শ্রাবণী

শ্রাবণী

টেবিলে খাম পড়ে আছে।শ্রাবণী টেবিলের দিকে রহস্য চোখে তাকিয়ে ছিলো।সে চিঠিটা কি হাতে নিবে?নিজের মধ্যে একপ্রকার দ্বন্দ্ব চলছে।শ্রাবণী চিঠিটা স্পর্শ করেনা। সে জানে চিঠিতে কী লেখা আছে।শ্রাবণীর চোখে জল টলোমলো করছে।বাহিরে তখন ঝুম বৃষ্টি।ফুপিয়ে কেঁদে নেওয়ার এইতো সময়।সে জানে এখন কাঁদলে, সেই কান্নার জবাবদিহিতা করতে হবেনা।কারণ,বৃষ্টির শব্দে কান্নার শব্দ কেউ শুনবেও না।শ্রাবণী জানালাটা খুলে দেয়।জানালা খোলার সাথে সাথে হিম শীতল বৃষ্টির স্নিগ্ধ বাতাস এসে শিউরে দেয়।শ্রাবণী তখনও চিঠি স্পর্শ করেনি।

ট্রেন আসবে রাত বারোটা পয়তাল্লিশে। এখন বারোটা দশ কিংবা এগারো বাজে। স্টেশনে নাকি মানুষে ভরপুর থাকে;কিন্তু,এখানে উল্টো।মানুষ নেই।আছে কম্বল! এই যে স্টেশনের বাম দিকে যতোদূর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে;সিরিয়াল ধরে কম্বল। কম্বলের নিচে নির্ভেজাল ঘুমিয়ে থাকা মানুষেরও কী প্রিয় হারানোর ব্যথা আছে?রুদ্র একটু ভেবে দেখলো।আচ্ছা,কথা বলে দেখবো কী?কার সাথে কথা বলবো?শুয়ে থাকা এই জীর্ণশীর্ণ লোকটার সাথে?নাহ্–বৃষ্টির কারণে একটু থমথমে পরিবেশ চারিদিকে।শীতের আবেশ শরীরের লোম দাড় করিয়ে দিচ্ছে।স্টেশনেও বৃষ্টি হচ্ছে। রুদ্র প্লাটর্ফমের বসে আছে।তার ব্যাগে একটা ডায়েরি।মাঝেমাঝে কবিতা লেখা হয়।একটু-আধটু চর্চা করে আরকি—

এই যন্ত্রণা আর বৃষ্টিস্নাত গভীর থমথমে রাতের মিশ্রণে ভেজা ট্রেন।একটা কবিতা হতো হতেই পারে।রুদ্র ডায়েরিটা বের করলো।ডায়েরিটা শ্রাবণী উপহার দিয়েছিলো।ডায়েরিটা নিয়ে সুন্দর একটা গল্প আছে।রুদ্র কবিতাচর্চা করে অনেক আগে থেকে।শরীরের গঠন আর মুখের অবয়ব রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লার মতো হওয়ায় নিজের নামটাও রুদ্র রেখেছে সে নিজেই।তার আসল নাম শাহেদ।দাদার দেওয়া নাম ছিলো।সে শুনেছিল দাদা নামটা খুব শখ করে রেখেছিল।নামটা রাখার পরে পুরো গ্রামের পরিচিত সবাইকে মিষ্টি দিয়েছিলো। কিন্তু,বড় হওয়ার পর রুদ্রের কবিতার প্রেমে নিজেকে মগ্ন করে ফেলে।এর পর নিজের নামটাও বদলে ফেলে।দাদা জানলে হয়ত কষ্ট পেতো।তবে,তার দাদা জীবিত ছিলো না।

স্টেশনের খুব কাছে একটা দোকান এখনো খোলা।সেখানে টিভি চলছে।অধিকাংশ লোক বোধহয় খেটে খাওয়া শ্রমিক। বাংলা ছবি চলছে।মান্নার সেই দারাজ কণ্ঠের ডায়লগ মানুষগুলো হা করে গিলছে।কী অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে।যেন জীবনের সব সুখ এখানে।এই মান্না তাদের সুখের কাণ্ডারি! চলচিত্র তাদের সুখের ঠিকানা।মৌসুমি তাদের স্বপ্নের নায়কা–ওরা হয়ত ভাবে মনে মনে ‘ইশ!যদি মৌসুমি রে বিয়া করতে পারতাম!’ জীবনটাই সুখের সাত সাগর হতো।কী সুন্দর মৌসুমি। রুদ্র ভাবে,এদের বুঝি কষ্ট নেই?সুখের সাগরে এরা কী রোজ ডুব দেয়?এই যে বাঁশের বেড়ার একটি চায়ের দোকান;দোকানে একটা সাদাকালো টিভি।টিভিতে বাংলা সিনেমা আর একটা বিড়িতে মাঝেমাঝে দীর্ঘ টান!তারপর আবার সিনেমায় মনোযোগী হচ্ছে।এদের বুঝি আলাদা কোনো চিন্তা নেই?এদের চিন্তা না থাকলেও রুদ্রের ঠিকই চিন্তা হচ্ছে।সে ভাবছে ‘শ্রাবণী কী চিঠিটা হাতে পেলো?চিঠিটা পড়ার পরে তার অনুভূতি কেমন হবে?রুদ্রের খুব ইচ্ছে শ্রাবণীর জলে ভরা দুচোখ দেখবে।কাঁপা ঠোঁটে শ্রাবণী বলবে ‘রুদ্র, তোমার পাশে থেকে বাঁচতে চাই।তোমার কবিতা খেয়েই মরতে চাই।তোমার ডায়েরি পড়ে পেট ভরতে চাই।রুদ্র, তুমি আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও—আমি তোমার সঙ্গেই যাবো বলে মন দিয়েছি।

হঠাৎ রুদ্রের ঘোর ভাঙে।চায়ের দোকানদার রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে জিগ্যেস করে ‘চা খাইবেন’ রুদ্র বলে,রং চা হবে? দোকানি বলে, হবে।এইদিকে বসেন।ঐ মফিজ সর দেহি।স্যার রে বইতে দে।সর–স’র। রুদ্র বসে।বাহিরে তখনো বৃষ্টি।বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গেছে।দোকানের টিনের চালে টপটপ শব্দ হচ্ছে।দোকানী টিভির ভলিউম বাড়িয়ে দিলো।মান্নার আবেগময় ডায়লগ চলছে।দর্শকশ্রোতা সব মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছে।বুড়ো একটা লোকের চোখের পানি ঝরছে অঝোরে।যেন বৃষ্টি বুঝি এই বুড়ো লোকটা চোখে এসে ভর করেছে। মান্না এবং মায়ের মধ্যে কথাবার্তা চলছিলো।বুড়োটা হয়ত মাকে হারিয়েছে বহুবছর আগে।এই চিত্রে বোধহয় নিজের মাকেই কল্পনা করছে মনে মনে।

মা-রুদ্র তার মাকে হারিয়েছে পাঁচ বছর দুই মাস এগারো দিন হলো।রুদ্রের ঠিক মনে আছে সেই দিনের কথা।বাবাকে হারিয়েছে তিন বছর সাত মাস ছয়দিন।এটাও স্পষ্ট মনে আছে।রুদ্র চায়ে চুমুক দেয় আর মায়ের কথা ভাবে।যদি তার একটা পরিবার থাকতো;তাহলে অন্যের বাসায় থেকে জীবনের সুখগুলো বিসর্জন দিতে হতো না।

আনিসুল হক ছিলের রুদ্রের বাবার ছোটবেলার বন্ধু।শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত দুজনে দাপিয়ে বেড়িয়েছে পুরো গ্রাম। খেলার মাঠ থেকে ধানের জমি,দীগন্ত জুড়ে দুজনের ছিলো পাখির মতো বিচরণ। পাখিদের যেমন সীমাবদ্ধ নেই আকাশে;আনিসুল হক এবং জামালেরও মাঠেঘাটে ছিলো না কোনো সীমাবদ্ধ। ওদের জন্য সব ছিলো খোলা প্রান্তর।সব ছিলো নিজেদের বিস্তৃত স্বাধীনতা । আনিসুল হক আর জামাল কলেজে উঠলে ঘটে বিপত্তি। আনিসুল হকের পিতা সিদ্ধান্ত নেয় তার ছেলেকে শহরে ভালো কোনো কলেজে পড়ালেখা করাবে।আর্থিকভাবে আনিসুল হকের পরিবার ছিলো সাবলম্বি।যার কারণে ছেলেকে ভালো মানের পড়াশোনার ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা কোনো বিষয় না।অন্যদিকে জামালের পরিবার ছিলো আর্থিকভাবে অস্বচ্ছ।যে কারণে জামালকে তাদের গ্রামেরই কলেজে পড়তে হয়ছিলো।ঠিক কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় থেকে দুই বন্ধুর দূরত্ব সৃষ্টি।তবে মনের দূরত্ব মোটেও ছিলো না।ওদের মধ্যে চিঠি আদান-প্রধান ছিলো।

এক পর্যায়ে লেখাপড়া শেষ করেছে দুজনেই। আনিসুল হক শহরে চাকরি পেয়েছে। জামালের বিয়ে হয়েছে।দুই জনেই ব্যস্ত জীবন অতিবাহিত করছিলো খুব।জামাল আনিসুলের ঠিকানা জানতো। রুদ্রের মা যখন পৃথিবী থেকে হঠাৎ বিদায় নেয়; জামাল শাহেদার মৃত্যুটা বোধহয় মেনে নিতে পারেনি।মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।ধীরেধীরে এই রোগটা এতোটাই চেপে বসে যে, জামালকেও টেনে নিয়ে যায় শাহেদার কাছে রুদ্রের বড় চাচা আজগর আলী।লোকটা অসম্ভব ভালো হলেও কিছু সময় ঘাড় ত্যাড়া মানুষ।রুদ্রের সব কর্মকাণ্ড উনি পছন্দ করতেন না।রুদ্রকে কোনোক্রমে বাড়ি থেকে বিদায় করতে পারলে তিনি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারতেন বোধহয়। আজগর আলী খুঁজে আনিসুলের ঠিকানা জোগাড় করেছিল।রুদ্র জানতোই না তার বাবার একজন খুব কাছের বন্ধু আছে। আজগর আলী একদিন একটা চিঠি পাঠায় আনিসুল হকের কাছে।তিনি সেখানে লিখেন,

প্রিয়
আনিসুল ভাই।

আশা করি সৃষ্টিকর্তার রহমে আপনি ভালো আছেন।আপনার পরিবারের সকলে আশা করি সৃষ্টিকর্তার রহমতে ভালো আছেন। আমি আজগর আলী।আরশীনগর থেকে বলছি।আমি জামালের বড়ভাই।আশা করি চিনেছেন আমাকে।জামালের মৃত্যুটা আমাকে পীড়া দেয়।আপনি এসেছিলেন তার মৃত্যুর সময়ে ;তার কারণে আমি কৃতার্থ। আপনি তো জানেন;জামালের একটা ছেলে রয়েছে।আপনি এটাও জানেন আমাদের আর্থিক অবস্থাও তেমন সুবিধের না।আপনার কাছে একটি অনুরোধ করবো বলে চিঠিটি পাঠালাম। জামালের ছেলের নাম রুদ্র। কলেজে পড়াশোনা করে।ভালো ছাত্র।আপনি যদি রুদ্রকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতেন এই আশায় চিঠি লিখেছি।আপনার সুস্থতা কামনা করছি এবং মঙ্গল কামনা করছি।

ইতি
আজগর আলী।
আরশীনগর,মোল্লা বাড়ী।

‘রুদ্রের চিঠি’

প্রিয়
শ্রাবণী।

পত্রের প্রথমে তোমার চোখে যে জলটুকু জমেছে;সেই জলটুকু মুছে ফেলার আকুল আবেদন রাখছি।তোমার চোখের জলের সাথে শুদ্ধ ভালোবাসাটুকুও যে বৃষ্টি হয়ে ঝরে যাচ্ছে তা আমি জানি।আমি সব জানি।আমি জানি তুমি কাঁদছো।তুমি এক হিমালয় কষ্ট নিয়েও স্তম্বের মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছো।আমি জানি তুমি পত্রখানি পড়তে পড়তে চোখের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছো পত্রের অক্ষরে লেখা সাগর!এই নোনা সাগরে তোমার চোখের জান্নাতি শরাব বেমানান। প্রিয় শ্রাবণী।তোমাদের এই দোতলা বাড়িটাতে যেদিন পা দিয়েছিলাম;আমি সেই দিনই উপলব্ধি করেছি বুকের কোথাও লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার পাহাড়ে ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে।সেই ঝড়ো হাওয়া আমাকে নতুন করে আশা-ভরসা জাগিয়েছে।পিতামাতাহীন আমিটা মোটামুটি নিঃস্ব পৃথিবীতে।বড় চাচাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো শেষ পর্যন্ত।এই আমিটা হয়ে উঠি পৃথিবীর অহেতুক একটি কঠিন বোঁঝা।যেন,আমিটাকে সবাই তাড়িয়েই দিচ্ছিলো।আমি যেন এক ফকির!যে দু-বেলা খেতে বা দুটো পয়সার জন্য গেরস্তের ঘরে ঘরে হাত তুলে বলছি ‘একটা টাকা দিবেন?দুপুরে কিছুই খায়নি” আমি যেন একটা ঝড়ো বৈশাখী বাতাস।

যে বাতাস মানুষের খারাপ করে।ভালো কখনোই করতে পারেনা।তাই সবাই মনেপ্রাণে চায়,বাতাসটা এদিকে না আসুক।না আসলে বাঁচি,মনভরে বাঁচি। আমার চাচা আজগর আলীর পত্র পেয়ে তোমার বাবা সেই পত্রের উত্তরে বলেছিলেন, আমাকে যেন তার কাছে পাঠিয়ে দেয়।জানো?যখন আজগর চাচা বলেছিল যে, তোর থাকার জায়গা হয়েছে।ঢাকা যেতে হবে তোর।আগামী মঙ্গলবার তোকে নিয়ে ঢাকায় যাবো।আমি সেদিন প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়েছি।তোমার পিতা আনিসুল হয়ে গেলেন আমার কাছে একজন ফেরেস্তা!কারণ,দুঃসময়ে মানুষ কাছে যাকে পায়;তাকে ঈশ্বরও বলতে দ্বিধান্বিত হয় না।আমি তখন নতুন স্বপ্ন বুনতে লাগলাম।

তোমাদের দোতলা বাড়িটার চিলেকোঠায় দেওয়া হলো আমার ঠিকানা।অসম্ভব সৌন্দর্যের মাধুরী মিশিয়ে রাখা একটি চিলেকোঠা।আমি থাকতে লাগলাম।দিন যাচ্ছে।বছর গেলো।তোমার পরিবার আমাকে তাদের একজন সন্তানরূপে আদর-যত্ন করতে লাগলো।কিন্তু,তুমি কেমন যেন ছিলে।আমি সব জানি। প্রতিদিন এসে দেখতাম আমার চিলেকোঠার রুমটা বেশ গোছানো।আমি দ্বন্দ্বে পড়ে যেতাম।ভাবতাম কে এই একাকি মানুষটার ঘরে পা রাখে? রোজ যখন আমি গভীর রাতে ডায়েরিটাতে লিখতে যেতাম ক্লান্ত কবিতা;আমি বুঝতে পারতাম কেউ একজন সেই ডায়েরিটা খুলেছে।পড়েছে কে হতে পারে এই নিঃস্ব কবিতায়ভরা ডায়েরির বুকে দাপিয়ে বেড়াবে? তোমার পিতা আমাকে নিয়ে একদিন একটা জায়গাতে গেলেন।খুব সুন্দর বাড়ি।

যেন রাজপ্রসাদ আবার শিল্পির কারুকার্যে আঁকা কোনো শিল্পিবাড়ি।আবার সেই পুরানো আমলের রাজাদের আয়েশের বারান্দা।যেখানে রাজা মশাই কনুয়ে ভর করে নিচে কাউকে দেখছে আর মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে নিজেকে ধন্য করছে।সব গুণাগুণ ছিলো বাড়িটি।যে কেউ চাইবে এই বাড়িতে থেকে যেতে।তোমার বাবা বাড়িটি দেখিয়ে বললেন,রুদ্র বাড়িটা কেমন?আমি মুগ্ধ হয়ে তখন দেখছিলাম। ঘোর কাটেনি।মনে মনে ভাবছিলাম, এই বাড়িটাতে থেকে যদি কবিতা লেখি;সেসব কবিতা জগত বিখ্যাত হলে হতেও পারে।সবকিছুর একটা পরিবেশ থাকা দরকার।বাড়িটা কবিদের জন্য স্বর্গ। আমি ঘোর ভেঙে উত্তর দিলাম, ‘বাড়িটা পৃথিবীর স্বর্গ ‘ তিনি বলেছিলেন, ‘তাহলে বাড়ির ভেতরের মানুষগুলো কেমন হবে?’ আমি বলেছিলাম, ‘স্বর্গে সবসময় ভালো এবং ফেরেস্তারাই থাকে’ তিনি বললেন, ‘এই স্বর্গেই আমার মেয়ে থাকবে বাকি জীবন!শ্রাবণীর ভবিষ্যৎ বরের বাড়ি এটি। তুমি কি বলো রুদ্র?শ্রাবণী সুখী হবে তো? আমি নির্দ্বিধায় বলেছিলাম, ‘স্বর্গে মানুষ সুখীই হয়,দুঃখ স্পর্শ করতে পারেনা’

তখনও আমি জানতাম না কেউ একজন আমাকে গোপনে নিজেকে দলিল করে দিয়ে রেখেছে।আমি জানতাম না একজন যে,আমার ঘরটাকে নিজের ঘর ভেবে গুছিয়ে দিচ্ছিলো,অধিকার প্রতিষ্ঠিত করছে আমার জমিনে।আমার নিঃস্ব মরুভূমিতে সবুজের অরণ্য গড়ে তুলছে।তুমি আমাকে ভালোবাসতে আমি উপলব্ধি করেছি।জানি তুমি বলতে চেয়েও পারোনি।আমি সেই সুযোগ দেয়নি শ্রাবণী।কারণ,আমি যে তোমার পরিবারের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। চিরঋণী।তোমার পিতার সেইদিনের বুকভরা আশা আমি কীভাবে নষ্ট হতে দেই?কীভাব এই চিরঋণ পিতার স্বপ্ন ভেঙে পরিশোধ করি?বলো শ্রাবণীকিছু ভালোবাসার সমাপ্তি হয়ত ব্যক্তি চাওয়ার উপর নির্ভরশীল করেনা।

এটাও তেমন।এই অদেখা,স্পর্শহীন, দূরত্বের ভালোবাসা পবিত্র থাকুক তোমার মনে। আমি চিরঋণী যার কাছে;যার কাছে পিতার স্নেহ পেয়েছি,তার চোখের জল দেখতে পারবো না।তার মন ভাঙার হাহাকার শুনতে পারবো না।আমি চলে আসার আগে তোমার বাবাকে বলেছি,চাকরি পেয়েছি।তাই চলে যাচ্ছি।তুমি বাসায় ছিলেনা।বেশ তাড়াহুড়ো করেই এসেছি।বলতে পারো,নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে এই চিলেকোঠায় রেখে পালিয়ে এসেছি চোরের মতোই।জানো,আমি চাকরি পায়নি।কোথায় যাবো তাও জানি না।তবে এতোটুক জানি,এই বাড়িতে থাকলে তুমি দুর্বল হবে আমার প্রতি।ভালোবাসা এমন,দুর্বল করে দেয়। মন্ত্রের মধ্যে ঘোর করে রাখে।এই ঘোর জানিনা কবে কাটবে।তবে তোমার শুদ্ধ ভালোবাসা আমার কবিতায়,আমার মনে,আমার ডায়েরিতে লেখা থাকবে চিরকাল।চিরজীবন… ভালো থেকো।

ইতি,
রুদ্র।

ট্রেন এসেছে শ্রাবণী কাঁদতে থাকে।ভালোবাসাটা এখন অপরাধবোধের জায়গাতে চলে গেছে। শ্রাবণী পত্রটি বিছানাতে রেখে জানালার পাশে যায়।বাহিরে বৃষ্টি তখনও।বৃষ্টিস্নাত রাত থমথমে আমেজ।শ্রাবণী ভাবে আর কাঁদে।নিজেকে দোষছে সে।ছেলেটা এই বৃষ্টির রাতে কোথায় আছে?কোথায় যাবে সে?ঠিকানা দেয়নি কেন?একটা চিঠি হলেও পাঠাতাম পরে না হয়।মাফ চেয়ে নিতাম তাকে ভালোবেসে আশ্রয়হীন করার অপরাধে।শ্রাবণী ভাবছে,সে বোধহয় ভালোবাসার চেয়ে ছেলেটার অসহায়ত্বকে এখন বেশি ভালোবাসছে।কেমন যেন বুকটা হাহাকার করছে রুদ্রের জন্য।সে যাবে কোথায়?আর কি দেখা হবে না তাদের?

স্টেশনমাস্টার ঘণ্টা বাজালেন।সতর্ক করে দিলেন যে,ট্রেন আসছে।স্টেশনে কেউ নেই।অল্প কিছু মানুষ।সবাই বৃষ্টির শীতল শীতে মুড়িয়ে বসে আছে।রুদ্র দাঁড়ালো। দূ’রে লাইট জ্বালিয়ে দ্রুতবেগে আসছে ট্রেন।ট্রেনের লাইটের আলোয় বৃষ্টির ফোঁটা অসাধারণ দৃশ্য।ট্রেন এসে থেমে যায় স্টেশনে।রুদ্র ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়ে।ট্রেন একটু পরেই ছেড়ে দেয়।ঝকঝক করে চলছে গন্তব্যের দিকে।ঠিকানা

কোথায়?
ঢাকা শহর তখনও এতো আলো ঝকঝকে ছিলো না।আশির দশকের কথা।তখন ঢাকাও ছিলো আঁধারে ঘেরা গহীন আঁধার অরণ্য।রুদ্র জানালার পাশে বসেছে।বৃষ্টির ফোঁটা এসে তার শরীর শিউরে দিচ্ছে। গভীর আঁধারে রুদ্রের চোখের জল কেউ দেখেনি।আর কী দেখা হবে শ্রাবণীর সাথে?সেই শ্রাবণী যে,তার চিলেকোঠা গুছিয়ে রাখতো।তার ডায়েরিতে লিখে রাখতো ‘ভালোবাসি রুদ্র সাহেব,ভীষণ ভালোবাসি;

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত