বউ এবং ভালবাসা

বউ এবং ভালবাসা

—-স্যার, আপনার ও..ও.য়া.. বউ এসেছে। কাজে ব্যাস্ত ছিলাম। সম্পূর্ণ মনযোগ কম্পিউটার এর উপরে। তারপরেও যখন করিম ভাই দড়জা ঠেলে মুখ বের করে তোতলাতে তোতলাতে বললেন, ‘স্যার আপনার ও…ও.য়া ‘ তখনই বুঝে গেছি তিনি কি বলতে চাচ্ছেন। মনে মনে না হেসে পারলাম না। আসলে করিম ভাইয়ের একটু তোতলানোর অভ্যাস আছে। সবসময়ই যে সমস্যা হয় তা না। তবে যখন তিনি একটু উত্তেজিত হন বা দ্রুত কিছু বলতে চান তখনই গন্ডগোল পাকিয়ে বসেন। তবে লোকটাকে অফিসের সবাই ভালবাসে। তিনি এমন একজন সহজ-সরল মানুষ যাকে না ভালবেসে পারা যায় না।

সে যাই হোক। আমার ওয়াইফ বা বউ এই অসময়ে আমার অফিসে কি করতে এসেছে সেটা নিয়ে একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। যদিও লাঞ্চের সময় প্রায় হয়ে গেছে। তবে আমিতো টিফিনে করে খাবার নিয়ে এসেছি! তাহলে তার আসার উদ্দেশ্য কি? কোন কিছুর দরকার হলে তো ফোন করেই বলতে পারত। এখানে আসার কোন প্রয়োজন ছিল না। করিম ভাই অসহায় ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাকে দেখে আমার আরেক দফা হাসি পেল। তাকে বললাম….

—-ভিতরে নিয়ে আসুন….

করিম ভাই চলে গেল। আমি একটু ভাবতে চেষ্টা করলাম, সে কেন আসছে ভাবতে ভাবতেই সে আমার ডেস্ক বা কেবিনে এসে পৌছালো। করিম ভাই দড়জার সামনে দাড়িয়ে রইল। আমি তাকে চোখ দিয়ে ইশারা করে থাকতে বললাম। আসলে বউয়ের সাথে একা মুখোমুখি হতে ভয় করছে! বউকে কে না ভয় পায়। অন্যদের কথা জানি না, তবে আমি ভয় পাই। শুধু আমার বউকে না, বরংচ সব মেয়েদেরকেই আমি ভয় পাই। ছোটবেলায় মা’কে ভয় পাওয়া দিয়ে শুরু। তারপরে ক্রমে ক্রমে সেই ভয় মনের ভিতরে তার জায়গা পাকাপোক্ত করেছে শুধু।

আমার বউ বারকয়েক করিম ভাইয়ের দিকে দৃষ্টিকটু ভাবে তাকাল। সে কোন কথা বলছে না। তার ভাবটা এমন যে, করিম ভাই থাকাকালীন সে কোন কথা বলবে না। আমি পরলাম বিপদে। বউয়ের চাহনী দেখে করিম ভাই থাকতে পারলেন না। তিনি চলে গেলেন। আমি একটু কেশে গলা ঝেড়ে নিলাম। আমার বউ আমার কাছাকাছি আসল। একেবারে চেয়ারের হাতলের কাছে এসে দাড়াল। আমি এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম। রুমটা কাচে ঘেরা। সুবিধা হল, এখান থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা গেলেও বাইরে থেকে ভিতরে দেখা যায় না। এখানকার শব্দ বাইরে যায় না, বাইরের শব্দ ভিতরে পৌছায় না। বউ মধুর সুরে বলল….

—-লাঞ্চ করবেন না?

আমার গলা শুকিয়ে গেল। খুব বেশিদিন হয়নি বিয়ে হয়েছে। আমাদের ভিতরে সেভাবে কখনো কথা হয়নি, মিল হয়নি। সম্পর্কও তৈরি হয়নি। এরজন্য অবশ্য দোষটা আমারই। কারণ হিসেবে ওই যে, মেয়েদের প্রতি অজানা এক ভয়! কলেজের এক ম্যাডাম একবার ভয়ংকর ভাবে ভৌতিক গলায় ক্লাসে বলেছিলেন, ‘এই ছেলেরা শুনছ, মেয়েদের ষোলকলা! এদের সাথে লাগতে এসো না, কুলিয়ে উঠতে পারবা না’ আমি ভয়ে ভয়ে বললাম…..

—-হ্যা, করব না কেন! এখনই করব বলে টিফিন বক্স বের করছিলাম। এমন সময়ে বউ হাত দিয়ে বাধা দিয়ে বলল…..

—-ওটা রাখেন, আমি আপনার জন্য নিজের হাতে পায়েস বানিয়ে এনেছি। আপনার না পায়েস খুব পছন্দ! এটা আগে খান বলেই সে ছোট একটা ব্যাগ থেকে একটা বাটি পায়েস বের করল। বাটির ভিতরে একটা চামস দিয়ে আমার মুখে তুলে দিতে যাচ্ছিল এমন সময় আসি বললাম…..

—-থাক, থাক, আমি নিজে নিজেই খাচ্ছি….

বলেই বাটিটা হাতে নিলাম। সাথে মনে মনে আল্লাহ নাম জপতে লাগলাম। আমি যতদূর জানি সে রান্না-বান্না পারে না! পারে না বলতে, শুধু ভাত রান্না করতে জানে আর ডিম ভাজতে পারে। তারপরেও ডিম ভাজি কখনো কখনো বিভিন্ন দেশের মানচিত্রের আকার ধারণ করে। একে বিয়ে করে হয়েছে আমার জ্বালা। রান্না-বান্না আমাকেই করতে হয়! ভাগ্যিস ব্যাচেলর থাকাকালীন রান্না করা শিখেছিলাম যাই হোক, আনন্দের বিষয় হল,পরিমাণে খুব কম! যতই খারাপ হোক না কেন, খেয়ে শেষ করা যাবে। আমি খাওয়া শুরু করলাম। বউ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। খাচ্ছি আর মনে মনে বলছি, ‘এটা কখনোই পায়েস হতে পারে না! কিছুতেই না। এভাবে আমার প্রিয় খাদ্যটার জাত না মারলেও পারতেন।’ তবে মুখে ঠিকই হাসি হাসি ভাব রাখলাম। পুরোটুকু খাওয়ার পরে সে বলল….

—-আপনি এত স্বার্থপর কেন? একা একাই খেলেন! আমাকেও একটু খাইয়ে দিতে পারতেন। সে যাই হোক, টেষ্ট হয়েছে? বাসায় ফ্রিজে রেখে এসেছি। শুনেছি ফ্রিজে রাখা পায়েসই নাকি বেশি ভালো লাগে।

—-ভালো হয়েছে। আপনি খাননি?
—-না, ভাবলাম আগে আপনাকে খাওয়াবো!
—-ওহ!
—-আচ্ছা এবারে আমার বখশিশ দেন! আমি অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। বউয়ের হাতের রান্না খেয়ে আবার বখশিশ দিতে হয় নাকি! আজব ব্যাপার….
—-ভয় পাবেন না, আপনার অসাধ্য হয়ে যায় এমন কিছু চাইবো না। যা চাইবো, তা আপনি এখনই দিয়ে দিতে পারবেন আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। সে বলল….
—-এই ধরুন, আমাকে দুটো চু তখনই আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম…..
—-দেখুন, বখশিশ তো আমি দেব আমার মনখুশি মত। আপনি চাইলে তো হবে না! সে মর্মাহত হল। তারপরে বলল….
—-আচ্ছা, এটা তোলা রইল…..

গত ৫-৬ মাস হল এই মেয়েটার সাথে বিয়ে হয়েছে। ওর নাম রিফা, রিফা তামান্না। আমি রায়হান রাজ। আমার মূল পরিচয় হল, হাবা-গোবা, বোকা-সোকা, সহজ-সরল একজন ছেলে। যে কিনা ছোটবেলায় মায়ের হাতে প্রচুর মার খেয়েছে। অজানা কারণবশত যার মনে মেয়েদেরকে নিয়ে অনেক ভয়। মেয়েদেরসাথে তেমন বিশেষভাবে কখনো মেশা হয়নি। তারপরেও ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে একটা মেয়ের সাথে প্রেম হয়ে গিয়েছিল। অনার্স ১ম বর্ষে তার সাথে ব্রেকআপ! কারণ হিসেবে বলেছিল, আমার মত আনস্মার্ট, ক্ষ্যাত, গাইয়্যা ছেলের সাথে নাকি তার যায় না, একদমই না। এরপরে আর কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক তো দূরে থাক সেরকম কখনো ভাবিই নি। বাবা মা কি দেখে যে এমন একটা মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দিয়েছে যাকে কিনা আমারই রান্না-বান্না করে খাওয়াতে হয়,কখনো ভেবে পাইনি তার কারণ….

সেদিন রাতে বাইরে থেকে খেয়ে দুজনা ফিরছিলাম। আমি একটু আগে আগে হাটছিলাম, সে আমার একটু পিছন পিছন হেটে আসছিল। রাত যত বাড়ছে চারিদিকে ততই যেন মানুষের সমাগম বেরে চলেছে। ফুটপাতের দোকানগুলোতে ভিড় জমতে শুরু করেছে। এরই ভিতরে রিফা যেন কিছুটা দৌড়ে এসে আমার হাতটা ধরল। হাতের আঙ্গুলের ভিতরে তার আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে আমার সাথে পা মিলিয়ে চলতে লাগল। আমি কিছু বলতে যাব, ঠিক তখন সে তার অন্য হাতের একটা নখ ঠোটের উপরে দিয়ে চুপচাপ হাটতে বলল। সে এক অন্যরকম অনুভূতি। তবে আশ্চ্যার্য ব্যাপার হল আমি ভয় পেলাম না। অবাক হলাম না। বরংচ মনে মনে একটু আনন্দিতই হলাম বটে। তার হাত ধরে চলতে আমার ভিতরে অন্যরকম এক ভালোলাগা কাজ করল। বাসায় আসলাম। সাধারণত রিফা ঘুমানোর পরে আমি ঘুমাতে যাই। আজকে রিফা ঘুমালো না। আমি বেলকনিতে চেয়ারে বসা ছিলাম। সে অনেকক্ষণ চুপচাপ আমার পাশে দাড়িয়ে থাকল। তারপরে হঠাৎ বলে উঠল….

—-এই যে শুনছেন

আমি তার দিকে তাকালাম। সে কিছু বলল না। একটু হাসল। তারপরে আচমকা দুটো চুমু খেয়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। বোকার মত তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কলেজের ম্যাডামের কথা মনে পড়ল, সত্যিই বুঝি মেয়েদের ষোলকলা! আমার বোকা চাহনি দেখে সে বলল…

—-সেদিনের পাওনা! এখন থেকে রোজ আমাকে ভালবাসবেন। সবসময়ই এমন বোকাই থেকেন সমস্যা নেই। আপনি খুব ভালো মানুষ….

পরেরদিন সকালে উঠলাম। সাধারণত আমার একটু দ্রুতই উঠতে হয়। কেননা রান্না-বান্না করতে হয়। কিন্তু সেদিন দেরি হয়ে গেল। কারণ খুজতে গিয়ে দেখলাম, মোবাইলের এলার্ম বন্ধ! তড়িঘড়ি করে উঠে দেখি রিফা সবকিছু সেড়ে রেখেছে। সে রান্না-বান্না করেছে। অবাক হলাম খাওয়ার পরে! এতসুন্দর রান্না যে পারে, সেই কিনা এতদিন আমাকে দিয়ে খাটিয়েছে! মনে মনে বললাম, তবে এবার সত্যিই ষোলকলা পূর্ণ হল! আজকে থেকে লাঞ্চে খাবার নিয়ে গেলে আর কখনো বখশিশ দেয়া মিস হবে না!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত