অমূল্য উপহার

অমূল্য উপহার

– এত মন খারাপ করে আছো কেন?সবসময় খালি চিন্তা করো।কতবার বলেছি এত ভেবো না।
– আমি সবসময় দুঃস্বপ্ন দেখি।রাতে ঘুম হয় না।
– তা তো দেখতেই পাই।কতটুকু ঘুমাও।
– আমার ঘুম হয় না।আচ্ছা আমি যদি আর না বাঁচি?
– বাজে কথা বলো না।কতদিন বলেছি এসব কথা বলবে না।
-কি করবো বলো?সারাদিন ভয়ে ভয়ে থাকি।কখন কি হয়।
– মেয়েদের প্রেগন্যান্টসির সময়টা খুব ভয়ে ভয়ে যায়।নানা রকম দুশ্চিন্তা মাথায় ঘুরে।আমি তো তোমার সাথে সবসময় থাকি।তুমি ভয় পেও না।
– ভয়টা তো এখানে না।ভয়টা কোথায় সেটা তুমিও জানো আর আমিও জানি।
– তাতে কি হয়েছে তিতলী?
-অনেককিছু হতে পারে।
– সবসময় একই কথা বলেই যাচ্ছ।
– দশ দশটা বছর এই দিনটার জন্য পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি।কতটা সময় একা একা কেটেছে।

শুধু একটা সন্তানের জন্য আমরা দু’জনে পাগল হয়ে গেছিলাম।আল্লাহ্‌ মুখ তুলে চাইলেন।

এখন শুধু ওর মুখটা দেখার অপেক্ষার পালা।দেখে শান্তি পাবো।প্রতিদিন একটু একটু করে স্বপ্নের জাল বুনছি।
– তুমি এসব নিয়ে আর ভেবো না।দেখবে সব ঠিকঠাক হবে তিতলী।
– ভাববো না।তবে মনের কোণে ভাবনা থেকেই যাবে।
– তিতলী আবার? সেই হতাশা।
– তুমি না বের হবে?
– অফিসে একটু কাজ আছে।ওটা সেরেই চলে আসবো তাড়াতাড়ি।তুমি প্রয়োজন ছাড়া চলাফেরা করবে না।

কোন সমস্যা হলেই আমাকে সাথে সাথে ফোন দিবে।আর ফোনটা হাতের কাছেই রাখবে।
– তুমি মনে হয় আর আসবে না।সবসময় বের হতে এত এত কথা বলে যাও।আমার সব কথা মুখস্ত হয়ে গেছে।
– আচ্ছা আচ্ছা। গেলাম।

সেই কখন তিতলীকে ওটি তে নিলো।প্রায় দেড় ঘন্টা হয়ে গেলো।আমার কিছুই ভালো লাগছে না।কি হয়ে গেলো এসব?

আমার আজ কেন ই বা মিটিং এ যেতে হলো।আমি তো যেতে চাইনি তিতলী আমাকে জোর করলো বলেই গেলাম।

আমি নিজেকে কি করে ক্ষমা করবো, তিতলীর কিছু হলে?ওর কাছেই বা কি করে মুখ দেখাবো।কত স্বপ্ন যে নিজে নিজে দেখলো।

আজ সব……! আমি আর ভাবতে পারছি না।বেবিটাকে দেখবো তো?আমার তিতলী ভালো আছে তো?আমি তিতলী বেবি কতনা স্বপ্ন দেখেছি।

পুরা ঘরটা বেবিটার জন্য আমরা দু’ জনে সাজিয়েছিলাম।আর কতক্ষণ ওটিতে তিতলীর অপারেশন চলবে?কেন বাথরুমে গেলো?

কি করে পিচ্ছিল খেলো?সব আমার দোষ।আমি ওকে কেন রেখে গেলাম।আমি আর কিছুই চাই না।শুধু তিতলীকে চাই।

আল্লাহ্‌ তুমি আমার তিতলীকে ফিরিয়ে দিও।

– কি খরব ডাক্তার? আমার তিতলী কেমন আছে?
– এত অস্থির হবেন না।
– কি বলেন?আমার তিতলীর কি হয়েছে?
– দেখুন আপনি একটু শান্ত হোন।আমি সব বলছি।
– আরে বলুন না।আমি তো আর ধৈর্য রাখতে পারছি না।
– আপনার ওয়াইফ এখন একটু ভালো আছে।তবে……..
– তবে কি ডাক্তার?
– আমরা অনেক চেষ্টা করেছি আপনাদের বেবি টাকে বাঁচাতে পারলাম না।দুঃখিত।
– কি বলেন?
– ওনাকে হসপিটালে আনার আগেই বেবিটা মারা গেছিলো।
– আমার তিতলী কেমন আছে?
– জ্বি ভালো।এখন বিপদমুক্ত।
– আমি কি ওকে একটু দেখতে পারি?
– পারেন। তবে আর একটু পরে। আর আরেকটা কথা।ওনি নেক্সট এ মা হতে পারবেন কিনা।আমি সিউর বলতে পারছিনা।
– আমি আর কিছু শুনতে পারছি না ডাক্তার।
– আপনি ভেঙ্গে পড়বেন না।ওনাকে তো আপনিই সান্তনা দিবেন।
– আর সান্তনা…..!

কি মুখ নিয়ে তিতলীর সামনে দাঁড়াবো?কি ই বা বলবো?কেন এমন হলো?বেশী কিছু তো তিতলী চায়নি।একটা বেবি চেয়েছিলো।সেটাও কেড়ে নিলো।আমি খুশি খুব খুশি।সব শেষ হয়ে আমি নিঃস্ব। যাক আমি আর কিছুই চাই না।তিতলী তো আছে।ওকে নিয়ে আমি আগেও সুখী ছিলাম।এখনও থাকবো।ও আমার কাছে অমূল্য উপহার।

বেশ কিছুদিন পর…….

– তুমি কি আজকেও অফিস যাবে আবির?
– না।
– কেন?আমি তো অনেকটা ভালো আছি।তাছাড়া মা আর বড় আপা তো বাসায় আছে।
– আমি থাকলে কি কোন সমস্যা আছে?
– না নেই।তবে তুমি এমনিতে অনেক ছুটি কাটিয়েছো।যখন হসপিটালে ছিলাম।
– যাবো।তবে আজকে যেতে ইচ্ছে করছে না।আজকে আমি আমার তিতলীর সাথে সময় কাটাবো।
– আবির তুমি এখন আগের মতই।
– তুমি কি চাও?আমি পরিবর্তন হয়ে যাই?
– না। চাই না।তুমি এমন করে ই আমাকে সারাজীবন ভালোবাসবে এটাই চাই।আচ্ছা আবির আমাকে কি একটু বারান্দায় নিয়ে যাবে?
– আসো।আমাকে ধরো।আস্তে আস্তে হাঁটো।এখানে বসো।
– হুম।তুমিও পাশে বসো।
– আমি তো আছি।
– তোমার মন খারাপ তাই না আবির?
-কেন?
– আমি এমন একটা মানুষ। একটা বেবি তোমাকে দিতে পারিনি।আমি রক্ষা করতে পারিনি তোমার আমানত।
– সেই শুরু হলো আবার ভাঙ্গা ক্যাসেট।
– না।তুমি সব মেনে নিয়েছো।
– তিতলী আমার সবসময়ের চাওয়া শুধু তোমাকে ছিলো।দশ বছর বেবি হয়নি।আর পেয়েও হারালাম।বাকী জীবনটা আর বেবি না হলেও আমার মন খারাপ হবে না।আমি তোমার কথা আগে ভাবি।
– আমিও ভাবি।ভালোবাসি খুব আবির।

আমি খেয়াল করলাম ওর চোখজোড়া জলে ছলছল করছে।নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না।মনে হল আমি ই একমাত্র অসহায় ব্যক্তি। যে কিনা তাঁর প্রিয় মানুষের কষ্ট এভাবে সারাজীবন দেখতে হবে। ওকে কিছুই বলতে পারলাম না। বুক ফেটে কান্না এলো।মনে হলো এটা সুখের কান্না। ওর এই সীমাহীন ভালবাসার কাছে আমি খুবই নগণ্য। কোথায় রাখবো ওর এতোটা ভালবাসা। কি দিয়ে শোধ করবো আমি। সুখের কান্নাটা আর থামাতে পারলাম না। চোখের সামনে থাকা স্বর্গটার দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদলাম।হাত দিয়ে ওর চোখের জলটা মুছে দিলাম।

ও হয়ত আর মা হতে পারবে না। তবে আমার শেষ নিঃশ্বাসটা পর্যন্ত এক বিন্দু কষ্ট পেতে আর দিবো না ওকে। তাতে আমার মরন হলেও হাসতে হাসতে মেনে নিবো সেই মরণটাকে।গভীর ভালোবাসায় তিতলীকে বুকে জড়িয়ে নিলাম।

আমি ভালোবাসি তিতলী।তুমি আমার জীবনে অমূল্য উপহার।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত