একটি রাগান্বিত পরীর গল্প

একটি রাগান্বিত পরীর গল্প

সকালবেলা অফিস যাবার জন্য রেডি হবার সময় আবিষ্কার করলাম আলমারিতে আমার কোন শার্ট বা প্যান্ট নেই।পাশের তাকে আনিকার জামাকাপড় থাকে।যদিও এখন সেটা ফাকা।কিন্তু আমারটা গেল কোথায়?আস্তে আস্তে ঘটনা ক্লিয়ার হল আনিকা গতকাল রাগ করে বের হয়ে যাবার সময় আলমারি থেকে নিজের কাপড়চোপড় তো নিয়েছেই সাথে আমারটাও নিয়ে গেছে।এখন কি পড়ে অফিস যাব এটাই চিন্তার বিষয়। তবুও মনে মনে খুশি হলাম আমি।যাক আমার বউ কঠিন লেভেলের বুদ্ধিমতী।স্বামীকে শিক্ষা দেবার জন্য এরকম ইনোভেটিভ আইডিয়া বোধ হয় প্রথম আনিকাই বের করল।

ট্রাউজার আর টিশার্ট পড়েই অফিসের জন্য বের হলাম।আশেপাশে শোরুম দেখে ঢুকে পড়লাম।এত সকালবেলা সেলসের ছেলেমেয়েগুলো সবে চোখ ডলতে ডলতে ঢুকছে।আমিও ঢুকলাম।একটা নীল রঙের শার্ট পছন্দ হল। তবুও মনটা খচখচ করছে।আনিকার মন্তব্য নেয়া যেতে পারে।কল দিলাম ওকে।দুবার রিং হতেই রিসিভ হল, “কি গো কি করছ?”বললাম আমি। “ফোন দিয়েছো কেন?” “এই তোমাকে একটা শার্টের ছবি পাঠাচ্ছি মেসেঞ্জারে দেখো তো?” “মানে সৌরভ? তুমি কোথায় এখন?” “একটা শোরুমে।আজকে আমার কলিগ আছে না।শিলা।শিলার বাসায় দাওয়াত আছে।অফিস থেকে সোজা যাব।শার্ট প্যান্ট তো সব নিয়ে গেলে।নাংগা তো আর যেতে পারি না” “শালা।শয়তান।যা তুই তোর ঐ শিলা পরীর কাছেই যা”বলে ফোন কেটে দিল আনিকা।আমি নীল শার্ট আর একটা প্যান্ট কিনে পড়ে অফিসের দিকে রওনা দিলাম।

ঘটনার সূত্রপাত আসলে এক পরীকে নিয়ে।গতকাল অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় বাসে উঠতেই পিছনের দিকে একটা মেয়েকে দেখি।সাদা একটা ওড়না মাথায়।জাস্ট বিউটিফুল।একদম পরীর মত।যদিও কখনো পরী দেখিনি।তবে মনে হয় মেয়েটার মতই হবে।কিন্তু আফসোসের ব্যাপার হল আমি যে স্টপেজে বাসে উঠলাম ঠিক তার পরের স্টপেজেই পরীটি নেমে গেল।মনে কষ্ট পেলাম।কিন্তু আমি সৌরভ।সৌন্দর্য্যের সৌরভের পূজারী।সৌন্দর্য্যের প্রশংসা করতে কুন্ঠাবোধ করি না।সাথে সাথে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম, “পরীরা এমনই।আমি যে স্টপেজে বাসে উঠব,ঠিক তার পরের স্টপেজেই পরী নেমে গিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়” ভালই লাভ,হাহা পড়ছে পোস্টে।মনটা পুলকিত হয়ে গেল।বাসায় যখন ঢুকলাম তখন টের পেলাম মনে তো আমার ঝড় বইছিল কিন্তু বাসায় একটা ঝড় হ্যারিকেনে রূপান্তরিত হয়ে আছে।এর দুইঘণ্টা পর হ্যারিকেনটি বাসা লন্ডভন্ড করে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে গেল।

এতে আমি খুব একটা বিচলিত হলাম না।বিবাহিত জীবনে সবারই একটা ব্রেক দরকার।কয়েকদিনের মিথ্যা মিথ্যা ব্যাচেলর জীবন।আরাম করে হাতমুখ ধুয়ে ফুডপান্ডায় কাচ্চি অর্ডার করলাম একটা।ঢেকুর তুলে খেয়ে একঘুমে রাত কাবার। অফিস শেষে বাসায় ঢুকতে গিয়ে দেখি দরজায় তালা।চাবি আমার কাছে আছে কিন্তু তালা দেখি ভিন্ন।ব্যাপারটা কি হল।তালা বদলায় গেল কিভাবে?নীচে নেমে দারোয়ানরে চেপে ধরলাম। “ব্যাটা বল কাহিনী কি?” “কি কাহিনী ভাইজান?” “কে ঢুকছে আমার বাসায়?”

“ভাবীসাব আইছিল।আইলো পনের মিনিট পর আবার চইলা গেছে” আমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেছে।আনিকা আমার সাথে এখন টম অ্যান্ড জেরী গেম খেলছে।আমাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য আমার মৌলিক অধিকারে হাত দিয়েছে।প্রথমে অন্ন আর বস্ত্রে।এখন বাসস্থানে।বাহ স্বামীকে শিক্ষা দেয়ার জন্য আরেকটি ইনোভেটিভ আইডিয়া।খুশিতে মনটা ভরে উঠল।কল করলাম আনিকাকে। “হ্যালো আনিকা” “বলো” “আজ আমি অনেক খুশি” “মানে?” “তুমি একটা বই লেখা শুরু কর।স্বামীকে শিক্ষা দেবার ইনোভেটিভ পাচটি উপায়।পাচ দশ টাকার ছোট সাইজের বই হবে।শেষ পেজে লিখা থাকবে ফল না দিলে মূল্য ফেরত।যাও ইনভেস্ট আমিই করব” “হাও ডেয়ার ইউ?তুই আমার সাথে মসকরা করিস?” “আহা তুই তোকারি করছ কেন?” “তুই কই?”

“তুমি তো আমার অন্ন,বস্ত্র,বাসস্থান সব কেড়ে নিয়েছো।কই আর যাব।দেখি নিয়াজের বাসায় যাব।ওর বউ ডাল চচ্চরিটা যা রান্না করে।আজকে সুযোগ পেয়েছি।আবদার করলে ভাবী ফেলবে না।তুমি একসময় ভাবীর কাছ থেকে প্রসেসটা শিখে নিতে পারো।শেখার কোন বয়স নাই” আনিকা কোন কথা বলতে পারছে না।ওর শিক্ষার কোন আছর আমার উপর পড়তেছে না কেন সেটা ভেবে মনে হয় শকড। আনিকার বাসার একটু কাছে একটা চায়ের টং এ বসে আছি।দোকানদার আমাকে আনিকার বাসা শ্বশুর বাড়ি হবার আগে থেকেই আমাকে চিনে।আনিকার সাথে আমার ঝগড়া হলে ঝগড়ার শেষ দৃশ্য এখানে সংঘটিত হয়।সেই থেকে দোকানদার মামা আমাকে তার দোকানে দেখলেই বুঝে যায় আমার ঝগড়া পিরিয়ড চলছে।যদিও বিয়ের পর আনিকার বাসায় আসলে এখানেই এসে বসি।তবে অসময়ে আসলে মামা বুঝে যায়। মাঝে মাঝে সাজেশনও দেয়।

“মামা এইবারের ঘটনা কি?”দোকানদার মামা তার পান খাওয়া লাল দাত বের করে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল।সংক্ষেপে খুলে বললাম।শুনে মামা মাথা নাড়াতে লাগল আর বলতে লাগল, “এইবার কিন্তু আপনের দোষ।যা করার আপনেরি করা লাগব” “যা করার করে ফেলছি।এখন খালি রেজাল্ট দেখবেন” “কি করছেন?” “শুনেন স্বামীরা হল স্ক্রুর মত।বেশি টাইট দিলে থ্রেড কেটে যায়।তখন আর কন্ট্রোলে থাকে না।স্ক্রু টাইট দেয়ার সময় স্ক্রু কিন্তু ওয়ার্নিং দেয় যে আর একটু টাইট দিলে আমি কেটে যাব।তেমনি আমার ওয়ার্নিং দেয়া শেষ”

“কি ওয়ার্নিং দিছেন?” “ওই যে বললাম নিয়াজের বউ এর ডাল চচ্চরি খেতে অনেক চমৎকার।বউয়েরা স্বামীর সব সহ্য করে।কিন্তু বাইরের কোন মেয়ে কিংবা কারো বউয়ের প্রশংসা নিতে পারে না।গিলে নিলেও হজম করবে না।তখন এরা স্বামীর সাথে নিজের গিট্টু আরো টাইট করবে”

এসব বলছি তখন দেখি আনিকা গটগট করে হেটে এদিকে আসছে।আমি দোকানদার মামাকে বললাম, “ওই দেখেন গিট্টু টাইট করতে আসতেছে”বলে সামনে এগিয়ে গেলাম।আনিকার পরনে কলাপাতা রঙের একটা শাড়ি।চুলগুলো খোপা করে বাধা।চোখগুলা একটু ফোলা।কেদেছে মনে হয়।সোডিয়ামের লাল আলোতে ওকে একদম অন্যরকম লাগল।মায়াবী মুখটা দেখে বুকটা কেমন করে উঠল যেন।এই কেমন করে ওঠাটা সেই যে সাতবছর আগে শুরু হয়েছে এখনো যায়নি। “ফোন বন্ধ করে রেখেছে কেন?নিয়াজের বাসায় যাওনি কেন?”আনিকা জিজ্ঞেস করল। “চার্জ শেষ।সারাদিন তোমাকে দেখি নাই।তাই দেখতে আসলাম।বেশিদিন না দেখলে যদি চেহারা ভুলে যাই”

“ঢং করো?” “ঢং তো নিজের বউয়ের সাথেই করব আর কার সাথে করব?”

“হয়েছে।আর তেল মারতে হবে না।ওগুলা নিয়াজের বউয়ের জন্য রেখে দাও।এখন বাসায় চলো”বলে আনিকা আমার হাত ধরল। আনিকা আর আমি রিকশায় বসে আছি।বাসায় যাচ্ছি।আনিকা আমার হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। কাধে মাথা হেলান দিয়ে রাখা।আটকে ফেলেছে আমাকে।একদম আটকে ফেলেছে।সে আমাকে আর কোথাও যেতে দিবে না।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত