তুই যে আমার

তুই যে আমার

অন্তি টিউশনির বেতন পেয়ে আজ এক প্যাকেট সিগারেট এনেছে আমার জন্য। সেখান থেকেই একটা বের করে টানতে টানতে কখন যে বর্ণালী থেকে লক্ষিপুর পৌঁছে গিয়েছি আমরা খেলায়ই করি নাই। খেয়াল হলো তার কথা শুনে- চল হালিম খাবো!’ তৃপ্তি হোটেলের হালিমটা কিন্তু সেই মজার!! আমি আগে কখনো তৃপ্তি হোটেলে হালিম খাইনি!’ প্রথমবার এক চামুচ মুখে তুলতেই বুঝলাম সত্যিই অসাধারণ। হালিম খেতে খেতে অন্তিকে প্রশ্ন করলাম- আচ্ছা কোথায় কোন খাবারের টেস্ট কেমন সবই কি তোর জানা নাকি? অন্তি~ বাহ্ রে, আট বছর ধরে রাজশাহী শহরটা চষে বেড়াচ্ছি আর আমি জানবোনা? শুনবি কোথায় কোন খাবারটার কেমন টেস্ট?’..

~নাহ্ থাক অন্য একদিন শোনা যাবে!’ আজ বরং চল কোথাও থেকে ঘুরে আসি।

হোটেল থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ক্রিসপি আর চিংড়ির চপ খেয়ে আমরা একটা টঙ দোকানে বসলাম চা খেতে। তারপর সেখান থেকে উঠেই অন্তি জিদ ধরলো মিষ্টি খাবো!’ (দিনদিন মিষ্টি কুমড়োর মতো মুটকু হয়ে যাচ্ছে তবুও খাওয়াতে যেন কোন কন্ট্রোলই নাই তার)। একটা ঝাড়ি দিয়ে রিক্সা নিয়ে আমরা চলে গেলাম টি বাঁধ। সেখানে ফুচকা খেয়ে একটু ঘোরাঘুরির পর বাটার মোড়ে গিয়ে গরম গরম জিলেপি খেয়ে সন্ধ্যার সময় সিটি কলেজের সামনে এসে উপস্থিত হলাম দুধ চা খেতে। ইচ্ছা ছিলো মুক্ত মঞ্চে গিয়ে খালার হাতের ঝালমুড়ি খাবো, কিন্তু তা আর আজ হলোনা।

মামা কথা বলতে পারেননা!’ তাকে ইশারায় দুই কাপ চা বলে অপেক্ষা করতে থাকলাম আমরা। যে পরিমাণ ভিড় তাতে ঘন্টা খানেক লাগবে বলে মনে হচ্ছিলো, কিন্তু দশ মিনিটের মাথাতেই আমরা চা পেয়ে গেলাম। অসাধারণ টেস্ট সেই চা এর!’ দশ টাকা অটো ভাড়া চেয়ে নিয়ে অন্তির কাছ থেকে যখন বিদায় নিলাম তখন আটটা বাজবো বাজবো। ইচ্ছা করছিলো আরো কিছুক্ষন থাকি একসাথে। কিন্তু এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে ওর, আরো দেরি হলেতো ওকে হোস্টেলেই ঢুকতে দিবেনা। তাই আর লেট করলাম না।অটোতে আসতে আসতে বারবার একটি কথাই মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো’- এতো দিনের সম্পর্কে আমি কি দিলাম অন্তিকে!’ কিই বা দিতে পারবো তাকে!’ একটা টিউশনি পর্যন্ত করতে পারিনা, এতোই অকর্মা আমি!’ অথচ কি নির্দিধায় না তার থেকে চেয়ে নিচ্ছি নিজের প্রয়োজন গুলো!’ রিক্সা ভাড়াটা পর্যন্ত নিজে না দিয়ে তাকে দিয়ে দেওয়াচ্ছি, এর চেয়ে লজ্জার কি আর কিছু হতে পারে??

ফাইনাল ইয়ারে উঠে একটা পার্ট টাইম জব নিলাম। তাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম কাজে!’ তাই আর অন্তির সাথে তেমন একটা সাক্ষাৎ হয় না। কলেজ বন্ধ’ বিধায় দেখাও হয় কম, ফোনে কথাতো খুবই সামান্য। তবুও আমি যেমন জানি সেও নিশ্চয় জানে- আমরা একে অপরকে কতোটা পছন্দ করি, কতোটা ভালোবাসি!’ চার বছরে অন্তি আমার হৃদয়ের সম্পূর্ণটা দখল করে নিয়েছে। আমাকেও যে সে ভালোবাসে তা তার হাবভাবে স্পস্ট ফুটে উঠেছে। কারন তার উপর আমি এখন সম্পূর্ণ কর্তিত্ত ফলাতে পারি। অথচ একবারো কেও কাউকে ভালোবাসি কথাটা আজো বলা হয়ে উঠলোনা!’

প্রথম বেতন পেয়ে অন্তির জন্য একটা আকাশী রঙের শাড়ি কিনলাম। ম্যাচিং করে কিনলাম চুড়ি, মালা, দুল আর লিপস্টিক!’ প্রথম এই উপহারগুলো দিয়ে তাকে বলতে চাই- ভালোবাসি তোকে, বড্ড ভালোবাসিরে। অন্তিকে সারপ্রাইজ দিতে’ না বলেই ওর হোস্টেলের সামনে উপস্থিত হয়ে কল ঢুকালাম তার নাম্বারে । কিন্তু ওর ফোন অফ পেয়ে খবর নিয়ে জানতে পারলাম সে এখন হাসপাতালে!’

অন্তির রুমমেট একটা চিরকুট আমার হাতে ধরিয়ে দিলে তা থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, তার বাবা তার অমতেই ভালো পাত্র পেয়ে বিয়ে ঠিক করে ফেললে সে ইচ্ছা মৃত্যুর চেষ্টা করে!’ কারণ সে ভালোবাসে আমাকে, অন্য কাওকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব না। মুখ ফুটে আমায় বলতে পারেনা বলেই তার যত দুঃখ্য। আমিও কি গাধা’ পুরুষ হয়েও বুকের কথাটা মুখে আনতে পারলাম না আজো!! এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আমি ছুটে গেলাম হাসপাতালে। অন্তির মাথার কাছে উপহারের প্যাকেট’টা রেখে’ তাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলে উঠলাম- ভালোবাসিরে তোকে, খুব খুব বেশি ভালোবাসি!’ অন্তির নিথর দেহটা লেপ্টে থাকলো আমার বুকের সাথে। তাকে আর বলা হলোনা তুই যে আমার, শুধুই আমার।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত