স্বচ্ছজল

স্বচ্ছজল

বিছানার চারপাশ জুড়ে সজ্জিত ফুলেরা খেলছে। আজই দীপ্তির বিয়ে হয়েছে। একপক্ষের গ্লানি মুছে এইপক্ষের প্রাপ্তির কথা ভাবতে ভাবতে একটু আগে দীপ্তির চোখ বেঁধে এসেছিল। দুঃখ ব্যতীত এই জীবনে কিছুই নেই। কিংবদন্তিরা এই দুঃখেই সুখ খুঁজে ফিরে। যা-ই হোক দেখে নেবে, এমন এক ডোন্ট কেয়ার ভাবে দীপ্তির মুখ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। তার এখনের ঘুমটা অনেকটাই ভিন্ন। কেমন সুখ-দুঃখ মিশ্রিত এই ঘুম! একদিকে আগের জীবনের পীড়া ফেলে আসার সুখ, অপরদিকে তার চেয়ে বছর বারো বড় এক ছেলের সাথে সংসার করতে হবে। দীপ্তি কিনা তার চেয়ে বছর দুয়েক বড় ছেলেদের সাথে কথা বলতেও সংকোচ করত। পায়ে হঠাৎ কারো হাতের ছোঁয়া পেয়ে শিউরে উঠল সে। স্বপ্নই সম্ভবত। স্বর্গীয় অনুভূতির দেখা এই ভূমিতে মিলে না। কখনই না।

চোখ পাকিয়ে দীপ্তি সামনের দিকে চেয়ে দেখে, তার পা’দুটো শাহাদাতের কোলে। পরম যত্নে সে দীপ্তির পায়ের গোড়ালি টিপে দিচ্ছে। দীপ্তি সচেতন হতেই চোখ বড় বড় করে বলল, ‘এ কী করছেন? স্বামী হয়ে আমার পা.. ছিঃ ছাড়ুন।’ সে নিজেই পা ছাড়ানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শাহাদাত শক্তভাবে পা ধরে থেকে মৃদু হাসছে, ‘স্বামীরা স্ত্রীর পা ধরতে পারবে না এরূপ কথা কোন শাস্ত্রে লেখা আছে?’ ‘জানি না, তবে এমনটা ভালো না।’ ‘বিয়েতে খেয়াল করেছিলাম, খানিকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলে। ভাবলাম ব্যথা করছে। একটু টিপে দিই। তুমি স্থির হয়ে ঘুমাও।’দীপ্তি নির্বাক হয়ে চেয়ে রয়েছে শাহাদাতের দিকে। তার জীবনে এমন চরিত্রের আবির্ভাবের প্রত্যাশা সে কখনোই করেনি। তার ভাগ্যে কি অবশেষে সূর্য কিরণ দিতে চলেছে? জীবনের প্রতি অভিমান দীপ্তির চোখে এখন গভীর সমুদ্রে পরিণত হচ্ছে। এখনই যেন চোখ থেকে বেরিয়ে টুপ করে একফোঁটা পড়ে না যায়।

সূক্ষ্ম এক চিন্তা দীপ্তির মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ল। মা বলেছে, সুন্দরী মেয়েরা স্বামীদের খুব সহজেই বশ করতে পারে। তুইও করবি, তখন সব তোর হবে। কেমন নীচুস্তরের এক ভাবনা! এই লোকটি সম্ভবত অনেকটাই ভদ্র। তিনি হয়তো নির্দ্বিধায় দীপ্তিকে ভালোবেসে যাবেন। সংসার করতে করতে কখনও বশ করার খেয়াল মাথায় এলেও সে এমনটা করবে না। কারণ সে লোকটির ওপর নিজ আধিপত্য জমাতে দিতে চায় না। দীপ্তি পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ল। সাগ্রহে শাহাদাত তার পা টিপেই চলেছে আর সময় সময় তার জীবনে আসা নতুন এবং ছোট অতিথিকে প্রাণভরে দেখছে।দীপ্তির বিয়ের পঞ্চম দিনে একটি ছেলে এসেছে। শাহাদাত তার সাথে হাত মিলিয়ে উভয়ই সোফায় বসে কুশলাদি বিনিময় করল। ‘ভাই, আপনাকে তো চিনলাম না।’, একপর্যায়ে শাহাদাত বলল।’আমার কথা দীপু আপনাকে বলেনি? আমি রিশান। ওর বাল্যকালের প্রতিবেশী বন্ধু।’

‘ওহ, হ্যাঁ। তোমাকে ওর কলেজেও দুয়েকবার দেখেছি। শুনেছিলাম, তোমাকে ছাড়া দীপ্তি তার চেয়ে বড় সব ছেলেদের ভয় করে। হা হা।’ ‘জ্বি,’ তার সাথে রিশানও হাসল, ‘ওর সাথেই যে বড় হয়েছি! ভয় পায় না।’ ‘শুনো,’ শাহাদাত কাছে গিয়ে বলল, ‘বাসর রাতে ওর পা টিপে দিচ্ছিলাম। পা ধরেছি দেখে সে কাঁপছিল, যদিওবা প্রকাশ পেতে দেয়নি।’ ‘হা হা হা। সে এমনই।’ ‘বুঝলে?’, প্রসঙ্গ পাল্টালো শাহাদাত, ‘বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না। বয়সও বাড়িয়ে ফেললাম…’ ‘দেখতে তো ছাব্বিশের কোঠায় লাগছে।’ ‘হয়েছে বয়স। দীপ্তির কথা আপুই বলল। কলেজে প্রথম বর্ষে অমুক ঘরের অমুক একটা ভালো মেয়ে পড়ে। পাশেই তো কলেজটা। একবার দেখে আয়। ওকে দেখে ভালো লাগল। আমাকে আর আমার আয় দেখে ওর মা মরিয়া হয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন। আবার ওর রূপ তো প্রতিটা ছেলের মন কাঁড়তে বাধ্য।’ ‘তা বটে।’

তাদের কথাবার্তা শেষে দীপ্তির সাথে রিশানের দেখা হলো। রিশান চলে গেল। দীপ্তি রয়ে গেল অজানা মানুষের ভিড়ে। মনটা মাঝে মাঝে বলে উঠে, এধারেও কেউ একদিন মন ভাঙাতে আসবে। দীপ্তির রূপের প্রশংসা চারিদিকে ভোঁ ভোঁ করছে। কেবল বড় ভাবীকে বিরস দেখাচ্ছে। শাহাদাতের ভাই-বোন সকলেই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বড় ভাই ওয়াফিয়াকে যখন বিয়ে করে এনেছিলেন, তার প্রশংসা খুব কমই হয়েছিল। তখন এতগুলো প্রতিবেশী ভিড় জমায়নি, বিস্ময় প্রকাশ করেনি। ভাবীকে সকলে কালো বললেও তাকে খুব মায়াবী লাগে দীপ্তির। দীপ্তি খাতির করতে চাইলে সে দীপ্তির আশপাশও ঘেঁষে না। এইসব গায়ে মাখে না দীপ্তি। কয়েকদিনেরই ব্যাপার। ঠিক হয়ে যাবে।

দীপ্তির মা এসেছেন, শাহাদাতের সাথে কথা বলছেন তিনি। দীপ্তিকে হাসিখুশিতে দেখে তিনি অনেকটাই চমকিত। দীপ্তিকেও তার ভাগ্য মাঝের মধ্যে এতটাই চমকিত করে। হুট করেই যে পাল্টে গেছে! একসময় যার কিনা একটা দিন খুব কষ্টে যেত, তার আজ বিয়ের পাঁচটি মাস চলে গিয়েছে। আদৌ শাহাদাতেরা কেউই তার সাথে উঁচুস্বরেও কথা বলেনি। যে কিনা একসময় একমুঠো ভালোবাসার জন্য মুখিয়ে থাকতো, আজ তার ছোট আঙিনায় আনন্দের সমুদ্র। শাহাদাত বলেই চলেছে, আমি ধন্য দীপ্তিকে পেয়ে। তার রূপের প্রশংসাও যতই করি, কম হবে। একদম খাঁটি হীরা যাকে বলে। ওয়াফিয়া এলো তাঁকে সালাম দিতে। সালামের পর্ব শেষে ওয়াফিয়া চলে গেল। নিজের চেয়ে ছোট কারো অতিরিক্ত প্রশংসা সওয়া একদমই যায় না। পাঁচটা মাস কেবল হজম করে চলেছে। না জানি আর কতদিন! কতবছর! তবু হিংসার বশে দীপ্তির সাথে খারাপ আচরণ করা যাবে না।

দীপ্তির মায়ের চলে যাওয়ার দিন চারেক পর চারিদিকে হট্টগোল পাকিয়ে গেল। শ্বশুরের টাকার বাক্সের আশি হাজার টাকা খোয়া গেছে। এমতাবস্থায়, বাসার লোকজন একত্রিত হলো শ্বশুরের ঘরে। আশ্চর্যের বিষয়, কেবল আশি হাজার টাকার বাণ্ডিল ব্যতীত বাকিসব বাণ্ডিল স্ব স্ব স্থানে রয়েছে। চোর ঢোকার সম্ভাবনা কম। সর্বোপরি এটা চোরের কাজ হতেই পারে না। বাকি টাকা কার ওপর দয়া দেখিয়ে সে রেখে যাবে! একজন বলল, অদ্ভুত চোর! সব টাকা নেয়নি কেন? আরেকজন বলল, আশি হাজার টাকা কি কম কিছু? অন্য একজন বলছে, পাঁচশ টাকার বাণ্ডিলগুলো ফেলে বড় চোখওয়ালা চোর কিনা হাজার টাকার বাণ্ডিল নিয়েই পালালো!

শাহাদাতদের মাথা ঘুরছে। অর্ধেক অর্থ নতুন একটা জায়গা কেনার জন্য ছিল। কে এমন কাজ করেছে? স্বাভাবিকের মতোই টাকাগুলো পাওয়ার আশায় শুরুতে সবগুলো ঘরের সন্ধান শুরু হয়েছে। যেইদিকেই চোখ যায়, খুঁজে দেখছে সকলে। অবশেষে টাকা পাওয়া গেল। কিন্তু ততক্ষণে সকলের কপালে হাত। বাণ্ডিলটা শাহাদাতের আলমারির পাশের দীপ্তির আলমারিতেই যে পাওয়া গিয়েছে! দীপ্তি হকচকিয়ে গেছে। টাকাগুলোর এখানে থাকা কী করে সম্ভব? শ্বশুরেরা মুখ নিচু করে ফেলেছেন। আদরের বউ দীপ্তির চোখ এখন কপালে। শাহাদাত নির্বাক হয়ে টাকাগুলো বাবাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। বাবা বললেন, এই টাকা হয়তো ওর প্রয়োজন হওয়ায় নিয়েছে। আমার লাগবে না। বাবার আওয়াজ শোনে দীপ্তি ভ্রম কেটে বলল, বিশ্বাস করুন বাবা, আমি নিইনি টাকাগুলো। শাহাদাত ঘুরে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিল দীপ্তির গালে। ‘চুপ, একদম কথা বলবে না।’ রাগত অবস্থায় বাবার হাতে পুনরায় টাকা দিয়ে বলল, ‘এগুলো নিন বাবা। টাকাগুলোয় ওর কোনো অধিকার নেই।’

শাহাদাত এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। বেরিয়ে গেল লম্বা লম্বা পা ফেলে। বাকিরাও নিজ নিজ ঘরে চলে গেল। দীপ্তির ঘরের দরজা খোলা। তার কানে বারবার প্রতিধ্বনি তুলছে শাহাদাতের দেওয়া চড়ের আওয়াজ। কেবল শাহাদাতেরই নয়, সকলের বিশ্বাস সে এক মুহূর্তেই হারিয়ে ফেলেছে। না, সে ভুল ভেবেছিল। তার ভাগ্যে কারো সত্য ভালোবাসা নেই। প্রকৃতি তার কাছ থেকে পরীক্ষা নেওয়া কখনই শেষ করবে না। এরূপ পরীক্ষা সে দিয়ে এসেছে, আগামীতেও দিয়ে যেতে হবে। সুবিধা কেবল, পরীক্ষাগুলোর মাঝে বিরতি আছে। ভাগ্য হেসে বলল, পাঁচ মাস তো সুখে কাটিয়েছ। এইবার পরীক্ষার পালা। এতো দীর্ঘ বিরতি তোমাকে দিতে ইচ্ছে হয় না।

শাহাদাতের হাতে পত্রিকা থেকেও চোখ তার আয়নার দিকে। ছোট পা দিয়ে ভর করে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আয়না চেয়ে লিপস্টিক লাগাচ্ছে। লিপস্টিক সে ঠোঁটের সীমার ভেতর লাগাতে পারছে না। ঠোঁট থেকে বেরিয়ে আসছে। খুব করে মায়া জাগছে শাহারিয়ার জন্য। এহেন সময় দরজা ঠেলে ঘরে একটা মেয়ে এসে ঢুকল, শাহারিয়ার খেলার সঙ্গী রিতু। সে বলছে, আমার লিপিসতিক দাও। আমার লিপিসতিক তাইতো, দীপ্তি লিপস্টিক ব্যবহার করেই না। শাহারিয়া কোত্থেকে পেল? তার কাছ থেকে শাহাদাত লিপস্টিক ছিনিয়ে নিয়ে রিতুকে দিয়ে দিল। হাতটা তার নিশপিশ করতেই শাহাদাত চড় লাগিয়ে দিল বছর তিনেক বয়সী মেয়েটির গালে।

শাহাদাতকে সে কখনও বাবা বলে ডাকতে শেখেনি। শাহাদাতকে প্রতিনিয়ত দেখেও সে খুব অপরিচিত। ঠোঁট বাঁকিয়ে শাহারিয়া কাঁদছে। কান্না শোনে রান্নাঘর থেকে দীপ্তি দৌড়ে এলো। ‘কী হয়েছে?’, দীপ্তি তার কান্না থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ‘আমাকে মেরেছে।’ ‘এভাবে কাঁদে না মা। কে মেরেছে?’ তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শাহাদাত ব্যঙ্গার্থে বলে উঠল, মা চোর হলে মেয়ে তো হবেই। একই রক্ত যে বাহিত হচ্ছে! সে রিতুমণির খেলার লিপস্টিক চুরি করে এনে আয়না দেখে লাগাচ্ছিল। দীপ্তির ভেতরটা বছর তিনেক পর আবার মুচড়ে উঠেছে। কিন্তু এইবার নিজের জন্য নয়। পুচকে মেয়েটির প্রতিও শাহাদাত ক্রমশ বিষিয়ে উঠছে। শাহারিয়ার কান্না তার পছন্দ নয়। দীপ্তি তাকে বাহিরে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে শান্ত করায়। দুপুরের কাপড় সাথে করে ছাদ থেকে তাকে নিচে নিয়ে আসে। এরপর দীপ্তি কাপড় গোছানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

শাহাদাতের চোখ পত্রিকার ওপর। অনেকক্ষণ যাবৎ ধরে রয়েছে, পড়ছে না। এতো ছোট অবুঝ মেয়েটির গায়ে হাত তোলা অনুচিত ছিল। চুরি কী জিনিস তা তো সে জানে না। শাহারিয়া বিছানারই একপাশে চুপটি মেরে বসে মায়ের কাপড় ভাঁজ করা চেয়ে রয়েছে। মায়ের মতোই নজরকাড়া রূপ তার। তুলতুলে নরম গাল, চোখে ঘন পাপড়ি। হাসলে গালের পাশে টোল দেখা যায়। কাচের প্লেট পাঁচেক একসাথে ভেঙে ফেললেও তার মায়াবী হাসিটা দেখার জন্য শাহাদাত অনেক সময়ই কিছু বলতে পারে না। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কোন জড়তায় শাহাদাত গিয়ে তার পেটে সুড়সুড়ি দিয়ে তাকে হাসাতে পারছে না। দীপ্তির কাপড় গোছানোও শেষ। শাহারিয়াকে গোমড়ামুখো দেখে দীপ্তি কাছে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে।

‘আমার মেয়ে কি চকলেট খাবে? নাকি একটা…লিপস্টিক এনে দেব?’ খুশিতে শাহারিয়া আটখানা হয়ে বলল, লিপিস্তিক। ‘তাহলে আমার মেয়েকে এত্তগুলো এনে দেব।’ ‘এত্তগুলা…তো তো একটা লিতুমণীকেও দেবেন।’ পত্রিকা থেকে চোখ তুলে তাকাল শাহাদাত। নিষ্পাপ এই মেয়েটির গালেই একটু আগে সে চড় বসিয়েছিল? শাহারিয়া হঠাৎই দীপ্তির একগাল স্পর্শ করে বলল, মা তুমি ভালো, এত্তগুলা দীপ্তির মাঝে হঠাৎই অদ্ভুত এক মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল। প্রাপ্তি উঁকি দেওয়ায় দীপ্তি সশব্দে হেসে দিল। শাহাদাত তার এই হাসি অবাক হয়ে চেয়ে রয়েছে। হাসলে যে তারও গালে টোল পড়ে, সেই হাসির দৃশ্য শেওলার ন্যায় তিন বছরের অভিমানের নিচেই যে চাপা পড়েছে! হঠাৎই তার মনে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। শাহাদাতের চোখের জল অদৃশ্য রাখতে হবে। পত্রিকা রেখে সে বেরিয়ে পড়ল।

হাঁটতে হাঁটতে সেই প্রাঙ্গণে সে এসে পড়ল, যেখানে সে দীপ্তিকে দেখতে আসত। তার পাশের বান্ধবী বলত মনে হয়, দেখ্, দেখ্, কত লম্বা একটা খাম্বা তোকে চেয়ে আছে। সবই তো ঠিক চলছিল। সেইদিনের নীচু কাজটা সে না করলে আজ বিনা দোষে শাহারিয়া শাস্তি পেত না। বাবা সম্বোধন করারও কেউ থাকত তার। দীপ্তি দ্বিধার বশেই কখনও শাহাদাতকে বাবা ডাকতে তাকে শেখায়নি শাহারিয়াকে। টাকা চাইলেই শাহাদাত তাকে ম্যানেজ করে দিতে পারত। কেন চুরির মতো জঘন্য কাজটা করেছিল?কলেজ গেটে আসতেই এক ছেলে বলে উঠল, আরে শাহাদাত! এখানে কী করছ? ‘এমনিই,’ রিশানকে চিনতে বেগ পেতে হলো না, ‘টাইম পাস। কেন এলে?’ ‘বোনকে আজ কলেজ থেকে পিকআপ করার কথা।’ রিশান বাসস্টেন্ডের সিটে বসতে বসতে বলল, ‘তো কেমন চলছে দিনকাল?’ ‘পরিকল্পিত কিছুই হচ্ছে না। জীবন থেকে স্বাদই উঠে গেছে। সেই টাকা চুরির পর থেকে সংসার জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে।”আজও’, রিশান গম্ভীর হয়ে শাহাদাতকে চেয়ে বলল, ‘আজও সে স্বচ্ছ ভালোবাসাটা পেল না।’ ‘কর্মেই মানুষ ফল পায়।’

‘সে দোষ না করেও ফল পাচ্ছে তেতো, ছোট থেকেই। সে যখন বোঝদার হয়, মায়ের সামনে সে বাবার পরকীয়া তুলে ধরে। এই কর্মের ফলও অত্যন্ত তেতো ছিল। বাবাকে তালাক দেন মা। সংসারের কর্তার বিচ্ছিন্নতার ফল ভুগতে হয় দীপুকেই। অর্থের অভাব মানুষকে পাগল করে দেয়। আন্টিকে যখন পুরোপুরি পাগল করে ফেলে, তখন থেকে তিনি বলতে শুরু করেন, তাঁর স্বামীকে দীপ্তি গিলে খেয়েছে। পৃথিবীর কোনো লোকে স্বচ্ছত্ব নেই। কাজেই বাবার কুকর্ম তুলে না ধরলে তাদের খারাপ দিন দেখতে হতো না। স্বামীকে অন্তত ভালো ভেবে জীবন কাটিয়ে দিতেন। কঠোর প্রহার শুরু হয় দিপুর ওপর, ঠিক যেই প্রহার মায়ের ওপর বাবা করতেন। বাসার প্রতিটি কাজই দীপুর করতে হতো। দিন শেষে মায়ের তিক্ততার শিকার জুতোর বাড়ি কিংবা লাঠির বাড়ি খেয়ে হতে হতো। বিয়ের দিনও একা কাজ করে সে পায়ের বারোটা বাজিয়েছিল। আপনাকে পাওয়ার পর সে যেন চাঁদই হাতের মুঠোয় পেল।’ সহাস্যে বলল, ‘ভাবল, এই বুঝি স্বচ্ছ ভালোবাসা পেতে চলেছে।’ ‘আমি ওকে পাঁচটা মাস নির্দ্বিধায় ভালোবেসেছি।’

‘কিন্তু ওটা স্বচ্ছ ভালোবাসা নয়। নইলে সামান্য টাকা চুরির প্রসঙ্গে তাকে দূরে ঠেলে দিতেন না। এই স্বচ্ছ ভালোবাসা বিশ্বাসের দ্বারা তৈরি। আপনার বাসায় নেই, আপনারটা কেবল ভালোবাসা। অথচ তার কাছ থেকে দূরে থেকেও তার নির্দোষিতার সাথে আমার দেখা হয়। জানেন সে কেন শাহারিয়াকে বাবা ডাক শেখায়নি? কারণ পুরুষজাতে পুনরায় সে বাবার নির্দয়তার ছবি দেখেছিল। আপনাকে সে একসময় ভালোবাসলেও এরপর ভয় করতে শুরু করে।’
শাহাদাত মৃদু হাসল, হীরাকে আমি পরখ করেছি ভালোবেসে। আর তুমি হীরাকে বিশ্বাস করেছ স্বচ্ছ ভালোবেসে। ভালই।আর কিছু সে বলতে পারল না, বাসায় ফিরে এলো। দীপ্তি বাহিরের দোলনায় বসে আছে। দূরত্ব বজায় রেখে পাশে গিয়ে বসে শাহাদাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘টাকার কী- যেকোনো প্রয়োজন হলে আমাকে বলতে পারতে।’ ‘বিশ্বাসের প্রয়োজন ছিল।’ ‘সবাই দেখেছে, টাকাগুলো তোমার কাছে ছিল।’

‘কেউ তো নিতে দেখেনি। আপনার বিশ্বাস ছিল না বলেই চুরিটা হয়েছে। নইলে সেদিন ভাবী বলেছিল, পাঁচশ টাকার বাণ্ডিলের মাঝের হাজার টাকার বাণ্ডিলটাই মিসিং। বাবা তো আমাদের ওই বাক্সের টাকা দেখাননি কখনও। আমার কাছে পাওয়া বাণ্ডিলটা যে হাজার টাকার ছিল, পূর্বে থেকে তো আপনিও জানতেন না। যাক, সবই আমার ভাগ্যের পরীক্ষা। আমাকে সুখে দেখে উভয়ের হিংসে হয়েছে। ভাবলাম, সে কখনও কিছুই পায়নি হেতু, আমার মর্যাদা কমিয়ে কিছু দিই।

ভালোবাসাটা স্বচ্ছ জলের মতোই। নোংরা হলে পানযোগ্য হয় না। আমারটাকে হয়তো মরীচিকাই দেখিয়েছিল। নইলে আপনার ভালোবাসা ছুঁইনি কেন?’ নীরবতায় চারিদিকটা থমথমে। সূর্যের অস্তায়মানে আকাশ রক্তিম হয়েছে। সারাদিনের বিরক্তিকর রঙে নতুন রং এলেও আকাশ তবু কেন বিষণ্ণ? গুড়িগুড়ি বৃষ্টি প্যান্টের ওপর পড়ছে। দোলনার একপাশের এই বৃষ্টি দেখে দীপ্তির একবার ইচ্ছে জাগল, ভাগ্যকে একটি বার যেন প্রাণভরে আলিঙ্গন করার সুযোগ সে পায়।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত