সংসার

সংসার

বিয়ের ২মাস পর সায়েমের সাথে রাগ করে তাকে ডিভোর্স দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাবার বাড়িতে চলে আসি।বেশ কয়েকবার সায়েম কল দিয়েছে।এই নিয়ে মোট ১০৮টা মেসেজ জমা হয়েছে। আর সব গুলো মেসেজই দিয়েছে সায়েম।প্রতিটা মেসেজে লেখা ছিল “ভালোবাসি প্রিয়”

সায়েমের সাথে আমার ঝগড়ার মূল কারণ তার মা।মহিলা ভীষণ জেদি।আমি সকালে ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি না উঠলে সায়েমকে বলে বউমাকে সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে বলিস।রান্নায় লবণ কম বা বেশি হলেই বলবে একটু দেখেশুনে রান্না করো।আমি আর সায়েম তো কোথাও ঘুরতেই যেতে পারি না উনি কল দিয়ে বার বার বলবেন তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে।এইসব বিষয় আমি কোনো ভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না।তাই চলে এসেছি।

ঠিক রাত ১০টায় রাতের খাবারটা শেষ করে শুয়েছি।এপাশ ওপাশ করছি।কোনোভাবে ঘুম আসছে না।বিছানা থেকে উঠে রুমের একটা দরজা খুলে দিলাম।আমার রুমে ২টা দরজা একটা দিয়ে সবাই আসা যাওয়া করে আরেকটা বেলকনির দরজা।আমি বেলকনির দরজাটা খুলেছি।বাহ!কি মিষ্টি বাতাস।চারিদিকে নিস্তব্ধতা।কোথাও কোনো আওয়াজ নেই।হালকা মৃদু বাতাসে চুল গুলো উড়ছে।

চোখ বন্ধ করে নিস্তব্ধতা অনুভব করছি।অনেকদিন পর এমন একটা সময় এসেছে।মাঝে মাঝে একা হয়ে যাওয়া ভালো নিজেকে চেনা যায়।নিজের ভিতরের আমিটাকে ভিতর থেকে টেনে বের করে সামনে একটা কল্পনার মানুষ ভেবে দাঁড় করিয়ে অনেক না বলা কথা বলা যায়। একটু পরে হঠাৎ কে যেনো আস্তে করে আমার রুমের দরজাটা খুলছে।কানে একটা শব্দ ভেসে আসলো।পিছনে ফিরে তাকাতে দেখি মা দরজা খুলছে।মা আমার কাছে এসে বলছে।

–কিরে!ঘুমাসনি?
–না মা।ঘুম আসছে না।
–আমি জানতাম তোর ঘুম আসবে না।
–কিভাবে জানলে?
–মা রা সব জানে।

বলে মা হাসছে।আমি আমার চেয়ারটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলছি বসো মা। মা চেয়ারে বসেছে।আমি ফ্লোরে বসে আস্তে করে মাথাটা মায়ের কোলে রাখলাম।মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।মনে হচ্ছে বুকের ভিতর জমাট বাঁধা কষ্ট গুলো শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।হাত বুলাতে বুলাতে মা বলছে জানিস!একদিন তোর বাবার সাথে রাগ করে আমিও তোর মত তোর নানার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম।কারণ ছিলো তোর দাদু।উনি ভীষণ রাগী ছিলেন।সব কিছু ঠিক টাইমে হতে হবে।টাইমের নড়চড় হতে পারবে না।দুপুরের খাবার ১২টার মধ্যে রেডি হতে হবে বিকালের নাস্তা ৪টার মধ্যে টেবিলে থাকতে হবে।রাতের খাবার ঠিক ৯টায়।সকালে তো ভোরে ভোরে ঘুম থেকে উঠতেই হবে।তা না হলে কেলেংকারী হয়ে যেতো।এইসব প্রথমে প্রথমে মেনে নিতে পারতাম না।মনে হতো কেউ একজন আমাকে পরিচালিত করছে আর আমি পরিচালিত হচ্ছি।তাই তোর বাবার সাথে এইসব বিষয়ে ঝগড়া করে চলে গেলাম।তখন শ্রাবণ মাস।প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো।

তোদের মতো এই মোবাইলের যোগ ছিলো না তখন।তোর বাবা আমাকে ফিরিয়ে আনতে গেলো।আমি রাগ করে তাকে আমার রুমে ঢুকতে দিলাম না।সে যেতে যেতে বললো যতক্ষণ তোমার রাগ কমবে না আমিও যাবো না।তোমাকে নিয়েই বাড়ি ফিরবো।আমি মনে মনে বলছি এএহ!কত আসছে আমাকে ফেরাতে।একটু পরই তো শুরশুর করে আবার চলে যাবে।ততক্ষণে বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।এই সেই বৃষ্টি না একেবারে ঝুম বৃষ্টি।তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা খুলে দেখলাম সে বাইরে বৃষ্টিতে সিনেমার নায়কদের মত দাঁড়িয়ে আছে।মনে মনে খুব ভালো লাগছিলো কেউ একজন আমার জন্য নায়ক হলো।আবার ভয় করছিলো যদি ঠান্ডা লেগে যায়।ভয়ে আমিও নায়কার মতো ছাতা নিয়ে বের হয়ে তোর বাবাকে বাসায় নিয়ে আসলাম।

তারপর আমরা তোর দাদু বাড়ি চলে আসি।আমি চাইলে সেদিন রাগ করে না এসে বিষয়টা একটা বড় ইস্যু বানিয়ে নিতে পারতাম।আমি শুধু একটা কথাই ভেবেছি তোর দাদু আমাদের গুরুজন তিনি কখনো আমাদের ক্ষতি চাইবেন না।তারপর থেকে তোর দাদুর বকা গুলোকে দোয়া ভেবেছি।আর তিনি চলে যাওয়ার পর বুঝতে পারছি তিনি কখনো আমাদের ক্ষতি হোক সেটা চাননি। তোরা তো একজন অন্যজনকে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিস।তাহলে ছেড়ে আসার কথা ভাবিস কি করে বল!

একটুপর মা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলছে রাত অনেক হয়েছে যা ঘুমিয়ে পর।আমি বিছানায় শুয়েছি।মায়ের কথায় মনটা যেনো হালকা হয়ে গেলো।ভাবছি সায়েমকে একটা কল দি।না থাক কাল সকালে দিবো।মা লাইট বন্ধ করে চলে গেলো।আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম।সকালে চোখ মেলতে না মেলতে সায়েমের কল।এতদিন রাগ করে কল রিসিভ করিনি।আজকে করলাম।হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে সায়েম ব্যস্ত গলায় বলছে প্লিজ চলে এসো তোমাকে ছাড়া ভালো লাগছে না।আমি বললাম কখন আসছো আমাকে নিয়ে যেতে? সায়েম খুশি খুশি মুখে বলল একটু পর বের হবো।আচ্ছা বলে লাইনটা কেটে দিলাম।সায়েম আসলো তার সাথে চলে গেলাম।

শশুর বাড়িতে গিয়ে আস্তে আস্তে সব কিছুর সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠছি নাস্তা তৈরি করে টেবিলে সাজিয়ে দিচ্ছি।সবার পছন্দ অনুযায়ী চলছি।সব কিছু ঠিক এখন।আমিও বেশ ভালো আছি।

একদিন সায়েম অফিসের ফাইল নিয়ে কাজ করতে বসেছে।২টা শাড়ি হাতে নিয়ে সায়েমের সামনে গিয়ে বলছি দেখো তো কোন শাড়িটা আমাকে ভালো লাগবে?সায়েম একটু গম্ভীর গলায় বললো জানি না।আমি আবারো বললাম একটু দেখে বলো না। সায়েম বললো পরে দেখবো এখন কাজ করছি আমি আরেকটু সামনে গিয়ে বললাম তুমি দেখবে কি না বলো সায়েম প্রায় আমার গায়ে হাতটা তুলেই ফেলবে এমন করে বললো যাও তো এইখান থেকে।

বিষয়টা আমার কাছে খুব অপমানের লাগলো আমি মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছি খুব কান্না পাচ্ছে।চোখ মুছতে মুছতে রুম থেকে বের হচ্ছি এমন সময় মা মানে সায়েমের মা আমাকে দেখলো কাঁদছি।এসে আমার হাত ধরে সায়েমের সামনে নিয়ে গেলো।নিয়ে গিয়ে বলছে বউমার কাছে এক্ষুনি ক্ষমা চেয়ে নে।তোকে আমি এই শিক্ষা তো দেয়নি কখনো।সে তো বেশি কিছু চাইনি।তোর কাছে কোন শাড়িটা ভালো লাগবে সেটাই জানতে চেয়েছে।সায়েম নিচু গলায় আমাকে সরি বলছে সেদিকে আমার খেয়াল নেই।আমি দেখে আছি মায়ের দিকে।যে মানুষটার দোষ দিয়ে আমি একদিন সংসার ভাঙতে চেয়েছি আজ সে আমার সব চেয়ে কাছের মানুষ হয়ে গেলো।

তারপর থেকে মা’ই আমার সব।মায়ের সাথে থাকতে থাকতে নিজের মায়ের কথা ভুলে গেছি।মন জয় করতে শুরুর দিকে একটু কষ্ট হয়েছে ঠিকই কিন্তু এখন তিনিই আমার মা।সায়েম তো এখন আমাকে আর মাকে দেখে হিংসে করে।প্রায় ভাবি মা যদি কখনো আমাদের ছেড়ে চলে যান সব চেয়ে বেশি কষ্ট হবে আমার।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত