স্নিগ্ধা

স্নিগ্ধা

৮ই ডিসেম্বর। এই দিনেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল প্রমিতির সাথে। প্রথমে আমিই নক দিয়েছিলাম তার আউডিতে। সাধারণত কারোর আইডিতে আমি নক দেই না। তবুও কেন জানো সেদিন ওহে নামক শব্দটা তার আইডিতে চলে গিয়েছিল নিজের অজান্তেই। আমিও অধীর আগ্রহে তার ম্যাসেজের অপেক্ষায় ছিলাম। দীর্ঘ ছয় মিনিট পর সে রিপ্লে দেয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লে দেই, কেমন আছেন? প্রমিতি ছোট করে বলে, ভালো আছি। এভাবেই আমাদের কথা বলার শুরু হয়।

অল্প দিনেই মেয়েটার সাথে আমি অনেক ক্লোজ হয়ে যায়। যা কখনো কোনদিন কোন মেয়ের সাথে হয় নি। তখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড ফিজিক্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আর প্রমিতি? প্রমিতি হলিক্রস কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। আমাদের কথা বলাটা অল্প অল্প করে বাঁড়তে থাকে। প্রমিতি আমাকে বলতো আমি নাকি অনেক গম্ভীর ও স্বল্পভাষী। মাঝেমাঝে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতাম আদৌ কি আমি এমন? বলে নিজেই নিজে হাসতাম। আমি বিদঘুটে, উন্মাদ, পাগল মস্তিষ্কের ছেলে। এজন্যই হয়ত আমার চিন্তাধারা সবার থেকে ভিন্ন।

প্রমিতি আমাকে বলতো আচ্ছা ভাইয়া আপনি এমন কেন? আমি প্রতিউত্তরে বলতাম, কেমন প্রমিতি? প্রমিতি কিছুটা ভেবে বলতো, না থাক বলবো না। আমিও কারোর কাছে কখনো জোর করিনি। এজন্য প্রমিতিকার কাছ থেকেও কখনো জোর করে কথা শুনি নি। প্রমিতি সবসময় যুক্তি দিয়ে কথা বলতো। এটা আমার বেশ ভালো লাগতো। আইডিতে ওর কোন ছবি দেওয়া ছিল না এমনকি আমার আইডিতেও কোন ছবি ছিল না। যেদিন প্রথম প্রমিতি ওর ছবি আমাকে দেয়। বোধ হয় সেদিনই ভালোবাসা নামক শব্দের সাথে পরিচিত হয়ে গেছিলাম আমি। এভাবে এক বছর চলে যায়। আমাদের কথা বলাও অনেকটা কমে গিয়েছিল। হয়ত ব্যস্ততার কারণে। আমার কোন ব্যস্ততা ছিল না। ব্যস্ততা ছিল প্রমিতির। আমি অনেকবার প্রমিতিকে ভালোবাসা নামক শব্দের সাথে পরিচিত করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে অনেক আগেই শব্দটার সাথে পরিচিত ছিল। প্রমিতি একজনকে ভালোবাসতো। তার নাম বাপ্পী।

হয়ত বাপ্পীই প্রমিতিকে ভালোবাসা নামক শব্দের সাথে পরিচয় করে দিয়েছিল। বাপ্পীর পরিবার এবং প্রমিতির পরিবার ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। বাপ্পীরা তৃতীয় তলাই থাকতো আর প্রমিতিরা চতুর্থ তলাই। প্রমিতিই বাপ্পীকে ভালোবাসতো। তবে বাপ্পীই আগে প্রপোজ করে প্রমিতিকে। প্রমিতি সেদিন অনেক খুশী হয়েছিল। আর এটাই সর্বপ্রথম জানাই আমাকে। সেদিন খুব করে কেঁদেছিলাম। আমার সেই কান্নার সাক্ষী পুরো রাবি ক্যাম্পাস। তারপর থেকে আমার ম্যাসেজ সিন করারও সময় ছিল না তার। প্রমিতি আমাকে সব বলতো আজ বাপ্পীর সাথে কি করেছি না করেছি সবকিছু। আমার প্রায় মাস্টার্স শেষ হবার পথে। আর প্রমিতি কোন জায়গায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ না পাওয়ার কারণে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। আর বাপ্পী তখন ঢাবির রসায়ন ডিপার্টমেন্টের ২য় বর্ষের ছাত্র। মাস্টার্স পরীক্ষা হওয়ার দুই মাস আগে রুমে হঠাৎ করেই অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর ইসলামি হাসপাতালে ভর্তি হই।

ডাক্তার আমাকে ইসিজি করানোর জন্য বলে। আমি করব না বলে হলে চলে আসি। ঠিক তিনদিন পর আবার একই রকম ঘটনা ঘটে আর মাথার যন্ত্রণাটা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। আমার পরিবার থেকেও মা-বাবা, বোন চলে আসে আমাকে দেখতে। সেই মুহূর্তে আমাকে ইসিজি করানো হয়। ডাক্তার তিনদিন পর ইসিজির রিপোর্ট দেয়। রিপোর্টে যেটা আসে সেটা দেখে প্রথমে মেনে নিতে না পারলেও পরে মেনে নিতে বাধ্য আমি। আমার ব্রেন টিউমার। বাবা ডাক্তারের পরামর্শ নেয়। বাবা ডাক্তারকে বলে কিভাবে কি করলে আমার ছেলেটা বাঁচানো যাবে। ডাক্তার সেদিন নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থেকেছে। এভাবে পনের দিন চলে যায় প্রমিতি এর ভিতর আমাকে একবারও নক দেয় নি। দেবেই বা কেন? আমি কে? আমি ওর কেউ না। আমি এফবিতে আসি আর ওকে নক দেই। ও এস এম এস এর রিপ্লে দেয় না।

চারদিন পর বাবা আমাকে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চেন্নাই নিয়ে যায় আর সেখানে একমাস ট্রিটমেন্ট করাই। একটু উন্নতি দেখে ডাক্তার আমাকে অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ডাক্তার বাবাকে ১১ লক্ষ টাকা জোগাড় করার কথা বলে। তবুও বাবা পিছাই নি। ১৫ই জানুয়ারি রাত ৯টার সময় আমাকে অপারেশন করা হয়। অপারেশন করার ৯ ঘণ্টা পর আমার জ্ঞান ফেরে। জ্ঞান ফেরার পর বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। সেদিন যে প্রশান্তি, যে সুখ আমি পেয়েছিলাম। সে সুখ জীবনে কখনো কোনদিন পাইনি। আমার শরীর সুস্থ হতে প্রায় তিন মাস লেগে যাই। দীর্ঘ পাঁচ মাস পর আমি এফবি লগইন করি। লগইন করার সাথে সাথে অনেকে এস এম এস দেয়। কিন্তু প্রমিতির আইডিতে যাওয়ার সাথে সাথে দেখলাম মেয়েটা আমাকে সেদিনই ব্লক করেছে। খুব কষ্ট হয় আমার।

আমি অন্য আইডি থেকে ওর আইডির ভিতর ঢুকি। তারপর দেখি বাপ্পীর সাথে অনেক ছবি প্রমিতির। যে মেয়ের আইডিতে একসময় কোন ছবিই ছিল না, সে মেয়েটাই আজ বেহায়ার মতো ছবি দেয়। আমার খুব খারাপ লাগে। কেঁদেও ফেলি। পরক্ষণেই চোখের জল মুঁছে বলি, আমি কার জন্য কাঁদছি? এই প্রমিতির জন্য। যে কিনা ভালোবাসার কোন মূল্যই দিতে জানে না। পড়াশুনা কনটিনিউ কারার কোন ইচ্ছা ছিল না। তবে মায়ের জোরাজুরিতে আবার মাস্টার্স ভর্তি হয়। মাস্টার্স শেষ করার পর জি আর ই করে অস্ট্রিয়াতে একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাই। অস্ট্রিয়া যাওয়ার তিনদিন আগে আমার বোন আমার রুমে আসে। আর বলে ভাইয়া তোকে একটা গল্প শোনাবো। যদি তুই শুনতে চাস। আমি মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দেই হ্যাঁ শুনবো। একটা মেয়ে একটা ছেলেকে খুব ভালোবাসে।

ছেলেটা যখন এইটে পড়তো, মেয়েটা তখন ফাইভে পড়তো। মেয়েটা ছেলেটার ঠিক তখন থেকেই পছন্দ করে। ছেলেটার পারিবারিক অবস্থা স্বচ্ছল না থাকার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু মেয়েটা সেটা হতে দেয় নি। মেয়েটা তার পরিবারের একমাত্র কন্যা। তাই সবাই তাকে ভালো রাখার চেষ্টা করে, খুশী রাখার চেষ্টা করে। কখনো কোন আবদার অপূর্ণ রাখে নি তার পরিবার। ছেলেটার পড়াশোনার দায়িত্ব মেয়েটার বাবা নিতে চাই। কিন্তু ছেলেটার বাবা সেটা হতে দেয় নি। তবুও মেয়েটা চুরি করে ছেলেটার মায়ের কাছে পড়াশোনার খরচ দিয়ে যেতো। ছেলেটা যেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড ফিজিক্সে পড়ার সুযোগ পাই। সেদিন মেয়েটার কি আনন্দ! মেয়েটাও ভালো ছাত্রী হওয়াই কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। যেদিন মেয়েটা শোনে ছেলেটার ব্রেন টিউমার।

সেদিন মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরে কতোই না কেঁদেছিল। বলেছিল কাব্যের কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে? আমি কি করে বাঁচবো? আমি সেদিন উত্তর দিতে পারি নি। ছেলেটার অপারেশন করার জন্য ১১লক্ষ টাকার প্রয়োজন। কিন্তু ছেলেটির বাবা ৯ লক্ষ টাকা জোগাড় করতে পারে। আর কোন ভাবেই বাকি টাকটা জোগাড় করতে পারে না। এই কথা মেয়েটা জানতে পেরে তার যত গহনা ছিল সব বিক্রি করে দিয়ে ছেলেটির বাবাকে টাকা দেয়। সেদিন ছেলেটির বাবা মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে খুব করে কেঁদেছিল আর বলেছিল, তোর ভালোবাসা সত্য মা। তুই তোর ভালোবাসাকে ঠিক জয় করতে পারবি। যেদিন ছেলেটার অপারেশন হয়, সেদিন সারারাত সে নিঃস্বার্থভাবে ছেলেটার জন্য দোয়া করেছে।

এই টুকু শুনে আমি আর সহ্য করতে পারি নি। আমি জানি মেয়েটা কে? মেয়েটা অনহার(আমার বোন) বান্ধবী। নাম স্নিগ্ধা। মেয়েটা বড্ড বেশী অভিমানী। আমি ওর সাথে সবকিছুই বলতাম, এমনকি প্রমিতিকে যে ভালোবাসতাম সেটাও স্নিগ্ধাকে বলেছিলাম। কিন্তু স্নিগ্ধা যে আমাকে এতো বছর ধরে ভালোবাসে সেটা আমার কাছে অধরায় রয়ে গেছে। আমি কিছু না ভেবেই স্নিগ্ধাদের বাসায় যায়। ওদের বাসা আমাদের বাসার থেকে চার মিনিটের রাস্তা। তাই বেশী দেরী হয় নি। আন্টিকে ওর কথা জিজ্ঞেস করাতে বলে, ছাদে আছে? আমি দৌঁড়ে ছাদে যায় আর দেখি, স্নিগ্ধা চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি আস্তে আস্তে ওর কাছে যায়। তবুও ঠিক একইরকম ভাবে ও দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওর ঠিক কানের কাছে মুখ লাগিয়ে বলি, কেমন আছো অস্পর্শী? মেয়েটা কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। আর আমার দিকে একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর কিছু না বলে চলে যেতে থাকে। আমি হাতটা ধরে বাহুডোরে বন্দি করি আর বলি, ভালোবাসি তোমায় প্রেয়সী। বড্ড ভালোবাসি তোমায়। কখনো ছেড়ে যাবে না তো? স্নিগ্ধা খুব করে কাঁদতে থাকে আমার বুকে মাথা রেখে। আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে, কখনো যাবো না ছেড়ে, যদি না যেতে চাও দূরে। আমি এবার আরো শক্ত করে স্নিগ্ধাকে জড়িয়ে ধরি। এটাই হয়ত ভালোবাসার প্রাপ্তি।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত