মরণ প্রেম

মরণ প্রেম

-তোমার আমাকে পছন্দ হয়নি, এ কথাটা বিয়ের আগে অন্তত একবার বলতে৷ আমি সেখানেই সব থামিয়ে দিতাম৷ কেন বলনি তখন? আমি চুপ থাকলাম। সে আবারও বলল,
-বল, কেন বলনি?
-আমাকে জোর করা হয়েছে। বাধ্য হয়েছি৷

আমার কি খুব সখ আপনার সংসার করার? তার মুখ মলিন হলো৷ যেন এমনটা আমার কাছ থেকে আশা করেননি। আমি ভ্রুক্ষেপ করলাম না৷ এসব ন্যাকামো আমার জানা আছে৷ আমি চুপ থাকলাম। সে খানিকটা অসহায় হয়ে বলল,

-চল, তোমাকে গল্পটা বলি। আমার প্রথম প্রেমের গল্প। যেটা তোমার ভীষণ অপছন্দ৷ যার কারণে তুমি আমাকে সহ্য করতে পারো না৷ চিন্তা করো না। ছোট করে বলব। বিরক্ত হইও না৷ কেমন?

বারান্দায় বসে আছি। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। বাইরে ঘন অন্ধকার। বৃষ্টি হচ্ছে ভীষণ। মাঝে মাঝে বৃষ্টির ছিটে গায়ে পড়ছে। আমার অসহ্য লাগছে৷ অসহ্য লাগার দুটি কারন, প্রথমটা হলো এই বৃষ্টি। বৃষ্টি খুব একটা ভালো লাগে না৷ এ সময়ে বেশ চমৎকার একটা ঘুম দেওয়া যেতে। কিন্তু আমি তা পারছি না। না পারার কারণের সাথে দ্বিতীয় কারণটা যুক্ত আছে৷ আমার অসহ্য লাগার দ্বিতীয় কারণ হলো আমার স্বামী। নাম সোহান আহমেদ৷ যাকে আমি একদমই সহ্য করতে পারি না৷ দু’চোখে দেখতে পারিনা। নাম মাত্র বিয়ে হয়েছে। তাকে বিয়েও করতে চাইনি। বাবা জোর করলেন। এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল বলা চলে। নিজেও উপায়হীন ছিলাম। তাকে বিয়ে না করার মূল কারণ হলো সে বিয়ের পূর্বে প্রেম করছে। ততদিনে প্রেমের প্রতি আমার যথেষ্ট ঘৃণা জন্মে গিয়েছিল। ঘৃণা জন্মানোর কারণ হলো আমার প্রেম। রোহান নামের একটা ছেলের সাথে আমার প্রেম ছিল। গভীর ভালোবাসায় লিপ্ত ছিলাম দুজনে।

শেষকালে সে জানালো আমাদের ভালোবাসা পরিপূর্ণ করবে এবং সেটা হবে রুমডেট এর মাধ্যমে। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে ও এমনটা বলেছে। দুবছরের প্রেম সেখানেই ইতি টানি আমি। বন্ধুবিরাও বলেছিল, আজকালের প্রেমে এসব খুব সিম্পল ব্যাপার। প্রেম করলে রুমে যেতেই হয়। সেদিন থেকে প্রেম এবং প্রেমিকদের প্রতি আমার বিষদ অনিহা জন্মে গিয়েছিল। ঘৃণা হতো ভীষণ। নিজেকে বহু বুঝাতাম। সবাই এক না। তবুও কেন জানি নিতে পারতাম না। বাবা যখন বললেন বিয়ে দিবেন তখন আমি সোজাসাপটা নিষেধ করে দিয়েছিলাম। তিনি আমার নিষেধাজ্ঞা শুনেন নি। পাত্রপক্ষকে বাসায় দাওয়াত দেন৷ তারা আসে। পাত্রের সাথে আমাকে আলাদা করে কথা বলতে বলা হয়৷ কথা বলি৷ আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল,

-প্রেম করেছেন কখনও?  তাকে হতভম্ব দেখাল। হঠাৎই এমন প্রশ্ন করব বলে ভাবেননি নয়তো। তবুও সে মৃদ্যু হেসে খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলল,

-জ্বী!  আমি সেখান থেকে উঠে গিয়ে বাবাকে আড়ালে এনে বলি,

-বাবা,আমি এই ছেলেকে বিয়ে করতে পারব না।  বাবা রেগে গেলেন। বললেন,
-এমন পাত্র হাজারে একটা পাওয়া যায়৷ তুই বলছিস আমি তা হাত ছাড়া করে ফেলব? কী খারাবি এই ছেলের মাঝে বলতো? দেখতে শুনতে তো চমৎকার। খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছি। চরিত্রে দাগ নেই তার।  আমার রাগ উঠল। বললাম,

-এসব খোঁজ খবরে বিশ্বাস করে লাভ নেই বাবা। এগুলো সব মিথ্যা আর ছেলে আগে প্রেমও করেছে।  বাবা খানিক চুপ থাকলেন। তার রাগত চেহারা স্বাভাবিক হতে থাকল। আমার ভ্রু কুচকে এল। বাবা বললেন,
-তুই প্রেম করিসনি? বল করিসনি?

আমার আর কিছুই করারা থাকল না। অগত্যা বিয়ের পিড়িতে বসতে হলো৷ খানিকটা ডিপ্রেশনেও ছিলাম৷ তাই জোরাজোরি করিনি৷ বিয়ে করলাম। বাসর ঘরে সে আমাকে কিছু বলতে চাইল৷ সুযোগ দিলাম না৷ স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম, আমার কাছ থেকে যেন তিনি কিছু আশা না করেন। এক মাস পেরিয়ে গেল। আজ আমরা এত রাতে এক সাথে বসেছি৷ আমাদের এভাবে আর বসা হয়নি৷ সোহান জোর করেছে আজ৷ তাই এলাম৷ সোহান গল্প বলা শুরু করল,

“ক্লাস নাইনে ছিলাম তখন। আমার স্পষ্ট মনে আছে৷ বারই ফেব্রুয়ারি। প্রথম প্রিয়ড। শান্তা মেডামের অংক ক্লাস৷ ম্যাম সবে রোল কল করে শেষ করলেন। এমন সময় হেড স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। তার পেছন পেছন একটা মেয়ে ঢুকল। নীল স্কুল ড্রেস পরা, কোমরে-বুকের উপর সাদা বেল্ট লাগানো, কানের কাছে ঘন চুলের দুটি বেণি ঝুলছে, ভাসা ভাসা চোখ দুটোয় গাঢ় কাজল, ঠোঁটে অল্প করে লিপস্টিক লাগানো, মীরা বিশ্বাস করো আমি স্তব্দ হয়ে যাই। আমার বুকের ভেতরটা কেমন জানি করতে থাকে। অদ্ভুত একটা শিহরণ আমার সমস্ত গা কাঁপিয়ে তোলে। বিশ্বাস করো, আমার মনে হলো আমি কোনো পরী দেখছি। এত সুন্দর মেয়ে আমি এর পূর্বে দেখিনি৷ আমার মনে হলো আমি এই মেয়ের জন্যে সব করতে পারব। সব। স্যার মেয়েটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার নাম সুমাইয়া আক্তার সুমি। আমার প্রথম এবং শেষ প্রেম সেখান থেকেই শুরু হয়।”

সোহান থামল। আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম৷ একটু আগেও আমার প্রচণ্ড অসহ্য লাগছিল। ভাবছিলাম কখন উঠব এখান থেকে৷ কিন্তু মানুষটার কথা গুলো শুনে আমার সেই অস্থিরতা, অসহ্য লাগা যেন হুট করেই তলিয়ে গেল। ওর চেহারাও যেন চরম পরিবর্তন হতে থাকল৷ একদম অন্যরকম। আমার মনে হলো আমি কখনই এই সোহানকে দেখিনি। কখনই না৷ সোহান আবার বলতে থাকল,

“প্রথমদিন থেকেই আড় চোখে মেয়েটাকে দেখতাম। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম৷ প্রতিদিনই দেখি। ক্লাসের অধিকাংশ ছেলেই তার প্রতি আগ্রহী ছিল। মুগ্ধ ছিল৷ ওর কলম পড়ে গেলে পাশের বেঞ্চের ছেলেটা দ্রুত গিয়ে সেটি উঠিয়ে দিত৷ মেয়েটা যদি বলত ও এখন আইস্ক্রিম খাবে ক্লাসের অধিকাংশ ছেলে যেন প্রতিযোগিতা করে দৌড়ে যেত। বলা বাহুল্য তাদের মাঝে একজন আমি ছিলাম। কিন্তু কখনই প্রতিযোগিতা চাইনি আমি। আমার তখন অসহ্য যন্ত্রণা হত যখন কোনো ছেলের সাথে ও কথা বলত৷ হাসাহাসি করত। কী দরকার এত কথা বলার! মীরা, আমি প্রতিদিন স্কুলে যেতাম। এমনকি শুক্রবারও ইচ্ছে হতো যাওয়ার। তুমি বিশ্বাস করবে না, আমার ভেতর কী ভীষণ উন্মাদনা কাজ করত তাকে দেখার। বুকের ভেতর কেমন জানি করত৷ কী অদ্ভুত এক শিহরণ আমাকে উন্মাদ করে তুলছিল। একদিন আমি ধরা খেয়ে যাই। মেয়েটা বুঝতে পেরে যায় আমি তাকে দেখছি৷ আমি ভয় পেয়ে যাই। মাথা নিচু করে রাখি৷ আড়চোখে দেখি তাকে। সে তখনও আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

আমাদের চোখাচোখি হয়৷ আমার গা কেঁপে উঠে তখন৷ আমার মনে হল ওর চোখে কারেন্ট জাতীয় কিছু ছিল৷ সেটা দূর থেকে আমাউ শক করে। আমি দিন দিন মেয়েটার প্রতি দূর্বল হয়ে যাই৷ মনের ভেতর অদ্ভুত এক দূর্বলতা কাজ করে। আমাদের প্রথম কথা হয়৷ তিন মাস পর। একদিন আমি আমাদের বেঞ্চের কর্ণারে বসেছি। ও নিজেদের বেঞ্চের কর্ণারে বসেছে। আমরা দুজনই কাছাকাছি। ওর গা থেকে মিস্টি একটা ঘ্রাণ আসছিল। দামি ফার্পিউম হবে হয়তো৷ আমি চুপচাপ বসে থাকলাম। এদিকে আমার ভেতরে যেন ঝড় বইছিল। ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়েছে। বুকের ভেতর কি যে কাঁপা কাপছিল! আমার যেন দম বন্ধ হয়ে আসবে। আমি কান্না করে দিব। চোখে জল জমবে। এমন অবস্থা৷ ঠিক সে সময়ে সুমির মিস্টি স্বর শোনা গেল,

-কেমন আছো সোহান?

আমার হার্টবিট যেন থমকে দাঁড়ায়৷ মুখ দিয়ে শব্দ আসে না৷ আমি বাক শক্তি হারিয়ে ফেলি৷ ওর দিকে তাকিয়ে হাসি কেবল। ও কেমন আছে এমনটা যে জিজ্ঞেস করব তাও পারিনি৷ বুকের ভেতর তখন কেউ ঢোল বাজাচ্ছিল যেন৷ আমি কেবল স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলাম। ঠিক তখনই একটা ছোট্ট কাগজ এসে পড়ে আমার সামনে। আমি সেটা খুলে পড়ি৷ সেখানে লেখা,

‘সারাক্ষন তো ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকো। কিছু বলতেও পারো না। যেই না আমি কথা বলতে এলাম ওমনি তোমার ভাব বেড়ে গেল। তুমি জানো? রুমার সাথে এক প্রকার ঝগড়া করেই কর্ণারের সিটটা নিয়েছি৷’ আমি দ্রুত ওর দিকে ফিরলাম। দেখলাম সে অভিমানী দৃষ্টিতে জানার দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মীরা, ওর সেই চেহারা সেদিন আমার মনের ভেতর গেঁথে গিয়েছিল৷ আজো আমি সেই চেহারা দেখতে পাই। সেই অভিমানী দু’চোখ! কী মিস্টি দেখায়। মীরা? তুমি কী বিরক্ত হচ্ছো?” আমি কিছু বলতে পারলাম না। কেবল চুপ থাকলাম। আমার মুখ দিয়ে যেন কোনো শব্দই আসছিল না৷ সোহান বলে উঠল,

“আচ্ছা ঠিকাছে। আমি তোমাকে আরো সংক্ষেপে বলছি। প্লিজ বিরক্ত হইও না৷ তোমাকে বিরক্ত করার ইচ্ছে নেই আমার। শোনো, ওর সাথে আমার প্রেম হয়৷ ক্লাস টেন এর প্রথম দিন থেকে। আমার প্রথম প্রেমের গল্প সেখান থেকেই শুরু হয় গভীর ভাবে। কী আবেগ দুজনের! কত কেয়ার! কত ভালোবাসা দুজন দুজনের জন্যে প্রাণ দিয়ে দিতে পারব। আমরা একই কলেজে ভর্তি হয়৷ কলেজে উঠার পর আমাদের প্রেম আরো গাঢ় হয়। দুজনের প্রতি দুজনের কেয়ার বেড়ে যায়৷ খুব আনন্দঘন দিন কাটতে থাকে আমাদের৷ সেখানে এক পশুর চোখ পড়ে ওর উপর৷ কলেজ ভিপি। আমাকে ধমকায়। আমি যেন সরে যাই সুমির জীবন থেকে। আমি সেগুলো এড়িয়ে চলি। নিজের মতো চলতে থাকি। এর জন্য আমাকে মার খেতে হয়৷ এক সময় কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমি বুঝতে পারি এসব ওই ভিপির চাল। আমি সুমিকে সব খুলে বলি। ওকে চিন্তিত দেখায়। আমি ওকে আশ্বাস দেই৷ বলি,

-সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করো না৷

সে বিকেলে আমার কাঁধে কত বিশ্বাসের সহিত মাথা রেখেছিল মেয়েটা। সে একবারই। শেষ বারের মতো। এর প্রায় দু সপ্তাহ পর সুমির বান্ধুবি ইরিনা আমাকে একটা চিঠি দেয়৷ এর মাঝে আমাদের যোগাযোগ হয়নি৷ দেখা হয়নি৷ আমি তখন উন্মাদের মতো ছিলাম। বেশ কয়েকদিন ওদের বাসার সামনে ঘুরাঘুরি করেছিলাম। কলেজ গিয়ে ওই ছেলে গুলোর হাতে মার খেয়ে এলাম। অনেকটা পাগলপারা অবস্থা৷ আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হতো যেন। মেয়েটাকে দেখি না কতোদিন৷ আমার প্রাণ ভোমর শুকিয়ে আসে৷ দম বন্ধকর অবস্থা৷ ওর চিঠিটা আমার জন্যে প্রাণ স্বরূপ ছিল৷ যেন আমার শুষ্ক গলায় পানি ঢেলেছে কেউ৷ আমার এ দেহে প্রাণ দিয়েছে কেউ৷ আমি চিঠি বুকে জড়াই প্রথমে। চুমু খাই। ঘ্রাণ নেই৷ আহা! সুমির সে হাতের লেখা দেখব কতো দিন পর৷ আমার মাঝে তখন কী ভীষণ উৎসাহ কাজ করছিল! আনন্দে গা কাঁপছিল৷ চোখে জল জমে এল৷ আমি চিঠি পড়া শুরু করলাম৷ খামের ভেতরের কাগজটা ভেজা ভেজা মনে হল আমার কাছে৷

প্রিয় ভালোবাসার মানুষ,  তোমার এমন কষ্ট সহ্য হয় না আমার। এত ভালোবাস কেন শুনি? প্রায় তোমাকে বাসার সামনে ঘুর ঘুর করতে দেখি। কেন এমন করো? না দেখে থাকতে পারো না বুঝি? শুনেছি কলেজ গিয়ে আবার মার খেয়ে এসেছো? কেন এত মার খাও? এত বেশি ভালোবাসো কেন? বেশি ভালোবাসা মোটেও ঠিক না, বুঝলে? সব কিছু সবার কপালে সয় না৷ আমারও সইবে না৷ সোহান, তোমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমি কেন তোমার সাথে দেখা করিনা, তাই না? আমার লজ্জা হয় ভীষণ! কোন মুখে তোমার সামনে দাঁড়াবো আমি? কী নিয়ে দাঁড়াব? আমার যে কিছুই নেই৷ সোহান, ওই পশু গুলো আমার সব শেষ করে দিয়েছে। সব। আমি আর পারছি এসব সইতে। পিশাচটার হাতের স্পর্শ এখন আমি অনুভব করি৷ যেন কোনো বন্য জানোয়ার আমাকে খুবলে খাচ্ছে৷ আমার ঘুম হয় না সোহান। কী অসহ্য যন্ত্র না আমার ভেতরটা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে সেটা যদি তোমাকে একবার দেখাতে পারতাম! তুমি যদি দেখতে! আমি পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছি। এত যন্ত্রণা সহ্য করতে পারি না আমি। সোহান,আমার দ্বারা আর সম্ভব হবে না৷ আমি পারছি না। আমাকে ক্ষমা করে দিও।” সোহান থেমে গেল। আমি ওরদিকে তাকিয়ে আছি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে৷ ভেতরে কেমন জানি করছে। অদ্ভুত একটা আগ্রহ জাগছে বাকিটা শোনার৷ আমি বললাম,

-এরপর? এরপর কী হয়েছে?  সোহানের গাল বেয়ে এক ফোটা পানি পড়ে গেল। ওর গলাটা ধরে এল৷ কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, “হঠাৎই বাসার ফোনে একটা কল আসে। আমি ফোন ধরি। ভাবি সুমি ফোন করেছে মনে হয়৷ অচেনা নাম্বার৷ হ্যালো বলে কল রিসিভ করি৷ ওপাশ থেকে কেউ কান্না করতে করতে বলে,

-সোহান, সুমি আত্মহত্যা করেছে৷ ট্রেন স্টেশনের আমার হাত থেকে ফোন পড়ে যায়৷ চোখে জল জমে। দ্রুত দৌড়ে যাই স্টেশনের দিকে৷ স্টেশন থেকে অনেক দূরে একটা জটলা দেখি৷ আমি দৌড়ে যাই। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে দেখি একটা নিলাভ রং ট্রেনের পাতের সাথে মিশে আছে। তার পাশে লাল হয়ে আছে রক্তে৷ নীল জামাটা। যেটি আমার ভীষণ পছন্দের ছিল। মীরা, সুমি আত্মহত্যা করে৷ মারা যায় ও! আমার প্রেম ধ্বংস হয়ে যায়।”

সোহান কান্না করে দেয়। বাচ্চাদের মতো কান্না করে ও। আমার চোখে জল এসে যায়। ক’ফোটা গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে৷ আমি তাকিয়ে দেখি সোহানকে। সে কান্না করছে তখন৷ নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতো কান্না করতে থাকে ও। আমি জলভরা দৃষ্টিতে দেখি তাকে। আমার ভীষণ মায়া হয় তখন৷ খুব ইচ্ছে হয় জড়িয়ে ধরি ওকে। শান্তনা দেই। আমি পারি না৷ জায়গা থেকে নড়তে পারি না যেন। সোহান অনেকক্ষন পর আবার বলে উঠে, “মীরা, আমার সমস্ত পৃথিবী থমকে যায়৷ আমি বোবার মতো হয়ে যাই! অনেকটা পাগলের মতো হয়ে যাই। আমার সমস্ত আগেব,ভালোবাসা সেখানে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। আমি উন্মাদের মতো হয়ে যাই। বহু কষ্টে সেখান থেকে বেরিয়ে আসি আমি। সুমির ঘোর আমি আজো কাটাতে পারিনি মীরা। তার শেষ কথাটা রাখতে আমি মেয়ে দেখতে যাই৷ সে বলেছিল আমি যেন ভালো একজনকে দেখে বিয়ে করি৷ সুখে থাকি। খুব করে বলল কথাটা রাখতে। ভালোবাসি ওকে। কীভাবে কথাটা ফেলে দেই? চিঠিটা দেখতে পারো। এখনও আছে আমার কাছে। বেশ যত্ন করে রেখেছি সেটা।

তোমাকে প্রথম দেখেই আমার মনে হয়েছিল তুমিই সেই মেয়ে। ভালো মেয়ে৷ আমার উপযুক্ত। তাইই তোমাকে বিয়ে করলাম৷ তা না হলে তোমাকে বিয়ে করার ইচ্ছে কি আমার ছিল? উহু৷ মোটেও না মীরা৷ আমি ভেবেছি হয়তো ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে৷ সব আগের মতো হয়ে যাব৷ তুমি আমাকে সুমির ঘোর থেকে বের করতে সাহায্য করবে। সেখানে সেই তুমিই কিনা আমাকে ঘৃণা করছো এই প্রেমের কারণে? আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছো? এই প্রেমের কারণে যেই প্রেম আমাকে আজ এই পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছে৷ আমাকে আত্মহত্যা করতে দেয়নি৷ আমাকে পড়ালিখা করে মানুষ হতে সাহায্য করেছে। যার কথা রাখতে,নতুন জীবনের সূচনা করতে আমি তোমাকে বিয়ে করি। মীরা,এটা তোমাদের প্রেম না যে কদিন প্রেম করেই রুমে যেতে হয়। এটা দুটি কিশোর কিশোরীর পবিত্র মনের নিষ্পাপ আবেগ যেটা ধীরে ধীরে প্রকাণ্ড আকার ধারণ করে। আমি এক জীবন সুমিকে যতটা ভালোবেসেছি ততটা আর কাউকে ভালোবাসিনি। বাসতে পারবও না। সম্ভবই না।”

সোহান উঠে চলে গেল। আমি বসে থাকলাম। একটুও নড়লাম না৷ আমাত নড়তে ইচ্ছেই হলো না৷ অনেকটা সময় কেটে যায়৷ আমার ঘোর কাটে৷ আমি উঠে দাঁড়াই৷ হঠাৎই মানুষটার প্রতি টান অনুভব করি৷ প্রেম নিয়ে যে অনিহাটা আমার গলায় মাছের কাটার মতো আঁটকে ছিল সেটা যেন কোথাও পালিয়ে গেল৷ মানুষটার প্রতি ভীষণ আগ্রহ জাগে আমার। টেনশন হতে থাকে। আমি দ্রুত রুমে যাই। সে নেই৷ এ রুম ও রুম খুঁজি। সে নেই। আমি কেমন জানি একটা তাড়না অনুভব করি৷ মানুষটা গেল কই৷ কই গেল? আমার মনের ভেতর কেমন জানি করতে থাকে৷ চোখে জল জমে দ্রুত। আমি কান্না করতে থাকি৷ দ্রুত মাকে ফোন দেই। বাবা ফোন ধরেন। আমি কান্না করতে করতে বলি,

-বাবা,সোহান কে বাসার কোথাও পাচ্ছি না। ও বাসায় নেই। কোথায় গিয়েছে বলে যায়নি৷ আমার টেনশন হচ্ছে খুব৷ বাবা আমি ফোনটা রেখে দিলাম। আমার মনে হলো আমি তো ছাদে যাইনি। ও ছাদে থাকতে পারে। সত্যি বলতে আমার ভেতর হঠাৎই এক প্রকার উত্তেজনা তৈরী হয়৷ মানুষটার প্রতি মায়া জমে যায়। পাগল পাগল লাগে। আমি ছাদে উঠি। বৃষ্টি তখনও হচ্ছিল মৃদ্যু ভাবে। আমি ছাদে যেতেই বৃষ্টি আরো জোরে বর্ষণ হতে থাকল৷ মুশলধারা বৃষ্টি হতে থাকে৷ আমি দেখি মানুষটা এক কর্ণারে দাঁড়িয়ে আছে৷ কান্না করছে। তার চাপা কান্নার আওয়াজে শুনতে পাচ্ছি আমি। আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠে। আমি ধীরে পাঁয়ে এগিয়ে যাই। সোহাম তখন হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে। দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্না করে কেবল। আমি আর থাকতে পারি না। দৌড়ে যাই। আঁকড়ে ধরি মানুষটাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেই। বলি,

-সোহান,কান্না করো না। আমি আছি তোমার পাশে। তুমি প্লিজ কান্না করো না৷  ও কিছু বলল না৷ কেবল শক্ত করে আমায় জড়িয়ে ধরল। জড়িয়ে ধরে কান্না কর‍তে থাকল ও। আমি তার আলিঙ্গনকে সাদরে গ্রহণ করে নিলাম।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত