আনরুমান্টিক বর

আনরুমান্টিক বর

কিশোরী বয়স থেকেই আমার খুব ইচ্ছা আমার একটা রুমান্টিক বর হবে, যে কিনা সবসময় রুমান্টিক মুডে আমাকে ভালোবাসবে। কিন্তু হায় অবশেষে এমন একজন এর সাথে বিয়ে হলো যে কিনা ভালোবাসা কি রুমান্টিকওতা কি তাও বুঝেই না। এইতো ছয়মাস হলো অনির সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। বাসর রাতে কত স্বপ্ন নিয়ে বসে ছিলাম, হঠ্যাৎ তরফৎ হয়ে অনি এসে বলতেছে….

~উফ!! যা গরম পড়ছে, দেশের যে কি হবে কে জানে।
~আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেনো এখানে দেশের আবার কি হলো?
~অনি গজ গজ করে বলতে লাগলো, কেনো জানো না সরকার বাজেট দিছে,

জিনিসপত্র এর কি দাম বাড়ছে, গরিব মানুষ বাঁচবো ক্যামনে, নাহ! এবার একটা বড় করে প্রতিবাদ করা উচিত। আমি তখন চারিদিক তাকিয়ে ভাবতেছি,বাসর ঘর ভেবে ভুল করে বোধ হয় কোনো এক রাজনৈতিক চায়ের দোকানে বসে আছি। তারপর, অনি আমাকে থমকে দিয়ে বলে উঠলো..

~হৃিদি, মোবাইল থেকে বেতারটা চালু করো তো, বাজেট এর রিভিউ দিবে, কি কি দাম বাড়লো তা নোট করতে হবে।
আমিও অসহায় এর মতো বেতার চালু করে দিলাম, আমি চুপ করে অনির দিকে তাকিয়ে আছি , আর উনি হরফর করে লিখতেছেন। বসে বসে গালে হাত দিয়া ভাবতেছি, সারা জীবন শুনে আসলাম বাসর রাতে মানুষ প্রেম- ভালোবাসা করে! আর আমরা কিনা বাজেট শুনতেছি। হায় এটা করে কয় ফাটা কপাল! বাজেট শোনতে শোনতে কখন ঘুমালাম বলতে পারি না।

পরের দিন খুব বেলা করে উঠলাম, পাশে অনি ঘুমিয়ে আছে, ঘুমন্ত মুখ দেখে বেশ সুন্দর লাগচ্ছে। অনেক দিন আগে একটা নাটক এ দেখেছিলাম, বউ এর ভেজা চুলের পানিতে বর এর ঘুম ভাঙ্গায়, এরপর কত্তকি রুমান্টিকতা। তাই আমিও সাত-পাঁচ না ভেবে স্নান করতে দৌড় দিলাম।মনের মধ্যে বসন্তের কোকিল ডাকতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর স্নান করে রুমে এসে, মনে হইলো কোকিল না, একটা কাক মাথার উপ্পরে দিয়া গেলো। দেখি অনি ইতিমধ্যে ঘুম থেকে উঠে রুমে পায়চারি করতেছে। যাক কাক মনে হয় রুমান্টিক এর বারোটা বাজালো। নাস্তা খাওয়ার জন্য আমাদের ডাকা হলো, আমি নিচে গেলাম সেই সাথে অনিও। শ্বাশুড়ি মা আমাকে দেখে সুন্দর হাসি দিয়ে আমায় বসালেন। মা আমাদের খাবার বেড়ে দিয়ে চলে গেলেন। অনি নাস্তা নিয়ে গপাগপ গিলতেছে, আমি যে এতো সুন্দরী বউ পাশে বসে আছি তার কোনো খেয়াল নেই, তাই আমি নিজ থেকে বললাম..

~এ্যাই, আমাকে একটু খাওয়াই দিবা? এই আমি হা করলাম দাও না মুখে তুলে!
~অনি চশমা টা ফাঁক করতে করতে বললো, কি ব্যাপার তুমি সারস পাখির মতো হা করে আছো কেনো? তোমার পাতে এতো খাবার রেখে আমার খাবার খাবে কেনো, আরো আছে নেও না খাও, তা ছাড়া সকালে ব্রেকফাষ্ট স্টোং করে খেতে হয়। আমার কাছ থেকে তোমাকে খেতে দিলে আমি খাবো কি! অনির কথা শুনে মনে হলো কেও আমায় জোড় করে এক গ্লাস করোল্লার রস খাইয়ে দিলো। খাবার খেয়ে অনি রেডি হচ্ছে অফিস যাবে, আমি তখন টাই ঠিক করতে করতে বললাম..

~আজকে অফিসে না গেলে হয় না! আমার কিন্তু একা একা খারাপ লাগবে খুব?
~ সেকি! কেনো অফিসে না গেলে কাজে ফাঁকি দেওয়া হবে না! আর আমি একজন সচেতন নাগরিক হয়ে কাজে ফাঁকি দিবো। জেনেশুনে অন্যায় করা ভালো কাজ না। আর তুমি একা কোথায়, মা আছে, রহিমা খালা আছে, এদের সাথে গল্প করো, না হয়তো টিভিতে সংবাদ দেখো। দেশের সম্পর্কে জানতে পারবে। অনির এমন ভাষণ শুনে মাথায় রাগ উঠে গেলো, মন চাইছিলো মাথাটা ফাটিয়ে দিয়ে ওরে এখানে বসায় রাখি। কিন্তু এর আগেই হন হন করে বেরিয়ে গেলো।

এভাবে অনেক দিন গেলো, অনির মাঝে কোনো পরিবর্তন দেখি না , তবে আমিও হাল ছাড়ার পাত্রী নই। সেবায় করলাম কি, রবী ঠাকুরের একটা গান চিরকুট হিসেবে অনির ওয়ালেটের পাশে রেখেদিলাম যাতে করে ওর নজরে আসে। সেদিন ঠিকি অনির নজরে আসলো,আমিও লজ্জা মাখা মুখ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছি। চিরকুট টি হাতে নিয়ে অনি পড়লো “আমি তোমারো বিরহে রহিবো বিলীনো, তোমাতে করিবো বাস! দীর্ঘ দিবসো -দীর্ঘ রজনী দীর্ঘ বরোমাস!! ” অনি আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ~বাহ চমৎকার! কবিতা তো, তুমি অনেক সুন্দর করে লিখো, তোমার তো এমন প্রতিভা কাজে লাগাতে হবে। তুমি দেশ কে নিয়ে একটা কবিতা লিখো তো, আগামীতে ফোরামে কবিতা টা আবৃত্তি করা যাবে। আর এতো ছোট কাগজে কেও লিখে, তোমাকে ভালো কাগজ এনে দিবো।

আমি হতভম্ব হয়ে, অনির দিকে তাকিয়ে আছি, এটা কি বললো, ভাগ্যিস, রবীন্দ্রনাথ কথাটা শুনেন নি, তাহলে এতোক্ষণ আমাকে কান মলা দিয়ে বলতেন, “এই মেয়ে আমার গান দিয়া জামাইরে পটাও না! গান রে কও কবিতা, এতোই যখন শখ তাইলে নিজে একটা লিখতে পারো না, আমার টা কপি মারো ক্যান.! ” চিরকুট দিয়েও কাজ হলো না, আমি সারাদিন সাজুগুজু করে ওর ধারে কাছে ঘুরঘুর করিও তবুও অনির মনে রোমান্স নেই। একদিন মনের কষ্টগুলা শ্বাশুড়ির সাথে শেয়ার করলাম, মা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন,

~ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই ছাত্র রাজনীতি করতে করতে নিজেরে একদম ঢেরষ কইরা ফালাইছে। বউমা! একটা কাজ করো ওরে নিয়া কোথাও ঘুরতে যাও তাও হয়তো একটু বুঝবে। ব্যপার টা তখন, আমার কাছে মন্দ লাগেনি। তাছাড়া বিয়ের তো অনেক মাস হলো। অনি কে বললাম কক্সবাজারে যাবো, কয়দিন ঘুরে আসবো। কিন্তু অনি কক্সবাজারে যাবে না, তার কথা একটাই,

~ হুদাই পানি দেখে কি লাভ! তারচেয়ে চলো চট্টগ্রামএর শুটকী পল্লীতে ঘুরে আসি, কিভাবে ওরা শুটকী উৎপাদন করে, আর জেলেদের জীবন সম্পর্কেও জানা যাবে। অনির সেই ভাবা সেই কাজ। পরেরদিন আমাকে জোর করে নিয়ে রওনা হলো চট্টগ্রাম এর উদ্দেশ্য, প্রায় অনেক ঘন্টার জার্নির পর পৌছালাম, শুটকী পল্লীতে। বিস্তর জায়গা জুড়ে মাছ শুকানো হচ্ছে, আমরা এর মাঝ পথে হাটতেছি। শুটকীর ভোটকা গন্ধ লাগতেছে তাই নাক চেপে হাটতেছি। একজন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতেছে,,

~আপা! শুটকী নিবেন? ভালো শুটকী।

আমি তখন মাথা নাড়িয়া না বলতেছি, আর মন মন বলতেছি, আমি নিজেই চ্যাপা শুটকী হয়ে বসে আছি , আর শুটকী নিবো কি। প্রায় দুদিন ঘুরাঘুরি করে বাসায় আসলাম। এভাবে দিন কয়দিন গেলো। একদিন প্রিয় বান্ধবী জারা ফোন দিয়ে জানতে চাইলো আমার বিবাহিত দিন কেমন চলতেছে।আমিও সব বললাম। জারা ফিক করে হেসে বলতে লাগলো..

~দোস্ত! দুলাভাইকে রুমান্টিক বই পড়তে দে, আর রুমান্টিক নাটক-সিনেমা দেখা, কাজ হতে পারে।
~আমিও চেষ্টা করবো বলে ফোন কেটে দিলাম।

পরেরদিন অনেগুলো রুমান্টিক বই কিনে আনলাম লাইব্রেরী থেকে। সেই সাথে ইন্টারনেট, ইউটিউব থেকে অনেক নাটক, মুভি ডাওলোড দিয়ে অনির ফোনে রেখে দিলাম। রাতে ভাত খেতে অনিকে জানান দিলাম

~তোমার জন্য কিছু বই কিনেছি, তুমি অবশ্যই এগুলো পড়বে!
~আচ্ছা বেশ পড়বো।

খাবার খেয়ে সবকিছু গোছানো পর রুমে এসে আমি তখন পুরাই টাস্কি খেলাম। যেগুলা বই এনেছিলাম সেগুলা নেই, সেই জায়গায় প্লেটো, মাং সে তু, শেখ মুজিব বড় বড় গুনিজনদের বই । জিজ্ঞেস করতেই অনি বইএর পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে,

~এগুলো বই, তো বাচ্চা ছেলেমেয়েদের , এগুলো পড়ে কি হবে, তাই দিয়ে দিছি।
~ আমি অবাক হয়ে বললাম, কারে দিছো তুমি??
~পাশের বাসার সুলেমান কে, ছোট মানুষ পড়ুক সে।

বিরক্ত হয়ে খাটে এক কোনে বসে পড়লাম। বসে বসে ফোন টিপতেছি। হঠ্যাৎ মনে হলো জারার কথা ওতো বললো বেশী বেশী করে রুমান্টিক নাটক দেখতে, মনে করতেই অনির কাছ থেকে বই কেড়ে নিলাম, আর হাতে ফোন দিয়ে বললাম,

~আসো নাটক দেখবো, ফোন স্টোর থেকে বের কর।
~ অনি ভ্রু কুচকে বললো, কিসের নাটক আমি তো ফোন স্টোরের সবকিছু ডিলেট করেদিছি, ভাবলাম এগুলো ভাইরাস হবে তাই। কথাটা শোনে এতো রাগ হলো, সেন্টিমেন্ট বেড়ে গেলো, রুম থেকে বের হয়ে অন্যরুমে লক মেরে বসে থাকলাম। শত প্যারা নিয়ে লম্বা ঘুম দিলাম। কয়েদিন থেকে বৃষ্টি ঝরতেছে। অনি কে দেখলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতেছে। আমিও প্রফুল্ল মনে গেলাম তার পাশে। আমাকে দেখে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো..

~বুঝলে হৃিদি! এবার বোধ হয় খুব বড়সড় বন্যা হবে। যে হারে বৃষ্টি হচ্ছে।
~হুম! বন্যা হলেও এর প্রতিকারও আছে। এগুলা সরকার দেখবে। এত চিন্তার কারণ নেই।
~কি বলো তুমি, দেশের সমস্যা কি শুধু সরকার নিবে নাকি, আমাদেরও দ্বায়িত্ব তো আছেই, এতো স্বার্থপর হলে কি চলে।
~আচ্ছা ঠিক আছে, বন্যা হোক আগে। আমি অনির হাত ধরতে ধরতে বললাম,চল না গো! আমরা এখন বৃষ্ট বিলাস করি, দেখছো কি রুমান্টিক ওয়েদার। অনি আমার হাত ঝামরা মেরে ফেলে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে গজ গজ করলো..

~আহঃ হচ্ছে টা কি! এতো মেলা করে আসমানের পানির ছিটা দেখার কি হলো। ছাতা টা বের কর, বাইরে যাবো দেখবে হবে পানি কত সেন্টিমিটার বাড়লো। অনির কথা শুনে আমি আর নিজের জায়গায় নেই, মনে হলো কেও মনে হয় ঠাডা মারা রোদে আমায় দাড় করিয়ে রেখেদিয়েছে।রাগে দুঃখে রুমে এসে নিজের ব্যাগ গোছাতে লাগলাম। ডিসিশন নিয়েনিলাম, এই বাড়িতে এক মূহুর্তের জন্য নয়। এই নিরস প্রাণী সাথে থাকার চেয়ে বনবাসে যাওয়াই উত্তম। থাকুক ওর বাজেট, রাজনীতি, বন্যা মানুষ নিয়া। আমি চললাম বাপের বাড়ি। শ্বাশুড়ি অনেক বুঝালেন, কিন্তু নাহ, অবশেষে বাইরে চলেই আসলাম, একটা টেক্সি ধরে সোজা বাপের বাড়ি। আমার শ্বশুরবাড়ির থেকে আমাদের বাড়ি বেশ দূরে নয় প্রায় এক ঘন্টার রাস্তা। পরিশেষ বাবার বাড়ি চলে আসলাম।

অনেকদিন হলো বাবার বাড়ি আছি। এখন আমি বাপের বাড়ি হাঁস -মুরগী পুষি। আমি সিন্ধাত্ব নিছি, আনরুমান্টিক বর এর পিছে না ঘুরে হাঁস -মুরগী পুষাই শ্রেয়। মাঝে অনি একবার আসছিলো নিতে,আমি অভিমান করে বারণ করি যেতে, দু একবার জোর কররার পর, রাজী হইছিলাম যাইতে। কিন্তু হায় সেই না অনি জানতে পারলো আমি মোরগ পালতেছি, সেই থেকে ওর ভাষণ শুরু, এই কাজ নাকি ভালো কাজ, আমি নাকি অনেক সফল উদ্যেগতা, দেশ কে নাকি অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবো। আমার মত বেকার এর নাকি এমন হওয়া উচিত।

অবশেষে আমার জামাই আমার নাম বেকার এর খাতায় নাম ওঠালো। হায় খোদা! জীবনটা একদম তেজপাতার মতো হইগেলো। কথা শুনে এমন রাগ উঠলো, ঝাটা মেরে অনিরে বিদায় করছি, দরকার নাই এমন দেশপ্রেমিক জামাই। মন খারাপ করে বারিন্দায় আসছি, দেখি মুরগীগুলান জোড়া হইয়া বসে আছে। আমি ওগুলা দেখে মনের কষ্টে অপরাধী গান ধরছি “ও অনি রে অনি রে তুই অপরাধী রে, আমার যত্নে গড়া ভালোবাসা দে ফিরাইয়া দে…. হঠ্যাৎ আমার ছোট ভাই চিৎকার দিয়া বলতেছে,

~এইরে আপা! ঠিকঠাক গাইতে পারিস না, লিরিক্স ভুল করোছ, শরম করে না এতো সুন্দর গান টারে কপি করস, এতো পিশাচ ক্যান তুই ছিঃ! অতপর আমি অজ্ঞান।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত