায় আমগাছের শাখা প্রশাখা এসেছে সেদিকটায় গিয়ে সে দাঁড়াল। পাশ ফিরে তাকাতেই আচমকা কেঁপে উঠল। ছাদের অন্য একটা প্রান্তে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিছন ফিরে৷ তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। পরী নিজ হাতে ছাদের তালা খুলে এসেছে। ছাদে তো অন্য কারো থাকার কথা না। পরীর হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়ে গেল। ছাদের মেঝেয় পড়ে ঠাস করে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মেয়েটা এবার ঘুরে থাকাল পরীর দিকে৷ পরী মেয়েটাকে দেখল। কোথায় যেন দেখেছি? খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে তার কাছে। কিন্তু কিছুতেই সে মনে করতে পারল না কোথায় দেখেছে। তার মাথা ঘোরাচ্ছে। তার মনে হল, সারা পৃথিবী সংকুচিত হয়ে তার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে! পরী জ্ঞান হারাল।

জ্ঞান ফেরার পর পরী চোখ মেলে দেখল, একরাম সাহেব তার মাথার কাছে চুপ করে বসে আছেন। তার মুখ গম্ভীর। পরী হাতে চিন চিনে একটা ব্যাথা অনুভব করল। তার হাতে স্যালাইন এর সূচ ঢুকানো। একরাম সাহেব বললেন, এখন কেমন আছো পরী? পরী বলল, ভাল আছি। তুমি কখন এলে? অনেকক্ষণ হল এসেছি। তুমি রেস্ট নাও পরী। তোমার শরীরটা ভীষণ দূর্বল। হুঁ আচ্ছা। তোমার কি হয়েছিল পরী? তুমি ছাদে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে কেন? পরীর ঠোঁট দুটো আলতো নড়ে উঠল। সে কিছুই বলতে পারল না। একরাম সাহেব বললেন, কিছুতে ভয় পেয়েছ? পরী উপর নিচে মাথা নাড়ল।

একরাম সাহেব বললেন, তোমার শরীরের যে অবস্থা এখন, এরকম সময় হেলুসিনেশন খুব স্বাভাবিক ঘটনা। অতিরিক্ত দূর্বলতাই তোমার এই অজ্ঞান হওয়ার কারণ। এর বেশি কিছু না। ও। শোনো, তুমি এখন থেকে শুধু রেস্টে থাকবে। ছাদে খুব বেশি যাবে না। আমি ফিরোজা খালাকে আনানোর ব্যবস্থা করছি। সব কাজ তিনিই করবেন। আর ছাদে যেতে চাইলে অবশ্যই তাকে নিয়ে যাবে সাথে করে। একা একা কোথাও যাবে না। কি মনে থাকবে তো? হুঁ। মনে থাকবে। একরাম সাহেব টেলিফোন করে ফিরোজা খালাকে তার বাসায় নিয়ে আসলেন। বললেন, খালা পরীর শরীর টা খুব বেশি ভাল না। তুমি ওর একটু দেখা শোনা করবে। ফিরোজা খাতুন পরীর দেখা শোনা করতে লাগলেন। সব কাজ এখন তিনিই করেন। সপ্তাহে দুই দিন একজন ডাক্তার এসে পরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দিয়ে যায়।

সময় ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসতে লাগল। পরীর দেহ ভেঙে গেল। চোখের নিচে কালি পড়ল। একরাম সাহেব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে তিনি দেখেন পরী একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে আছে ফ্যানের দিকে। ফ্যান ঘুরছে, পরীর চোখের মণিও ঘুরছে। তিনি আলতো করে ডাক দেন, পরী! পরী কোন জবাব দেয় না। তখন তিনি পরীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। পরীর চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি ঘুমান। এভাবে কিছুদিন চলল। একদিন দুপুরবেলা ফিরোজা বেগম রান্না করছিলেন৷ হঠাৎই তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন, ও আল্লাহ! পরী একরাম সাহেব কে তাড়াতাড়ি টেলিফোন করল। একরাম সাহেব একজন ডাক্তার নিয়ে দ্রুত বাসায় এসে উপস্থিত হলেন। জ্ঞান ফিরলে ডাক্তার সাহেব ফিরোজা খাতুনের কাছে কারণ জানতে চাইলেন। ফিরোজা খাতুন জানালেন তার কিছুই মনে পড়ছে না। পরে একরাম সাহেব কে তিনি আড়ালে ব্যাপারটা বললেন। ‘আমি রান্নাঘরের জানালা দিয়া দেখলাম বারান্দায় একটা মাইয়া দাঁড়ানো। আমি ভাবলাম পরী। পরে দেখি যে, না পরী না! আমাদের শোভা দাঁড়ায়ে আছে! আপনেই কন এইটা কি সম্ভব কোন ঘটনা?’

পরী একদিন ড্রয়ার খুলে সেই ফ্রেমটা বের করে দেখল। তার সব সন্দেহের অবসান ঘটল। ছাদে যে মেয়েটাকে সে দেখেছে তার নাম শোভা। শুধু যে ছাদেই দেখেছে ব্যাপারটা তা না। ঘরেও সে বেশ কয়েকবার তাকে দেখেছে৷ সবুজ রঙের একটা শাড়ি সে পরে থাকে৷ শাড়ির আচল পড়ে থাকে মেঝেতে। কেমন একটা উদাসীনতা যেন তাকে ঘিরে রেখেছে৷ পরী বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। তার মাথা ঘুরতে শুরু করে। মনে হয়, সারা পৃথিবী ঘুরছে। এবং যে কোন সময় সেটা সংকুচিত হয়ে তার শরীরের ভেতর ঢুকে যাবে৷ সে অন্য কাজে মন দেয়। বুক শেল্ফ থেকে পছন্দের কোন বই নিয়ে পড়তে চেষ্টা করে। এই ব্যাপারগুলো যেদিন যেদিন ঘটে, সেদিন সে কিছুই খেতে পারে না। এরকম প্রায়ই ঘটে। পরীর শরীর আরো খারাপ হয়ে গেল অল্প কিছুদিনের মধ্যেই।

ফিরোজা খাতুন একদিন শাক সবজি কাটছিলেন। পরী কোমরে হাত দিয়ে ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ ফিরোজা খাতুন প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বললেন, আম্মা গো! আপনি বিছানা থেকে কেনো উঠছেন? আমারে ডাকলেই পারতেন! পরী বলল, না না খালা। সারাদিন শুয়ে থাকতে ভাল লাগে না। একটু হাঁটতে ইচ্ছে করল। ও আচ্ছা। তয় সাবধানে দাঁড়ান। আমি হাতলওয়ালা চেয়ারটা নিয়া আসি। তিনি চেয়ার এনে পরীর সামনে রাখলেন। ধীরে ধীরে পরীকে সেই চেয়ারে বসালেন। এরপর আবার সবজি কাটতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে পরী বলল, খালা, শোভা বুবু মারা গেল কিভাবে?

ফিরোজা বেগম চোখ গোল গোল করে তাকালেন পরীর দিকে। বললেন, হঠাৎ এই কথা কেন আম্মা? পরী বলল, এমনিতেই। আপনি বলুন, জানতে ইচ্ছে করছে। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়া গেছে আম্মা। এইগুলা নিয়া কথা বলা ঠিক না। পরী বলল, আচ্ছা। ঠিক আছে। আপনি সেদিন শোভা বুবু কে দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন তাই না খালা? ফিরোজা বেগম এই কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন। একটুর জন্য তার হাত কাটল না। পরীর এই প্রশ্নের কি জবাব দেবেন তাও সে জানেন না৷ বোকার মত মুখ করে তিনি পরীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। পরী বলল, খালা আমি নিজেও মাঝে মাঝে শোভা বুবুকে দেখি। সবুজ শাড়ি পরা। শাড়ীর আচল মেঝেতে পড়ে আছেন৷ তিনিও আমাকে দেখেন৷ কেমন মায়া ভরা একটা চোখে তাকান৷ আমি অবশ্য বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারি না। আমার মাথা ঘোরায়। আপনি আমাকে বলুন সে কিভাবে মারা গেল?

ফিরোজা খাতুন বলবেন না কিছুতই। এদিকে পরী ঘটনাটা জানবেই। ফিরোজা খাতুন মনের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বলতে লাগলেন, প্রথম বাচ্চাটা মারা যাবার পরে সে অদ্ভুত আচরণ করা শুরু করল। অনেক ডাক্তার কবিরাজ দেখানো হইছে কাজ হয় নাই। এভাবেই বছর খানেক কাটল। দেড় বছরের মাথায় সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেল৷ আমরা সবাই ভাবলাম এই বুঝি সুদিন ফিরল। এরপর ফিরোজা খাতুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, দ্বিতীয় বাচ্চা হওনের সময় তারে আর বাঁচানো গেল না। বাচ্চাটাও আর বাঁচলো না। সবই আল্লাহর ফয়সালা। আমরা আর কি করি? পরী চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। সারাদিনে সে কিছুই খেতে পারল না। সন্ধ্যার দিকে তাকে এক প্রকার জোর করেই খাওয়ানো হল। একরাম সাহেব পরীকে বললেন, তুমি এভাবে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিলে কেন পরী? তোমার ভিতরে তো আরেকজনও আছে। তার কথাও তো তোমাকে ভাবতে হবে তাই না?

পরীর চোখের কোণা দিয়ে একফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। পরী বলল, আর এরকম হবে না। একরাম সাহেব বললেন, সামনে সপ্তাহে তোমাকে হাসপাতালে এডমিট করিয়ে দিব। সেখানেই বাকিটা সময় থাকবে। এই সময়ে খুব সাবধান থাকতে হবে। বাসায় ঠিকমত পরিচর্যা হচ্ছে না তোমার, এটা আমি বুঝতে পারছি। পরী বলল, একটা কথা বলি? হুঁ বল। আমাদের তো মেয়ে হবে তাই না?একরাম সাহেব একটু হেসে বললেন, টেস্টে তো তাই বলছে। আপনি খুশি হয়েছেন তো? একরাম সাহেব পরীকে আলতো জড়িয়ে ধরে বললেন, অসম্ভব খুশি হয়েছি! আমার জীবনের সেরা উপহার এটা। পরী হাসল। এতদিন পরে পরীর মুখে হাসি দেখে একরাম সাহেবও খুব আনন্দিত হলেন। যদিও এই আনন্দের রেশ খুব বেশি সময় ধরে থাকল না।

পরী বলল, আমি মেয়ের একটা নাম ঠিক করেছি।একরাম সাহেব বললেন, তাই নাকি! বলতো শুনি! এখনই শুনবেন? হ্যা, এক্ষুণি বলো! আমি ঠিক করেছি আমার মেয়ের নাম হবে ‘জরী’। একরাম সাহেব বললেন, বাহ! খুব সুন্দর নাম রেখেছ তো! তোমার নাম পরী, কন্যার নাম জরী! কম্বিনেশন টা খুব ভাল হল। এর পরের বার ছেলে হলে নামটা কিন্তু আমিই রাখবো! পরী লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে রইল। কোন কথাই সে বলতে পারছে না। এত সুন্দর একটা সংসার ক’জনের ভাগ্যে হয়? পরী একরাম সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বলল, আচ্ছা আমি যদি মারা যাই? তাহলে কি হবে? কত মেয়েই তো বাচ্চা হতে গিয়ে মারা যায়। তাই না?

একরাম সাহেব এর মুখ গম্ভীর হয়ে আসল। তিনি বিজড়িত গলায় বললেন, এরকম কথা আর কখনোই বলবে না পরী। ভুলেও মুখে আনবে না। মনে থাকবে? পরী একটু হেসে বলল, জি জনাব মনে থাকবে। আর কখনোই বলব না। পরীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। খবর পেয়ে শরীফা বেগম ছুটে আসলেন। বড় মামা, মামি আসলেন। সবাই পরীকে দেখে গেলেন। শরীফা বেগম অবশ্য ফিরে গেলেন না। থেকে গেলেন। সারাদিন তিনি হাসপাতালে থাকেন। রাতে শুধু পরীদের বাসায় গিয়ে ঘুমান। দেখতে দেখতে ডেলিভারির দিন এসে গেল। একরাম সাহেব এক সপ্তাহের ছুটি নিলেন। সার্বক্ষণিক ভাবে তিনি পরীর উপর নজর রাখছেন।

এক মুহুর্তের জন্যেও কোথাও যাচ্ছেন না। পরী মনে মনে ভাবছে, এই মানুষ টা কে ছেড়ে যদি তার কোথাও চলে যেতে হয়, সেখানে গিয়ে সে কিভাবে থাকবে? পরীকে যেদিন অপারেশন থিয়েটারে ঢোকানো হল সেদিন কোন ঝড় বৃষ্টি ছিল না। ছিল ঝকঝকে রোদ। পরীর চোখে রোদ এসে পড়ল। সে চোখ মেলে তাকিয়ে চারপাশটা ভাল করে দেখে নিল। ঝলমলে রোদে চারপাশটা কেমন আলোকিত হয়ে আছে। আজ তার জীবনের একটা বিশেষ দিন। এবং আজকেও সে পরাধীন। ডাক্তাররা যেরকম চাইবেন সেরকমই হবে। নতুন একজন অতিথি কে সে আজকে পৃথিবীতে স্বাগতম জানাতে চলেছে। এর চেয়ে আনন্দের ঘটনা আর কি হতে পারে? নতুন দিনের অতিথি কে স্বাগতম জানাতে আজ কি সুন্দর ঝলমলে রোদ উঠেছে৷ আলবার্ট আইনস্টাইনের সেই কথাটা তার আবারও মনে পড়ে গেল, ‘Look deep into nature and then you will understand everything better.’ প্রকৃতি আসলেই বড় অদ্ভুত, বড় বিচিত্র।

পরীর শরীরে যন্ত্রণা ক্রমেই বেড়ে চলল। ডাক্তাররা এনেস্থেসিয়া দিলেন। এই দূর্বল শরীরে নরমাল ডেলিভারি অনেক রিস্কি হয়ে যাবে তার জন্য। সিদ্ধান্ত হল, সিজারিয়ান ডেলিভারিতেই তারা যাবেন। এনেস্থেসিয়া কাজ করতে শুরু করেছে। পরীর চোখ ঘোলা হয়ে আসতে লাগল। ঘোলা চোখেও সে স্পষ্ট দেখতে পেল, শোভা তার মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। একরাম সাহেবের কথাও তার মনে পড়ল। তিনিও এভাবে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। পরী মনে মনে প্রার্থনা করল, হে সৃষ্টিকর্তা! এই মানুষটা অসম্ভব ভালো একজন মানুষ। তুমি তাকে দেখে রেখো।

পরীর দূর্বল শরীর এনেস্থেসিয়া সারভাইভ করতে পারল না। পরী মারা গেল সন্ধ্যার পর পর। সুন্দর ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তান সে জন্ম দিয়ে গিয়েছে। শরীফা বেগম পরীর পাশে বসে অঝোরে কাঁদছেন। কোনভাবেই তার কান্না থামানো যাচ্ছে না। একরাম সাহেব কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। নিজের চিন্তাভাবনা গুলো বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। শিশুটিকে কোলে নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ ম্লান চেহারায় তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। শিশুটি দেখতে অবিকল শোভার মত হয়েছে। তিনি আর কিছু ভাবতে পারলেন না। ভাবতে গেলেই তার মাথা ঘোরাচ্ছে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু তিনি এটা জানেন যে, তাকে যেভাবেই হোক নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতেই হবে।

কয়েক বছর পরের কথা। জরী কথা বলা শিখছে ধীরে ধীরে। সে বৃষ্টি হতে দেখলেই হাত পা ছোড়াছুড়ি করে। খুব কান্না করে। একরাম সাহেব অল্প কিছুক্ষণের জন্য হলেও জরীকে কোলে নিয়ে বৃষ্টিতে ভেজেন। জরীর কোন ইচ্ছাই তিনি অপূর্ণ রাখেন না। রাখতে চান না।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত