বৃষ্টির রঙ লাল

বৃষ্টির রঙ লাল

— আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি অরন্য। প্লীজ আমাকে একটা সুযোগ দাও। তোমাকে মন ভরে ভালবাসতে চাই।

— তোমার মত বুদ্ধিমতী একটা মেয়ের এমন পাগলামী মানায় না তানিজিয়া। আমার সাথে জড়িয়ে পড়লে নিজেকে আর ছাড়াতে পারবে না। পরে আফসোস করবে।

— আমি নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে চাই তোমার সাথে। আমাকে একটা সুযোগ দেয়া যায় না?

— একটু পর বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টিতে ভিজলে তোমার জ্বর হয়। তাই এখনি রিক্সা নিয়ে যদি রওনা হও তাহলে বৃষ্টির আগেই বাসায় পৌছাতে পারবে।

কথা শেষ করে অরন্য উঠে চলে যায় তানজিয়ার পাশ থেকে। তানজিয়া ঠায় বসে থাকে। তার চারপাশের সবকিছুই কেমন যেন খাপছাড়া মনে হচ্ছে। আকাশের দিকে তাকায় সে। আকাশে পূর্ণতেজে সূর্য তার রাগ পৃথিবী নামক গ্রহের উপর ঢেলে দিচ্ছে। কিন্তু অরন্য বলে গেল একটু পর নাকি বৃষ্টি হবে। মানুষটা কেন তানজিয়াকে কাছে টেনে নিচ্ছে না তা তানজিয়া বুঝতে পারে না। অরন্য নামের মানুষটাকে ছাড়া তানজিয়া যে এক মূহুর্ত থাকতে পারবে না। ঘন্টাখানেক একই জায়গায় বসে থাকার পর তানজিয়া উঠে দাঁড়ায়। তখনই হঠাৎ চারদিক মূহুর্তের মধ্যেই অন্ধকার হয়ে আসে। আকাশে শুরু হয় মেঘের গর্জন। তানজিয়া অবাক হয় কিছুটা। মাত্রই তো রোদ ছিল চারদিকে। হঠাৎ এমন অন্ধকার হয় কিভাবে চারপাশ?

এসব ভাবতে ভাবতেই তানজিয়া একটা রিক্সা খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু আশেপাশে কোন রিক্সা না থাকায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে সে। তখনই আকাশে জমে থাকা মেঘগুলো বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটার আকারে মাটিতে আছড়ে পড়তে শুরু করলো। বৃষ্টিতে ভিজলে তানজিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়। তাই ডাক্তার বলেছে তার বৃষ্টিতে ভেজা সম্পূর্ণ নিষেধ। এসব ভেবে তানজিয়া পেছন দিকে ঘুরে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে যেইনা দৌড় দিবে তখনই সে কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে থমকে যায়। যার সাথে সে ধাক্কা খেয়েছে সে আর কেউ না, অরন্য নিজেই। তার মাথার উপর বড়সড় একটা ছাতা।

— বলেছিলাম না বৃষ্টি আসবে? আমার কথা কি বুঝতে পারোনি তখন? নাকি আমি হিব্রু ভাষায় কথা বলেছিলাম তখন? এতটা কেয়ারলেস কেন তুমি?

কথাগুলো বলে অরন্য চুপ করে চারপাশে পিটপিট করে তাকালো। তারপর তানজিয়ার একটা হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো কোথাও। প্রথমবার অরন্যের স্পর্শ পেল তানজিয়া। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে অরন্যের দিকে তাকিয়ে তার পদাঙ্ক অনুসরন করে সে চলতে শুরু করলো। রাস্তা পার হয়ে রাস্তার পাশের বেঞ্চটায় গিয়ে বসলো দুজনে। অরণ্য তানজিয়ার মাথায় ছাতা ধরে আছে আর তানজিয়া অরণ্যের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক।

— ওইযে সামনে বাদামওয়ালাকে দেখতে পাচ্ছো? একটু পর একটা মেয়ে বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনবে।

মেয়েটার শখ জেগেছে বৃষ্টিতে ভিজে বাদাম খাওয়ার। কিন্তু সে শখ পূরণ করতে পারবে না। কারণ বাদাম কিনে হাতে নেয়ার সাথে সাথেই একটা বাস নিয়ন্ত্রন হারিয়ে সোজা মেয়েটার উপর উঠে যাবে। তানজিয়া হঠাৎ চমকে গিয়ে তাকায় অরণ্যের দিকে। অরণ্যের চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে আসলে অরণ্য কি বলতে চাইছে। তারপর কৌতুহলবশত চা দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বাদামওয়ালার দিকে তাকিয়ে রইলো।

কয়েকমূহুর্ত পরই একটা মেয়ে এলো বাদামওয়ালার কাছে। মেয়েটাকে দেখেই তানজিয়া চমকে উঠলো। আরে এই মেয়েটাকে তো তানজিয়া চেনে। ওদেরই ডিপার্টমেন্টে পড়ে। তানজিয়া আবার তাকায় অরণ্যের দিকে। অরণ্যের চোখমুখ ভাবলেশহীন। তানজিয়া চোখ ফেরায় বাদামওয়ালার দিকে। মেয়েটার হাতে বাদামওয়ালা বাদামের প্যাকেটটা তুলে দিল। মেয়েটা টাকা দিয়ে মাত্রই ঘুরে দাঁড়ালো। তখনই কোথাথেকে একটা বাস সোজা উঠে গেল ফুটপাতে। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা মূহুর্তেই থেঁতলে গেল। তানজিয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।

— আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাই তানজিয়া। সামনে কি হতে যাচ্ছে তা প্রকৃতি আমায় বলে দেয়। আমার আশেপাশে কি হতে চলেছে আমি তা আগেই বলে দিতে পারি। কে কার স্বামীর সাথে চিট করবে , কে কার স্ত্রীকে ধোঁকা দিবে, কে কাকে খুন করে ফেলার প্ল্যান করছে সবই আমি বলতে পারি। অরণ্যের কথা শুনে তানজিয়া কি বলবে ভেবে পায়না। তাদের সামনে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। বাস চালক বাস রেখে দৌড়ে পালিয়েছে। বাসের ভেতরের যাত্রীদেরকে বের করে আনা হচ্ছে। তারা এখনো ঠায় বসে আছে সেখানে।

— কি বলছো এসব অরণ্য? আমাকে ভালবাসার সু্যোগ দিতে হবে না। তবুও আমাকে এসব বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করো না।

— ঠিক তিনমিনিটের মাথায় খুব জোরে মেঘের গর্জন শোনা যাবে। আমাদের ডানপাশের ওই যে ট্রান্সফরমারটা দেখছো ওটা মেঘের গর্জনের পরপরই ব্লাস্ট হবে। ছোটখাটো ব্লাস্ট, কারো কোন ক্ষতি হবে না।

অরণ্যের কথায় এবার একটু ঘাবড়ে গেল তানজিয়া। সাথে সাথে ঘড়ির দিকে তাকালো। যদি সত্যি হয় অরণ্যের কথা তাহলে? কি হবে তা ভেবে পায়না তানজিয়া। ঠিক তিন মিনিটের মাথায় খুব জোরে মেঘের গর্জন শোনা গেল। আর তার পরপরই তাদের ডানপাশে একটু দূরে অবস্থিত ট্রান্সফরমারটা হালকা শব্দে ব্লাস্ট হয়। চারপাশে আগুনের ফুলকি ঝরে পড়ে। তানজিয়া বিস্ফোরিত চোখে তাকায় অরণ্যের দিকে। অরণ্য তানজিয়ার হাত ধরে বলে,

— তুমি কখন কোথায় যাবে, কখন কি করবে তা আগে থেকেই বলে দিতে পারবো আমি, সবকিছু জেনে যাবো আমি। তুমি বলো এমন একটা মানুষের সাথে নিজের জীবনটাকে জড়াতে চাইবে তুমি?

— তুমি তো মেয়েটাকে বাঁচাতে পারতে। কেন বাঁচালে না? কেন মেয়েটাকে সতর্ক করলে না তুমি?

— মেয়েটা যদি বেঁচে যেত তাহলে বাদামওয়ালা লোকটা মারা যেত। প্রকৃতি একজনের মৃত্যু চেয়েছে। একজনকে অবশ্যই মরতে হবে। মেয়েটা বাঁচলে বাদামওয়ালা মরতো, বাদামওয়ালা বাঁচলে মেয়েটা মরতো। আমার কিছু করার ছিল না।

— মেয়েটা আমার ক্লাসমেট ছিল অরণ্য। বাদামওয়ালা মরলে তো কিছু হতো না অরণ্য। মেয়েটা আমার বন্ধু ছিল।

— মেয়েটার বাবা মায়ের অারো দুইটা মেয়ে আর একটা ছেলে আছে। কিন্তু বাদামওয়ালা লোকটার ঘরে থাকা ছোট্ট ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ে আর অল্পবয়সী বউটার আর কেউ নেই। এই ইট পাথরের শহরে তারা একা হয়ে যেতো, বড্ড একা হয়ে যেত। তানজিয়ার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল ঝরতে থাকে। বৃষ্টি থেমে গেছে একটু আগে। তানজিয়া অরণ্যের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। তারপর হনহন করে হাঁটতে থাকে সামনের দিকে।

— তানজিয়া দাঁড়াও। প্লীজ তানজিয়া!

— লীভ মি এলোন অরণ্য। প্লীজ আমাকে একা থাকতে দাও। চলে যাও তুমি।

— তানজিয়া প্লীজ আমার কথাটা শোনো।

— গেট লষ্ট অরণ্য!

চিৎকার করে কথাটা বলে তানজিয়া রাস্তার অপরপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিক্সার দিকে তাকায়। তারপর রাস্তা পার হওয়ার জন্য পা বাড়ায় রাস্তার দিকে। তখনই হঠাৎ অরণ্য তানজিয়ার হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দেয়। তানজিয়া রাস্তার পাশে উবু হয়ে পড়ে যায়। তারপরই বিকট একটা শব্দ হয়।

তানজিয়া কপালে হালকা একটু আঘাত পেয়েছে। মাটি থেকে উঠে তানজিয়া রাস্তার দিকে তাকায়। একটা বাইক মাঝরাস্তায় পড়ে আছে। মাথায় হেলমেট পরা একটা লোক খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে যাচ্ছে। আর বাইকটা থেকে একটু দূরে পড়ে আছে অরণ্য। মাথার অর্ধেকটা থেঁতলে গেছে। রক্তে রাস্তা ভেসে যাচ্ছে। তানজিয়া দৌড় দিল অরন্যের দিকে। তখনই তার মনে পড়লো অরণ্যের বলা একটা কথা,

— প্রকৃতি একজনের মৃত্যু চেয়েছে। একজনকে তো অবশ্যই মরতে হবে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত