নুপুর

নুপুর

রাবেয়া চাচিকে আমার বাবা ভালবাসতেন। অবশ্যই সেটা বিয়ের আগে। তবে রাবেয়া চাচি যেই মুহূর্তে ইকবাল চাচার সাথে বিয়েতে মত দিয়েছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে বাবা চাচিকে ভুলে গিয়েছিলেন। এজন্যে রাবেয়া চাচি মারা যাবার পরে যখন তার মেয়ে নুপুরকে তার সৎমায়ের সংসার থেকে তুলে ঘরে নিয়ে আসলেন, আমরা বেশ অবাক হয়েছিলাম। মায়ের মনে কোন ভাবনা থাকলেও তিনি আমাদের টের পেতে দেননি। উলটো আমাদের সমস্ত দুশ্চিন্তা উপেক্ষা করে তিনি নুপুরকে নিজের মেয়ের মতোই গ্রহণ করেছিলেন।

তবে মা নুপুরকে নিজের মেয়ের মত ভাবলেও নুপুর আমাকে তার ভাই ভাবতো না। অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত আমার জন্যে। আমার প্রতি নুপুরের যে অনুভূতিটা ছিল সেটাকে ভালবাসা বলতে হবে, ভাললাগা নয়। ভাললাগা আর ভালবাসা শব্দ দুটির মধ্যে বিস্তর ফারাক। এই ফারাকটা আমাকে চোখে আঙ্গুলে দেখিয়েছিল মেয়েটা। নুপুর আমাকে ভালবাসতে শুরু করে সেদিনটাতে, যেদিন ওর হাত ধরে রাস্তা পার করে দিয়েছিলাম। হয়ত তার ভালবাসা হঠাত করে শুরু, কিন্তু গভীরতা মেপে দেখবার মত মানুষ বোধহয় আজ অবধি জন্মায় নি।

মা চিরকাল দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে তিরষ্কার করতেন। নুপুরকে সৎমায়ের ঘর থেকে নিয়ে আসবার পর থেকে শব্দটা কোনদিন মুখে আনেননি। তবে বাবা আমার কাছে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে প্রতিয়মান হয়ে ওঠেন নুপুরকে আমাদের ঘাড়ে তুলে নিশ্চিন্তে পরপারে পাড়ি জমাবার পরে। অভাবের সংসার নিয়ে আমাদের কোনকালেই অভিযোগ ছিল না। তবে এই সংসারটাকেই চালাবার দায়িত্ব ঘাড়ে উঠবার পরে আমার তথাকথিত দায়িত্বজ্ঞানহীন বাবার দায়িত্ববোধ বারবার চোখে জল এনে দেয় আমার। সামান্য টিউশনি করে পকেট খরচ সামলানো আমাকেই ছুটতে হয়েছিল ফাইল বগলে শাহবাগের জ্যাম ঠেলতে। বিভিন্ন অফিস থেকে হতাশ হয়ে রাস্তায় নেমে বাবার পেনশনের টাকাটা তুলতে গিয়ে রীতিমত হাত কাঁপত আমার। তবুও মা কিভাবে সামলে নিতেন সব। হয়ত পারতেন না যদিনা নুপুর তার টিউশনির টাকাটাও মায়ের হাতে তুলে না দিত।

নুপুরের প্রতি আমার খানিকটা আবেগ কাজ করত না, তা না। ছিমছাম সংসারি একটা মেয়েকে জীবনে টানবার যে স্বপ্নটা আমার ছিল, নুপুর হয়ত সেটা পূরণ করতে পারত, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিজয় সরণীতে দাঁড়িয়ে কপাল থেকে ছুড়ে ফেলা তিরষ্কারের ঘামটা। নিজের অকর্মণ্যতার প্রতি ধিক্কার জানিয়ে যে তিরষ্কারটা বুক থেকে ছিটকে বেরুতো, ঘর বাঁধবার স্বপ্নটা আর সে বুকে জায়গা পেতো না। বেশ ক’দিন নুপুরকে বুকের বাঁ পাশে জায়গা দেবার চিন্তাটা মাথা চাড়া দিলেও শক্ত হয়ে তুলতে হতো নিজেকে।

তবে দিনের শেষে নিজের শরীরটাকে টেনে ঘরের চোকাঠটা পেরিয়ে নুপুরের মুখের লাজুক হাসিতে আমার শক্ত হওয়া খোলসটা ভেঙেচুড়ে যেত একদম, সাথে ক্লান্তিটাও কোথায় হারিয়ে যেত টের পেতাম না। রাতে খাবার টেবিলে বসে নুপুরের চোখের লাজুকতায় হারিয়ে যেতে বসে বুঝতে পেতাম, এটাই হয়ত ভালবাসা। তবুও আমাকে গা ঝাড়া দিয়ে এড়িয়ে চলতে হতো। নিজের ব্যর্থতার মাঝে আরেকজনকে টেনে আনবার মত সাহসটা ছিল না আমার।
ছোট একটা চাকুরী পেয়ে ঘরে ফিরে নুপুরের যে ব্যকুলতা দেখেছিলাম আমি, সেটা আমাকে দুমড়েমুচড়ে দেবার জন্যে যথেষ্ট ছিল। মেয়েটা আমার দুই হাত ধরে ফিসফিস করে বলছিল, “আমার কপালে একটা চুমু দেবেন? শুধু একটা” চুমুটা কপালে লাগিয়েই দৌঁড়ে কোথায় পালিয়েছিল কে জানে।

চাকরীটা পেয়ে যাবার পরেই হয়ত নুপুরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখায় দোষ কিছু ছিল না, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্নটা। সম্মানিত একটা চাকরী পেয়ে নিজের মান সম্মানকে আসমান ছোঁয়া করে তুলবার যে লোভ জন্মেছিল আমার ভেতরে, নুপুর তার কাছে গৌণ হয়ে পরে। নুপুরের লাজুক হাসি, চোখের চাহনি, ভালবাসা সবটাই আমার কাছে তখন অর্থহীন। নুপুরকে নিজের পুত্রবধু হিসেবে দেখতে চাওয়ার আবদারটাও আমার চোখের বক্রতার জন্যে দাবিয়ে রাখতে হয়েছিল মায়ের। হয়ত চোখ মুছতেন মা, এতবড় একটা আশা, চাওয়া তার সন্তান সাধ্য থাকার পরেও পূরণ করছে না বলে, সেটা সৃষ্টিকর্তাই ভাল বলতে পারেন। তবে আমার তখন প্রতিষ্ঠিত হবার চাহিদা।

মানুষের জীবনে কখনো না কখনো বোধোদয় নামক একটা ঘটনা ঘটে। একটা সময় আসে। আমার এই সময়টা এসেছিল নুপুরের বাবা আমাদের বাসায় আসার পর। পাঁচ বছর পর তিনি এসেছিলেন পিতৃত্বের দাবী নিয়ে। নুপুরকে আমার জীবন থেকে নিয়ে যেতে। নুপুর যদিও আমার জীবনে সেভাবে বলতে গেলে আসেনি, তবু হয়ত আসত কোন না কোন একটা সময়ে। কিন্তু তার বাবা সেই অধিকারটাও কেড়ে নিতে এলেন বাসায়। নুপুরের বিয়েটা হতে দিতেন না মা, শুধুমাত্র আমার উপর অভিমানের বশেই নুপুরকে তুলে দিলেন ওর বাবার হাতে।

আমি বুঝতে শুরু করেছিলাম নুপুরের অভাবটা। পুরো বাসা এক নুপুরের অভাবেই খালি হয়ে গেল। নুপুরের হাসি, চাহনি, খোলা চুলের উষ্ণতা, গায়ের ঘ্রাণ সবকিছুই তীব্রভাবে অনুভব করতে শুরু করেছিলাম। নতুন করে যেন নুপুরকে চাইতে শুরু করেছিলাম আমি। হঠাত করেই বুঝে গিয়েছিলাম নুপুর আমার জন্যেই সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টিকর্তা ওকে আমার জন্যেই পাঠিয়েছেন পৃথিবীতে। ওকে ছাড়া আমি অপূর্ণ। আমি বুঝেছিলাম ঠিকই, তবে ততদিনে হারিয়ে গিয়েছে নুপুর।

নুপুর যে শুধু আমার জীবন থেকেই হারিয়ে গিয়েছে, তা নয়। ওর বাবা ওকে বিয়ে দিতে পারেনি, তার আগেই নিরুদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছে নুপুর। কোথায় আছে, বেঁচে আছে না মারা গিয়েছে, কোন খবর নেই। আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছি ঠিকই, আমি হারিয়েছি আমার ভালবাসা। আমাদের থেকে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে হারিয়ে গিয়েছে সে অজানায়। ভালবাসার মানুষের প্রতি মানুষের অভিমান যে কতটা তীব্র হতে পারে নুপুরকে দেখে জেনেছি আমি। জীবনটা সিনেমার গল্প হলে হয়ত নুপুর একদিন সব অভিমান ভুলে আমার অফিসের দরজায় দাঁড়াত, কিন্তু এটা জীবন। নুপুর আসেনি। কখনো আসবেও না হয়তোবা। ভালবাসা একবার অভিমানে পরিণত হলে তার থেকে ভয়ংকর অনুভূতি আর হতে পারে না।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত