এপিটাফ

এপিটাফ

আগামীকাল শফিক সাহেবের একমাত্র মেয়ে অধরার বিয়ে।বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এসে ভরে গেছে।ছোট্টছোট্ট বাচ্চাকাচ্চারা এদিকওদিক দৌড়াচ্ছে।বাড়িটাতে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।পরিবারের বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা!শফিক সাহেবও বেশ খুশি।হঠাৎ একটা ফোন এলো বাড়ির ল্যান্ডলাইন নম্বরে।অধরা রিসিভ করলো।ফোন পেয়েই অধরা কাঁদতে কাঁদতে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।পিছন পিছন ছুটলো তার বাবা শফিক রহমান। দুই বছর পর- শফিক সাহেব বললেন,”তাড়াতাড়ি টিফিন বক্সটা দাও রেণু।সারাদিন কিছু খায়নি মেয়েটা” মিসেস রহমান বললেন, ” নাও।আজ ওর প্রিয় খাবারটা দিয়েছি।ইলিশ মাছের ডিমের তরকারি।আর এই নাও ছাতা।আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে।”

রহমান সাহেব তাঁর স্ত্রীর হাত থেকে টিফিন বক্স আর ছাতা নিয়ে তাড়াতাড়ি রওনা দিলেন।ঠিক আড়াটায় তাকে অধরার কাছে পৌছোতে হবে শফিক সাহেব থেকে বেশ দূরত্বে বসে অধরা ভাতটা খাচ্ছে।মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষরা যেভাবে খাবার খাই ঠিক সেভাবে।পাগুলো দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে।ভাতগুলো মুঠি করে গালের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে সে।কিন্তু খাবার খাওয়ার ধরণটা ঠিক আগের মতোই আছে।বেগুন ভাজা আর মশুরের ডাল দিয়ে সে প্রথমে ভাত খেয়ে ফেলবে।সে ইলিশ মাছের ডিমের তরকারিটা সে ভাত ছাড়াই খাবে।

সুন্দর চুল,দামী জামা-প্যান্ট পরিহিত অধরাকে দেখে মনে হয় না যে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে।প্রায় দেড় বছর আগে।কত ঔষধ,কত ডাক্তার,কত ঝাড়ফুঁক আর কত কবিরাজ!কিছুই বাদ রাখেন নি শফিক সাহেব।কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না অধরার।এমনকি মানসিক হাসপাতালেও দুইমাস রাখা হয়েছিল অধরাকে।কোনো উন্নতি না হওয়ায় ডাক্তার বলেছেন অধরাকে নিজের মতো থাকতে দিতে।যাতে কোনোধরণের মানসিক চাপ তার উপরে না পড়ে।

এখন সে খুব ভোরে বাসা থেকে বের হয়।সারাদিন এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়াই।আর রাতের ঠিক ১০ টায় বাসায় ফিরে।আর প্রতিদিন ঠিক আড়াইটায় এই জায়গায় আসে সে।এই সময় শফিক সাহেব তার জন্য ভাত নিয়ে আসে।সে শান্তভাবে ভাত খেয়ে এখানে বসে থাকে। এসব ভাবতে-ভাবতেই শফিক সাহেবের চোখে পানি এসে পড়ে।মেয়ের এই অবস্থার জন্য তো তিনিই দায়ী!আর ওই ছেলেটার মৃত্যু কারণও তো তিনিই! অধরার বিয়ের আগের দিনটা আবার মনে পড়ে গেল শফিক সাহেবের।

অধরার পিছু-পিছু হাঁটতে হাঁটতে রফিক সাহেব চলে আসেন এই বিশাল কবরস্থান-এ।তখন ঠিক আড়াইটা।তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন অধরার কোনো বান্ধবীর মা বা বাবা মারা গিয়েছেন।কিন্তু পরে বুঝতে পারেন তার মেয়ে তাঁর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যে ছেলেটাকে ছেড়ে চলে এসেছিল সে আত্মহত্যা করেছে।আর তার দাফন করা হবে এখানেই।অধরা আর অভ্রের প্রেমটা সাত বছরের।কিন্তু হঠাৎ করে এক ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সাথে শফিক সাহেব অধরার বিয়ে ঠিক করে ফেলেন।শফিক সাহেব একটিবারের জন্যও অধরার মতামত নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি।অধরাও বাবার মানসম্মান বাঁচাতে নিজের ভালোবাসার বলিদান দেয়।অধরার মতামত নিলে দিনটা এরকম নাও হতে পারতো!

বৃষ্টির ফোঁটা গাঁয়ে এসে পড়ায় চিন্তাজগত থেকে বেরিয়ে এলেন শফিক সাহেব।অধরার খাওয়া শেষ হয়েছে।সে এখন একমনে কবরটাকে দেখছে।শফিক সাহেব তাড়াতাড়ি ছাতাটা খুললেন।তারপর অধরার মাথার উপর ছাতাটা ধরলেন।ঠিক সেই মুহূর্তেই ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল।অধরাও ছাতা থেকে বেরিয়ে গেল।তারপর সে কিছু একটা বলতে শুরু করলো।প্রথম লাইনটা বুঝতে পারলেন শফিক সাহেব- “যখন নামবে ওই বাদলা..” শফিক সাহেবের দেখলেন অধরা কাঁদছে।খানিক দূরে অভ্রের কবরের এপিটাফ-টা দেখা যাচ্ছে।অভ্রের লেখা কয়েকটা লাইন সেখানে শোভা পাচ্ছে- “যখন নামবে ওই বাদলা, তুমি চলে এসো একলা। চোখের তারায় নইবা রইলাম, তোমার মনে ভেতর করবো বাস, তোমার জন্য রয়ে যাবে আমার এই দীর্ঘশ্বাস।”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত