থিওরি

থিওরি

—তোমার বউকে ঠিক কি বলব বুঝতে পারছি না বোকা নাকি মায়াবতী?নিজের স্বামীকে কেউ তার প্রেমিকার জন্য ছাড়তে রাজি হয়?

শহরের নাম করা রেস্তোরাঁয় বসে হিমালয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বরাবরের মতোই স্পষ্ট কন্ঠে, দৃঢ়তা নিয়ে কথাটা বলল রৌদ্রময়ী। হিমালয় চুপটি করে আছে পলকহীন চোখে চেয়ে আছে রোদের দিকে, মনে হচ্ছে কত জনমের তেষ্টা ওর চোখে শুধু রোদকে দেখেই সে তৃষ্ণা মিটাচ্ছে। একদম আগের মতোই আছে রোদ, সেই ৩ বছর আগে ওকে যেরকম দেখেছিলো হিমালয়, ঠিক সেরকম,নামের মতোই জৌলুশ, আত্মবিশ্বাস আর ব্যাক্তিত্বের সাথে আপোষহীন একটা মেয়ে।ওর এই নাকের ডগায় রাগকেই তো ভালোবেসেছিলো হিমালয়। রোদের প্রখরতায় হিমালয় গলে বাষ্প হয়ে গিয়েছিলো।

—কি হলো কথা বলছ না কেন?৩ বছরে দেখছি অনেকটা বদলে গেছো সেই বকবকিয়ে স্বভাবটা নেই আগে হলে তো এতক্ষণ প্রশ্নের পাহাড় গড়ে আমাকে তার নিচে ফেলে পিষে মারতে, হিমালয় ফিক করে হেসে ফেলল,মেয়েটা আগের মতোই আছে উচ্ছল চঞ্চল আর প্রাণবন্ত। কিছুটা বিরক্ত নিয়েই রোদ বলল,

—কথা বলো প্লিজ তুমি খুব ভালো করেই জানো আমার ধৈর্য শক্তি খুবই কম। হিমালয়ের তেমন কোনো ভাবান্তর হলো বলে মনে হচ্ছে না,খুব শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো
—কেমন আছো রোদ?
—উহুহ রোদ নয় আমার নাম রৌদ্রময়ী, সবাই সে নামেই ডাকে।
—আমি ডাকি না আমি তোমাকে রোদ বলেই ডাকতাম আজো যখন তোমায় ডাকি রোদ বলেই ডাকি,আজীবন তাইই ডাকব।

—আজও ডাকার সময় হয় নাকি তোমার?এত বড় বিজনেসম্যান তুমি তোমার বাবার আদর্শ ছেলে এখন আবার কারোর স্বামীও, এখনো ডাকাটা কি পাপ নয়,নাকি তোমার বউয়ের কথা মতো তাকে ডিভোর্স দিয়ে আমাকে বিয়ে করবে ভাবছ?

—তুমিও কম নাকি? বেস্ট বিজনেস ওমেনের তালিকায় নিজের নামটা সবার উপরে ঠিক পাকা করে নিয়েছ।বিয়ে করোনি?

—তুমি খুব ভালো করেই জানো বিয়ে করার হলে তোমাকেই করতাম আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম জীবনে যদি বিয়ে নামক বন্ধন আসেই তবে তোমার হাত ধরেই আসবে

—তাহলে চলে গেলে কেন?

কফি এসে গেছে ধোয়া ওড়া গরম কফির মগ টা দুহাতে মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে রোদ।হিমালয় খুব ভালো করেই জানে এবার গরম কাপটা নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নেবে , ভার্সিটির ক্যান্টিনে ৫ বছরে ওর সামনে বসে এভাবেই হাজার কাপ কফির ঘ্রাণ নিয়েছে রোদ। হিমালয় হালকা সামনে ঝুকে বলল,

—খুব দরকার ছিল রোদ আমায় কষ্ট দেওয়াটা? আমায় ক্ষত বিক্ষত করে চলে যাওয়াটা? তোমার কি কোনো পিছুটান ছিল না আমার প্রতি! শুধুমাত্র নিজের জেদের জন্য আমাকে কষ্ট দেওয়াটা কি খুব দরকার ছিল?একবারো কি প্রয়োজন মনে হয় নি একবার আমার ভালোবাসা প্রমাণের সুযোগ দেওয়া?! তোমায় কোথায় কোথায় খুজেছি তোমার হিসেব আছে? সেই সবটা জায়গায় দিনের পর দিন বসেছিলাম এই ভেবে এই বুঝি রোদ এলো এই বুঝি রোদ এলো।
বরাববের মতো হিমালয়ের চোখে চোখ রাখল রোদ, হিমালয়ের বুকের ভেতর টা হুহু করে উঠল,এই চোখের মায়াতেই তো নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল,সারাজীবন এই চোখেই চোখ রাখতে চেয়েছিল,ভার্সিটির সবচেয়ে আড্ডাবাজ, স্মার্ট আর ব্রিলিয়ান্ট ছেলেটা, এই রোদের তেজকেই তো ভালোবেসেছিল।

—কথা বলো রোদ প্লিজ তুমি তো জিতে গেছো আজ অন্তত বলো কতটা সুখে আছো। রোদ এবার কিছুটা ঝুকে বলল,

—আচ্ছা একটা সত্যি কথা বলতো আমার সেই ভালোবাসার থিওরিটা কতটুকু মিথ্যে প্রমাণ করতে পারলে?মনে আছে? হিমালয় হালকা হেসে বলল,

—”মানুষ মুগ্ধ হবে বারবার, একাধিক মানুষের মায়ায় পড়বে, সে বারবার মোহে পড়ে তবে মায়া আর ভালোবাসা এক কি না সেটা বুঝতে পারে না এক জীবনে একটা মানুষ একজনের মায়ায় আটকে থাকতে পারে না”।তাইতো?

—হ্যা এটাই,সবসময়ই তো বলতে আমার থিওরি তুমি ভুল প্রমান করে ছাড়বে তুমি আর কাউকে ভালোবাসবে না, আচ্ছা তুমি আর কাউকে ভালোবাসো কি না বুঝতে পেরেছ?

—তুমি খুব স্বার্থপর রোদ, শুধু নিজেকে সারাজীবন আমার মনে প্রতিষ্ঠিত করবে বলেই তুমি আমায় ছেড়ে চলে গেছিলে।

—আমি কিন্তু তোমাকে কথাটা আগেই জানিয়েছিলাম আমি প্রেম ভালোবাসায় বিশ্বাসী নই প্রেমে কোনোদিন পরিনয় পেতে নেই যে প্রেম পরিনয় পায় তাতে কখনোই সারাজীবন ভালোবাসা থাকে না বলি নি? এ সব জেনেই তো আমায় ভালোবেসেছিলে তাই না

হিমালয়ের কলেজের দিনগুলোর কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেলো, কলেজের সবার ক্রাশ রৌদ্রময়ী চৌধুরী প্রেম ভালোবাসায় মোটে বিশ্বাসী না সবকটা ছেলে ওর জন্য পাগল হলেও কেউই খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারি রোদের প্রচুর রাগ ছিল,একবার এক ছেলে বারবার ওকে প্রোপজ করায় রোদ বিয়ের সাজ সেজে ভার্সিটিতে এসেছিলো। ছেলেটির বাবা মা কে ডেকে এনে ছেলেটিকে বলেছিলো, চলো বিয়ে করি ভালো যখন বাসোই বিয়ে করে ফেলি ওই দেখ তোমার বাবা মা আসছে আমাদের দোয়া খায়ের করবে, ছেলেটা রোদের এরকম আচারণে একদম ভড়কে গেছিলো এরপর আর অন্য ছেলে রোদের কাছে যাওয়ার তেমন সাহস পায় নি,আর সেই বিয়ের সাজেই রোদকে দেখে পাগল হয়ে গেছিলো হিমালয়।

হিমালয় ছিল খুব চঞ্চল আর হাস্যোজ্জ্বল একদম রোদের বিপরীত, তবে হিমালয় বাকিদের মতো বোকামি করে নি সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিল আর পেয়েও গিয়েছিল, রোদ যতই কঠিন হোক অন্যের কষ্ট সহ্য করতে পারত না একদিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার সময় একটা পথশিশু এক্সিডেন্ট করলে রোদ সবার আগে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায় হিমালয় ও রোদ কে হেল্প করে ওর গাড়িতে ছেলেটা কে হসপিটাল নিয়ে নিজে দাড়িয়ে চিকিৎসা করায় সেই থেকে ওদের বন্ধুত্ব, একসময় জড়তা কাটিয়ে হিমালয় ওর মনের কথা ১০০ গোলাপ দিয়ে প্রকাশ করেছিল,খুব শান্ত ভাবে রোদ বলেছিল, আমাদের দুজনের জুটি হবে পার্ফেক্ট আমরা দুজনেই পরিপূর্ণ তাই দেখো আমাদের সম্পর্ক টিকবে না কোনো বড় বিপর্যয় আমাদের সারা জীবনের মতো আলাদা করে দেবে কিন্তু বন্ধু থাকলে সে চান্স কম তখন কারোর প্রতি কারো চাহিদা থাকবে না আজীবন যোগাযোগ থাকবে, তুমি সব জেনে বুঝে মেনে নিয়ে কি এই রিস্ক নিতে চাও? হিমালয় দারুণ আত্মবিশ্বাসের সাথে সেদিন হ্যা বলেছিল ওর নিজের ভালোবাসার প্রতি পূর্ণ আস্থা ছিল,কিন্তু জেদী রোদ একদিন হুট করেই কিছু না বলেই আড়াল হয়ে গেছিলো হিমালয়ের ধরা ছোয়ার একদম বাইরে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হিমালয় রোদের চোখে চোখ রেখে বলল,

—এখনো ভালোবাসি। ঠোটে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে রোদ বলল,

—আর তোমার বউ? তাকে ভালোবাস না? মায়ার কথা মনে হতেই হিমালয় থমকে গেলো,হিমালয়কে চুপ থাকতে দেখে রোদ যা বোঝার বুঝে গেছে, রোদ মুচকি হেসে বলল,
—আচ্ছা যদি এখনো তুমি মায়াকে এক মিনিটের জন্য ভালোবাসতে না পার তবে ওকে ডিভোর্স দিয়ে দাও আমরা বিয়ে করে নেব। হিমালয় রোদের দিকে তাকিয়ে বলল,

—মিথ্যে বলছ কেন রোদ?তোমাকে আমি খুব ভালো করেই চিনি তোমার কাছে আমার কোনো কিচ্ছুর প্রত্যাশা নেই শুধু বলো কেন ছেড়ে গিয়েছিলে?
—ধরে নাও বিশ্বাসঘাতক ছিলাম,তোমায় ঠকিয়েছি। একজন বিশ্বাস ঘাতক মেয়ের জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট করছ কেন হিমালয়?

—রোদ প্লিজ আমি খুব ভালো করে তোমায় চিনি তুমি কিচ্ছু কারণ ছাড়া করো না আমি সেই কারণটা জানতে চাই।
—বেশ বলব আগে বলো ছয় মাসে তোমার বিবাহিত জীবনে কি আমি কোনো প্রভাব ফেলেছি?মায়া কি তোমার জীবনে কোথাও এতটুকু জায়গা জুড়ে নেই? হিমালয় কিছুক্ষণ চুপ থাকলো, তারপর রোদের চোখে চোখ রেখে একটু সামনে ঝুকে আসলো,

— যখন তুমি আমায় ছেড়ে চলে গেছিলে আমি একদম দিশেহারা হয়ে গেছিলাম না খেয়ে অসুস্থ হয়ে হসপিটালে এডমিট হতে হয়েছিলো, সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলে মা তার মাথায় হাত রেখে আমায় বিয়েতে রাজি হওয়ার জন্য ওয়াদা করিয়েছিলেন,একরকম বাধ্য হয়েই বিয়েটা করেছিলাম, কিন্তু তুমি তো আমাকে চেন রোদ আমি কিরকম আমি কিন্তু আবেগের বশে অন্য মেয়ের জীবন নষ্ট করি নি আমি মায়াকে তার সব অধিকার দিয়েছি কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত করি নি, অবহেল করি নি,অন্ধকারে রাখি নি সবটা জানিয়েছি,খেয়াল রেখেছি গুরুত্ব দিয়েছি, হ্যা হয়তো মায়াবতী ওই মেয়েটার মায়াতেও পড়ে গেছি তোমাকে ছাড়া যেমন বাচতে শিখেছি ওকে ছাড়া হয়তো সেটা সম্ভব না ও আমার অভ্যেস হয়ে গেছে এখন আমি চাইলেও আর তোমাকে নিয়ে জীবন টা শুরু করতে পারব না। আমি তো প্রতারক নই রোদ আমি ওই মেয়েটাকে ঠকাতে পারব না।

মায়া খুবই শান্ত একটা মেয়ে একজন আদর্শ স্ত্রী, বাড়ির লক্ষী বউ,ভালোবাসার বড্ড কাঙালী, সবকিছু ছেড়ে মেয়েটা আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে একটু ভালোবাসার আশায়, কিন্তু ওখানেই আমি অপারগ, ভালোবাসার অনুভূতি টা যে কি তা আমি তোমায় বোঝাতে পারব না, বুকের মধ্যে না পাওয়ার ক্ষতটা যে কিরকম করে জ্বালা দেয় তুমি বুঝবে না কখনোই বুঝবেনা, মায়া প্রতি মধ্যরাতে উঠে বসে আমার দিকে চেয়ে থাকে ভালোবাসা খোজে আমি বুঝি খুব মায়া হয় বিশ্বাস করো, আমাদের রক্তে মাংসে খেলা হয় কিন্তু ভালোবাসাটা হয় না, আমি এখনো আমার রোদকে খুজি যে আমায় শাসন করতো আমার পাগলামি গুলোকে সহ্য না করে প্রতিবাদ করত, আমি এখনো মাঝরাতে জেগে উঠি মায়ার মতোই ভালোবাসা খুজি কিন্তু পাই না এমনকি ভালোবাসার মানুষটার দেখাও মেলে না, তোমার থিওরি কি বলে রোদ কিসের টানে মানুষ একজনের সাথে সংসার করে অন্যজন কে ভালোবাসে? রোদ অন্য দিকে মুখটা ফিরিয়ে নিয়েছেরোদে তো আর বৃষ্টি হতে পারে না খুব কষ্টে গলার কাছের দলাটা আটকে রেখেছে। হিমালয় আলতো ক

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত