অপেক্ষার প্রহর

অপেক্ষার প্রহর

-অপেক্ষার প্রহর শেষে— না, এই গানটাও ভালো লাগছে না। আর কতক্ষণ এভাবে বসে গান শুনতে হবে। সন্ধ্যা নেমে আসছে।

পার্কের চারপাশে সাস্থ্যরক্ষার জন্য মানুষগুলো পায়চারি করছে। কত ধরণের কত চিন্তার মানুষ।

কত ছেলেই পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর দুই-একটা খারাপ মন্তব্য করছে আমাকে। কখনো এভাবে কারো অপেক্ষায় বসে থাকিনি।

তাও অপেক্ষাটা কোন ছেলের জন্য। এমন অপেক্ষার অভিজ্ঞতা এই প্রথমবার অর্জন করলাম। কোন ছেলের প্রতি বিশেষ অনুভূতি জন্ম নেয়নি।

যখন জন্মালো তখন সেটা সার্থকও হয়ে গেলো। এটা ভাগ্য নয়, সৌভাগ্য। সৌভাগ্যটা ক্ষনস্থায়ী ছিলো।

হাসিবের সাথে আমার প্রথম পরিচয়ে তার প্রতি সামান্য আগ্রহ জন্মায়। কারণ তাকে আমি অন্য ছেলেদের থেকে আলাদা আবিষ্কার করি।

হ্যাঁ তার চলাফেরা সবার মতোই ছিলো কিন্তু তবুও আমি তার মাঝে ভিন্নতা খুজে পাই। সেও হয়তো বিশেষ কোন কারণে আমার প্রতিঝুঁকে যায়।

তবে রিলেশন করার ব্যাপারে উদাসীন ছিলাম।

কারণ আপু বলেছিলো, কলেজ জীবনের আবেগপ্রবণ ভাবনা — ভালো লাগাকে ভালোবাসা বলে মনে করে।

অধিকাংশ ছেলে-মেয়ের প্রেমের সূচনা হয় এই কলেজ জীবনে। তখন নাকি আবেগে আর হরমোনের কারণে এমনটা হয়।

যেমন, বিশেষ কোন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্ম নেয়া। তাইতো সে সম্পর্কগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই ঝরে পড়ে।

আমি সেই ঝরে পড়া সম্পর্ক করতে চাইনি। কারণটা এটা ভেবেই– একটা মানুষের সাথে দীর্ঘসময় আমার সাথে সম্পর্ক থাকবে।

আমার ব্যক্তিগত অনেককিছু জানবে, আমি তারটা জানবো। আমার ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো সে জানবে, বুঝবে।

আর ভুল বেঝাবুঝির কারণে যখন সে আমায় ছেড়ে চলে যাবে তখন সাথে করে নিয়ে যাবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো।

আমি যাকে আপন ভেবে ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবো,

তার চলে যাওয়ার পর যখন আবার অন্যকেউ আসবে তখন তাকে শেয়ার করার মতো আমার ব্যক্তিগত বলে আরকিছুই থাকবে না।

তবুও হাসিবকে জানার জন্য তার পরিবেশকে জানার চেষ্টা করতাম।

হাসিবকে আমি আমার কলেজ জীবনে শুধু জেনেই গেলাম তা নয় মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে স্বপ্নও দেখতাম।

কিন্তু ভয় হতো রিলেশনের পরের বিষয় নিয়ে তাই কখনো তাকে বলিনি বা বুঝতে দেইনি।

তবুও সে কিভাবে আমার চোখের ভাষা পড়ে ফেললো জানি না।

আমায় সে প্রপোজ করে। তখন তার ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো আমি ধীরে ধীরে জানতে পারি।

ঠিক আমার যেভাবে তাকে ভালো লাগা শুরু হয়, তারও নাকি সেভাবে শুরু হয়। তার ভাবনাগুলোর সাথে আমার ভাবনার কতই না মিল।

সেদিন তাকে আমি একসেপ্ট করতাম না। ভয় ছিলো যদি সে না এসে অন্যসময় আমার জীবনে অন্যকেউ আসে।

আমি অপেক্ষা করতে পারলাম না কলেজ জীবন শেষ হওয়াপর্যন্ত। আমি জড়িয়ে গেলাম তার সাথে প্রেমের বন্ধনে। এটাকে প্রেম বললেও ভুল হবে।

প্রেমতো সেটা — ডেটে যাওয়া, প্রেমিকের বায়না পূরণ, তার যত্ন রাখা, তাকে অনুপ্রেরণা দেওয়া, তার হাসিরকারণ হওয়া।

কিন্তু আমাদের মাঝেতো এমন কিছুই ছিলো না। আমি এইচ.এস.সি পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম।

তাছাড়া, পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে তাকে কখনো ভালো মতো সময়ই দেয়া হয়নি। তবু সে কখনো অভিযোগ করেনি।

তবে আমার খেয়াল-যত্নের কোন ত্রুটি রাখতো না সে। আমি আমার বান্ধবীদের কাছে কমপক্ষে হাসতে হাসতে বলতে পারতাম

— আমার প্রেমিক মানুষ হিসেবে একজন ভালো মানুষ। অন্যসব বান্ধবীদের প্রেমিকের মতো সে বায়না করতো না, চলো দেখাকরি।

চলো ফুচকা খাই। আসলে আমার সমস্যাটা ছিলো, আমি এটা ভাবতাম– তাকেতো পেয়েই গেছি। আর চিন্তা কি!

পাওয়ার পরই আমার উদাসীনতা বেড়ে যায়। আমার অযোগ্যতা তার তার কাছে প্রমাণ পেতে থাকে। তবুও সে বলেনি, তুমি আমার অযোগ্য।

আমাকে খুব স্নেহ করতো সে। আর বিনিময়টা খুব ছোট ছিলো। সে প্রেমিক হিসেবে খাটি ছিলো, কখনো দেখা হলে বলতো না, হাতটা দিবে।

তবে তার হাতের ভাষা আমি বুঝতে পেতাম। চোখের ভাষার অস্থিরতা দেখে বুঝতে পেতাম আমার হাতে সে তার স্বর্গরাজ্য খুজে পেতে চায়।

কিন্তু আমার নিজেরই অস্থির লাগতো। আমি চাইতাম সে আমার হাতটি ধরুক।

তবুও যখন দুইজনের আঙ্গুলের ডগায় আঙ্গুল লাগতো তখনই তাকে আমি অনুভব করে নিতাম। হয়তো সেও আমাকে অনুভব করতো।

তবে হ্যাঁ আমাদের সম্পর্কে হাত ধরা শুরু হয় তখন, যখন আমাদের সম্পর্কের ২ বছর পার হয়। আমরা দুইজনই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই।

তবে সে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় আর আমি অন্য। তখন আমাদের হাত ধরারটা কিভাবে হতো?

রাস্তা পার হতে গেলে সে অনেক আড়ষ্টতা অগ্রাহ্য করে আমার হাতটা তার মুঠোয় করে নিতো।

আমি তখনই অনুভূতির অন্যভুবনে হারিয়ে যাই, তাকে অনুভব করি। আমাদের এই প্রায় তিন বছরের সম্পর্কে কখনো কোনদিন ঝঘড়া হয়নি।

কারণ ঝঘরা করার মতো কখনই কিছু ঘটেনি। আমরা দুজনই দুজনের থেকে প্রায় দূররত্বে থাকতাম।

কিন্তু তবুও কখনো আমার প্রতি তার অবহেলার রেশ মাত্র দেখিনি।

বরং অবহেলাটা আমার যখন মাস কয়েক পার হতো সে অনেক আড়ষ্টতা নিয়ে বলতো চলো দেখা করি। আর আমি তাকে শুকনো মুখে না বলতাম।

তবুও দেখা হলে আমি দেড়ি করে আসতাম। মদ্দা কথা,আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তার কাছে হাজারটা কারণ ছিলো।

অথচ বেচারা কোনদিন একটা অজুহাত পর্যন্ত করেনি।

সে ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও দিন শেষে আমায় স্মার্টফোনে একটা খুদে বার্তা পাঠাতে কখনো ভুলে যায়নি।

আজ আমার অপেক্ষার করার কারণটা আমার উদাসীনতা। সেও হয়তো কাল থেকে আমার প্রতি উদাসীনতা দোখাবে।

উদাসীনতা নয়, হয়তো সে ব্যস্ততার আড়ালে আমায় ভুলে যাবে। সে ব্যস্ত হওয়ার আগে আমি তার অবসরে তাকে যত্ন করতে পারিনি।

তাই আজ হয়তো আমার অনুশোচনায় তার সাথে দেখা করার জন্য আমিই তাকে আসতে বলি। পার্কে আমি একা।

এই পার্কটা আমাদের কলেজ জীবনের অনেক স্মৃতিই বহন করে। না জানি কত প্রেমের সূচনা হয়েছে এই ‘‘ভিক্টরিয়া পার্ক ’’-এ।

আবার কত প্রেমের ইতি ঘটেছে এই পার্কেরবুকে। হয়তো এই পার্কে যতগুলো সম্পর্ক সৃষ্টি হয় সবগুলো সম্পর্কতে কোন না কোন ঘাটতি ছিলো।

আমাদের সম্পর্কে ঘাটতিটা সৃষ্টি করেছি আমি। আমি নিজেই কখনো হাসিবের হাত ধরতে চেষ্টা করতাম। অনেক লজ্জা, আড়ষ্টতায় পারিনি।

অথচ, আজ ইচ্ছে করছে সে আসলেই তার বুকে ঝাপিয়ে পড়বো।বেলি ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে।

চোখ বন্ধ করে পিছনে তাকালাম ঘ্রাণের আগত গতিপথকে অনুভব করতে করতে। চোখের পলক খুলতেই বুকের ভিতরটা নাড়া দিয়ে উঠলো।

হাসিব এসেছে, অপেক্ষার প্রহর শেষ। আমি উঠে দাড়ালাম। এতক্ষণে পার্কে অন্ধকার নেমে এসেছে। তবুও মানুষের আনাগোনা কমেনি।

হাসিব আমার দিকে একটা বেলি ফুল হাত বাড়িয়ে দিয়ো বললো,— আমাদের বাগিচার ফুলদানির ফুল। ফুলটা আজ খুব বেশিই ঘ্রাণ ছড়াচ্ছিলো।

আমি ভাবলাম, হয়তো এই ফুলের জন্ম কারো মনে বসন্ত সৃষ্টির জন্য।— আমিতো তোমায় কিছু দিতে পারলাম না। কখনই দিতে পারিনি।

আমারঅবহেলায় তুমি অনেক কষ্ট পেতে তাই না?— না। তুমি অবহেলা করোনি। তুমি ঠিক করেছো।

আমিই সবসময় চাইতাম আমার প্রেম পবিত্র থাকুক। আমি চাইনি আমার প্রেমে নগ্নতা, যৌনতা বা দেহকেন্দ্রিক হয়।

রাস্তায় পার হওয়ার উছিলার এই কুসুম কোমল হাতটি ধরার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকতে চেয়েছি।

কারণ বাকি অনুভূতিগুলো বিয়ের পরের জন্য গচ্ছিত রাখলাম।

— এতো সুন্দর করে কথা বলা শিখলে কি করে?

— কেনো আগে বললতাম না?

— বলতে।

— সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করি আর সুন্দর করে কথা বলতে পারবো না?

— কালকে ফ্লাইট কয়টায়?

— ভোর রাতে, ৩ টার দিকে।আমার অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। এমন মহান মানুষের কাছে আমার দেয়ার মতো কিছুই নেই।

কাল সে লন্ডন চলে যাবে পড়াশোনার জন্য। এখানে তার ভর্তি বাতিল করা হয়েছে। আমিও চাই সে দেশের বাহিরে গিয়ে পড়াশোনা করুক।

একটা ভবিশ্যত গড়ুক। কিন্তু তাকে ছেড়ে থাকতে না পারার ব্যাথা কিভাবে সহ্য করবো জানি না। এতদিন কখনোএমন শূন্যতা আমাকে দাবা দেয়নি।

তার চলে যাওয়ার খবর আর নিজের হেয়ালিপনার অনুতপ্ততা কেনো আমায় এতটা উন্মাদ করে দিচ্ছি। বুকের ভীতর চাপা ব্যাথা অনুভব হচ্ছে।

ইচ্ছে করছে লাজলজ্জাভিমান ভুলে তাকে ভরিয়ে দিয়ে নিজেই মোচন করে নিই শূন্যতার ব্যাথা। কী করে বলি তাকে? সে দেখছে আমার চোখের ভাষা।

সে কি আজ বুঝতে পারছেনা কিছুই? আমি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি।এখনি তার কাঁধে মাথা রেখে আমার ঢলে পড়তে ইচ্ছে করছে।

আজ আমরা ইচ্ছেগুলো কি নিরুপায়।

হাসিব বলে উঠলো, কি ব্যাপার কিছু বলবে? আমি চুপ করে রইলাম।

সে আবার বললো, ইচ্ছেগুলো আজ মেরে ফেলো।

যেদিন বধূ বেশে আসবে আমার জীবনের নবসূচনা হয়ে, সেদিন আমার কাধে, আমার দেহে তুমি মিশে যাবে।

প্রেমকে দেহ দিয়ে অনুভব না হয় বিয়ের পরই করলাম। আকাঙক্ষাগুলো না হয় বিয়ের পরই সম্পন্ন হবে।

আমিতো এটাই চেয়েছি– আমাদের মাঝে কোন এক্সপেকটেশন থাকবেনা। থাকলে বিয়ের পর।

তখন তোমার ব্যক্তিগত আমার ব্যক্তিগত মিলে এক হয়ে যাবে।

তখন তুমি নির্ভয়ে আমায় ভালোবাসতে পারবে।সে তাহলে আমার মনের ইচ্ছেগুলো, চোখের ভাষাগুলো পড়তে পেরেছে।

এতেই আমার ব্যকুলতা কমেছে।

সত্যিই তার মতো মানুষইতো চেয়েছিলাম। এর চেয়ে বেশি গর্ব আর কি হতে পারে।

তারপর আবার সে থেমে বললো, চলো আজ না হয় রাস্তা পার হওয়া ছাড়াই তোমার সাথে খানিক হাতটি ধরে হেঁটে বেড়াই।

কাল থেকেতো আর পারবো না। আবার যেদিন ফিরি সেদিন। চলো ঘুরে আসি। শুধু আমার হাতটি তার হাতের মুঠোয় চলে গেলো না।

আমার মনটি যেন তার মনের আঙিনায় ধপাস্ করে পড়ে গেলো– এমন অনুভব করলাম।

চুপটি করে দৃষ্টি হারিয়ে তার হাতে ধরে দেখানো পথে হাটছি।

জানি না কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তবে জানি সে আমায় রাতের আধারেও আলোর পথে নিয়ে যাচ্ছে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত