সংসার

সংসার

আমি যখন এসএসসি পাশ করি তখন থেকেই একটা ছেলের নজরে পরে যাই। সে কিছুতেই আমার পিছু ছাড়বে না।রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকত। অামার অাসা যাওয়ার সময় পিছু নিত। শেষ পর্যন্ত আমার বাসায় বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠায়। আমার বাবা রাজি ছিলেন না। অামি পড়া লেখা চালিয়ে যেতে থাকি। কিন্তু তাদের অধিক আগ্রহ, এই জন সেই জন দিয়ে সুপারিশের কারণে এক পর্যায়ে বাবা মা ভাবল মেয়ে তো বিয়ে দিতেই হবে। অার প্রস্তাবও ভালো। সবকিছু চিন্তা করেই অামার বাবা মা রাজী হলেন।

আমার এইচ এস সি পরীক্ষার পরে বিয়ে হয়ে যায় সেই ছেলেটির সাথে। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে আমার খুব কষ্ট হত। মাস দুয়েক পর থেকেই অামাকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে হত। কারন স্বামী নামের সেই মানুষটার ভালোবাসার চেয়ে মেজাজটাই বেশি ছিল। পান থেকে চুন খসলেই রাগ দেখাত। কারণে অকারণে গায়ে হাত তুলত। বাবার কাছ থেকে যৌতুক আনতে বলত। অথচ এই মানুষটাকে আমার বাবা খুশিতে কত কিছু দিতে চেয়েছিল তখন সে নিতে অস্বীকার করেছিল।বলেছিল আমি কিছু নেব না।

যখন অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিলাম তখন ওকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম যদি ভালোই বাসতে না পারবে তাহলে বিয়ে করেছিলে কেন? আর বিয়ের সময় যৌতুক নিতে অস্বীকার করেছিলে কেন? তখন সে বলল, “তোমার চুল অার চোখের প্রেমে পড়েছিলাম। তোমার সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েছিলাম আমি। তাই তোমাকে বিয়ে করেছি।”

—এখন ও তো আমার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়নি তাহলে আমাকে ভালোবাসো না কেন? অামি তোমার স্ত্রী, অামার গায়ে হাত তুলো কেন? আর কেন তুমি এখন যৌতুকের টাকা চাও?
— আমি তখন ভেবেছিলাম যৌতুক না নিলে পরবর্তীতে দ্বিগুন টাকা আমাকে দিবে তাই তখন নিতে চাইনি।
— আমার বাবা তো তোমাকে তার সাধ্যমত অনেক কিছুই দিয়েছেও।
—সংসারের কী হাল দেখো না? ভবিষ্যতের জন্য বাড়ি ঘর করতে হবে না?
—তাহলে তুমি নিজে গিয়ে আমার বাবাকে বলো যে তোমার যৌতুক চাই। প্লিজ আমাকে বলতে বলো না। আমি বাবার কাছে অনেক ছোট হয়ে যাব। কারণ তুমি অনেক বড় মুখ করে বলেছিলে যে আমি যৌতুক নেব না।

প্রতিটা দিন প্রতিটা রাত আমার কষ্টে কাটত। এমন অনেক রাত না খেয়েই কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছি। একবারের জন্য জানতে চায়নি কাঁদছি কেন? শ্বশুর বাড়িতে মেয়েদের সবচেয়ে আপন জন হয় তার স্বামী। যাকে সুখ দুঃখ সব কথাই বলা যায় কিন্তু আমার এমন ই পোঁড়া কপাল ছিল যে আমার স্বামীকে ভয়ে আমি কিছু বলতে পারতাম না। ভয়ে থাকতাম, না জানি অাবার মারধোর করে।

এমনও সময় গেছে আমাকে মারার পর অামি কান্না করছিলাম, অার বাড়ি থেকে কাকতালীয় মা বা বাবা ফোন দিত। আমি কান্না বন্ধ করে আমার জন্ম দাত্রি কে মিথ্যা বলতাম যে মা আমি খুব ভালো আছি। কারণ আমি কখনোই তাকে ছোট করতে চাইনি কারো কাছে। আমার সব সময় ই মনে হত অামার স্বামীর এসব কথা সবাই জানলে সবার কাছে ছোট হয়ে যাবে অামার স্বামী। ছোট হলে সব চেয়ে বেশি কষ্ট পাব আমি। তাই নীরবে সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতাম।

তার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে কয়েকবার আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কিন্তু পারিনি এটা মহাপাপ বলে। আমাকে সবার সামনে মারত। আমি তাকে কত করে বলেছি যে আমাকে মেরে যদি তুমি শান্তি পাও তাহলে সবার সামনে নয় একা ঘরে মারবে, যেন কেউ না দেখে। আমি ওর হাতে পায়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতাম আর ভালো হয়ে যেতে বলতাম। নামাজ পড়তে বলতাম। সিগারেট খেতে নিষেধ করতাম। সে আমার কান্না দেখে আমাকে লাথি দিয়ে ফেলে দিয়ে বলত, “তোর যদি ভালো না লাগে তুই চলে যা। আমি এসব কিছু করতে পারব না।” আমি আমার স্বামীর মুখে এসব কথা শুনে চিৎকার করে কাঁদতাম। দিন দিন ওর অত্যাচার গুলো বাড়ছিল। এমন একটা সময় আসল যখন আমার সব সময় মনে হতো ও আমাকে মেরে ফেলবে অথবা আমার নিজেই একসময় আত্মহত্যা করে মরতে হবে। কারণ প্রতিনিয়ত যে কোন অজুহাতে মারত। ঠিক তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে এখান থেকে আমাকে মুক্তি পেতে হবে।

এই তো সেদিন গুটি গুটি পায়ে তার হাতটি ধরে এ বাড়িতে এলাম। দুই চোখে কত স্বপ্ন ছিল। এখানে আসার সময় আমার বাবা স্বামীর হাতে তুলে দেয়ার আগে বলেছিল, ” আমার অতি আদরের জিনিস টা আজকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। আমার মেয়েটাকে তুমি দেখে রেখো বাবা। কোনো ভুল ত্রুটি করলে শুধরিয়ে নিও। আজকে আমার মেয়েটা লাল বেনারশি শাড়ি পরে নতুন বধূ হয়ে তোমার ঘরে যাচ্ছে। আমার মেয়েটা যেন তোমার সাথে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সুখে কাটাতে পারে। তোমার ঘর থেকে একদিন আমার এই আদরের মেয়েটি সাদা কাফন পরে পরপারে চলে যাবে। ততদিন পর্যন্ত আমার মেয়েটার যত্ন নিও বাবা।” আজ বড্ড বেশি বাবার বলা শেষ কথা গুলো মনে পড়ছে। “বাবা তোমার সেই ছোট্ট পরিটা ভালো নেই বাবা। বাবা তোমাকে দেয়া একটা কথাও সে রাখেনি। বাবা তোমার এই আদরের মেয়েটার শরীরে মানুষ নামের অমানুষ টা শত শত আঘাতের চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।বলোতো বাবা ও যে আমাকে এত কষ্ট দেয় তারপরেও ওকে ছেড়ে যেতে এত কষ্ট হচ্ছে কেন?” বুকের বাম পাশটা ব্যথায় চিন চিন করছে।

সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি। এভাবে অত্যাচার সহ্য করে তার ঘর করা সম্ভব হবে না। গতকাল সবার সামনেই মারধোর করে অাবারো বলেছিল, “ভালো না লাগলে চলে যা”। বুঝতে বাকি নেই, এই লোকের কাছ থেকে মার খাওয়া যাবে কিন্তু ভালোবাসা পাওয়া যাবে না।  আমি আর সহ্য করতে পারিনি, এই প্রথম কাঁদতে কাঁদতে রুমে গিয়ে মা’কে ফোন দেই, “মা,মাগো আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, আমি ভালো নেই মা।” মায়ের কাছে বলেছি বলে আবার আমাকে মেরেছিল।  আমি গতকাল সারা রাত কেঁদে কাটিয়েছি| সারাটা রাত স্বামীর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। একা একাই বলছিলাম, “ওগো কী এমন ক্ষতি হতো একটু ভালোবাসলে? আমি তো তোমার কাছে বেশি কিছুই চাইনি। আমার চাওয়া গুলো তো খুব অল্প ছিল। তোমার চোখে চোখ রেখে গল্প করা। তোমার হাতটি ধরে পাশাপাশি বসে একটু সময় কাটানো। সুখের একটি সংসার গড়ে তোলা। কেন আমার জীবনটা নষ্ট করে দিলে? ”

আজ অামার স্বামীর এই ঘুমন্ত মুখটাই হয়তো শেষ দেখা। জানিনা আর কোনো দিন দেখা হবে কিনা? ফজরের আযান দিচ্ছে। আজ আমার ভাই আমাকে নিতে আসবে, আমি চলে যাব। আর এটাই আমার শেষ চলে যাওয়া। আমার ভাই এসেছে দুপুরে । দুপুরে খেয়েই আমি রেডি হচ্ছিলাম আর কান্না করছি। আমার ভাই আমার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল, “কাঁদিস না সব ঠিক হয়ে যাবে”

যখন চলে আসব তখন অামার স্বামী বলছে, “যাচ্ছিস যা,আর আসবি না। এই যাওয়াই যেন শেষ যাওয়া হয়”
স্বামীর মুখে বিদায় মুহূর্তে এমন কথা শুনব স্বপ্নেও ভাবিনি। সেই মুহূর্তে এতটাই কষ্ট পেয়েছিলাম যা আগের শত অত্যাচারেও পাইনি।  মনে মনে বলছিলাম, ” আমি তো চলেই যাচ্ছি। আর কোনোদিন তোমাকে জ্বালাতে আসব না।” যখন আমার এই চিরচেনা ঘর টা থেকে বের হই আমার কলিজাটা ছিড়ে যাচ্ছিল। বার বার পিছনে ফিরে আমি আমার স্বামীর মুখটা দেখছিলাম। কিন্তু সে আমার চোখের ভাষা বুঝতে পারেনি। একটিবার যদি বলত, যেওনা। আমি তোমাকে ভালোবাসব। আমি তবুও থেকে যেতাম ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়ে।

চিরচেনা এই বাড়িটা থেকে যখন চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াব তখন হঠাৎ করে মনে হলো তাকে দেয়ার জন্য আমার পক্ষ থেকে একটা শেষ চিঠি লিখেছি যা ওকে দেওয়া হয়নি। তাই আবার রুমে এসে ওর একটা প্যান্টের পকেটে চিঠিটা ওর অগোচরে রেখে দিয়েছি। সে মানুষ হলে তার ভুল সে বুঝতে পারবে। কেন যেন তার কিছু একটা নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। যা আমার কাছে বাকিটা জীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমি ওর শরীর থেকে খুলে রাখা একটি শার্ট আর একটা রুমাল আমার ব্যাগের মধ্যে নিলাম। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। এই মানুষটা যদি আমাকে একটু ভালোবাসা দিত তাহলে কোনোদিন তাকে ছেড়ে যেতাম না।

আমি আর আমার ভাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি অটো রিক্সার জন্য। বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত অটোতে যেতে হবে। রাস্তায় অটো পাওয়া যাচ্ছিল না। ওখানে প্রায় অাধা ঘন্টার মত দাঁড়িয়ে ছিলাম। যতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলাম ততক্ষনই অশ্রু ভরা চোখে আমার স্বামীর বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আর আল্লাহ কে বলছিলাম, “হে আল্লাহ আমি তো চলেই যাচ্ছি এই শেষ মুহূর্ত টাতে যদি আমার স্বামীর মুখটা দেখতে পারতাম। দশ মিনিট পরে আমার স্বামী বাহিরে বের হল। বাহিরে বের হয়েও আমার দিকে একবারও তাকায় নি।  জানিনা জীবনে কী ভুল করেছিলাম যার শাস্তি আমাকে এভাবে পেতে হলো।  অটো রিক্সার মানুষ গুলো জানতে চেয়েছিল কাঁদছি কেন? আমি তাদের বলতে পারিনি কেন অামার চোখে পানি।

বাসায় ঢুকেই মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কান্না শুরু করেছি।  “মা আমি চলে এসেছি মা। ওই জাহান্নাম থেকে চলে এসেছি।” মা’ও আমার সাথে কাঁদছিল। আমি যে সারা জীবনের জন্য চলে এসেছি সেটা শ্বশুর শ্বাশুড়ী কেউ জানত না। তারপর ও আমাকে একটা বারের জন্য ফোন দিয়ে জানতে চায়নি আমি ভালোভাবে পৌঁছলাম কিনা? বেঁচে আছি না মরে গেছি।

এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে যায়। এরপর আমি বাবা মা’কে দিয়ে ওদের বাসায় ফোন করে জানিয়ে দেই যে, আমি ওদের বাড়িতে আর যেতে চাই না। শ্বশুর শ্বাশুড়ী অামার স্বামীর আচরন সব জানত। তারপরেও না জানার ভান করেছিল। তাই বাধ্য হয়েই আমার সাথে ঘটে যাওয়া অত্যাচার গুলোর কথা বললাম। তিনমাস পর শ্বশুর শ্বাশুড়ী আমাকে নিতে এসেছিল, অামার স্বামী আসেনি। ফোন করে আমাকে যেতে বলেছিল। কিন্তু আমি বাকি জীবনটা ধ্বংসের মুখে ফেলে দিতে চাইনি। তাই স্বামীর সংসারে অার ফিরে যাইনি।

আজ দেড় বছরের বেশি হয়ে গেল আমি আমাদের বাড়িতে আছি। এত দিনের ভিতর আমার স্বামী একবার ভুল করেও আমাকে দেখতে আসেনি।  অামি জানি অামি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন অনেক ভালো অাছি। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি। এখন রোজ অামাকে মার খেতে হয় না। অত্যাচার সহ্য করতে হয় না। জীবন তো এখনই শেষ হয়ে যায়নি।  “অামি মার খেয়ে নয়, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত