ঢাকা থেকে চাঁদপুর

ঢাকা থেকে চাঁদপুর

আমি সবসময়ই লঞ্চেই যাতায়াত করি । কারণ নদীতে কোন যানজট নেই ; আছে নির্মল বাতাস আর দু’চোখ ভরে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ ।

ক্লাশ শেষ করে সদরঘাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ১১টা বেজে গেল । টিকেট কেটে লঞ্চে উঠলাম । রাতে একটু আরামে ঘুমানো যাবে বলে ১ম শ্রেণীর টিকেটই কাটলাম । গিয়ে দেখি আমার সিটে একটা মেয়ে চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসে আছে । পকেট থেকে আমার টিকেটটা বের করে আবার দেখলাম । নাহ্ , আমার সিটতো ওটাই ।

– এক্সকিউজ মি ।

– জ্বী বলুন ।

– আপনি যে সিটে বসে আছেন সেটা আমার ।

– কিন্তু আব্বু তো বলে গেল এটাই আমার সিট ।

– আপনার টিকেট দেখুন । টিকেটে সিট নং দেওয়া আছে । মিলিয়ে দেখুন ।

মেয়েটা ওর ব্যাগ থেকে টিকেট বের করলো । আমি টিকেটটা দেখে বললাম,”আপনার সিট আমার পাশেরটা । আমারটা জানালার পাশে ।” মেয়েটা ওর ব্যাগগুলো নিয়ে পাশের সিটে এসে বসলো । আমি আমার সিটে বসে চোখ বন্ধ করে হ্যাডফোন দিয়ে গান শুনতে লাগলাম । ১২ টায় লঞ্চ ছাড়লো । বুড়িগঙ্গা নদীর উপর তরতর করে বয়ে চলছে লঞ্চ । কখন যে চোখে ঘুম চলে আসছে বুঝতেই পারি নি । হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শে ঘুম ভেঙ্গে গেল । চোখ খুলে তাকিয়ে দেখলাম মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।

– শুনছেন, আপনি কি ঘুমিয়ে পড়েছেন ?

– হুম, একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । কি হয়েছে বলুন ?

– কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি ?

– বলেন ।

– আমি কি জানালার পাশের সিটটাতে বসতে পারি ?

মেয়েটার দিকে একটু তাকিয়ে ঘাড় দুলিয়ে বললাম,”ঠিক আছে বসুন ।” আমি মেয়েটাকে আমার সিটে বসতে দিয়ে আমি পাশের সিটটাতে বসলাম । ১ম শ্রেণীর মেইন লাইটটা অফ করে দেওয়া হয়েছে । হালকা মৃদু আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে । আমি আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম । নাহ্ , ঘুম আসছে না । চোখ খুলে দেখলাম মেয়েটা হালকা আলোতে বই পড়ার চেষ্টা করছে । আমি মোবাইলের ফ্ল্যাশ আলোটা জ্বালিয়ে বললাম,

– “এত অল্প আলোতে পড়লে তো চোখের প্রবলেম হবে ।” মেয়েটা একটু হেসে বলল,

– “কি করবো বলেন ? ঘুম আসছে না ; সময়ও কাটছে না ; আর কেউ নেইও কথা বলার জন্য ।”

– চা খাবেন ? আচমকাই প্রশ্নটা করে ফেললাম । মেয়েটা একটু দ্বিধা করে বলল,

– হ্যা , খাওয়া যেতে পারে ।

– ঠিক আছে আপনি ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ান । আমি চা নিয়ে আসছি ।

মধ্যরাতের চাঁদটা আকাশময় ভেসে বেড়াচ্ছে । ঝিরঝিরে বাতাস বইছে । নদীর ঢেউয়ের তালে তালে খেলা করছে চাঁদের আলো । মধ্যরাতের এই অন্ধকারে চাঁদের আবছা আলো অদ্ভুত সৌন্দর্য তৈরী করেছে পরিবেশে ।

– এই নিন আপনার চা । মেয়েটা হাসিমুখে কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিল ।

– আপনার নামটাই তো জানা হলো না ?

– ওহ্, সরি আমি সারিথা ।

– এত রাতে একা লঞ্চে চাঁদপুর যাচ্ছেন ?

– আসলে আম্মুকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে । আব্বুর অফিস আছে । তাই একাই যাচ্ছি । এখন ক্লাশ অফ ।

– ওহ্ বুঝলাম ।

চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিলাম । লঞ্চটা মধ্যরাতের নীরবতা ভেঙ্গে ধীরে ধীরে গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে । আমি আর সারিথা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছি।

– আপনি কবিতা বলতে পারেন ? কবিতা আমার খুব পছন্দ ।

– টুকটাক পারি আরকি । কি নিয়ে বলবো ?

– কি নিয়ে আবার ? আমাকে নিয়ে । আব্বু বলে আমি নাকি কবিতা লিখার মত মেয়ে ।

সারিথার দিকে তাকালাম । শুভ্র মুখে চোখগুলো যেন মুক্তা । পাঁপড়ি গুলো হালকা কাজলে রঞ্জিত । খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে । বাতাস যেন ওর চুলে হারিয়ে যেতে চাইছে । আসলেই কবিতা লেখার মতোই সুন্দর সারিথা । কোন কবিই ওকে দেখে কবিতা লিখার লোভ সামলাতে পারবে না । কিন্তু আমি তো কবি নই । তারপরও গুছিয়ে দু’এক লাইন বলার চেষ্টা করলাম – “নদীর বুকে চন্দ্রময় মাঝরাতের অদ্ভূত নিস্তব্ধ নীরবতা, ঐ চাঁদ চুপি চুপি বলে যায়,কানে কানে কারও কথা । আজ যেন ধরণীতে উদিত হয়েছে চাঁদদ্বয়,এক চাঁদ আমার পাশে অন্যটা আকাশময় ।এলোমেলো চুলের অপরূপ সুন্দর তার মুখখানা , মনে হয় কোন অপ্সরী মর্ত্যে নেমেছে কেটে তার ডানা ।” কবিতা শুনে সারিথা খুশি হয়ে বলল,”ভাবি নি আপনি এত সুন্দর করে কবিতা বলতে পারবেন !!” আমি লজ্জিত কন্ঠে শুধু ধন্যবাদ বললাম ।

– “আপনি চাইলে আমাকে তুমি করে বলতে পারেন । আমি আপনার বয়সে ছোট হবো”,সারিথা বলল ।

– আপনি চাইলেও তুমি করে বলতে পারেন । সারিথা আমার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল । আমি দরজার দিকে হাটঁতে লাগলাম ।

– এই যে শুনো । আমাকে এখানে একা রেখে তুমি চলে যাচ্ছো ? সারিথার ডাকে পিছনে ফিরে তাকালাম ।

– তোমার মুখে তুমি ডাকটা তো অনেক মায়াবী ।

– তাই ।

– হুম ।

সারিথা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো । এত সুন্দর হাসি আমি কখনও কোন মেয়ের দেখি নি ; নাকি কারও হাসিতে সৌন্দর্য খুঁজি নি ? আজ এই চন্দ্রময় মাঝরাতে হঠাৎ দেখা হওয়া এই অপরূপার মুখেই কিনা খুঁজে পেলাম সেই সৌন্দর্য যা আমি জীবনভর খুঁজে এসেছি ।

– ছাদে যাবে ?

– ভয় করে ।

– কিসের ভয় ? আমি আছি তো ।

– আচ্ছা চল ।

সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলাম দু’জন । চাঁদটাকে আজ অসম্ভব সুন্দর লাগছে । মনে হচ্ছে চাঁদের আলো আজ আমার মনের অনুভূতিকে নতুন রং রাঙ্গিয়েছে । ছাদে উঠে লঞ্চের একদম সামনে গিয়ে দাড়াঁলাম । রেলিংয়ে হাত দিয়ে দাড়াঁলো সারিথা । লঞ্চটা নদীর ঢেউ ঠেলে গন্ত্যবের দিকে এগোচ্ছে । বাতাস সারিথার চুল নিয়ে খেলা করছে ; লুকোচুরি খেলছে যেন । সারিথা বারবার হাত দিয়ে ওর মুখ থেকে চুলগুলো সরাচ্ছে । বাতাসে ওর চুলের ঘ্রাণ মিশে অদ্ভুত এক মাদকতা সৃষ্টি হয়েছে চারপাশে ।

– জানো খুব ভালো লাগছে আমার । আমার জীবনে এই রাতটা খুব স্মরণীয় হয়ে থাকবে । ধন্যবাদ তোমাকে ।

আমি কিছু না বলে সারিথার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম । জানি অনুভূতিগুলো খুবই স্বার্থপর। মনে ঝড় তোলে কিন্তু সে প্রকাশে অক্ষম। খুব ইচ্ছে করছে সারিথার হাত ধরে একসাথে চন্দ্রবিলাস করতে’; ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে তার এলোমেলো চুলগুলো। কিন্তু অনুভূতির কোন অধিকার নেই ; ইচ্ছের কোন অধিকার নেই।

স্মৃতির ডায়েরীটা বন্ধ করলাম। নদীর স্রোতের মত সময়ও বহমান। দশ বছর চলে গেল এর মাঝেই। চশমা পড়া আমি লঞ্চের ছাদে রেলিং পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সময়টা আজও চন্দ্রময় মাঝরাত। তবে পরিবর্তন এসেছে আমার মাঝে। চেহারায় যৌবনের ছাপটা মুছে যাচ্ছে ক্রমশ। সেদিনের সেই কবিতা লেখা অপরূপা সারিথা আজও আমার পাশে। তবে আজ ওর হাত বা চুল ছুঁয়ে দেখতে বারণ নেই।

সারিথা আমার কাঁধে মাথা রেখে বলল,”সারাজীবন এমনভাবেই আমার পাশে থেকো।”আমি ওর চুলে হাত বুলিয়ে একটু হাসলাম। আজ অনুভূতিগুলো স্বার্থপর নয়। অধিকার আছে অনুভূতির। লঞ্চটা ঢেউ ঠেলে ধীরে ধীরে গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে। সময় তো চলেই যায়। অনুভূতিগুলোও পরিবর্তন হয়। কিন্তু শুধু ভালোবাসা থেকে যায় । হারায় না প্রকৃত ভালোবাসা। ডায়েরীর প্রতি পাতায় স্মৃতি কথা লিখা থাকে। কিন্তু ডায়েরীর প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা থাকে “সেই ভালোবাসা এই ভালোবাসা”।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত