পরিবর্তন

পরিবর্তন

“দেখো তোমার এই প্রতিদিনের ন্যাকামি আমার ভালো লাগেনা। আর হ্যা আজকে বিকেলে রেডি থেকো কোর্টে যাব।” ঘুম থেকে উঠে রিফাত কথা গুলো নূপুরকে বলল। পারিবারিক ভাবেই আজ ১ মাস হলো ওদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু রিফাত নূপুরকে মেনে নিতে পারছেনা। ওর এখন বিয়ে করার ইচ্ছে একদমই ছিলোনা। বাবা জোর করে বিয়ে দিয়েছে। বলেছে মেয়ে ভালো, সাংসারিক ব্লা ব্লা। নূপুর রিফাতকে সকালে গোসল করে যখন ইচ্ছাকৃত ভাবেই ওর চুলের পানি ছিটিয়ে দিয়েছিলো তখন-ই রিফাত উপরোক্ত কথা গুলো বলে। নূপুরকে রিফাতের বাবা বলেছিলো, আমার ছেলেটা অনেক রাগী, ও না চাওয়া সত্তেও ওকে বিয়ে দিলাম।

একটু মানিয়ে নিও মা। তবে ওর মনটা খুব ভালো। এই কয়েকটা কথার ভিত্তিতে নূপুর রিফাতকে বিভিন্ন ভাবে ভালোবাসার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নূপুর সফল হয়ে ওঠেনি। বরং রিফাত ওর সাথে সবসময় উগ্র ব্যবহার করছে। তবুও নূপুর দিনরাত সেগুলো সহ্য করে যাচ্ছে। প্রত্যেকটা মেয়েরই তাদের স্বামীকে নিয়ে আলাদা কিছু স্বপ্ন থাকে। ইচ্ছে থাকে। তেমনি নূপুরের ও আছে। একসাথে লং ড্রাইবে যাওয়া, মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে ছাদে গিয়ে চাঁদ দেখা। বৃষ্টিতে ভেজা। কিন্তু রিফাতের কর্মকাণ্ডে নূপুরের সেই ইচ্ছেগুলো মরে গেছে। রিফাত গোসল সেরে এসেছে। টেবিলে বিভিন্ন ধরনের খাবার রেডি করে রেখেছে নূপুর। রিফাত তোয়ালে দিয়ে মাথার চুল মুচতে মুচতে বলল….

–এত খাবার কার জন্য?
-বারে কার জন্য আবার, আপনার জন্য।
–তোমাকে কখনও বলেছি আমার জন্য কাবার রেডি করতে?
-বলেননি তো কি হয়েছে আমার ইচ্ছে হলো তাই করেছি। আর প্রতিদিন হোটেলের খাবার খেলে আপনার শরীর খারাপ করবে।
–আমার শরীর নিয়ে তোমার ভাবতে হবেনা, জাস্ট ডিসগাস্টিং….
-রেগে যাচ্ছেন কেনো? ভালোবেসে কি একদিন খাবার বানাতে পারিনা?
–শোন মেয়ে তোমাকে আগেই বলেছি আমার উপর অধিকার খাটাতে আসবেনা। আর আমি তোমাকে নিজের স্ত্রীর অধিকার দেইনি। সো বুঝতেই পারছো, যত্তসব…

বলেই রিফাত রুমে চলে গেলো। চেয়ারে বসে পরলো নূপুর। মনটাই খারাপ হয়ে গেলো ওর। যার জন্য এতকিছু সেই কিনা এমন করে। নূপুরের চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে। শাড়ীর আচল দিয়ে চোখ মুচে রুমে চলে যায়। রিফাত তৎক্ষনাত অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়েছে। নূপুর বলল….

–আজকে কি একটুও আমার হাতের রান্না খাবেননা?
-বললামতো খাবনা।
–কোনদিনতো করেননা, আজকে একটু করুননা প্লিজ?
-দেখো এসব ন্যাকামো আমার সামনে একদম করবানা। বলেই রিফাত চলে যাওয়া শুরু করলো। পিছন থেকে নূপুর বলল…
–বিকেলে কোর্টে নিয়ে যাবেন কেনো? রিফাত ভ্রু-কুচকে পিছনে তাকালো। তারপর মুখে বিরক্তিকর ছাপ নিয়ে বলল….
–উকিলের সাথে কথা বলবো।
-মানে?
–আমাদের ডিভোর্স নিয়ে কথা হবে।
-তাহলে আমায় বিয়ে করলেন কেনো?
–সেটা ডিভোর্সের পরই বুঝে নিও….

রিফাত হনহন করে চলে গেলো। মূহুর্তেই নূপুরের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরলো। মাথায় ডিভোর্সের কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। রিফাতকি কথাগুলো সত্যি সত্যি বলেছে? বিশ্বাস হচ্ছেনা নূপুরের। রিফাতকি সত্যি সত্যি ডিভোর্স দিবে? ভাবতে পারছেনা নূপুর। ওর চোখে পানি।

জ্যামে আটকা পরেছে রিফাত। এদিকে অফিসের সময় হয়ে আসছে। আজকে বিদেশী কোম্পানির সাথে একটা মিটিং আসছে। একটা প্রজেক্ট নিয়ে কথা হবে। যদি রিফাত প্রজেক্টা পায় তাহলে দুই কোটি টাকা লাভ হবে। এদিকে লম্বা জ্যাম লেগে আছে। গাড়ির লুকিং গ্লাস খুলে দেয় রিফাত। রাস্তার পাশে দুটো কুকুর। একটা দাড়িয়ে আছে, আরেকটা শুয়ে শুয়ে গোংড়াচ্ছে। কেউ বোধহয় কোমড়ে বারি দিয়েছে ফলে কুকুরটি সোজা হতে পারছেনা। কুকুরটির চোখে স্পষ্ট পানি লক্ষ করা যাচ্ছে। দাড়িয়ে থাকা কুকুরটি শুয়ে থাকা কুকুরের চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে আর এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। ব্যাপারটা রিফাতকে কষ্ট দিলো। ঠিক তখনি ট্রাফিক পুলিশ বাঁশি ফুকালো। রিফাত গাড়ি দিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

বিছানার উপর শুয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে কাদছে নূপুর। এই মূহুর্তে কাঁদা ছাড়া তার কোন উপায় নেই। রিফাতের বাবাকে ফোন করবে, পারছেনা। পরে যদি রিফাত জেনে রেগে গিয়ে সিনক্রিয়েট করে ফেলে সেই ভয়ে। চোখের পানি মুছলো নুপূর। ওয়াস রুমে গিয়ে শাওয়ার ছেরে দিয়ে বোবা কান্না শুরু করলো সে। যদি একটু কষ্ট কমে।

রিফাত বেশ খুশী। বেশ বলতে অনেকটাই খুশি। বিদেশী ক্লাইন্টের সাথে ওদের প্রজেক্ট পাকাপোক্ত হয়েছে। সবাই রিফাতকে কংগ্রাজুলেশন জানাচ্ছে। রিফাত ও সবাইকে হাসি মুখে ওয়েলকাম বলছে। অফিসে হারুন রিফাতের সবচেয়ে কাছের মানুষ। কিন্তু আজকে অফিসে হারুন নেই। কথাটা রিফাত পিওনকে অনেক আগেই বলতে চেয়েছিলো। কিন্তু মিটিং এর দেরি হওয়ায় বলতে পারেনি। রিফাত পিওনকে ডাকলো, বলল….

–আজকে হারুন আসলোনা কেনো?
-স্যার হারুন ভাইয়ের অনেক বড় সমস্যা হইছে।
–কি সমস্যা?
-উনার বউ নাকি অন্য পোলার হাত ধইরা ভাইগা গেছে। কথাটা শুনে রিফাত অবাক হয়ে গেলো। আগামাথা কিছুই ভালো করে বুঝলো না। বলল….
–আবার বলোতো?

-স্যার গোপনে গোপনে হারুন ভাইর বউ অন্য পোলার লগে সম্পর্ক করছে। কিন্তু হারুন ভাই জানতোনা। আজকে সকালে সুযোগ বুঝে ভাবি সেই পোলার লগে পালাই গেছেগা। অফিসে আসার সময় হারুন ভাইর বাসায় গেছিলাম, পরে শুনি এই কাহিনী। জানেন স্যার হারুন ভাই সে কি কান্না। কোন পুরুষ মাইনষে এভাবে কান্না করে জানতামনা। আল্লাহ ঐ মাইয়ার বিচার করবো। আর হারুন ভাই ভাবিকে অনেক ভালোবাসতো। রোজ আমাকে গল্প শোনাতো। আর দেখেন? সবাই কপাল স্যার।

বলেই পিওন চলে গেলো। সম্পুর্ণ ঘটনা শোনার পর রিফাত অবাক হয়ে গেলো। এটা কি করে সম্ভব। হারুন মাঝেমাঝে রিফাতকেউ ওর বউয়ের গল্প শোনাতো। সেগুলো শুনে হাসতো রিফাত। হঠাৎ-ই রিফাতের বুকটা মোচর দিয়ে উঠলো। বুকে চিনচিন ব্যাথা অনুভব হলো। হুট করে তার নূপুরের কথা মনে পরে গেলো। আচ্ছা আমি কি নূপুরের সাথে অন্যায় করছি? ও কি খুব বাঁজে? ও বাঁজে হবে কেন? আচ্ছা ওতো আমায় ভালোবাসার চেষ্টা করে। আমার জন্য রাত জেগে বসে থাকে। তাহলে আমি কেনো ওর উপর রাগ দেখাই? আমি কেন ওর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াই? কোন উত্তর খুজে পায়না রিফাত। তবে হারুনের সাথে যে নূপুরের একটা সাদৃশ্য আছে সেটা রিফাত ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। দুই প্রান্তের দুটো মানুষই একজনকে খুব করে ভালোবাসে। কিন্তু তাদের বোঝার মতন কেউ নেই। রিফাতের চিনচিন ব্যথাটা বৃদ্ধি পেয়েছে। নিজেকে আজ বড্ড অপরাধি মনে হচ্ছে। অফিস থেকে তড়িঘড়ি করে গাড়ি নিয়ে বের হলো সে।

রিফাতের কেনো জানি মনে হচ্ছে গাড়ি আজকে আগাচ্ছেনা। অনুশোচনায় রিফাতের চোখে পানি এসেছে। রিফাত রাস্তায় গাড়ি থামালো। রাস্তার পাশে থাকা কুকুর দুটি আগের মতই আছে। একজন ব্যথায় কাতড়াচ্ছে, আরেকজন চারপাশ ঘুরছে। কুকুর দুটোর মাঝে কতটা ভালোবাসা। কেউ একটু আড়াল হয়না। অথচ রিফাত…?

নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা হচ্ছে রিফাতের। পকেট থেকে ফোন বের করে নূপুরের নাম্বার বের করলো। কল দিবে, পারছেনা। হাত কাঁপছে! কল দিয়ে কি বলবে সে..? অবশেষে কল দিলো রিফাত। এই প্রথম রিফাতের নাম্বার থেকে কল আসলো নূপুরের ফোনে। নূপুর অবাক হয়ে যায়। পরক্ষনেই অজানা এক ভয়ের আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে ওঠে তার। শাড়ীর আঁচল দিয়ে চোখে পানি মুচে কল রিসিভ করলো নূপুর। কেউ কোন কথা বলছেনা। দুজনেই চুপচাপ। রিফাত ফোনে নূপুরের ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। রিফাত বলল….

–সকালের খাবার গুলো কি ফ্রিজে রেখে দিছো নাকি ফেলে দিছো?
-ফ্রিজে রেখে দিছি। (কান্নাজড়িত কণ্ঠে)
–আচ্ছা তুমি খাবার গুলো রেডি করো আমি বাসায় গিয়ে খাব।
-(ফুঁপিয়ে কান্না)

–আর হ্যা শোনো ভুল করেছি আমি। আর হবেনা, ডিভোর্সের চিন্তা মরার আগ পর্যন্ত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও। আরেকটা কথা বাসায় গিয়ে যেন তোমার চোখে পানি না দেখি। সবসময় হাসবা। তোমার হাসি অনেক সুন্দর। কাঁদলে তোমায় পেত্নীর মতো লাগে। ভালোবাসবো এখন থেকে।

ফোন কেটে দেয় রিফাত। নূপুর কিছুই বুঝে উঠতে পারলনা। হুট করে রিফাত এমন করলো কেন? ওকি বদলে গেলো? তবে রিফাতে শেষের “ভালোবাসবো এখন থেকে” কথা টা শুনে নূপুরের কেমন জানি লাগলো। অদ্ভুত এক অনুভুতি। কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলে দেয় নুপূর। রিফাতের সাথে চোখাচুখি হতেই রিফাত মুচকি হাসি দেয়। কেউ কাউকে কিচ্ছু বলতে পারছেনা। কি দিয়ে শুরু করবেনা বুঝতে পারছেনা। রিফাত সরাসরি গিয়ে টেবিলে বসে। বলল….

-তুমি বসবানা? রিফাতের কথায় অবাক হয়ে যায় নূপুর। ওকি স্বপ্ন দেখছে নাকি? আজকে বসতে বলছে। রিফাত বলল….
–বসোনা একটু। খুব খিদে পেয়েছে , জলদি খাবার দাও।

নূপুর রিফাতের প্লেটে ভাত বেরে দেয়। রিফাত হাত না ধুয়ে খাওয়া শুরু করে। নূপুরের হাসি পায়। নূপুরের রান্নার হাত এতই ভালো যে কি বলে প্রশংসা করবে রিফাত বুঝতে পারছেনা। রিফাতের চোখে পানি টলমল করছে। বাম হাত দিয়ে চোখে পানি মুচলো রিফাত। নূপুরকে বলল

–সারাজীবন এভাবে রান্না খাওয়াবা?
-আমিতো খাওয়াতেই চাই, কিন্তু আপনিইতো
–আর ওমন হবেনা নূপুর। একটা কথা বলি তোমায়?
-বলুননা।
–আমাকে খাওয়াই দিবা? কতদিন কারো হাতে ভাত খাইনা, সেই ছোটবেলায় আম্মু খাওয়াই দিত। নিজের চোখের পানি আটকে রাখতে পারেনা নূপুর, কেঁদে দেয়। রিফাত বলে
–ঐ তোমাকে না বলছি কাঁদবানা। পেত্নী
-আমি মোটেও পেত্নী না। আপনি একটা ভুত, হাদারাম

বলেই এক লোকমা ভাত রিফাতের মুখে দেয় নূপুর। রিফাতো নূপুরকে খাইয়ে দেয়। দুজনের চোখেই পানি। মুখে তৃপ্তির হাসি। ভালোবাসাও আজ ওদের দেখে হিংসে করছে। রাত দুটো বাঁজে। ছাদের উপর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে দুটি মানুষ। মানুষদুটি কে হতে পারে? ওরা এত সুখী কেনো? কি আছে ওদেট মাঝে? ভালোবাসা? নাকি অন্য কিছু! সব প্রশ্নের উত্তর হয়না। কিছু প্রশ্নের উত্তর নাহয় অজানাই থাক, ক্ষতি কি?

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত