অভিমান

অভিমান

দির্ঘ্য নয় বছর পর আজ এইভাবে অবনীর সাথে আমার দেখা হয়ে যাবে আমি ভাবিনি। ভাইয়ার জমি সংক্রান্ত ঝামেলার জন্য আজ আমাকে ভূমি মন্ত্রণালয় অফিসে আসতে হল, আর এসেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে অবনীর দেখা পেলাম। এই মুখটা দেখার জন্য আমার বুকটা হাহাকার করছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত মুখটাকে দেখে খুব শান্তি অনুভূত হচ্ছে। পরক্ষনেই মনে হল, অবনী এখন হয়তো অন্য কারো, আমার অবনী তো নয় বছর আগেই আমার কাছ থেকে অনেক দুরে চলে গেছে। ভাবতে ভাবতে চোখের কোনায় জল জমে উঠল, অবনীর কথায় আমার ধ্যান ভাঙল।

,কি হল আরাফ তুমি চুপ করে আছো কেন, কোথায় ছিলে এত বছর, আর আজ এখানে কি ভেবে।
,,কেন আমি কি এখানে আসতে পারিনা।
,,আসতে পারবেনা কেন, কিন্তু যেই তোমাকে কত খুঁজেছি সেই তুমি এইভাবে এখানে আমার সামনে।
,,ভাইয়ার জমি নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছে, ভাইয়া অসুস্থ থাকায় সে আসতে পারেনি তাই আমাকে আসতে হল।
,,তুমি এতদিন কই ছিলে, তোমার ছেলেমেয়ে কয়জন, বিয়ে করছ কোথায়।
,, বিয়ে করিনি ছেলেমেয়ে আসবে কোথা হতে, আমি আট বছর ইটালি ছিলাম একমাস আগে বাংলাদেশে আসছি।
,, আট বছরের মধ্যে বাংলাদেশে আর আসনি।
,, দুইবছর আগে একবার আসছিলাম, যখন আব্বা মারা গেছে, ছিলাম পনেরো দিন, এইবার আসতে চাইনি ভাইয়াভাবীর জোরাজুরিতে আসতে হল।

,, আচ্ছা আরাফ তুমি এখন বিয়ে করনি কেন। আমি অবনীর কথার কি জবাব দেব, তার জন্য আমি বিয়ে করিনি সেটা কি তাকে বলা ঠিক হবে, না ঠিক হবেনা, আর এখন বলার প্রয়োজনই বা কি, সে অন্যজনের স্ত্রী, আমি তাই অবনী সামনে থেকে চলে যেতে উঠে দাঁড়ালাম।

,, অবনী আমি এখন আসি, তুমি ভাইয়ার জমির ব্যাপারটা একটু দেইখো।
,, আরাফ শুনো, তুমি আমার বাসায় এসো একদিন তোমার সাথে অনেক কথা আছে, এই নাও আমার বাসার এড্রেস

কাগজে লিখে দিলাম, আসবে কিন্তু, বল আসবে। আমার ইচ্ছা নেই অবনীর বাসায় যাওয়ার, কিন্তু এখন অবনীর সাথে মিথ্যে বলতে হবে সৌজন্যতাবোধ বজায় রাখতে।

,, আচ্ছা যাবো সময় পেলে।

অবনীকে যাবো বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সামনে থেকে কোনমতে চলে আসলাম। অবনী বুঝতে পারছে আরাফ তার কাছ থেকে এখন ইচ্ছা করেই চলে গেল, এতদিন পর দেখা পেয়ে আরাফ তার সাথে কেন অপরিচিত মানুষের মত ব্যবহার করল, তাহলে কি আরাফ তাকে ভুলে গেছে, আমি না হয় বলছিলাম আমাকে ভুলে যেতে তাই বলে আমাকে সে ভুলে গেল, আমার প্রতি কি এখন আরাফের ভালোবাসা নেই, তাহলে সে এখনো বিয়ে করেনি কেন, হাজারো প্রশ্ন অবনীর মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

আমি ভূমি মন্ত্রণালয় অফিস থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে গেলাম, এখানে অবনী সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িত আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি আর অবনী সবসময় এখানে আসতাম। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এসে আগের স্মৃতি গুলো খুব মনে পড়ছে। প্রথম যেদিন অবনী আমার সাথে এখানে আসে, আমার কাঁধে মাথা দিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিল আর হাতে হাত রেখে বলেছিল, আরাফ আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি আমাকে কখনো ছেড়ে যেয়ো না, কখনো ভুল বুঝনা।

আমি অবনীকে কথা দিয়েছিলাম জীবন থাকতে তাকে ভুলবো না। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আজ অবনী আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, হয়তো ভুলেও গেছে। অবনী সেদিন যদি আমার কথা বিশ্বাস করত তাহলে আজ আর এমন দিন আসতো না। আমি যখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ার তখন অবনী অনার্স ফাষ্ট ইয়ার অবনীকে দেখেই আমার ভালো লেগে যায়, কিন্তু আমি তাকে সাহস করে কিছু বলতে পারিনি। একদিন অবনী আমার কাছে এসে জিজ্ঞাস করল,, আচ্ছা আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চান,, আমি ঘাবড়ে গিয়ে উত্তর দেই, না। সে আবার বলে,, যদি কিছু না ই বলতে চান তাহলে আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকেন কেন।

আমি বললাম এমনি, কেন আপনার কোন সমস্যা আছে আমি তাকিয়ে থাকলে। হ্যা সমস্যা আছে আপনার এমন করে তাকানো আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয়না,, অবনী বলল। আমি হা করে তাকিয়ে ছিলাম তার কথা শুনে, তখন সে আমার সামনে থেকে চলে গিয়েছিল আর আমি তার চলে যাওয়া দেখছিলাম। ওই দিনের পর থেকে অবনীর দিকে আমি আড়চোখে তাকাইতাম যেন সে বুঝতে না পারে। কিন্তু সে আরেকদিন আমার কাছে এসে বলল,, আপনার সাথে কথা আছে আপনি বিকাল চারটায় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দেখা করবেন। আমি জিজ্ঞাস করছিলাম কেন। অবনী বলছিল আপনাকে জেলে বন্দি করব। আমি যথাসময় চত্বরে গিয়ে উপস্থিত হই, গিয়ে দেখি অবনী বসে আছে, সে সরাসরি আমার সামনে এসে জিজ্ঞাস করল,

,, আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন। আমি অবনীর কাছ থেকে এমন প্রশ্ন আশা করিনি, তার প্রশ্ন শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কি বলব, না বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না, আবার অবনীর হুংকার,

,, কি হল বলেন, আমি সত্যিটা শুনতে চাই, ছেলে মানুষ এত ভিতু হয় আপনাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না।
আমি মাথা নিচু করে জবাব দিয়েছিলাম, ভালোবাসি অনেক ভালোবাসি। আমার কথা শুনে অবনী আমাকে জড়িয়ে ধরে, আমিও জড়িয়ে ধরি। সেদিন থেকে শুধু হয় অবনী ও আমার ভালোবাসার পথচলা। মেয়েটা পাগলের মত ভালোবাসে আমাকে, অবনীর বাসায় ভালো কিছু রান্না হলে লুকিয়ে আমার জন্য নিয়ে আসতো আমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতো।

আমার আর অবনীর ভালোবাসা ছিল পবিত্র, আমরা কেউ কাউকে কামনার দৃষ্টিতে দেখতাম না। অবনী সবসময় বলত, যে ভালোবাসা দেহের তা দেহ ভোগ করার পর ভালোবাসা আর থাকেনা, পবিত্র ভালোবাসা সারাজীবন থাকে। আমার বন্ধু সুমন সে অনেক মেয়ের সাথে রিলেশন করে, শারীরিক সম্পর্ক করার পর মেয়েদেরকে ধোকা দেয়। একদিন সুমন আমাকে বলেছিল, দেখিস তোর ভালোবাসা থাকবেনা, অবনী তোকে কিসটা পর্যন্ত করতে দেয়না, আমার মনে হয় অবনী তোকে ভালোবাসে না। আমি সুমনের কথা শুনে অবনীর কাছে কিস করব বলে আবদার করেছিলাম, সে বলেছিল, আরাফ যা করবে বিয়ের পর এখন এগুলো পাপ।

আমি অবনীকে বলেছিলাম, তুমি আমাকে ভালোবাসো না জাষ্ট একটা কিস করতে চাইছি সেটাও দিচ্ছ না।
অবনী কি যেন চিন্তা করে, কিছুক্ষণ পর রাজী হয়ে গেল, আরাফ শুধু একটা কিস আর কখনো এমন অন্যায় অবদান করবেনা। আমি সাথে সাথেই অবনীকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে আমার ঠোঁট লাগিয়ে দেয়, প্রায় দশমিনিট চুষে দেই, অবনী আমাকে ছড়াতে চেষ্টা করে পারেনা। দশমিনিট পর অবনী কান্না জড়িত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, আরাফ কাজটা তুমি ঠিক করলে না, আমি শুধু একটা কিস দিতে বলছি আর তুমি কি করলে, ছিঃ এতক্ষণ এইভাবে, আসলে তোমরা ছেলেরা শুধু দেহটা বুঝো আর কিছুনা। আমি সরি বলছি তবু অবনীর রাগ কমেনি, আমি মেসে এসে সুমনকে বললাম, তোর জন্য অবনী আজ আমার সাথে রাগ করল।

সুমন বলল, আরে দেখিস অবনীর রাগ কমে যাবে, আমাকে অন্তত ধন্যবাদ দে আমার বুদ্ধির জন্যই তুই তাকে কিস করতে পারলি। অবনী কয়েকদিন রাগ করে থাকার পর আস্তে আস্তে আবার আগের মত স্বাভাবিক হয়, আমিও তাকে প্রমিজ করি বিয়ের আগে আর কোনকিছু করতে চাইবো না। থার্টি ফাষ্ট নাইটে সুমন আমাকে জোর করে বিয়ার খাওয়ায়, আমি নেশায় একদম বুদ হয়ে যায়, সকালে অবনী চিল্লাচিল্লিতে আমার ঘুম ভাঙে চেয়ে দেখি অবনী রাগী চোখে দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে আমাকে গিলে খেয়ে ফেলবে আমার সাথে শুয়ে আছে জেসমিন, জেসমিন আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে তার প্রায় লগ্ন শরীরটা আমার সাথে লেপ্টে রয়েছে। আমি বুঝতে পারলাম না জেসমিন আমার সাথে শুয়ে আছে কেন, জেসমিন তো সুমনের নিউ গফ আর এত সকালে অবনী আমার মেসে কেন আসল।

,, ছিঃ তোমাকে আমি ভালোবাসছি, এমন একজন নোংরা মনের মানুষ তুমি যদি আগে জানতাম কখনো ভালোবাসতাম না।

,, প্লিজ অবনী শুনো আমি কিছুই জানিনা এই মেয়ে আমার বিছানায় আসলো কিভাবে।
,, চুপ মিথ্যুক আর কোন কথা নেই তোমার সাথে, এই ছিল তোমার মনে যখন দেখলে আমার দেহ ভোগ করতে পারলে না তখন অন্য মেয়ে খুঁজে নিলে।

,, অবনী প্লিজ আমাকে বিশ্বাস কর আমি এই মেয়েকে ছুঁয়ে দেখিনি, কি করে সে আমার বিছানায় আসলো জানিনা।
,, বিশ্বাস করব তোমাকে আমার নিজের চোখকে কি অবিশ্বাস করব, আমি নিজের চোখে দেখলাম এই মেয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে।

আমি সুমনকে বললাম, এই সুমন বল আমি জেসমিনের সাথে কিছু করিনি, জেসমিন তোর গফ। সুমন বলল, আরাফ তুই খুব নেশা করে ফেলছিলি রাতে তখন তোর কোন হুশ ছিল না, বার বার জেসমিনকে জড়িয়ে ধরছিস তার পরে আমার কিছু মনে নেই আমিও নেশার ঘোরে ঘুমিয়ে গেছি। আমি জেসমিনের দিকে তাকিয়ে বললাম, জেসমিন তুমি বল আমি তোমাকে কিছু করিনি। আরাফ তুমি আমাকে তোমার বিছানায় জোর করে নিয়ে আসছ, আমি সুমনের সাথে শুইতে চাইছি তুমি দেওনি, বলছ জেসমিন আজ রাতটা আমার সাথে থাক আমি তোমাকে আদর করতে চায়, এটা বলেই তুমি আমার সবকিছু খুলে ফেলে পাগলের ঝাঁপিয়ে পড় আমার উপর আর কি বলব সব কেড়ে নিয়েছ তুমি আমার। জেসমিনের কথা শুনে আমার মাথা ঘুরছে কি বলছে এই মেয়ে আমার তো কিছু মনে নেই, আমি সেক্স করব আর আমার মনে থাকবেনা, অবনী এতক্ষণ জেসমিনের কথা শুনে আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে।

,, আজ থেকে মনে করব আরাফ নামের কাউকে আমি চিনিনা, আর তুমিও কখনো আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেনা, ভুলে যাবে আমাকে, আমিও ভুলে যাবো তোমাকে।
,, আমি তোমাকে ভুলতে পারব না, প্লিজ অবনী তুমি আমাকে ভুল বুঝো না আমি জেসমিনের সাথে কোনকিছু করিনি, আমি তোমাকে ভালোবাসি অন্য কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাই না।

,, আমি তোমার আর কোন কথা শুনতে চাইনা, তুমি আমার সাথে যোগাযোগ করবেনা, আমার সামনে কখনো আসবেনা যদি আমার সামনে আসো আমার মরা মুখ দেখবে।
,, না অবনী তুমি এমন কসম দিতে পারনা, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না অনেক ভালোবাসি তোমায়।
,, যা বলছি মনে রেখো, না হলে আমার কথা আমি রাখব।

অবনীর কথা আমি রাখছি তার সামনে আর কখনো যাইনি যোগাযোগ করার চেষ্টাও করিনি। খুব ইচ্ছা করতো অবনীর সামনে যেতে, কিন্তু সে তো কসম করছিল আমি সামনে গেলে সে মরে যাবে, তাই আর সামনে যাবার চেষ্টা করিনি। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ইতালি চলে যায়, কারণ এখানে অবনীর স্মৃতিগুলো আমাকে কুড়েকুড়ে খাচ্ছিল। খেয়াল করলাম আমার ফোনে রিং হচ্ছে, ফোন পকেট থেকে বের করে দেখি ভাইয়া বিশ বার কল দিয়েছে, এতক্ষণ কল্পনার জগতে ছিলাম তাই রিংটোনের শব্দ শুনতে পাইনি। চারদিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যা হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি একটা রিক্সা ডাক দিয়ে উঠে বসলাম। বাসায় যেতেই ভাবী বলল, কোথায় ছিলে এতক্ষণ, তোমার ভাইয়া তোমার জন্য চিন্তা করছে।

,,আরে ভাবী আমি কি বাচ্চা হারিয়ে যাবো, ভাইয়ার চিন্তা করা লাগে। ভাইয়া জানতে চাইল, জমির ব্যাপারে ভৃমি অফিসার কি বলল। আমি বললাম, সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে আমি কথা বলে আসছি। অবনী তার বাসায় যেতে বলছে, যাব কি যাবনা বুঝতেছি না, আমার মন বলছে না যেতে। আবার ভাবছি এতদিন পর দেখা হল, সে সামান্য একটা আবদার করছে তার সে আবদার না রাখাটা ঠিক হবে না। শুক্রবার দিন অবনীর বাসায় গিয়ে দরজায় বেল চাপলাম, আমার বুক ধুকপুক করছে, মনে হচ্ছে এই বুঝি অবনীর হাজবেন্ড এসে দরজা খুলে। বয়স্ক মহিলা এসে দরজা খুলে দিয়ে জানতে চাইল আমি কে,

,, আমি আরাফ অবনীর ফ্রেন্ড, সে আমাকে আসতে বলছিল, অবনী কি বাসায় আছে।
,, অবনী গোসল করতেছে, তুমি বসো বাবা চা নাস্তা খাও।
,, কিছু খাবো না, দিয়েন না, আপনি অবনীর কে হোন।

আমি অবনীর মা, এই কথা বলে আন্টি ভিতরের রুমে চলে গেল। ভাবতেছি তাহলে অবনী শ্বশুরবাড়ি থাকেনা মা বাবার সাথেই হয়তো থাকে স্বামী নিয়ে। আন্টি আমাকে চা নাস্তা দিয়ে গেল, আমি চা খাচ্ছি অবনী আমার সামনে এসে বসল। আমি অবনীকে জিজ্ঞাস করলাম, বাসায় আর মানুষজন কই, কোথাও বেড়াতে গিয়েছে না কি,

,, আম্মুকে তো দেখলে, আর আব্বু বাজারে গিয়েছে বাজার করতে।
,, আর কেউ নেই বাসায়, মানে তোমার স্বামী ছেলেমেয়ে।
,, বিয়ে করিনি।
,, তুমি বিয়ে করনি, সত্যি বলছ।
,, মিথ্যা বলব কেন, আমার কপালে বিয়ে স্বামী সন্তান এগুলো নেই বুঝলা।

অবনী এখনো বিয়ে করেনি এই কথা শুনে আমার বুকের ভিতর থেকে অনেক বড় একটা পাথর নেমে গেল, আমি অবনীকে জিজ্ঞাস করলাম, কেন আসতে বলছ আর আমার সাথে না কি অনেক কথা আছে, কি কথা বল।

,, আরাফ তুমি কেন আমার সামনে আসনি এতগুলো বছর, তুমি জানো তোমাকে আমি কত খুঁজেছি, তোমার ফোন নাম্বারের অনেকবার ট্রাই করছি নাম্বার অফ পেয়েছি, পাগলের মত খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে গেছি আমি তবু তোমাকে পাইনি।

,, আমি কি করে তোমার সামনে আসবো বল, খুব ভালোবাসি তোমাকে, আমি চাইনি তোমার ক্ষতি হোক, তুমি তো বলেছিলে আমি তোমার সামনে আসলে তুমি আত্নহত্যা করবে, সেই ভয়ে আমি তোমার থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছি, আমি জানতাম বাংলাদেশে থাকলে আমি তোমার কথা রাখতে পারতাম না তাই ইটালি চলে গিয়েছিলাম, খুব কষ্ট হতো তোমাকে না দেখে থাকা কি করব বল তুমি কসম দিয়ে আমাকে বেধে দিয়েছিলে।

,, আরাফ আমাকে ক্ষমা করে দাও এতগুলো বছর তোমাকে কষ্ট দিয়েছি, সেদিন যদি তোমাকে বিশ্বাস করতাম তাহলে আজ দুজনে কষ্ট পেতাম না, অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি আমি তোমার কথা বিশ্বাস না করে।

,, আমি তো তোমাকে বলেছি, তুমি ছাড়া অন্য কোন মেয়ে আমার লাইফে ছিলনা, সুমন আর জেসমিন মিলে প্ল্যান করে তোমার চোখে আমাকে খারাপ বানিয়েছে।

,, আগে বুঝতে পারিনি, যেদিন জেসমিন আমাকে সব খুলে বলেছে সেদিন আমি বুঝতে পারি তোমাকে অবিশ্বাস করে জীবনে কত বড় ভুল করছি।
,, জেসমিন তোমাকে কি বলছে।
,, সেইদিনের পর আমি তোমাকে খুব ঘিনা করতাম,

ভাবতাম যে মানুষটাকে নিজের চেয়ে বেশী ভালোবাসলাম সে অন্য একটা মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করছে, সে আমাকে কখনো মন থেকে ভালোবাসেনি, ওই দিনের ঘটনার দুইবছর পর শপিংমলে জেসমিনের সাথে আমার দেখা হয়, সে বলছে, সুমনের কথায় সে তোমার বিছানায় শুয়ে ছিল, তুমি তাকে ছুঁয়ে দেখনি, তোমার আমার রিলেশন ভাঙার জন্য সুমন এই প্ল্যানটা করে, সুমন জেসমিনকেও ঠকিয়েছে।

,, আমি যদি কখনো ওই সয়তানকে সামনে পাই খুন করব।
,, কিছু করতে হবে না তার বিচার আল্লাহ করবে, জানো তারপর তোমাকে অনেক খুঁজেছি প্রতিরাতে তোমার জন্য কান্না করছি, ভেবে নিয়েছি তোমাকে আমি সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলছি, কিন্তু তোমাকে যে আবার এইভাবে ফিরে পাবো ভাবতে পারিনি।

,, কি হল পাগলি কাঁদছ কেন, তোমার আরাফ তোমারি আছে, তোমার ভালোবাসার টানে তোমার কাছে ফিরে আসছে।

আমি অবনীকে আমার বুকে জড়িয়ে ধরছি, অবনী কেঁদেই যাচ্ছে, তার চোখের পানি আমি মুছে দিয়ে বললাম, বিয়ে করবে আমাকে। অবনী মাথা নেড়ে হ্যা সূচক জবাব দিল, আমি তাকে খুব শক্ত করে আমার বুকের সাথে চেপে ধরলাম অবনীও আমাকে খুব জোরে আঁকড়ে ধরল। কখন যে রাত এগারোটা বেজে গেছে বুঝতে পারিনি, আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবনীকে বললাম, অনেক রাত হয়েছে এখন আমি যাই। অবনী বলল, কি করে যাবে বাহিরে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে, যেতে পারবেনা, রাতটা এখানে থাকো। আমিও আর না করলাম না, ভাইয়াকে ফোন করে বলে দিলাম বন্ধুর বাসায় আছি, চিন্তা না করতে। অবনী আমাকে তার রুমে নিয়ে গিয়ে বলল,,

,, তুমি আমার রুমে থাকো, আমি মা বাবার সাথে গিয়ে থাকি।
,, আংকেল আন্টি মনে হয় ঘুমিয়ে গিয়েছে, তাদের ডেকে ঘুমের ডিস্টার্ব করবে, তুমি বরং আমার সাথে ঘুমাও।
,, পাগল না কি তুমি, আমাদের কি বিয়ে হয়েছে একসাথে থাকবো।

বিয়ে হয়নি হবে, এটা বলেই আমি অবনীকে টান মেরে আমার কোলে বসালাম। অবনী কিছু বলতে চাইছিল আমি কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তার ঘাড়ে গলায় কিস করতে থাকলাম। অবনী আর কিছু বলতে পারল না সেও সাড়া দিল আমার আদরে। সকালে ঘুম ভেঙে চেয়ে দেখি অবনী আমাকে ঝাপটে ধরে রয়েছে, আমি অবনীর কপালে চুমো দিলাম, অবনী সজাগ হয়ে গেল।

,, আরাফ আমরা এটা কি করলাম, ছিঃ ছিঃ ভাবতে পারছিনা অবশেষে আমিও অন্য মেয়েদের মত বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক করে ফেললাম।
,, আরে আমরা তো বিয়ে করব, তুমি যদি বল আজই বিয়ে করব, আমি বাসায় গিয়ে ভাইয়া ভাবীর সাথে কথা বলছি।
,, ওকে যা কর তাড়াতাড়ি করবে, আমি আর নিতে পারছিনা এত বড় অন্যায়টাকে।

আমি অবনীর বাসা থেকে নাস্তা করে বের হলাম, বাসায় যেয়ে, ভাইয়া ভাবীকে অবনীর কথা বললাম, অবনীকে আমি বিয়ে করব। আমার কথা শুনে ভাইয়া বলল,

,,তোর সাথে আমার শালী সাদিয়ার বিয়ে দেবো, তোর ভাবীরও এই ইচ্ছা।
,, ভাইয়া অন্য কোন মেয়েকে আমি বিয়ে করতে পারব না, আমি অবনীকে বিয়ে করব, যার জন্য আমি এতগুলো বছর অপেক্ষা করেছি তাকে রেখে কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমার কথা শুনে ভাবী রেগে গিয়ে বলল,

,,তুমি যদি আমাদের কথা না রাখো তোমার সাথে আমাদের কোন রকম সম্পর্ক থাকবেনা। ভাইয়াও ভাবীর কথাতে সাই দিল। আমিও জানিয়ে দিলাম, আমি অবনীকেই বিয়ে করব, ভাইয়া বলল, আজ থেকে তুই আমার ভাই না মনে করব আমার কোন ভাই ছিলনা। ভাইয়ার কথা শুনে আমি বাসা থেকে বের হয়ে অবনীকে ফোন দিলাম,

,, অবনী তুমি বাসা থেকে বের হও এখন, শপিং করতে যাবো।
,, এখন শপিং করতে যাবে, এই দুপরবেলা।
,, সন্ধ্যায় তোমাকে আমি বিয়ে করব, তাই এখন শপিং করতে হবে, আর শুনো তোমার কয়েকজন ফ্রেন্ডসকে থাকতে বইলো কাজী অফিসে বিয়ের সাক্ষী হিসেবে।
,, আচ্ছা আমি বের হচ্ছি এখনি, তুমি আসো।

আমি অবনীকে নিয়ে শপিং করে তাকে বাসায় পাঠিয়ে দিলাম আর বললাম তার ফ্রেন্ডসদেরকে নিয়ে সন্ধ্যা ছয়টায় হাজির থাকতে কাজী অফিসে। আমি কাজী অফিসে গিয়ে কথাবার্তা বলে সব ঠিকঠাক করে আসলাম। যথা সময়ে অবনী তার ফ্রেন্ডসদের নিয়ে হাজির হল, আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। আমি অবনীকে নিয়ে এক অভিজাত হোটেলে উঠলাম। পরেরদিন অবনী তার অফিসে গিয়ে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে আসল, আর আমাকে নিয়ে তার বাসায় গেল। অবনী তার বাবা মাকে বলল, আমাকে সে বিয়ে করছে, অবনীর বাবা মা খুব খুশী হয়েছে। আমি অবনীকে বললাম, আমার ইটালি যেতে হবে, সেখানে আমার যা কিছু আছে, সবকিছু নিয়ে একেবারে বাংলাদেশে চলে আসব। অবনী বলল,

,, ফিরে আসবে তো আরাফ, আমার না খুব ভয় করছে, তোমাকে হারানোর ভয়।
,, কি বল পাগলী দেখবে কয়েকদিনের মাঝে তোমার আরাফ তোমার কাছে চলে আসবে।
,, এতদিন পর তোমাকে পেয়েছি, তাই হারানোর ভয় কাজ করছে আমার মনে।
,, আচ্ছা তুমি যদি না চাও আমি ইটালি যাবো না।
,, যাও তবে বেশী দিন দেরি করবেনা।
,, জাষ্ট সাতদিন এর বেশী দেরি হবেনা।

আমি যাবার সময় অবনী কাঁদছে, তাকে বুঝিয়ে ইটালি চলে আসলাম এখানে সবকিছু গোছগাছ করে সাতদিনেই বাংলাদেশে চলে আসছি। বসুন্ধরাতে অবনীর নামে ফ্ল্যাট কিনলাম, অবনী চাইছিল ফ্ল্যাট আমার নামে কিনি, কিন্তু আমি জোর করে অবনীর নামে দিলাম। পরশুদিন ফ্ল্যাটে উঠবো, দেখলাম অবনীর মন খারাপ,

,, কি হল জান, তোমার মন খারাপ কেন, কি হয়েছে আমাকে বল।
,, আমরা চলে গেলে মা বাবা একা হয়ে যাবে, এই বয়সে তারা একা একা কিভাবে থাকবে।
,, আরে কি বল, মা বাবা একা থাকবে কেন, তারা আমাদের সাথে থাকবে, এখানে শুধু শুধু ভাড়া ফ্ল্যাটে কেন থাকবে নিজেদের ফ্ল্যাট থাকতে।

,, সত্যি বলছ, মা বাবাকে আমাদের সাথে রাখবে তুমি।
,, কেন রাখবো না, তোমার মা বাবা কি আমার মা বাবা নয়, আমি তাদেরকে আমার নিজের মা বাবার মত ভালোবাসতে চাই।
,, তুমি আমাকে বাঁচালে জান, খুব চিন্তা হচ্ছিল বাবা মাকে নিয়ে, আই লাভ ইউ আরাফ। আমিও আই লাভ ইউ অবনী বলে, অবনীকে আমার বুকে আঁকড়ে ধরলাম।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত