নিরুদ্দেশ

নিরুদ্দেশ

প্রতিবছর আমি সুযোগ পেলেই সিলেটে কেনো আসি জানিস? শুধু এই শহরের রুপ এবং ঐশ্বর্যের জন্য নয়, এই শহরের এক মায়াময়ী অপ্সরাকে আরেকটাবার দেখার জন্য। যেই মায়া ফিরিয়ে দিয়েছে আমার আবেগহীন এই জীবনে একটু আবেগ। ভলবাসাহীন এই জিবনে একটু ভালবাসা। আর পাথরে শক্ত হয়ে যাওয়া মনটাকে আলতো রেশমী ছোয়া।

সেদিন সন্ধ্যায় যখন চা বাগানের ছোট রাস্তা বেয়ে হোটেলে ফিরছিলাম, তখন পেছন থেকে নুপুরের ঝনঝম শব্দ আমাকে থামতে বাধ্য করেছিল। পেছনে তাকিয়ে দেখি এক মেয়ে তার হাতে সোয়েটার নিয়ে আমার পিছু পিছু আসছে। মেয়েটার দিকে তাকাতেই ও আমায় দেখে মাথা নিচু করে নিলো। কিন্তু আমি হারিয়ে গেলাম মেয়েটার ভয়ভয় চোখের ওই নিস্তব্ধ মায়াতে। টিপটিপ করে মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকাতে দেখেও আমি থমকে গিয়েছিলাম। খুব করে চাচ্ছিলাম সময়টা এখানেই আটকে থাক সারাজিবন।

কিন্তু এসব কাটিয়ে সামনে ফিরেই যখন চলতে শুরু করি তখন আবার পেছন থেকে নুপুরের শব্দ। মেয়েটা আমার পিছু নিয়েছে। কিন্তু কেনো। আবারও থেমে পেছনে ফিরে জিজ্ঞেস করলাম, কি বেপার? আপনি আমার পিছু নিয়েছেন কেনো? মেয়েটা কিছু না বলে হাতের সোয়েটারটি আরও চেপে ধরলো। আমি বললাম, আপনি কিছু না বললে বুঝবো কি করে? মেয়েটি কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, “দেখুন আমি রাস্তা ভুলে গিয়েছি। আমাকে কি একটু মুল সড়কের দিকে দিয়ে আসবেন?” ভয়ভয়ে বলা কথাটায় কি ছিলো জানিনা। সে হয়তো জানেনা যে এখানে আমিও নতুন। তবে মুল সড়কের দিকে নিয়ে যেতে পারবো। বললাম, ‘আমি ওদিকেই যাচ্ছি, আসুন আমার সাথে।’ মেয়েটা আর কিছু না বলে আমার পিছু পিছু আসছে। অন্ধকারের তীব্রতা বাড়ছে। আরও বাড়ছে আমার মনের শীতল অনুভুতি মেয়েটিকে নিয়ে। আচ্ছা মেয়েটির কি এরকম কিছু হচ্ছে? মনে হয় না, হয়তো সে শুধুই ভয়েই পাচ্ছে।

হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটাকে পেছনে ফিরে দেখতেই আমি কেমন ভেবাচেকা খেয়ে গেলাম। মেয়েটি হাতে চাকু নিয়ে আছে। আমি একটু পিছিয়ে মেয়েটিকে বললাম, ‘আপনার হাতে চাকু কেনো? দেখুন আমি কিন্তু আপনার কোন ক্ষতি করছি না। আপনি আমার সাথে এরকমটা করতে পারেন না।’ “ছি ছি। না, আপনি ভুল ভাবছেন। আমি তো আমার জন্য এটা হাতে নিয়েছি। ভেবেছি আপনি খারাপ কেউ তাই।” একটু সাহস পেয়ে আমি বললাম, ‘আমিই আপনাকে সাহায্য করছি আর আপনি আমাকেই সন্দেহ করছেন? আমি আর পারবো না, আপনি একাই আসুন।’

মেয়েটা কিছু না বলে চুপচাপ আছে। আমিও আর কিছু না বলে সামনে হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু মেয়েটাও দেখি তখনও পিছু পিছু আসছে। একটু থেমে পেছনে তাকালাম। মেয়েটাও থেমে গিয়ে মাথা নিচু করে আড় চোখে দেখছে। চাকুটা ঢুকিয়ে ফেলেছে এর মাঝেই। আবারও আমি নিঃশব্দে হাঁটা শুরু করি। একটু পরেই চা বাগানের গা বেয়ে একটা ছোট রাস্তা পেয়ে গেলাম। মেয়েটাকে বললাম, ‘একা কেনো এসেছিলেন? রাস্তা চেনেন না তো কাউকে সাথে নিতে পারেন নি?’ “আজই সকালে এসেছি তাই ওরা সবাই ঘুমিয়েছিলো। আমার সময় যাচ্ছিলো না তাই হাঁটতে হাঁটতে এখানে চলে এসেছি।” ‘তো কেমন লাগলো এই সবুজের ঢেউ খেলানো পাহাড়?’ “আমাদের আর কতোক্ষন লাগবে?” ‘হ্যা! আমি কি বলছি আর আপনি কি বলছেন?’ “সবাই হয়তো চিন্তা করছে আমার জন্য। আর কতোক্ষন লাগবে যেতে আমাদের?” ‘এইতো সামনেই। কোথায় উঠেছেন আপনারা?’ “জানিনা তবে মুল সড়ক দিয়ে যেতে পারবো।” ‘হোটেলের নামও জানেন না?’ মেয়েটা চুপ করে থাকলো। মুল সড়কে আসার পর বললাম, এখন যেতে পারবেন?

রাত হয়েছে তাই মেয়েটার হয়তো ভয়ও করছে। তাই বললাম, ‘চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’ মেয়েটা কিছু না বলে হাঁটতে শুরু করলো। কিন্তু মেয়েটাতো আমরা যে হেটেলে উঠেছি সেদিকেই যাচ্ছে। একটু পরে আমার হোটেল চলে এলো। আমি তারপরও যাচ্ছি উনার সাথে। আমার হোটেলের পরের হোটেলে এসেই মেয়েটা বললো, “এসে পরেছি। এই হোটেলেই উঠেছি আমরা।” আমি একটু হাসলাম। মেয়েটাও একটু স্বস্তি পেয়েছে। বললাম, ‘ভালো থাকবেন। আসি।’ কি যেনো মনে করে মেয়েটা বললো, “আপনি কি পরীক্ষা দিতে এসেছেন?” ‘হ্যা, বলতে পারেন। আপনিও কি তাই?’ “জি। আপনি কোথায় উঠেছেন? আপনাকে অনেক কষ্ট দিলাম আজ। আপনি হয়তো প্রস্তুতি নিতেন এই সময়টা।” ‘হাহা, না না সমস্যা নেই। আমিও পাশের হোটেলেই উঠেছি। আর আপনি হোটেলের নামটি দেখে নিন। এবার যেনো হারিয়ে না যান।’

মুচকি হেসে মেয়েটি বললো, “চা খাবেন? ওই যে সামনেই দোকান।” ‘সিলেটে এসেছি, চা তো খাওয়াই যায় তবে আপনি কি পরীক্ষার কোন প্রস্তুতি নিবেন না?’ “একদিন পড়েই তো আর সবকিছু করে ফেলতে পারবো না তাই আমি চিন্তা করি যে এই ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হলেও আমার দেশটাকে একটু ভালভাবে ঘুরে দেখতে পারি। আর তো সুযোগ নাও হতে পারে, তাই না?” আশ্চর্য হলেও মেয়েটার চিন্তার সাথে কেমন করে যেনো আমার চিন্তা মিলে গেলো। মৃদু হেসে বললাম, ‘চলুন চা খেতে খেতে কথা বলি।’ মুচকি হেসে মেয়েটি বললো, চলুন।

পাঁচ রংয়ের চা নিয়ে বসে আছি। মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন বিষয়ে পড়ার ইচ্ছে আপনার?’ “আমার তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রো বায়োলজি নিয়ে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিলো তবে ভাগ্য হয়তো ওখানে নেই। তাই এখানে কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে যদি পড়া হয় আরকি। আপনার?” ‘ হাহা, আমার পছন্দের সেরকম কোন বিষয় নেই। যে কোন একটাতে হলেই হলো। তো আপনি বললেন না, এই সবুজের সমারোহ কেমন লাগলো?’ “আপনাকে যদি বলি যে চিনি ছাড়া চা খেতে খেতে একটা সময় চিনি দিয়ে চা খেতে কেমন লাগে, তখন আপনি কি বলবেন? আমাদের দেশটাই প্রকৃতির অপুর্ব রুপে প্রকাশিত। তবে আজ ওই অনেকটা চিনি দিয়ে চা এর মতো মনে হয়েছে।”

মেয়েটা অনেক সুন্দর করে কথা বলতে পারে। কথার মতো তার জন্য আমার অনুভুতিটাও অনেক সুন্দর করে বেড়ে চলেছে। তাই বললাম, ‘আপনি অনেক সুন্দর করে কথা বলতে পারেন। সত্যি বলতে আপনার সবকিছুই অনেক গোছানো মনে হয়েছে। আপনি মনে হয় অনেক ঘুরতে পছন্দ করেন তাই না?’ “অনেক পছন্দ করি। আমার এই একটাই শখ, পুরো দুনিয়াটা ঘুরে দেখা।” ‘এর আগে কখনও সিলেটে আসেন নি?’ “না, সুযোগ হয় নি। আসলে বাবা মা বাসার বাইরে কখনও খুব প্রয়োজন ছাড়া যেতে দেয় নি। এমনকি বন্ধুবান্ধবদের সাথে কোন পিকনিকেও যেতে পারিনি। তাই এই শখটা নিজের মাঝেই সৃষ্টি করেছি। আচ্ছা, আপনার ঘুরতে ভালো লাগে?”

‘আমার? বলতে পারেন আপনার সাথে এই বেপারে আমার অনেক মিল। তবে বাবা মা কখনও কোথাও যেতে না করেনি। বিশ্বাস ছিল আমি খারাপ কিছু করবো না। আচ্ছা, অনেক রাত হলো মনে হয়, তাই না?’ “হুম। হয়তো আমার জন্য ওরা চিন্তা করছে। আজ বরং উঠি।” ‘হুম সেটাই ভালো হবে। আপনার সাথে কাটানো এই কিছুটা সময় আমার কয়েকটি ভালো মুহুর্তের সাথেই মনে থাকবে।’ মৃদু হেসে মেয়েটি বললো, “আমারো। আপনার সাথে কথা বলে ভালো লেগেছে। আচ্ছা! আমাদের কি আর দেখা হবে না?” ‘কাল পরীক্ষা দিতে যেয়ে হয়তো দেখা হতে পারে। আবার নয়তো কোন এক সবুজের সমারোহে আবারও দেখা হবে। হয়তো তখন এর থেকেও ভালো কিছু মুহুর্ত কাটানো যাবে। তবে মানুষের জিবনে এই অপেক্ষাটা থাকা ভালো কারও জন্য।’

“বাব্বাহ, অনেক কিছু বললেন। তবে আমি অপেক্ষায় থাকলাম সেই দিনের।”
‘আমিও। ভালো থাকবেন আর শুভ কামনা আপনার জন্য।‘
“আপনিও ভালো থাকবেন। আর কোন মেয়েকে এভাবে একা সাহায্য করবেন না যেনো।”

কথাটা শোনার পর আমি প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকাতেই মেয়েটি মুচকি হেসে হোটেলের দিকে যেতে লাগলো। আমিও মুখের কনায় এক সুক্ষ্ম হাসি নিয়ে আমাদের হোটেলে আসলাম। পরেরদিন পরীক্ষা দিতে গিয়ে তেমনটা ভালো করতে পারলাম না। চান্স পাবো না এটা তখনই মনে হলো। পরীক্ষা শেষে বন্ধুরা মিলে বিভিন্ন প্রশ্নের বেপারে কথা বলছি ঠিক সেই সময়েই চোখ পরলো কাল রাতের মেয়েটার উপর। মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাকাতেই ও মুচকি হাসলো। হাত নেড়ে জিজ্ঞেস করলো, পরীক্ষা কেমন হয়েছে? মুখ নেড়ে আমিও বুঝালাম যে ভালো হয় নি। হাত দিয়ে বুঝালাম, আপনার কেমন হয়েছে? এটা দেখে সে আমার দিকে আসতে লাগলো। আমিও তখন তার দিকে এগোচ্ছি। কাছে আসতেই বললো, “খুব ভালো এমনটা বলবো না তবে ভাগ্য থাকলে হয়েও যেতে পারে।

” আমি হেসে বললাম, ‘ভাগ্য থাকলে কি আমি একটা ট্রিট পেতে পারি রেজাল্টের পর?’ মেয়েটা মুচকি হাসলো, বললো, “সবকিছুই কি ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিলে হয়? কিছু জিনিস তো নিজে থেকেই ধরে রাখতে হয় যেনো হারিয়ে না যায়।” আমি এটা শুনে হাসলাম। মেয়েটিও হাসছে। কি বলবো খুজে পাচ্ছি না। তাই মেয়েটিই বললো, “কি জনাব, আপনি তো দেখছি কথাই হারিয়ে ফেলেছেন? কিছু বলবেন নাকি ভাগ্যকেই মেনে নিতে হবে?” আমি বললাম, ‘আসলে কি বলতে হয় আমি জানি না। তাই ভাবছি চুপচাপ থাকাই শ্রেয়।’ মেয়েটি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

“ছেলেরা বোকা হয় এটা জানতাম তবে আপনাকে দেখে মনে হলো এরা গাধার বৈশিষ্ট্যও কম আয়ত্ত করে না। কলম আছে?”
‘হ্যা?’
“বললাম কলম আছে?”
‘হ্যা, আছে তো, এই নিন।’

মেয়েটি কলমটা নিয়ে এক কাগজে কি যেনো লিখতে যাচ্ছিলো তখনই অন্য এক মেয়ে এসে ওকে টানতে টানতে নিয়ে গেলো। মেয়েটি ওকে বারবার বলছে একটু থাম একটু থাম। কিন্তু না ও থামছেই না। আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছি আর মেয়েটিও কেমন যেনো করুন চোখে তাকিয়ে ছিলো। ওই চোখে কি ছিলো জানিনা তবে কেনো যেনো আমাকে বারবার বলছিল, তোমাকে হারাতে চাই না। পরবর্তী সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকলাম। ততোদিনে ভুলে যেও না। এই মনটাকে তুমি চুরি করে নিয়েছো কিন্তু। তাই তোমার কাছেই রেখো। সেই দিনটার কথা আমি আজও ভুলিনি। তাইতো পারিনা তার বাধন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে। আচ্ছা! মেয়েটার ওই করুন চোখ দেখে তুই বুঝে গেলি ও কি বলছে? তাও আবার এতো কিছু? চোখ দিয়ে কিভাবে বলেছিলো তোকে যে মন চুরি করেছিস, অপেক্ষায় থাকলাম, এসব?

গতরাতে সিলেটে এসেছি সুমনের কাছে। দুজনে পরীক্ষা দিয়েছিলাম সাস্ট এ। ও কম্পিউটার ইন্জিনিয়ারিং এ চান্স পেয়ে যায়। আমার চান্স হয়নি তাই ঢাকায় একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে ইন্জিনিয়ারিং এ পড়ছি। গত চার বছরে বেশ কয়েকবার এসেছি সিলেটে। ঐ একটি আকর্ষন থেকেই। চা বাগানের মাথায় একটা ফাকা জায়গা আছে। অনেক উচুতে হওয়ায় অনেক দুর পর্যন্ত দেখা যায়। এখানেই বসে গল্প করছিলাম সুমন আর আমি। ও যখন উপরের কথাটি বললো তখন আমার হাসি পেয়েছিল। আসলেই তো, কারও চোখ দেখে কি এতো কিছু বোঝা যায়? কিন্তু এতোদিন এটা ভেবেই আমার ঠোটের কোনে মৃদু হাসির রেখা এঁকেছি। আমি ভালই আছি আমার কল্পনাতে। হঠাৎ সুমন বললো, “এসব ভুলে কি নতুন করে শুরু করা যায় না? অনেক তো হলো এবার তো এই জিবনটাকে একটু গোছানো শুরু কর। কি লাভ বলতো এই ভবঘুরে জিবনে?” ‘তুই কখনও তোর গার্লফ্রেন্ডের সাথে মুক্তভাবে নিজের অনুভুতি গুলো শেয়ার করেছিস? নাকি ওই সবার মতো শতশত নিয়মের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিস?’ “সবকিছুই একটা নিয়মের মধ্যে চলে। সম্পর্কও সেরকমি একটা জিনিস। কাছের কাউকে আগলে রাখতে হলে একটু নিয়ম তো আবশ্যক তাই না?”

‘আসলে আমার যতটুকু মনে হয় যে সম্পর্কে বিশ্বাস থাকলে নিয়মটা মেনে চলা জরুরী না। নিয়মটাই তোকে মেনে চলবে। নিয়ম মানাটা তখন বাধ্যবাধকতা মনে হবে না আর। আমার মনের মাঝে ওই মেয়েটির জন্য যে ভালবাসা আছে তা দিয়ে এই ভবঘুরে জিবনেও দিনশেষে একটা সুক্ষ্ম হাসি থাকে। ওকে হারানোর ভয় আমার মাঝে নেই জানিস। তবে খুব ভয় লাগে যদি ওকে পেয়ে যাই, আগলে রাখতে পারবো তো? আমি চাই না আর দশটা সম্পর্কের মতো আমার ভালবাসাটাও হারিয়ে যাক শতশত গল্পের ভিড়ে।’

সুমন আর আমি কেউই অনেকক্ষন কথা বললাম না৷ একটু পরে সুমন বললো, “সন্ধ্যা হতে চললো, চল, রুমে যাই৷” একটু হেসে বললাম, ‘তুই যা, আমি একটু পরেই আসছি।’ সুমন ঘাড়ে হাত রেখে একটু পরে চলে গেলো। আমি সামনে তাকিয়ে ভাবছি, সত্যি তো। আর কত এভাবে? এবার শুরু হোক নতুন কিছু। সবুজের সমারোহ মিলিয়ে গেছে দিগন্তের নীল আকাশে। মুক্ত ধ্বনি যুগল ছড়িয়ে পড়লো এই সবুজের বুকে, একদিন হয়তো তোমার জন্য আমার অনুভুতিগুলো হারিয়ে যাবে, একদিন হয়তো নিজের কাছেই হেরে যাবো তবে সেদিন হবে শেষ হেরে যাওয়া। দেখতে এসো এই সবুজের সমারোহে, আমার নিধর দেহটি অপেক্ষায় থাকবে।

সেবার সিলেট থেকে চলে আসার পর আর যাওয়া হয় নি। মাঝেই কেটে গেছে তিনটি বছর৷ সময় পাল্টেছে৷ পাল্টেছে সময়ের যুগোপযোগী মানুষগুলো। আরও পাল্টেছে নিজের মাঝের অগোছালো ভবঘুরে সময় গুলো৷ শুধু হারিয়ে ফেলেছি নিজের একান্তে বাস করা অনুভুতি গুলো।

আমিও থেমে নেই। ভার্সিটি থেকে বেরিয়েই ছোট একটা জবে ঢুকেছিলাম। পাশাপাশি মাস্টার্স টা করে এখন একটা ভালো কোম্পানিতে জব করছি। দিনকাল কেমন যেনো ভালই যায়। টাকাই দিনশেষ মুখের হাসি ফোটায় তবে তৃপ্তি না থাকাটা আলাদা বেপার। কালরাতে বান্দরবান যাচ্ছি। সেদিন বিকেলে সুমন ফোন করে বললো, ওরা একটা টিম করে বান্দরবান যাচ্ছে। আমাকেও যেতে হবে। সুমনও পরবর্তিতে ভার্সিটির লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছে। আমিও সাপ্তাহিক ছুটিগুলো কাজে লাগানোর জন্য আর মানা করিনি। ঘুরতে তো ভালই লাগে তো যাওয়া যাক।

ব্যাগ গুছিয়ে ঠিক করা জায়গায় আসলাম। একে ওপরের সাথে ওরা খুব ভালই পরিচিত বুঝতে পারলাম। আমার আবার এসবে সমস্যা নেই। আমি একা ঘুরতেও সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। সুমনের সাথে কথাবার্তা বলে গাড়িতে উঠলাম। একে একে সবাই উঠলে সবশেষে এক মেয়ে উঠলো। কেমন যেনো পরিচিত মনে হলো তবে সেভাবে চিনতে পারলাম না। কানে এয়ারফোন লাগিয়ে, প্লে লিস্ট থেকে গান ছেড়ে দিয়ে চলে গেলাম অচেনা শহরে৷ যেই শহরের প্রতি মুহুর্তের বাতাসে আমার গা শিহরিত হয়।

সকাল হতেই পৌছে গেলাম। আমাদের ক্যাম্প করে থাকতে হবে৷ একটু রেস্ট নিয়েই শুরু করতে হবে খাড়া পাহাড় ভ্রমন। আমার এসবে ক্লান্তি নেই। একটু ফ্রেশ হয়ে পাউরুটি হাতে নিয়ে খেতে খেতে একটু সাইডে গেলাম। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধোরালাম। সিগারেটের ধোঁয়া সবসময় ছোড়ানো হয় না তবে কিছু মুহুর্তে ভাল লাগে। এদিক ওদিক তাকাতেই দেখলাম সুমন আর ওই সবার শেষে বাসে ওঠা মেয়েটা আমার দিকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে কি যেনো কথা বলছে৷ ওকে দেখে কারো কথা মনে পড়ছে৷ জানিনা তবে সত্যি কারও কথা মনে পড়ছে।

পাহাড়ে উঠতে সবাই মোটামুটি ক্লান্ত। আরও অনেকটা উঠতে হবে। সবার অবশ্য পাহাড়ে ওঠার ইচ্ছেও কম নয়। পাহাড়ে উঠতে আরও ঘন্টাখানেকের মতো লেগে গেলো। কিন্তু উপরে উঠেই পাহাড়ে ওঠার কষ্টটা একেবারেই ভুলে গেলাম। প্রকৃতি কি আসলেই এতটা রুপে সজ্যিত হতে পারে? একটু পরেই পাশে ওই মেয়েটা আসলো। অনেকটা হাপাচ্ছে বলা যায়। আমি ভদ্রতার খাতিরে পানির বোতলটা বাড়িয়ে দিতেই মেয়েটা বোতল নিয়ে ঢকঢক ঢকঢক করে পানি খেতে লাগলো৷ আমি উনার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে সামনে গেলাম। সত্যি কেমন যেনো কামনা ভর করে পাহাড়ের চুড়ার কিনারায় গেলে। বারবার মনে হচ্ছিলো মিলিয়ে যাই এই সৌন্দর্যের মাঝে। পাশে মেয়েটা কখন এসে দাড়িয়েছে জানি না। হঠাৎ উনি বললেন, “আর সামনে এগোবেন না।”

আমি উনার দিকে তাকালাম। উনি আমার দিকে না তাকিয়ে সামনে জোরে আওয়াজ করলেন৷ খুব অল্প হলেও একটু প্রতিধ্বনি শোনা গেলো। আবারও করলেন। এবার আমার দিকে তাকালেন। কি যে হলো জানি না তবে পরেরবার আমিও উনার সাথে অনেক জোরে আওয়াজ করলাম। এতোটা ভালে লাগতে পারে ভাবিনি। অথচ উনাকে আমি এখন পর্যন্ত চিনিও না। অনেকটা সাচ্ছন্দ্য নিয়ে পানির বোতলটা আমায় এগিয়ে দিয়ে মেয়েটি চলে গেলো৷

রাতে খাওয়ার মেনু ঠিক হলো মুরগির কাবাব আর সালাদ। মুরগি গুলো আগুনে মসলা দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে৷ একপাশে গিটার নিয়ে বসেছে একদল লোক। আরেকপাশে ওই মেয়েটি আরও কয়েকজন মেয়েকে নিয়ে শসা কাটতে বসেছে৷ সুমনকে দেখছি সবদিকেই দৌড়াদৌড়ি করছে। আর আমি পরিবেশটাকে উপভোগ করছি। এর মাঝে ওই মেয়েটির দিকে তাকাতেই দেখলাম মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ তার হাতে চাকু। আমার কিছু একটা মনে পরে গেলো। চলে গেলাম সাতবছর পেছনে। বসা থেকে দাড়িয়ে গেছি। মেয়েটিও কেমন চমকে গেছে৷ হ্যা, এতো আমার সে। আমার অপেক্ষার সেই নৌকা। আমার? আমার কেনো বললাম? আচ্ছা মেয়েটা কি চিনতে পেরেছে আমায়? থাকতে না পেরে সুমনের কাছে গেলাম। বললাম,

‘ওই মেয়েটিকে চিনিস?’
“হ্যা চিনি তো, ওর নাম নিশি। ভার্সিটির লেকচারার। কিছুদিন আগেই যোগ দিয়েছে। কেনো বলতো?”
‘শাহজালাল ভার্সিটিতেই?’
“হ্যা, কেনো বলনা? বলেই মুচকি মুচকি হাসছে।।”

ওকে অনেক কিছু বলতে চেয়েও পারছি না। কিছু না বলেই আমি চলে আসি এদিকে। হঠাৎ আবারও নিজের অনুভুতি গুলো ভিড় জমাতে শুরু করেছে। কেনো, কেনো, কেনো? আমি তো গুছিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে৷ তবে আবার কেনো? তারপর ভাবলাম, উনি হয়তো আমাকে চেনেনি তাই সাত বছর আগের আবেগকে এখন প্রশ্রয় দেওয়াটা বোকামি ছাড়া কিচ্ছু না। তবে আজ ভাবতে ভালো লাগবে রাতের অন্ধকারে।

সিগারেটের ধোয়া ছড়িয়ে গাছে হেলান দিয়ে বসে আছি। চারদিকে জোছনা সহ অনেকটা অন্ধকারও আছে। মেঘ গুলো ভেসে চলেছে পাহাড়ের গা বেয়ে। দুরে কোথাও একটা হ্যারিকেনের আলোর মত দেখা যাচ্ছে। হয়তো একটা ছোট্ট নদীতে এই হ্যারিকেনের আলো নিয়ে অনেকটা দুর পাড়ি দিয়ে ফেলতাম। খুব মনে পড়ছে ‘ববি বারে’ এর ‘ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস’ গানটি। তবে একলা থাকার মজাই হলো এমন কিছু উপভোগ করা যা সবার অগোচরে ঘটে। সবাই ঘুমিয়ে গেছে অথচ ওরা জানবেও না এই পাহাড়ের সৌন্দর্য রাতেও অমায়িক।

রাত প্রায় আড়াইটা হবে। মোবাইলের টর্চ জালিয়ে হঠাৎ কে যেনো আমার পাশে বসলো। তাকিয়ে দেখলাম নিশি। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে এই মেয়েটার নামটাও এতোদিন ধরে জানতাম না। উনাকে দেখে বললাম, আরে আপনি এতো রাতে? উনি কিছু না বলেই একটা প্লেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। দেখলাম, মুরগির কাবাব আর সালাদ রয়েছে। যেহেতু নিশি আমাকে চেনে না তাই ভদ্রতার জন্য বললাম, আরে আপনি এতো রাতে আবার এসব কষ্ট করলেন কেনো? নিশি আমার দিকে তাকালো। অন্ধকারে কেনো যেনো এটুকু মনে হলো যে ও আমার দিকে অনেকটা অভিমান নিয়ে তাকিয়েছে। হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে সামনে তাকালাম। শুনশান নীরবতা বয়ে চলেছে৷ হঠাৎ উনি বললেন, “চিনতে পেরেও কথা বললেন না যে?” কথাটা শুনেই আমার শরীর কেমন যেনো হালকা হয়ে গেলো। মেয়ে তো দেখি আমাকেও চিনতে পেরেছে৷ একটু পরে বললাম, ‘চিনতে পারাটা মুখ্য বিষয় নয়। সময় অনেক দুর এগিয়েছে। তাই পুরনো কথা ভাবতে ভয় লাগে এখন।’ “কেমন আছেন জানতে পারি?” ‘নিজের অধিকার কাউকে চেয়ে নিতে অনেকদিন পর দেখলাম। তবুও বলছি, ভালো আছি কিনা এটা নিয়ে ভেবে দেখিনি তবে নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছি। আপনি কেমন আছেন?’

“হাহাহা৷ আমি? আছি ভালোই আছি। আমি ভাবতে পারিনি কেউ আমার জন্য এভাবে অপেক্ষা করবে?” ‘আপনি ভুল ভেবেছেন৷ কেউই আপনার জন্য অপেক্ষা করে নি।’ “সুমন সাহেব আমাকে সবটাই বলেছে। উনি ফেসবুকে রিকুয়েষ্ট পাঠালে উনার প্রোফাইলে ঢুকে আপনার সাথে ছবি দেখি। কতোটা খুশি হয়েছিলাম বলার বাহিরে৷ তখনই উনার সাথে যোগাযোগ করি। উনাকে আমি সবটা বললেই উনিও আমাকে আপনার বেপারে সবটা বলে। তাই আমি জানি কেউ একজন অপেক্ষা করছে আমার জন্য।” ‘সবি যখন জানেন তখন আর একটু জেনে নিন যে আপনার জন্য অপেক্ষা করা কেউ তিন বছর আগে থেকেই ছেড়ে দিয়েছে। এখন জিবন অন্যরকম।’ “হাহাহা। হাসালেন আপনি। আপনি কি জানেন না মেয়েরা চোখের ভাষা পড়তে জানে?” ‘জানি, আর এজন্যই আমি চশমা পরি।’

“কিন্তু যখন আমি আপনার চোখ পড়ছিলাম তখন আপনি বসা থেকে উঠে দাড়িয়েছেন। আপনার মনে আমার জন্য পুরনো অনুভতিগুলো আবারও জেগে উঠেছে। খুব করে দমানোর চেষ্টা করছিলেন এটাও বুঝতে পেরেছি। কিন্তু কেনো?” ‘কেনো আবারও পুরনো কথায় আমায় জড়াচ্ছেন? আবেগকে প্রশ্রয় দিয়ে কি লাভ বলুন তো?’ “খুবি দুঃখিত তোমাকে আপনি করে বলতে পারছি না। এবার আসল কথা। মানলাম তোমার বুকে অনেক অভিমান যেটার জন্য প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে আমিই দায়ী। তবে একবার অভিমান কে সরিয়ে আমায় দেখো। কথা দিচ্ছি, আবেগ মনে হলে নিজে থেকেই সরে যাবো।” আমি কিছু বলতে পারলাম না এটা শুনে। নিশি আবারও বললো, “সেবার আমারও চান্স হয় নি সিলেটে৷ ঢাকায় এসে পড়াশুনা করি।

গ্রাজুয়েশন শেষ করে মাস্টার্স এর জন্য বাইরে যাই। এর মাঝে অনেকবার চেষ্টা করেছি সিলেট আসার কিন্তু ওই যে বাবা মা প্রয়োজন ছাড়া কোথাও যেতে দিতেন না। মাস্টার্স টা অনেক রাগ করেই বাইরে করি। দেশে এসে একটা প্রাইভেট ভার্সিটি তে শিক্ষকতা শুরু করি। তারপর এখানে শিক্ষকের জন্য আবেদন করলে অনেক কিছুর পর জয়েন করি। ভেবেছি আমার অপেক্ষাটা নাহয় এখন থেকেই প্রখর হোক। এতোদিনে মনে হতো কেউ হয়তো আমার অপেক্ষায় আছে। সত্যিটা জানতে পেরে আফসোসের থেকে বেশি ভালো লেগেছে। তারপর তো কলিগ সুমন সাহেবের সাথে পরিচয় হলো। তাই তোমাকে পেয়ে আর হারাতে চাই না।“ আমি চুপচাপ শুনছিলাম সবকিছু। হঠাৎ নিশি আমার হাত ধরলো। বললো, “কিছু বলবে না? নাকি এখনও গাধার মতই রয়ে গেছো?” আমি হাসলাম। কেমন যেনো একটু সুখ অনুভুত হচ্ছে। অভিমানের পাহাড়টাও কমে এসেছে উচ্চতায়। বললাম,
‘গাধা হলে কি হাতটা ছেড়ে দিবে?

হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বললো, “তোমার বন্ধু সুমনকে একটা ধন্যবাদ দিও। এই ট্যুরটা শুধুই উনি আমাদের জন্য দিয়েছে। আর হ্যা, আমার গাধাই পছন্দ।” ‘আমি হাসলাম। বললাম, ও আসলে সবটা জানতো। তাই আরকি।’ “তো সিলেটে ওই চা বাগানের উপরের টিলায় বসে আমার জন্য যেই ভালবাসা ছিলো, সেটা কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব মামুন সাহেব?” ‘পুরনো অনুভুতি গুলো কি বেশি জরুরী?’ হ্যা, ওগুলো অনেক খাঁটি।” ‘কিন্তু আমার যে ভয় হয় যদি আবার হারিয়ে ফেলি তোমায়?’ “তবে এবার আমি বলছি, এই রুপের বৈচিত্রে সময়ের অগোচরেই খুজে নেবো তোমায়। অপেক্ষার মৃদু আশা নিয়ে নয়, ভালবাসার গহীন বৃত্তান্ত থেকে।”

সময় অনেক পেরিয়েছে। ভোর হতে চললো বলে। মেঘগুলো অনেকটাই দেখা যাচ্ছে। সামনে এখনো ওই হ্যারিকেনের আলো। নিশি আমার বাহু জড়িয়ে সামনে চেয়ে আছে৷ আর আমি চেয়ে আছি নিজের স্বস্তিকে পাশে আঁকড়ে ধরে। পেয়েছি তাকে, যাকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছি। সামনে প্রতিক্ষিত কিছু খুনসুটির বেড়াজালে আবদ্ধ হওয়াটাই এখন দুটি মানুষের লক্ষ্য। খনিক বাদেই নিশির মুখে গুনগুন করে শোনা যাচ্ছে,

If you missed the train I’m on
You will know that I am gone
You can hear the whistle blow a hundred miles
A hundred miles, a hundred miles
A hundred miles, a hundred miles
You can hear the whistle blow a hundred miles

Lord, I’m one, Lord, I’m two
Lord, I’m three, Lord, I’m four
Lord, I’m five hundred miles away from home
Away from home, away from home
Away from home, away from home
Lord, I’m five hundred miles away from home

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত