সুখী-জীবন

সুখী-জীবন

গুণে গুণে ৩ ইঞ্চি ছোট একটা ছেলেকে যখন বিয়ে করতে চেয়েছিলাম তখন পরিবারবর্গ থেকে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশি যে যেখানে আছে সেই ফ্রিতে এসে কথা শুনিয়ে যাচ্ছিল। ছেলেটার আচার-আচরণ, দেখতে-শুনতে সব দিক থেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পারফেক্ট ছিল কিন্তু বাদ সাধল তার উচ্চতা। বান্ধবীরা তাদের স্মার্ট স্বামী বা বয়ফ্রেন্ড এর সাথে তার তুলনা করতে থাকল।

একেকজনের কথা ছিল একেকরকম। যা না হজম করা সম্ভব না উগলিয়ে দেওয়া। এলাকায়, বান্ধবী আসরে কথা বলার বিষয় যেন আমি হয়ে গেছিলাম। তাদের এটা বলতে হয়নি এমনি এমনি আমি তাদের কথা বলার মূলসূত্র হয়ে গিয়েছিলাম। বান্ধবীরা একদিন আসল দেখা করতে, এসেই শুরু হল আমার বিয়ের গল্প। একজন আরেকজনকে বলছে, আচ্ছা অমি তুই ভাইয়ার বুকে মাথা রাখবি, না ভাইয়া তোর বুকে মাথা রাখবে? বলেই সবাই হোহো করে হেসে উঠল। আরেকজন সে কথা টিপ্পনী কেটে বলল, সমস্যা কি? আধুনিক যুগ, কলি যুগ এ যুগে না হয় আমাদের অমি উলটা কাজ টাই করল।

আরেকজন বলে উঠল, সমস্যা কি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় ভাইয়াকে উঁচু হিল পড়ায় দিব আর অমিকে চটি। এইভাবে তারা একেকজন কথা বলে লোকটাকে অপমান করতে থাকে সুযোগ পেলেই। কথাগুলো কেন জানি আমার সহ্য না। এদিকে এলাকায় পাড়া- প্রতিবেশীর কাঁনাঘুষা তো আছেই। ছেলেটিকে বাবার পছন্দ হলেও পাড়া-প্রতিবেশীর কথায় বাবা বিয়েটা ভেঙে দিতে প্রস্তুত হলেন। এদিকে এলাকায় রটে গেছে, এই মেয়ের সাথে হয়তো ছেলেটার তলে তলে কিছু একটা আছে তা না হলে গুণে গুণে ৩ ইঞ্চি ছোট কোন ছেলেকে মেয়ে বিয়ে করতে চায়। আবার ছেলেও কি তার থেকে বড় মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। অথচ আমারা একে অপরকে চিনতামই না। দেখতে এসে তাকে আমার পছন্দ হয় আর তারও আমাকে।

ছেলে মানুষের চোখ যে এত সুন্দর হয় তা আমার জানা ছিল না। তাকে না দেখলে হয়তো বুঝতামই না। তার চোখজোড়ার প্রেমে পড়ে গেছিলাম প্রথম দেখাতেই। তখন আমার আর কিছু মনে ধরছিল না, শুধু একটা কথায় মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, ওই চোখজোড়া আমার চাই চাই যেকোনো উপায়ে। সব কিছুই ঠিক ঠাক ছিল মাঝে বাদ সাধল আমাদের উচ্চতা। আমি তার থেকে মাত্র ৩ ইঞ্চি বেশি হলাম। তারপরও আমি যখন তাকে বিয়ে করতে চাইলাম তখন পাড়া- প্রতিবেশীর কথার পরিমাণ বেড়ে গেল। সবাই বলতে লাগল, আতিক সাহেব মেয়েকে বাইরে রেখে পড়াশোনা করিয়েছে না জানি কোথায় কি করে এসেছে। এই ছেলের সাথে মনে হয় আগের থেকে সম্পর্ক ছিল এই সেই। এদিকে বান্ধবীদের টিপ্পনী তো ছিলই। সবাই বলেছিল, বিয়ে যদি হয়ও, তবুও এ সম্পর্ক টিকবে না।

অবশেষে বাবাকে রাজি করিয়ে বিয়েটা করি ফেলি। ছেলের পরিবারের অমত থাকলেও ছেলের ইচ্ছাতে বিয়েটা হয়। বিয়ের পর ছেলের বাড়িতে যাওয়ার পর যখন সং সেজে তাদের সামনে বসেছিলাম যারা দেখতে এসেছিল তাদের সবার কথা ছিল এরকম, মেয়ে তো দেখছি খাম্বা। এই খাম্বাকে ঘরের বউ করে নিয়ে আসলা গা কি করতে? তা কত দিয়েছে? নানাজনের নানা কথা শুনতে হচ্ছিল কিছু বলতে যাব তখনি পাশ থেকে আমার শাশুড়ি মা সবার কথার উওর দিয়ে দিচ্ছিলেন। সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম তার এই ব্যবহারে। পরে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মা আপনিও তো আমাকে পছন্দ করেছিলেন না। আপনার অমতেই তো এই বিয়ে হয়েছে তাহলে আপনি কেন সেদিন আমার হয়ে কথা বললেন। তিনি তখন উওরে বলেছিল, ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক তুই এখন আমার মেয়ে, আর মা কি কখনো মেয়ের বিরুদ্ধে যেতে পারে তুই বল।

আমার ছেলের সুখই আমার কাছে বড়। তাই একটা কথা বলবো, ওকে কখনো কষ্ট দিস না। আমি মার কথা কতটুকু রাখতে পেরেছি তা জানি না। তবে সজ্ঞানে কখনো উনাকে কষ্ট দেইনি। উনার আচরণে মাঝে মাঝে অবাক হতাম। যখন রাস্তায় বেরুতাম। তখন দু’জন পাশাপাশি হাঁটলে তা কেমন জানি বেমামান দেখাতো আমার কাছে নয় লোকজনের কাছে।সবাই আগ্রহের সাথে হাহা করে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকত। তাকে একদিন বলেছিলাম, আপনি একটু সামনে হাঁটুন আমি পিঁছে পিঁছে আসছি। তিনি শুধু একবার আমার দিকে তাকিয়েছিলেন তারপর মৃদু হেসে হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিলেন, তোমার কি আমার পাশে হাঁটতে সমস্যা হয়েছে। আমি তৎক্ষণাৎ বলেছিলাম, নাহ। উনি তখন বলেছিলেন, এই হাত ধরেছি, হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পিঁছানোর জন্য না বুঝলে।

প্রথম প্রথম আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন উনাকে আর আমাকে নিয়ে নানান কথা বলত তাদের মুখ এখন বন্ধ হয়েছে। যে বান্ধবীরা বিয়ের আগে টিপ্পনী কেটে কথা বলেছিল তারা এখন বলে আমিরা নাকি সেরা সুখী জুটি। আমার সেরা সুখী জুটি হওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না, শুধু ইচ্ছা ছিল একটু ভালো থাকার। হ্যাঁ আজ আমি অনেক ভালো আছি। উচ্চতা কখনো আমাদের ভালোবাসার মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নি। অনেকে আমার শাশুড়ি মাকে বলত ছেলের বউ তো খাম্বা তা নাতি-পুতি যে কি হবে তা কি ভাবছেন?? এমন মেয়ে ঘরে তুললেন যে। তখন তিনি হেসে বলতেন, আর বলবেন না আমার বড় ছেলে,বৌমার কি কপাল দেখছেন তারা এত সুন্দর অথচ নাতিটা আমার তাদের মতো হয় নি। তাই বলে কি আমার দাদুভাই এর আদর কমে গেছে?

শুধু আমি একা চাইলে হয়তো আমরা সুখী হতে পারতাম না। পরিবারের সবাই আমাকে আপন করে নিয়েছে তাই হয়তো পেরেছি আর আমিও তাদের আপনজন ভেবেছি বলেই এতটা সম্ভব হয়েছে। অনেক জায়গায় দেখেছি বউ-শাশুরির বনিবনা হয় না বলে ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে। এরকম একটা ঘটনা স্ব-চক্ষে দেখেছিলাম, ছেলের মায়ের সাথে বউ এর পড়ে না বিষয়টা এমন ছিল মেয়েটা সহজ সরল ছিল আর তার ছেলে হচ্ছে রাজপুত্র তাই তার হা-হুতাশ এর শেষ ছিলনা।অপরদিকে ছেলে আর ছেলের বউ এর মধ্যে সম্পর্ক ঠিকই ছিল কিন্তু ছেলের মায়ের জেদের কারণে তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়।

আর এমনো ঘটেছে যে স্বামী স্ত্রীর ছোটখাট কিছু সমস্যার জন্য আলাদা হয়ে গেছেন। সবার মনে একটায় কথা আমি কেন ত্যাগ স্বীকার করব। আমি এর থেকে ভালো কিছু ডিজার্ভ করি। শেষে সবাইকে এইটুকুই বলব কিছু পেতে হলে কিছু ত্যাগ করতে হয়। আর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য ভালবাসতে শিখতে হয় করুণা করতে নয়। আমাদের ভাবনা এমন সম্পর্কটা যখন হয়ে গেছে তখন টিকিয়ে রাখার জন্য মেনে নিতে হবে। আমি বলব মেনে না নিয়ে, ভালোবেসে কাজগুলো করে দেখেন কাজের মাঝে আনন্দ পাবেন। আর আপনারাও সুখী জুটি হতে পারবেন আশা করা যায়।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত