পুলিশ কন্যা

পুলিশ কন্যা

আপনি আজকেও এসেছেন? সুপ্তি বেশ বিরক্তি ভাব নিয়েই কথাটি বললো।কিন্তু আমি সেদিকে তাল দিলাম না।সুপ্তির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম,

-অফিস তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেলো,তাই ভাবলাম আপনার সাথে দেখা করেই যাই। আমার কথায় সুপ্তি কিছু বললো না।হয়তো ও বুঝে গিয়েছে আমাকে বলে কিছু লাভও হবে না।আমি সুপ্তির দিকে তাকিয়ে দেখি এতক্ষনে ওর মুখের রাগি আভাটা অনেকটাই কমে এসেছে। আমি কিছু বলার আগেই সুপ্তি বললো,

-ভেতরে আসুন।এখানকার অবস্থা খুব একটা ভাল না।

সুপ্তির কথায় আমি মাথা নাড়িয়ে ওর পেছন পেছন ওর রুমে গিয়ে বসলাম। বাস চাপায় কলেজ শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার প্রতিবাদে বেশ কঠোর আন্দোলন হচ্ছে।গাড়ি থাকলে লাইসেন্স নেই,লাইসেন্স থাকলে গাড়ি ফিটনেস বিহিন।আবার গাড়ি ঠিক থাকলেও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না।এর প্রতিবাদে আস্তে আস্তে ছাত্র আন্দোলন বেশ প্রখর হচ্ছে।এদিকে মারা যাওয়া তিনজনের বিচারের জন্যে তো আন্দোলন হচ্ছেই।

অফিস থেকে আজ বেশ তাড়াতাড়িই বের হয়েছি।শুনেছি ছাত্ররা বেশ জোর দিয়েই আন্দোলনে নেমে পড়েছে।সহপাঠী হারানোর বেদনা যে হারিয়েছে সেই বোঝে কেমন লাগে।ছাত্রদের সাথে একটু জোগ দিতেই অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হওয়া। আমি অফিস থেকে বের হয়ে আর রিক্সা নিলাম না।আন্দোলন এই সামনেই হচ্ছে।অফিস থেকে হেটে যেতে মিনিট পাচেক লাগবে।রাস্তায় এমনিতেই গাড়ি দেখা যাচ্ছে না।পুরো রাস্তাটাই ব্লক করে রেখেছে। বাঘের বাচ্চা সবগুলা।এভাবে যদি আর কিছুদিন আগে গর্জে উঠতো তাহলে দেশটার এমন হাল হতো না।

বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষ মারছে,আবার এটা বলতে গেলে উলটো তারাই আবার মারতে আসছে।এভাবে আর কত। বের হয়েছে ছাত্র,ছাত্রিরা।এবার ঠেকাও এদের,বোঝ ঠেলা। আমি একটু এগিয়েই যেতেই দেখি বেশ কিছু ছাত্র স্লোগান দিচ্ছে আর সবাই রাস্তা ব্লক করে শুনছে।মাঝে মাঝে আবার মানুষের জটলাও দেখা যাচ্ছে।এই ছোট ছোট বাচ্চাদের এমন একতা,সাহসী মনোভাব দেখে বুকটা কেমন যেন শান্তিতে ভরে উঠলো।বেশ ভাল লাগছে।কোই ছিল এরা এতদিন। আমি পেছনের দিকটাতে গিয়ে পিচের রাস্তায় বসে পড়লাম।এত শান্তি আমি কোনদিনও পাইনি যতটা না আজ পাচ্ছি।গর্ব হচ্ছে এদের নিয়ে।

বেশ কিছুক্ষন বসে থেকে গরমে আর টিকতে পারছিলাম না।একদম ঘেমে গেছি বলতে গেলে।অবশ্য রোদটাও খুব একটা নেই।তবুও কেমন যেন গরম।আমি উঠে পাশের দোকান থেকে এক বোতল পানি নিয়ে মুখটা ধুতেই সামনে দিকে আমার চোখটা আটকে গেলো। মেয়েটা দেখতে বেশ।তার উপর পুলিশের ড্রেসে আরও সুন্দর লাগছে।মনে হচ্ছে খুব পানির পিপাসা পেয়েছে।আমার মত উনিও ঘেমে গেছেন।মেয়েটার মুখের উপর বিন্দু বিন্দু ঘামগুলা যেন মুক্তর মত ফুটে উঠেছে।বারবার ঘাম মোছার বৃথা চেষ্টা করছে। আমি পানির বোতলটা নিয়ে মেয়েটার দিকে আগালাম।পুলিশ দেখলে কেমন যেন ভয় পাই কিন্তু আজ কেমন যেন সাহস পাচ্ছি।মনে হচ্ছে টানছে আমাকে।আমি ওনার সামনে গিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে ওনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম,

-বেশ ঘেমে গেছেন,ধরুন পানিটা দিয়ে মুখ ধুয়ে এটা দিয়ে মুছে নিন।ভাল লাগবে।

আমার কথায় মেয়েটা আমার দিকে কেমন করে যেন তাকালো।তাছাড়া এইটা আমি কি বললাম।আমার কথায় ওনার পাশে বসা পুলিশ মেয়েটাও মিটিমিটি হাসছে।আমার সাহস নিমিশেই নাই হয়ে গেলো।এখন যদি আমাকে ধরে নিয়ে যায়। আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটা আমার হাত থেকে পানির বোতলটা নিয়ে মুখে পানি ছিটাতেই বেশ ভাললাগা কাজ করলো।এত সুন্দর একটা মেয়ে,কোথায় ভাল একটা ছেলে দেখে বিয়ে করে নেবে,নইলে ডাক্তার হবে।কিন্তু এই পুলিশের চাকরি কিসের জন্যে নিল বুঝলাম না।রোদে কালো হয়ে যাবে তো। আমি ওনার দিকে তাকাতেই ইশারায় রুমালটা দিতে বললো।বাহ মেয়েটা দেখি ইশারায় ও কথা বলে।আমি রুমালটা এগিয়ে দিতেই মেয়েটা বললো,

-আপনার সাহস আছে বলতে হয়।
-ছিল না,আপনাকে দেখে বেড়ে গেছে।
-কি?
-না মানে,কিছুনা।
-দেখে তো মনে হচ্ছে জব করেন।
-হ্যা,এদিকটায় আমার অফিস।
-তো এখানে কি করছেন,জায়গাটা সেইফ না,যান বাসায় চলে যান।
-হ্যা যাব।আপনার নামটা?
-সুপ্তি।
-সুপ্তি।বাহ সুন্দর নাম।ঠিক আপনার মত।

কথাটি বলে আর আমি দাড়ালাম না।হাটা দিলাম।পেছনে তাকানোর মত সাহসটা আর পেলাম না।তবে আমি যে ওই পুলিশ কন্যার মায়ায় পড়ে গেছি এটা শিওর। আজ আমি ঘামিনি। পরেরদিন মেয়েটাকে দেখতে আবার আসলাম।অফিসে আর ভাল লাগে না।আজ যখনি আমি ওনার সামনে গিয়ে দাড়ালাম তখনি উনি কথাটি বললেন।আমি ওনার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললাম,

-আমি রুমালটা নিতে এসেছিলাম।

মেয়েটা হয়তো আমার কথায় একটু অবাকই হলো।সামান্য রুমালের জন্যে এসেছি।কিন্তু এছাড়া আমারও আর কিছু বলার ছিল না।এই উছিলায় সুপ্তিকে বেশ কাছে থেকেই দেখতে পেলাম। আমি কিছু বলার আগেই সুপ্তি আমার দিকে একটা রুমাল বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

-আপনার রুমালটা হারিয়ে ফেলেছি, আপনি বরং আমার রুমালটা নিয়ে যায়। আমি সুপ্তির হাত থেকে রুমালটা নিয়ে পকেটে রেখে বললাম,
-ধন্যবাদ।আবার আসবো।

কথাটি বলেই আমি আর দাড়ালাম না।এখন রিক্সাও পাওয়া যাবে না।তাই হেটেই যেতে হবে।আমি একটু এগুতেই পেছনে তাকিয়ে দেখি মেয়েটা অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।হয়তো বুঝতে চেষ্টা করছে,আবার আসবো বলার কারনটা।

বাসায় এসে রুমালটা বের করতেই দেখি মাঝখান বরাবর লেখা,সুপ্তি।আমি রুমালটা একবার মুখে বুলিয়ে ভাজ করে রেখে দিলাম।এটা তো রুমাল না।এটা প্রেমের রাস্তা। এরপর থেকে প্রতিদিনই অফিস শেষে সুপ্তিকে বিরক্ত করাই ছিল আমার কাজ।ভেবেছিলাম মেয়েটা বিরক্ত হয়ে হয়তো আমাকে জেলে পুরে দেবে। কিন্তু হয়েছে উল্টোটা। ছাত্র আন্দোলনের জন্যে ওদের ক্যাম্পটা এখানেই করা হয়েছে।শুনলাম এক মন্ত্রির গাড়ি ও নাকি আটকে দিয়েছিল বাচ্চারা শুধু মাত্র উলটো পথে ঢোকার জন্যে।এমনকি পুলিশের গাড়িও আটকে দিয়েছিল লাইসেন্স না থাকার কারনে।সাহস আছে বলতে হয়।বলতে গেলে এদের পুরো শরীরটাই কলিজা। দেশ রক্ষায় এরাই একদিন বড় ভূমিকা পালন করবে। সুপ্তির সাথে বেশ ফ্রি হয়ে গেছি এই অল্পকিছু সময়েই।মেয়েটার সাথে বসে চা খেতে বেশ ভালই লাগে।কিন্তু আজ এসে সুপ্তিকে না দেখতে পেয়ে ওর পাশে থাকা মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন,

-ওর আজ ডিউটি অন্য জায়গায়।আজ আসেনি।

মেয়েটার কথা শুনে মনটা একটু খারাপই হলো।তারমানে আজ আর দেখা হচ্ছে না।কিন্তু কাল যে এখানে ডিউটি পড়বে তারও কোন গেরান্টি নেই।আমি বেশ কিছুক্ষন বসে রইলাম।যদি আসে।কিন্তু আসলো না। আজ সকাল থেকেই আকাশে মেঘ করেছে।এদিকে সুপ্তিকে না দেখতে পেয়ে মনটাও বেশ খারাপ।অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না।তবুও কেন যেন যেতেই হলো।ভাল লাগছে না। অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়িই বের হলাম।সুপ্তি কি আজও আসবেনা। আপনি আজকেও এসেছেন? আজ যেতেই দেখি সুপ্তি সেই আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে।আমি ওর সামনে যেতেই সুপ্তি বেশ বিরক্তি ভাব নিয়েই কথাটি বললো।কিন্তু আমি সেদিকে তাল দিলাম না।সুপ্তির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম,

-অফিস তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেলো,তাই ভাবলাম আপনার সাথে দেখা করেই যাই।

আমার কথায় সুপ্তি কিছু বললো না।হয়তো ও বুঝে গিয়েছে আমাকে বলে কিছু লাভও হবে না।আমি সুপ্তির দিকে তাকিয়ে দেখি এতক্ষনে ওর মুখের রাগি আভাটা অনেকটাই কমে এসেছে। আমি কিছু বলার আগেই সুপ্তি বললো,

-ভেতরে আসুন।এখানকার অবস্থা খুব একটা ভাল না। সুপ্তির কথায় আমি মাথা নাড়িয়ে ওর পেছন পেছন ওর রুমে গিয়ে বসলাম। আমি চেয়ারে বসতে বসতে বললাম,

-কাল কোথায় ছিলেন?
-কালও এসেছিলেন?
-হ্যা,আপনাকে না দেখে থাকতে পারিনা।
-তো কাল থাকলেন কিভাবে?
-সারারাত ঘুম হয়নি। আমার কথায় সুপ্তি মুচকি হেসে ওর পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

-দেখো তো চিনতে পারো কি না।
-হ্যা,এটা তো আমার রুমাল।তুমি বলেছিলে হারিয়ে গেছে।
-হারায় নি।মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম রুমালটার।তাই মিথ্যে বলে আমার কাছে রেখে আমারটা তোমাকে দিয়েছিলাম।
-শুধু রুমালটার মায়ায় পড়েছিলে নাকি মানুষটারও?

আমার কথায় সুপ্তি কিছু বললো না। এদিকে দুজন আপনি থেকে কখন যে তুমিতে নেমে এসেছি সেটা বুঝতেই পারিন।সুপ্তি একটু চুপ থেকে বললো,

-কাল ইচ্ছে করেই আমি অন্য জায়গায় ডিউটি করেছি।
-কেন?
-দেখলাম তোমার মায়াটা কাটাতে পারি কিনা,ভুলে থাকতে পারি কিনা।
-তো কি বুঝলে?ভুলে থাকতে পেরেছো? আমার কথায় সুপ্তি আমার দিকে চেপে বসে আমার হাতটা ধরে বললো,
-থাকতে পারিনি বলেই তো আবার ফিরে এসেছি।
-রিভালবারে আমি খুব ভয় পাই।
-এটা তো শুধু ডিউটিতে,ঘরে তো তুমিই সব। কথাটি বলেই মেয়েটা আমার বুকে মুখ লুকালো।এদিকে আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম।কাল একটা পোষ্ট দিয়েছিলাম,
-পুলিশ কোন চ্যাটের বাল।

আমি ফোনটা বের করে দ্রুত পোষ্টটা কেটে দিলাম।এই মেয়ে দেখলে কি যে হতো।একদম ঘুষি মেরে দাত ভেঙে দিত।সুপ্তিকে পেয়ে যতটা না শান্তি পাচ্ছি তার চেয়ে বেশী শান্তি পাচ্ছি পোষ্টটা ডিলেট করে।তবে এরচেয়েও একটা ভাল খবর আছে।মেয়েটা বেশ ভাল বিরিয়ানি রান্না করতে পারে।আজ বেশ চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে,
আমি পেলাম, অবশেষে বিরিয়াপ্তিকেই পেলাম।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত