আবেগ ও বাস্তবতা

আবেগ ও বাস্তবতা

আমি তখন কেবল ২৩ বছরে পা রাখলাম। সবে মাত্রই অনার্স কমপ্লিট করে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি।আর রেণু তখন অনার্স ২য় বর্ষে পড়ে।বাবা-মা কে না জানিয়েই ওই সময়ে রেণুকে বিয়ে করেছিলাম।রেণুর চাপেই বিয়েটা করতে হয়েছিলো।এই বিয়েটা আমার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াবে, সেটা আমি আগে কখনও ভাবিনি।ভাববোই বা কেনো? আবেগের বশে পড়ে তো স্বপ্ন দেখতে পয়সা লাগে না।তাই না? হ্যা,তবে রেণুকে আমি বহুবার বুঝিয়েছি এখন আমাদের বিয়ে করাটা ঠিক হবে না, আমরা দুজনে-ই এখন বেকার।এখন পর্যন্ত আমাদের নিজস্ব কোন অস্তিত্ব-ই নেই।

যাই হোক, সেদিন ছিলো বুধবার। দুজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হই।বিয়ের প্রথম একমাস আমি থাকতাম হলে আর রেণু থাকতো মেসে।দিনকাল তখন বেশ ভালোই যাচ্ছিলো। তবে, বিয়ের একমাস পর রেণুর কথায় একটা বাসা নিলাম।একসাথে থাকতে শুরু করলাম। বাড়ি থেকে আমি আর রেণু যে টাকা আনতাম তা দিয়ে বাসা ভাড়া আর দশদিনের খরচ কোনরকম চলতো।বাধ্য হয়ে আমি তিনটে টিউশনি নিলাম। শুরু হলো জীবনের চ্যালেঞ্জ।

(একদিন রাতে)

-জামিল, এই কষ্ট আর কতোদিন করবে?
-জানি না, আগেই বলেছিলাম, এই পাগলামিটা না করতে!
-যাজ্ঞে, যা হওয়ার তো হয়েই গেছে।এখন তুমি একটা চাকরি জোগাড় করলেই তো পারো।
-এতো সহজে চাকরি হয়? কয়েকটা প্রাইভেট ফার্মে সিভি সাবমিট করেছি দেখি কিছু হয় কিনা!
-ও আচ্ছা।তাহলে এখন ওয়াশরুমে যাও।ফ্রেশ হয়ে এসো।একসাথে ভাত খাবো।

বিয়ের দু মাস হতে চলল।বেশ ভালোই যাচ্ছে।ভালোবাসা এখনোও কমেনি।আগের মতোই চলছে সবকিছু্।সারাদিন ক্লাস করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে তিনটে টিউশনি করাতাম।তখনও এই কষ্টকে কষ্ট মনে হয়নি।কারণ এটা দিনশেষে ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে যেতো।

(বিয়ের ৩য় মাস)

এক প্রাইভেট কোম্পানি থেকে মেসেজ আসে৷ সোমবার ভাইভা।সোমবার সকালে রেণু আমাকে ভালো করে গুছিয়ে ‘বেস্ট অফ লাক’ বলে বিদায় দেয়।কোম্পানির চাকরি পেতে অভিজ্ঞতা আর রেফারেন্স লাগে বলে চাকরিটা আমার আর হয়নি।তবুও হতাশ হয়নি।একের পর এক চেষ্টা করেই যাচ্ছি।এদিকে সংসারের অভাবের ঘনঘটা বাজতে শুরু করে।বাস্তবতা যে তার মতোই এতো কঠিন, তা আগে জানতাম না।এখন সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।যাইহোক, এরিমধ্যে বিয়ের তিনমাসের শেষের দিকে রেণুর জন্যে সাতশো টাকা দিয়ে একটা শাড়ি কিনলাম।আর এটই ছিলো বিয়ের পর আমার পক্ষ থেকে রেণুকে প্রথম কোন কিছু দেয়া।এরেই সাথে আমার জন্য বাসার পাশে বসা ফুটপাতের দোকান থেকে দুইটা টি-শার্ট কিনলাম। রাতে খুশি মুখে রেণু বললো, ‘শাড়িটা খুব সুন্দর হয়েছে ‘!

-কতো দিয়ে কিনলে?
-সাতশো টাকা।এর বেশি আমার সাধ্য নেই রে!
-হ্যা, তো তো বুঝতেই পারছি।

‘জামিল, তোমার ভালোবাসা হলেই চলবে।আমি এতেই অনেক খুশি’ চারমাস খুব ভালোই কাটে।একটু-আধটু অভাব তেমন কিছু-ই মনে হয়নি।তবে, ৪র্থ মাসের শেষাংশে আমার একটা টিউশনি চলে যায়। (বিয়ের ৫ম মাস)

-জামিল, বৈশাখ উপলক্ষে কিছু কেনাকাটা করবে না?
-কিভাবে করবো? হাতে টাকা নেই তো।সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা।ফরম-ফিলাপ করতে হবে।
-তাই বলে কিছু কেনাকাটা করবে না?এই কথা আমার ফ্রেন্ডরা শুনলে আমাকে নিয়ে হাসবে তো।এটা আমার সহ্য হবে না।আমি এটা পারবো না, জামিল!

বিয়ের পর আজ প্রথম ঝগড়া হলো।রাতে রেণু বা খেয়েই শুয়ে পড়লো।সংসারের অভাবের সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রমশ রেণুর চাহিদা বাড়তেই থাকে।তার চাহিদা পূরনে ব্যর্থ হলে প্রায়শই ঝগড়া হয়। আমার মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ। রেণু এবার তৃতীয় বর্ষে।শুক্রবার সকালে রেণুর ফ্রেন্ড তিশা আসে।হাতে লাল একটি কার্ড।আমি রুমেই ছিলাম।তিশা রেণুর হাতে কার্ড দিয়ে বলে, ‘রেণু, তুই ভাইয়াকে নিয়ে আমার বিয়েতে আসবি কিন্তু!’।রেণু কিছুক্ষণ চুপ রইলো।

-রেণু, তিশাকে কিছু খেতে দাও। রেণুর যেনো ওইদিকে মোটেও খেয়াল নেই। খানিকবাদে,
-আচ্ছা জামিল, ওর বিয়েতে কি দেয়া যায়?
-২,০০০ টাকার মধ্যে একটা শাড়ি দিলেই চলবে।
-তোমার রুচি দিনদিন কমে যাচ্ছে এতো?এতো কমদামি গিফট কিভাবে দিবে?
-রেণু, দেখো।আমাদের অবস্থাটা একটু দেখতে হবে না?এটা আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে।

এ নিয়ে আজও ঝগড়া হলো রেণুর সাথে।দিনদিন ঝামেলা বেড়েই চলছে। একটি চাকরি থাকলে অবশ্য এমনটি হতো না।যাইহোক, কম বাজেটের গিফট দেয়া বিশাল লজ্জার ব্যপার।এই ভেবে রেণু তিশার বিয়েতে যায়নি। (বিয়ের ৯ম মাস) সেদিন ছিলো রবিবার রাত।টিউশন শেষ করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে রুমে আসা মাত্রই রেণু খুব তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল, “জামিল, আমার এসব কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না! ফ্রেন্ডরা আমাকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করে।” না শুনার ভান করে এক গ্লাস পানি চাইলাম। রেণু না সূচক জবাব দিয়ে বারান্দায় চলে গেল।বুঝবার আর বাকী রইল না রেণুর সাথে এই বিয়ে বোধহয় আর টিকবে না।ইদানীং ওর সাথে আমার প্রায়শই মনমালিন্যতা হয়।সবকিছু বুঝতে দিই না।কিছু কথা নিজের মধ্যেই চেপে রাখি।

পরদিন সকালে রেণু বলেই দিলো, ‘আমি আর কন্টিনিউ করতে পারছি না’ কথাটা বুকের ভেতর খুব আচড় দেয়।এই বুঝি, ওকে হারাতে বসেছি। তাকে অনেক্ষণ বুঝালাম। ‘রেণু, একদিন আমাদেরও সুদিন আসবে।চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে!’ এবার রেণু প্রতিবাদ করেই বললো, ‘সরি জামিল, আমি এই কষ্টের জীবন আর চাই না” আমি রেণুর হাত ধরে বললাম, তাহলে আমাদের ভালোবাসার কি হবে?তুমি ই বলেছিলে “ভালোবাসা থাকলে সবেই জয় করা সম্ভব ” “হুম বলেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা এটা বলে না।বিয়ে করে সত্যি ভুল করেছিলাম।”

কথাটি বলে রেণু রুমে চলে গেল। এর ঠিক দুইদিন পর রাতে টিউশনি করিয়ে বাসায় ফিরে এসে দেখি রেণু রুমে নেই।আমার মন জানান দিচ্ছে রেণু নেই।চলে গেছে। খাটের উপর ‘ডিভোর্স পেপার’ রাখা।ডিভোর্স পেপারের নীচে ছোট একটা চিঠি ছিল। “জামিল, আজ রাতে বাসে বাড়ি চলে যাচ্ছি।হয়তো আর দেখা হবে না।জীবনটাকে সুন্দর করে সাজায় নিও।জীবনটা কারও জন্যে থেমে থাকবে না।পারলে ক্ষমা করে দিও।”

সেদিন রাতে খুব সিগারেট খাচ্ছিলাম একটু শান্তির জন্যে।শান্তি পাইনি।সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রত্যেকেরেই আছে।কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত নিবেন না যার কারণে ভালোবাসা এমনকি নিজের অস্তিত্বকেও বিকিয়ে দিতে হয়।আবেগ খুব খারাপ জিনিস। বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করে আবেগকে প্রাধান্য দিলে বাস্তবতা একদিন সত্যি সত্যি-ই আবেগ কে পুড়িয়ে দিবে।বাস্তবতা ঠিকেই তার আসল চেহারা একদিন উন্মোচন করবে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত