চন্দ্রদর্শন

চন্দ্রদর্শন

আজ আমার চাচাতো বোনের গায়ে হলুদ। অনুষ্ঠান গ্রামে হওয়ার ফলে অফিস থেকে তিনদিনের ছুটি নিয়ে গ্রামে আসতে হয়েছে। আগামী ছয় মাসে কোন ছুটি চাইতে পারবো না এই শর্তে অফিস থেকে ছুটি পেয়েছি। এই কারণে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে আছে ।  কিছুদিন পর আমার বন্ধুর বিয়ে। কিন্তু আফসোস আমি যেতে পারবো না। কারণ ছুটি তো আমি কাটিয়ে ফেললাম। আমার মেজাজ খারাপ হলে কি হবে? ইরা ঠিকই আনন্দে আটখানা হয়ে আছে। সে আমার চাচাতো ভাইদের বউদের সাথে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। ভাব দেখে মনে হচ্ছে বিয়েটা ইরার হচ্ছে। আমি শুয়ে ছিলাম। এমন সময় এসে জব্বর এক চিমটি কেটে বললো,

— এই তুমি সারাদিন শুয়ে থাকো কেন? আসোনা একটু পুকুরপাড়ে গিয়ে বসি।

আমি তার এমন আহ্লাদী কথা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। বিয়ে হয়েছে প্রায় দুই বছর হতে চললো। এখনো তার ন্যাকামি শেষ হয় না। মনে হয়ে ন্যাকামির ফ্যাক্টরি নিয়ে বসেছে।

— ইরা বুড়ো বয়সে এসে ন্যাকামি করছো কেন? যাও তো, শান্তিতে ঘুমাতে দাও। রাতে তো আর ঘুমাতে পারবো না।

অন্য কোন মেয়ে হলে হয়তো বুড়ো বলার কারণে এতক্ষনে কেঁদে অস্থির হয়ে যেত। কিন্তু ইরা কখনো কাঁদে না। সবসময় কেমন যেন লক্ষীবাঈ ভাব নিয়ে থাকে। আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে আমাকে শোয়া থেকে বসিয়ে দিয়ে বললো,

— তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি। কোন অ্যাঙ্গেল থেকে আমাকে বুড়ো মনে হয়? বুড়ো তো তুমি। হাঁটলে তোমার আগে তোমার ভুড়ি যায়, আর মাথার মাঝখানে স্ট্যাডিয়াম হচ্ছে সে খেয়াল আছে? আমার বয়স এখনো পঁচিশ হয়নি। আর তোমার তো ত্রিশ পার হয়ে গেছে কতো আগে। আমি ইরার কথা শুনে চুপ করে বসে মাথা চুলকাতে লাগলাম। একেবারে জায়গামত আক্রমন করেছে সে আমায়। সত্যিই ভুড়িটা বড্ড বাড় বেড়েছে আর অজানা কারণে আমার সাধের চুলগুলো পড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষন চুপ থেকে ইরাকে বললাম,

— ইরা যাও তো। গিয়ে আমার জন্য চা নিয়ে আসো। তোমার জ্বালায় তো আর ঘুমানো যাচ্ছে না। চা খেয়ে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।

আমার কথায় ইরা তার ঠোঁটদুটো একশো ত্রিশ ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরিয়ে একটা ভেংচি কেটে বললো,

— হুহ পারবো না। বুড়ি বলেছো না? নিজের চা নিজে বানিয়ে খাও।

এই কথা বলেই ইরা ফুড়ুৎ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি আবার শুয়ে পড়লাম। আজকে আর কালকে রাতে ঘুমানো হারাম হয়ে যাবে। তাই দিনে একটু ঘুমিয়ে নেয়া দরকার। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর একটা চেষ্টা করলাম। ঘুম চলে আসছিল প্রায়। এমন সময় আবার ইরা চিমটি কেটে আমার ঘুম ভেঙ্গে দিল।

— এই যে সাহেব, চা’টা খেয়ে আমাকে উদ্ধার করুন।

এই কথা বলে ইরা আমার পাশে বসে পড়লো। তার চেহারায় রাজ্যের হতাশা এসে ভর করেছে। এই হতাশা কি কারণে তা আমার জানা নেই। আমি জানতে চেষ্টা করলাম না। চায়ে চুমুক দিলাম। ইরা বসে বসে নখ কামড়াচ্ছে।

— এই মেয়ে তোমার মাথায় কি সমস্যা আছে? বাচ্চাদের মত নখ কামড়াও কেন? কতদিন মানা করেছি এমন করবে না। তারপরেও কথা কানে যায় না?
— আমার নখ আমি কামড়াবো, দরকার হলে আমার নখ আমি রান্না করে খাবো। তোমার কোন সমস্যা আছে? বেশি কথা বললে তোমাকে কামড়ে দেব। এই কথা বলেই ইরা হা করে আমার দিকে এগিয়ে আসলো। আমি একটু পেছনে সরে গেলাম। আমার হাতে থাকা চায়ের কাপ কাত হয়ে গরম চা ছলকে পড়লো আমার লুঙ্গীতে। আমি উহ্ করে আর্তনাদ করে উঠলাম। আর ইরা হি হি করে হেসে দৌড়ে পালিয়ে গেল।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ইরার চলে যাওয়া পথের দিকে। এই মেয়ের বয়স কি আসলেই পঁচিশ হয়েছে? আমার তো সন্দেহ হয় এই মেয়ের বয়স পনেরো, সার্টিফিকেটে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে বয়স। কারণ এই মেয়ের আচরণ দেখলে মনে হয় মাত্রই এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। আমি উঠে বাইরে বেরিয়ে এলাম লুঙ্গী উঁচিয়ে ধরে। এসময় আমার থেকে বয়সে এক বছরের ছোট এক চাচাতো ভাই এসে সামনে দাঁড়ালো। সে একবার আমার দিকে তাকায় আরেকবার আমার লুঙ্গীর দিকে তাকায়।

— কিরে এভাবে কি দেখছিস? যা আমার জন্য একটা লুঙ্গী নিয়ে আয় তো। আর এই লুঙ্গী এখনই সাবান পানিতে ভেজানোর ব্যবস্থা কর। নয়তো আজীবনের জন্য দাগ লেগে যাবে। আমার কথা শুনে চাচাতো ভাই হো হো করে হেসে উঠে বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বললো,

— হুম ভাই ব্যাপারটা আমি বুঝতে পেরেছি। দাঁড়া আমি লুঙ্গী নিয়ে আসছি।

একথা বলেই সে হাওয়া হয়ে গেল। প্রায় দশ মিনিট এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে যখন বুঝতে পারলাম ভাই আর আসবে না তখন বাধ্য হয়ে অন্য এক চাচাতো ভাইয়ের ঘরে ঢুকলাম। তখন সেখানে আমার সব চাচাতো ভাবী, কয়েকজন অপরিচিত মেয়ে আর ইরা বসে বসে একে অপরের হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিচ্ছিল। আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে সবাই একযোগে প্রথমে আমার দিকে তাকালো। তারপর আমার সাদা লুঙ্গীটার দিকে তাকালো। আমি অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। তখন এক ভাবী জিজ্ঞেস করলো,

— আবির ভাই কিছু লাগবে নাকি আপনার?
— ভাবী একটা লুঙ্গী দেয়া যায়? এই লুঙ্গীটায়! আমি কথা শেষ করতে পারলাম না। তার আগেই ইরা চেঁচিয়ে উঠলো।

— কিহ! তুমি আবারো লুঙ্গীতে ইয়ে করে দিয়েছো? আল্লাহ আমি কার সাথে সংসার করি? যে কাজ মানুষ ছোটবেলায় করতো সেই কাজ উনি বুড়ো বয়সে এসে করছে।

ইরার কথা শুনে আমার হার্টের ভেতর রক্ত চলাচল করা বন্ধ হওয়ার মত অবস্থা হলো। ঘরের ভেতর বসে থাকা সবাই একযোগে আমার দিকে তাকালো। সবার ঠোঁটে হাসি লেগে আছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে সবাই হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করছে। ইরার চোখে মুখে শয়তানী হাসি খেলা করছে। বুঝতে পারলাম আমাকে বিব্রত করার জন্যই ইরা এই কান্ড করেছে। আমি লুঙ্গী ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হলাম। বের হওয়ার সাথে সাথেই ঘরের ভেতর থেকে হাসির শব্দ ভেসে এলো আমার কানে। সবাই হাসছে, কিন্তু ইরার হাসির শব্দটা সবচেয়ে জোরে শোনা যাচ্ছে।
আমি রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে ঘরের পেছনের পুকুরঘাটে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষন । চায়ের দাগ ততক্ষনে শুকিয়ে খয়েরি রঙ ধারণ করেছে। পুকুরের পানি বাতাসের তোড়ে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সাথে আমার লুঙ্গীটাও উড়ার পায়তারা করছে। আমি লুঙ্গী সামাল দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এমন সময় পেছন থেকে কে যেন কাঁধে হাত দিল। আমি চমকে গেলাম।

— আমাকে বুড়ি বলার মজা টের পেয়েছো তো? এখন থেকে আমাকে পিচ্চি বা বুড়ি বলার আগে ভেবে চিন্তে বলবা।

ইরা আমার পাশে বসতে বসতে কথাটা বললো। আমি ইরার দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। ইরা আমার গা ঘেষে বসে বললো,

— আমার বুড়ো জামাইটা রাগ করেছে নাকি? রাগ করেনা বাবু। আমি উনাদের বলে দিয়েছি যে তোমার লুঙ্গীতে চা পড়েছে। ইরার কথা শুনে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক মান সম্মান বেঁচে গেল। কিন্তু উপরে উপরে আমি রাগ দেখিয়ে অন্য দিকেই তাকিয়ে রইলাম। ইরা আমার মাথার পেছনের চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,

— আবির, দেখো তোমার আকাশে কি বড় একটা চাঁদ উঠেছে।

ইরার কথা শুনে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। সূর্য মামা একটু পর ফুল স্পিডে গরম বর্ষণ করতে শুরু করবে আর ইরা বলছে আকাশে নাকি চাঁদ দেখা যাচ্ছে। আমি এবার ইরার দিকে তাকালাম। তাকিয়ে আমি মনে হয় আকাশ থেকে পড়লাম। কারণ বিয়ের পর এই প্রথম ইরাকে শাড়ীতে দেখলাম। এই শাড়ী কখন পরলো বুঝতে পারলাম না।
আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম ইরার দিকে। ইরা লজ্জাবনত দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে বললো,

— বলেছিলাম না তোমার আকাশে আজ চাঁদ উঠেছে। বলো আমি সত্যি বললাম কিনা?

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত