অভিমান

অভিমান

প্রায় দুই ঘন্টা ধরে স্টেশনে বসে আছি। যদিও অপেক্ষাটা কোনো ট্রেনের জন্য নয়। তথাকথিত প্রেমিকা নামক ব্যক্তিটির জন্যই এই অপেক্ষা। ইমুর সাথে সম্পর্কটা তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আমি এখন পর্যন্ত মেয়েটাকে ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারিনি। আসলে মেয়ে মানুষের মন বোঝার ক্ষমতা মনে হয় না কোনো পুরুষের আছে। মেয়েটার কখন যে মন ভালো থাকে, আর কখন যে টেম্পারেচার হাই হয়ে যায় তা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে এতোদিনে আমি এইটুকু নিশ্চিত যে আমার প্রতি মেয়েটার ভালোবাসার চেয়ে এলার্জিটাই বেশি কাজ করে। আর সেজন্যই আমাকে দেখা মাত্রই কীভাবে ঝগড়া করা যায় তার ফন্দি আঁটে।

তবে আজ আমি বাসা থেকে প্রতিজ্ঞা করেই বের হয়েছি, যে যাইহোক না কেন আজ ইমুকে ঝগড়া করার কোনো সুযোগই দেব না। ও যদি আজ সারাদিন আমাকে স্টেশনে বসিয়েও রাখে তবু কিছুই বলবো না। কারণ কাল ও বাড়ি চলে যাবে। আর বাড়ি চলে যাওয়ার পর আবার না ফেরা পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ থাকবে না। ওর ফ্যামিলি ভীষণ স্ট্রিট। যদি কোনোভাবে আমাদের সম্পর্কের কথা বাসায় জানাজানি হয়ে যায় তবে ওকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। আমি কোনোভাবেই ইমুকে হারাতে চাই না। এইভাবে একা একা কতক্ষণ বসে থাকা যায়। বারবার কল দিচ্ছি, কিন্তু সেই বান্দার ফোনটা রিসিভ করার সময় হচ্ছে না। আমার সাথে দেখা করতে আজ আসবে কিনা সেটা তো অন্তত রিসিভ করে বলতে পারে।

আমি প্লাটফর্মটার চারিপাশ হেঁটে হেঁটে দেখছি। বহু পরিচিত একটা প্লাটফর্ম। এই প্লাটফর্মটার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ইমু আর আমার হাজারো রাগ অভিমানের গল্প। যদিও অন্যদিনের তুলনায় আজ মানুষের সমাগমটা নেহাত কম, তবু বারবার মনে হচ্ছে দুই ঘন্টা ধরে আমার এখানে অবস্থানটা কেউ খেয়াল করে মজা নিচ্ছে না তো। আমি চারিপাশটা ভালো করে একবার দেখে নিলাম। নাহ আমার দিকে কেউই সেইভাবে তাকিয়ে নেই। তবে একটা দৃশ্য সবাই উৎসুক দর্শকের মতো বেশ উপভোগ করছে। বিষয়টা কী দেখার জন্য আমি কিছুটা সেইদিকে এগিয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারলাম কেসটা আর কিছুই না প্রেম কেস। প্রেমিক তার প্রেমিকার রাগ ভাঙানোর জন্য রেল লাইনে দাঁড়িয়ে বলছে, “তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাও তবে আমার লাশের উপর দিয়ে তোমার যেতে হবে।” পুরো সিনেম্যাটিক ব্যাপার। এইসব সিনেমার ডায়লগ শুনে নিজের অজান্তেই কখন যে হাসতে শুরু করেছি তা ঠিক খেয়াল নেই। হাসিটা যে এত জোরে হয়ে যাবে তাও ঠিক বুঝতে পারিনি।

সবার দৃষ্টি এখন ওই প্রেমিক-প্রেমিকার দিক থেকে সরে আমার উপর এসে পড়েছে। তবু আমি এখনো হেসেই চলেছি। কিন্তু নাহ, হাসিটা আর বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। সামনে দাঁড়ানো ইমুর মুখ দেখে আমার মুখটা যেন ফিউচ বাল্বের মতো অন্ধকার হয়ে গেল। এই পরিস্থিতিতে ঠিক কী করবো বুঝে ওঠার আগেই ইমু গট গট করে আমার সামনে থেকে সরে ওভার ব্রিজ বেয়ে উপরে উঠে যেতে লাগলো। আমিও ওর পেছনে পেছনে ওর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে যেতে লাগলাম। কিন্তু নাহ, সেই বান্দার সেইদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ওভার ব্রিজ পার হয়ে একটা রিক্সা নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই উধাও হয়ে গেল। এইসবের কোনো মানে হয়? মেজাজটা পুরো খারাপ হয়ে গেছে। ইমু কেন যে আমার সাথে এমন করে তা আমি ঠিক বুঝতে পারি না। এই মেয়েটাকে বুঝতে হলে হয়তো আরও কয়েকবার আমাকে জন্মগ্রহণ করতে হবে।

এখন কী করা যায় ভাবতে ভাবতে আবার সেই প্লাটফর্মটায় এসে দাঁড়ালাম। প্রেমিক নামক সেই ছেলেটি এখনো তার আগের স্থানেই অবস্থান করছে। আর মেয়েটার মধ্যে এতক্ষণেও কোনো ভাবের পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হচ্ছে না। আসলে মেয়ে জাতি বড্ড আজব প্রাণি। এদের মনের প্যাচ গোনার চেয়ে জিলাপির প্যাচ গোনা অনেক সহজ।
ট্রেনের হুইসেল বাজছে। তার মানে ট্রেন আসছে। কিন্তু নাহ, ছেলেটার ভাব মূর্তি তো বেশি সুবিধার মনে হচ্ছে না। বাংলা ছবির ডায়লগ দিলেও কাহিনী তো হিন্দি ছবির মতো হয়ে যাচ্ছে। আমার সামনে একজন মানুষ এইভাবে মরে যাবে এটা কিছুতেই সহ্য করা যায় না। আমি তৎক্ষণাত ছেলেটাকে রেল লাইন থেকে সরিয়ে গালে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বললাম, মরার এত শখ কেন?

এইসব ফালতু মেয়ের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দিলেই বুঝি তাকে প্রেম বলে? মরে গেলেই বুঝি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? এই রকম আরও দুই একটা বাণী বাক্য শুনিয়ে দিলাম ছেলেটাকে। বিনিময়ে ভেবেছিলাম ছেলেটা অন্তত আমাকে একটা ধন্যবাদ দেবে। কিন্তু ধন্যবাদ দেওয়া তো দূরের কথা ছেলেটা উল্টে কিনা আমাকে পাগল বলে সম্বোধন করলো। সেই সাথে আরও বলল, “ট্রেনের হুইসেল দিলো আর আপনিও আমাকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। একবার তো অন্তত খেয়াল করবেন ট্রেনটা কোন লাইন থেকে আসছে। এই লাইনে অন্তত আরও পাঁচ ঘন্টার মধ্যে কোনো ট্রেন আসবে না জন্যই দাঁড়িয়েছি।” ছেলেটার কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল আজব দুনিয়া।

ইমুর সাথে প্রায় ২৩ঘন্টা ২৯মিনিট ধরে কথা হয় না। এর মধ্যে আমি ওকে ৪৬৫বার কল দিয়েছি। কিন্তু প্রতিবারই একজন মহিলা বলছে, আপনার ডায়েলকৃত নম্বরটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একটু পরে আবার ডায়েল করুন। নাহ, কিছুই ভালো লাগছে না। ইমুর সাথে এর আগেও আমার অগণিতবার ঝগড়া হয়েছে। কিন্তু কোনোবারই ও ফোন বন্ধ করে রাখেনি। ভীষণ চিন্তা হচ্ছে আমার।

ইমুর সাথে কাটানো হাজারো স্মৃতি মনে করে করেই রাতটা পার করে দিয়েছি। সকাল হওয়ার সাথে সাথেই ছুটে গেলাম ইমুর হোস্টেলে। যেহেতু মেয়েদের হোস্টেল সেজন্য ভেতরে কোনো ছেলে যেতে দেবে না এটাই নিয়ম। তাই দারোয়ান চাচাকে পাঠালাম ইমুকে একটু বাইরে আসার জন্য বলতে। ইমুর সাথে সম্পর্কের কথা দারোয়ান চাচা খুব ভালো করেই জানেন। উনি আমাকে বেশ স্নেহও করেন। দারোয়ান চাচা ফিরে এসে যা বললেন তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। কারণ ইমু আমাকে না জানিয়ে কখনোই বাড়ি চলে যেতে পারে না। প্রতিবার আমিই ওকে বাসে তুলে দিয়ে আসি। আর এবার তো আমাদের একসাথেই যাওয়ার কথা ছিল। তাহলে ইমু কীভাবে আমাকে কিছু না বলেই চলে যেতে পারে ভেবেই আমি অবাক হয়ে গেলাম।

হতাশ হয়ে আবার ফিরে আসলাম ম্যাচে। আজ একসাথে দুজনের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। ইমু যেখানে একাই চলে গেছে সেখানে আমি বাড়ি গিয়ে কীই বা করবো। আর এইভাবে মন মরা দেখলে বাড়ির সবাই হাজার রকম প্রশ্ন করবে। তারচেয়ে না যাওয়ায় ভালো। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন ইমুর শূন্যতা আমাকে আরও আকড়ে ধরছে। ওকে ছাড়া এতোটা কষ্ট হবে সেটা কখনো বুঝতে পারিনি। আসলে যতই রাগ অভিমান হোক না কেন ওকে ছাড়া তো এর আগে কখনো থাকিনি। তাহলে বুঝবো কীভাবে ওকে ছাড়া এতটা কষ্ট হবে।

দেখতে দেখতে প্রায় এক মাস পার হয়ে গেল। এখন পর্যন্ত ওর নম্বরটা বন্ধ। ও একবার আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করলো না। আমার অপরাধটা কোথায় ছিল সেটা অন্তত বললে নিজেকে শুধরে নিতে পারতাম। এখন ইমুকে ভীষণ বলতে ইচ্ছে করে “জানো ইমু তোমার আকাশ আর অল্পতেই হেসে গড়িয়ে পড়ে না। তোমার আকাশের ভীষণভাবে তার ইমুকে প্রয়োজন। তুমি প্লিজ ফিরে এসো ইমু।” আজ দুইদিন ধরে রুমমেট জোরাজুরি করছে তার সাথে তার বাড়ি যাওয়ার জন্য। আসলে ওর ভাইয়ের নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে।

আমাকে না নিয়ে নাকি কিছুতেই সে বাড়ি যাবে না। আর সে না গেলে তার ভাই বিয়েও করবে না। এইসবের কোনো মানে হয়। ছেলেটার সাথে পরিচয়টা খুব বেশি দিন হয়নি এখনো। তার মধ্যেই কীভাবে যে ও আমাকে এতটা আপন করে নিয়েছে ভেবে কিছুটা অবাক হই আমি। আসলে পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা অল্পতেই খুব আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা নিয়েই জন্মায়। আর কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা টুপ করেই জীবনে এসে হাজারো সুখ দুঃখের স্মৃতি রেখে আবার টুপ করেই জীবন থেকে হারিয়ে যায়। আচ্ছা ইমু কি সত্যি চিরতরের জন্য আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে? হাজার অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুমমেটের জোরাজুরিতে আসতেই হলো ওর সাথে। এসে বুঝতে পারছি খুব ধুমধাম করেই ওর ভাইয়ের বিয়ে হচ্ছে। চারিদিকে রঙিন আলোর ছড়াছড়ি। কিন্তু কোনো আলোয় আর আমার মনের অন্ধকার দূর করতে পারছে না।

এক পর্যায়ে রুমমেট তার ভাই আর হবু ভাবির সাথে পরিচয় করানোর জন্য ভেতরে নিয়ে গেল। এই রকম অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের মুখোমুখি কখনো হতে হবে কল্পনাতেও ভাবিনি। কনে সেজে যে মেয়েটি বসে আছে সে আর কেউ না, বরং আমার চির পরিচিত অপ্সরা ইমু। এই মুহূর্তে ঠিক কী বলা উচিত তা আমার ঠিক ধারণার বাইরে। তবু মুখ দিয়ে অস্পষ্টভাবে বেরিয়ে পড়লো “খুব সুন্দর দেখতে তোমার ভাবি।” বিয়ে বাড়িতে থেকে আমার স্বপ্নের পরীর সাথে অন্য কারো যুগল বন্দী দেখার মতো এতটা দুঃসাহস আমার কোনো কালেই ছিল না। আর কোনোদিন হবেও না, তাই অনেক আগেই বাড়ি থেকে বেশ দূরে চলে এসেছি। এখান থেকে আর কোনো বিয়ে বাড়ি দেখা যাচ্ছে না। কোনো রোশনাই কিংবা শানাইয়ের শব্দও আর শোনা যাচ্ছে না।

আমি এখন একটা পুকুরের সামনে বসে আছি। অবশ্য এটা পুকুর না নদী তাও ঠিক জানি না। পানির দিকে তাকিয়ে আছি আর আমার প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজছি। কিন্তু নাহ, কোনো উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছি না। ভীষণ চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে কেউ এক এক করে আমার বুকের পাঁজরের সবগুলো হাড় ভেঙে ফেলছে। এই যন্ত্রণা আমি একদম সহ্য করতে পারছি না। কাঁধের ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছি। হ্যাঁ ডায়েরিটা ইমু আমাকে গত বছর ফ্রেন্ডশিপ ডেতে দিয়ে বলেছিল, এই ডায়েরিটা যতক্ষণ আমার সাথে থাকবে ততক্ষণ বুঝবো ইমু আমার সাথেই আছে। সেইদিনের পর থেকে এক মুহুর্তের জন্যও আমি ডায়েরিটাকে হাত ছাড়া করিনি। কারণ আমি এক মুহূর্তও ইমুকে ছাড়া থাকতে চাই না।

আজ ইমুর সব কথা আমার ভীষণ মিথ্যে বলে মনে হচ্ছে। আমার ইমু তো আর আমার সাথে নেই। আমার হাসি কান্নাতেও তো আর ওর কিছু যায় আসে না। ও তো ওর নতুন জীবন সাজাতে ব্যস্ত। তাহলে এইসব ডায়েরি আমি নিজের কাছে রেখে কী লাভ? যেখানে ওকেই সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলেছি সেখানে ওর দেওয়া এইসব স্মৃতি আমাকে কী সুখই বা দেবে। ডায়েরিটা তাই ছুড়ে ফেলে দিলাম পানির মধ্যে। ধীরে ধীরে ডায়েরির একটা করে পৃষ্ঠা ডুবছে আর সেই সাথে তলিয়ে যাচ্ছে আমার এতদিনের আশা, ভরসা, বিশ্বাস, ভালোবাসার ইমু।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত