লুতুপুতু গল্প

লুতুপুতু গল্প

সরষে ইলিশ রাঁধতে পারো?

-হ্যাঁ পারি ডালের বড়া?
-হ্যাঁ। দুপুর নাগাদ বাসন্তী রেস্তোরাঁয় হটপটে করে নিয়ে এসো তবে।

-কিন্তু বাসায় যে রান্নাবান্না করা যাবেনা,মা সন্দেহ করবেন রান্নাবান্না করে সেগুলো আবার হটপটে করে বাইরে নিয়ে গেলে। মাকে বলবে তোমার এক বন্ধু বাইকে এক্সিডেন্ট করে মরমর অবস্থা,তার অনেকদিনের শখ তোমার হাতের ইলিশ,বড়া খাওয়া।তোমার মা নিশ্চয়ই এতটা নির্দয় না যে মরতে যাওয়া মানুষের জন্য রাঁধতে বসলেও বাঁধা দেবেন।

-মিথ্যা বলব? আচ্ছা ঠিক আছে বলবো।তুমি দেড়টা নাগাদ থেকো রেস্তোরাঁয়, এখন তাহলে রাখি? আচ্ছা। আল্লাহ হাফেজ।

ফোনকলে কথা শেষ হতেই বাইরে বেরিয়ে এলাম,উদ্দেশ্য বসুন্ধরা শপিং মল।চিটচিটে রোদে পিঠ ঘেমে চলেছে চিড়িৎ চিড়িৎ করে।ওদিকে রান্নাঘরে আয়েশাও হয়তো ঘামতে শুরু করেছে চুলোর আঁচে।আয়েশার সাথে পরিচয় বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবসের সেমিনার থেকেই।তামাকে যেমন নেশা ধরে তেমনি আয়েশার টিপে টিপে কথা বলার ঢঙ, আয়েশার কোকিলের মতো ছোট্ট চোখে সেদিন থেকেই আমার নেশা ধরেছে।এক নেশা ছাড়ার সেমিনারে অন্য নেশা নিজের ধমনীতে নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরে ছাগলের মতো সারারাত জাবর কেটে সেমিনারে দেখা আয়েশাকে বারবার ভেবেছিলাম।তবে বুঝতে দেইনি,ভালোলাগা ব্যাপারটা হওয়া উচিত চোর পুলিশের মতো ধরা দিলেই তা পানসে হয়ে যায়।আমিও সিঁদেল চোরের মতো খালি সিঁদ কেটেই চলেছি এতদিন ধরে, একবারের জন্যও ধরা দেইনি।তবে আজ ধরা দেব, বেশি দেরি হলে বাংলাদেশের পুলিশ যেমন আসল চোরকে ধরতে না পেরে ভুলভাল লোককে ধরে আয়েশার বাবা মাও তেমনটা করতে পারে যেকোন সময়। কাজেই ধরা দেবার সময় হয়ে গেছে। টিউশনের জমানো টাকা থেকে ছোট্ট একখানা ডায়মন্ডের নাকফুল নিয়েছি,দু গোছা কাচের চুড়ি আর একখানা শিমুল তুলোর বালিশ।আয়েশা ঘুমের পাগল।এক বন্ধুকে দিইয়ে স্টাম্প পেপার কিনিয়ে এনেছি।যা হবে কাগজে কলমে হবে।

রেস্তোরাঁর বেটে ওয়েটারটা একটু পর পর এসে জিজ্ঞেস করছে,স্যার কী খাবেন? খাসি,মুরগী,গরু,চিতল মাছ,কৈ মাছ,রুই মাছ,কলিজা,কাচ্চ ি।কী খাবেন বলেন। বেশ শান্ত গলায় দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,ভাই আমার হলেও হতে পারে প্রেমিকা আসুক।তারপর বলছি। ওয়েটা দাঁত বেরে করে হেসে বলল,ওকে স্যার, ওকে। আয়েশা আমার সামনে এসে বসেছে,হাতে নীল রঙের একখানা হটপট।বেচারির সারা মুখ জুড়ে উত্তেজনা আর কপালে চিন্তার ভাঁজ।তার রান্নায় পাশ মার্ক পাওয়া নিয়ে সে বেশ সন্দেহে আছে তা অল্পতেই টের পাওয়া যাচ্ছে। ওয়েটারকে শুধু ভাত আর পানি দিতে বলায় তার মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।রোবটের মতো ভাত আনতে হেঁটে চলে গেল সে। রাঁধতে খুব কষ্ট হয়েছে বুঝি?

-আরে না! কষ্ট হবে কেন! আমার রেঁধে অভ্যাস আছে। তবুও হুটহাট করে বায়না ধরাটা মনে হয় অন্যায় আবদার হয়ে গেল,না?
-উহু! অন্যায় আবদার হবে কেন? আর আবদারের জায়গাটা তোমার আছে বলেই করেছ। ওয়েটার ভাত এনে দিতেই আয়েশা ছোট্ট বাটি দুটো বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিল। সে খেয়ে এসেছে,অনুরোধ করেও খাওয়াতে পারলাম না।

ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, ডালের বড়া আর কাঁচামরিচে কামড় বসিয়ে বললাম,তুমি আমাকে পছন্দ করো? আয়েশা যেন বড়সড় ধাক্কা গেল,নিজেকে কেমন করে যেন গুটিয়ে নিল।আমি ঢকঢক করে আধা গ্লাস পানি শেষ করে আবার বললাম,পছন্দ করো আমাকে? করলে বলে দাও,তুমি যা চাইবে আজ তাই পাবে।আর না করলে এক্ষুনি ফেসবুকের ফ্যামিলি মেম্বার অপশনে ব্রাদার হিসেবে আ্যড করে দাও। আয়েশা মাথা নিচু করে বলল,হ্যাঁ করি পছন্দ। আমি সরষে ইলিশ দিয়ে ভাত মাখিয়ে নিতে নিতে বললাম,ভালোবাসো আমাকে? আয়েশা আর মাথা উঁচু করার সাহস করল না।আমি মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে বললাম,চুপ হয়ে আছ কেন? খাওয়া শেষ হলেই আমি উঠে যাব।টিউশন আছে,কোচিং ক্লাস নিতে হবে।ভালোবাসো আমাকে? আয়েশা তবুও কোন উত্তর দিল না।বুঝতে পারলাম যা বলার আমাকেই বলতে হবে।

আয়েশা শোন,তোমার হাতে আমাকে ভালোবাসার অনেকগুলো কারণ আছে তবে আমাকে ভালো না বাসার বেশ কতগুলো কারণ আমি তোমাকে বলি,প্রথমত আমি বাউন্ডুলে স্বভাবের,অন্যদের মতো ওমক তোমক চাকরির পেছনে ছুটতে পারবো না।গ্রাজুয়েশন শেষে মুরগীর ফার্ম দিব,গরুর ফার্ম দিব। তোমার কিংবা তোমার ফ্যামিলি স্টাটাসের সাথে সেটা যায়না।দ্বিতীয়ত আমি নিম্নমধ্যবিত্ত ফ্যামিলির ছেলে,জীবনটা বাংলা মুভির মতো না যে আমি তোমার আব্বার সামনে যেয়ে গলা ফাটিয়ে বলব,চৌধুরী সাহেব ভালোবাসা ধনী গরীব দেখে হয়না।আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি সেখানে অনেক কিছু হিসেব করে চলতে হয়,তোমার ফ্যামিলি জয়েন্ট ফ্যামিলি এলাউ করবে বলে মনে হয়না।আরও নানা কারণ আছে আমাকে ভালো না বাসার।বাই দ্য ওয়ে,সত্যিই কী তুমি ইলিশটা রেঁধেছ?
আয়েশা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল।

বেশ রেঁধেছ,তুমি আমার বউ হলে রোজরোজ এমন রান্না খেতে পারতাম।সেই কপাল আমার নেই। আয়েশা মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বলল,আছে তো।আমি রেঁধে খাওয়াব,আর তোমাকে ভালো না বাসার যতগুলো কারণ তোমার হাতে আছে তার চেয়ে সহস্র গুণ কারণ আমার হাতে আছে তোমাকে ভালোবাসার। বাঁ হাত দিয়ে আয়েশার থুতনিটা ধরে উঁচু করে বললাম,নাকখানা ঠিক এই কারণেই ফোটাতেই বলেছিলাম।পকেটে হাত দাও। আয়েশা ঠোঁট টিপে হেসে বলল,পকেটে কী? আহ,দেখোই না।

আয়েশা পকেট থেকে নাকফুলটা বের করে আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।চোখে পানি চিকচিক করছে।
আমি আয়েশাকে পানি ফেলার সুযোগ না দিয়ে বললাম,এটা তোমার।সূর্যের আলোয় তোমার নাকখানা আস্ত মুক্তের খণ্ড মনে হবে,বেখেয়ালি প্রেমিক ক্লান্ত দুপুরে নাকের ঘামতে থাকা মুক্তখণ্ড দেখেই না হয় তৃষ্ণা মেটাবে।আর হ্যাঁ এই ব্যাগে একটা শিমুল তুলোর বালিশ এনেছি তোমার জন্য। আয়েশা অবাক চোখে বলল,বালিশ কেন! তুমি আরাম করে ঘুমাবে বলে। আয়েশা ফিক করে হেসে বলল,আর কী এনেছে? আর কিছুই আনিনি তবে একটা স্টাম্প পেপার এনেছি।

-স্টাম্প পেপার কেন? কী লেখা তাতে?

দ্বিতীয় ইলিশের টুকরোটা পাতের কোণায় নিয়ে বললাম,তাতে লেখা আছে, দু হাজার উনিশ সালের সেপ্টেম্বরের নয় তারিখ হতে তোমার সকল রাগ,অভিমান,বাজে স্বভাব,ভুল আর ভালোবাসার একছত্র অধিকারী আমি।স্বাক্ষর করবে না?

আয়েশার চিবুক চুইঁয়ে পানি পড়ছে,নোনা পানি।আয়েশা কাঙালের মতো আমার দিকে তাকিয়ে বলল,প্রপোজ করবে না? আমি সরষে ইলিশে মাখানো এক লোকমা ভাত আয়েশার মুখের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম,এভাবে আমৃত্যু তোমার হাতে সরষে ইলিশ খেয়ে যেতে চাই,আমাকে সে সুযোগটা দেবে? আয়েশা মুখে ভাত নিয়ে মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত