বেসুর

বেসুর

-এত কাছে এসো না ছুঁতে ইচ্ছা করবে।
-আসব।

তার ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরে আমার মাথা। কাছে আসতেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। সে ঠিক আগের মতই আছে।মাথা ভর্তি এলোমেলো চুল, কপালের তিল থেকে শুরু করে ঠোঁটের নীচে ভাজটা পর্যন্ত। একটু লক্ষ্য করলে বোঝা যায় গায়ের রঙটা ময়লা হয়ে ছে, চোখের নীচে ডার্ক সার্কেল আরেকটু বেশি গভীর। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে বসলাম,

-নিশান, চোখ খুলো। তোমায় ছুঁয়ে অপবিত্র করছি না।
-তুমি স্পর্শ করলে বরং পাপ কাটবে। তারপর কেমন আছ তুমি?
-যেমন দেখছ!
-তোমাকে এভাবে দেখব কোনদিন ভাবি নি। নাকফুল,অনামিকাত ে আঙটি। এই চুড়ি পরো নি কেন? মা বলত চুড়ি না পরলে বরের অকগল্যাণ হয়।
-খোঁচা মারছ?
-সত্যিটা বললাম। বর খুব ভালোবাসে?
-তার মত করে বাসে।
-তুমি বাসো না?
-স্বামী হিসেবে বাসি।তুমি কেমন আছ?
-খুব ভালো আছি।কখনও শুনেছ নি আমি খারাপ ছিলাম?

সত্যি নিশান কখনও খারাপ থাকতে পারে না। আমার বিয়ে হয়ে যাবার পর সিগারেট ছাড়া এক দণ্ড থাকতে পারত না, রাতের পর রাত আইরিশ পাবে মাতাল হয়ে থাকত তারপরও কোনোদিন কল করে জানায় নি,

-অনামিকা, কষ্ট হচ্ছে খুব।

আমার কিন্তু কষ্ট হত।গা ভর্তি গহনা, কাতান শাড়িতে শরীর জড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম। এত লোকজন নতুন বউ দেখতে আসত। চুল,চেহারা নিয়ে নানারকম মন্তব্য করত।আমার কান দিয়ে কিছুই ঢুকত না। একটা মানুষ সে কেমন আছে! আজও সকালে নাস্তা না করে ঠিক ক্লাসে চলে গেছে। পাঁচ দিনের জ্বরে জবুথবু হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকে৷ তবু ঔষুধ খাবার ভয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে না আমি শুধু সেই মানুষটার কথা ভাবতাম। চোখের কোণায় জল গড়াত।

-ইশ! নতুন ভাবীর বাড়ির জন্যে মন কেমন করছে বুঝি।
-আরে সেসব না। য
-তোর ভাইকে নিয়ে আয়৷ তাহলেই হবে।

হাসির ঢেউ খেলে যেত রুমে। বরের সাথে হানিমুনে যেতে হয়েছিল কাশ্মীর। সোনামার্গ, গুলমার্গ,পেহেলগাও,শ্রীনগর সব জায়গায় তার কাপল ছবি তোলা চাই। বরের হাত জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে পোজ দেবার সময় মনে পড়ত, কথা ছিল অনেকগুলো টাকা জমলে আমরা পাহাড় দেখতে যাব অথবা সমুদ্র। কত স্বপ্ন অধরা থেকে যায়।

-কি ভাবছ? নিশান সিগারেট ধরিয়ে জিজ্ঞেস করল।
-কিছু না। তুমি জানো আমার সিগারেটে গন্ধে গা জ্বলে।
-জ্বলুক। তোমার জেন্টলম্যান হাজবেন্ড নিশ্চয়ই স্মোক করে না। একটা দিন সহ্য করো।
-একটা স্প্যানিশ মেয়েকে জড়িয়ে ধরে খুব ছবি আপলোড করো। ওই মেয়েটা কি তোমার গার্লফ্রেন্ড?
-হুম। লিভ টুগেদারে অাছি।
-আমি উঠছি।
-রাগ করে করছ কেন?

এখনও জেলাস! হায়রে মেয়েমানুষ! বসো। মেয়েটা আমার কলিগ হয়। কী কপাল আমার দেখো! তোমাকে পাবার জন্যে কত চেষ্টা করলাম স্কলারশিপটা যেন হয়ে যায়। হলো না! তোমার বিয়ে হয়ে যাবার মাস খানেক পর লেটার হাতে পাই। যেনতেন ভার্সিটি,পেটেভাতে থাকতে পারব তবু তো স্কলারশিপ! ছয় মাস পর কাজের পারমিট পাই। টিউশন ফীর যোগাড় হয়ে যায়। এই তো ভালোই আছি। গার্লফ্রেন্ড বলছ! আমার একটা তুমি ছিলে শুধু তুমি!

– তোমার সাথে বিয়ে না হয়েই ভালো হয়েছে। বিড়ি খাওয়া নিয়ে রোজ অশান্তি হত,সভ্য দেশে থেকেও ভদ্র হয় নাই। নখের ডগায় ময়লা। কতবার বলেছি চুলের ঝুটি করলে মাস্তানদের মত দেখায়। এখনও তোমার চুল বড়।
তোমার বেখেয়ালি জীবন কোনদিনও মেনে নিতে পারতাম না। নিশান হাসছে।

-নিজের মনকে নিজেই সান্ত্বনা দিচ্ছ? অনামিকা তুমি সত্যি ভালো আছ?
-হ্যা,ভালো আছি।

অন্য কারো বুকে মাথা রেখে ঘুমানোর অভ্যাস হয়ে গেছে।ফোনের অপর প্রান্তে কেউ মিস ইউ বলে মিস ইউ টু বলতে শিখে গেছি। এমন কি আহ্লাদ করে কাউকে ভালোবাসি বলতে ঠোঁট কাঁপে না।সত্যি বেশ আছি। নিশান হাসছে। ওর হাসি কি আমার চোখের ভাষা পড়ে নিচ্ছে! তিন বছর কেটে গেছে। এখনও ঘুম ভাঙলে বড় একলা। পাশের বালিশে ঘুমন্ত মানুষটার অচেনা মুখ হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কমাতে পারে না। দরজা খুলে বেলকুনিতে এসে দাঁড়াই। শেষ রাতের শীতল বাতাস জানান দেয়,আমার প্রিয়জন আজ অন্য পৃথিবীর মানুষ চাইলেও তাকে আর ছোঁয়া যায় না।

-নিশান,আমার উঠতে হবে।
-তোমার ফ্লাইট কবে?
-কাল রাত ১১ টায়।
-সরি, এত রাতে আর সী অফ করতে এয়ারপোর্টে আসতে পারব না।তোমার যাত্রা শুভ হোক।
-অনামিক দাঁড়াও।

আর কি ফিরে আসা যায় না? পাসপোর্ট করে চুপচাপ চলে আসবে। ভিসার ব্যবস্থা আমি করব।
ফিকে হাসি হেসে মাথা নাড়লাম, গত তিন বছরে কতবার ভেবেছি অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত ভীষণ। এবার ক্ষান্ত দেই।এক জীবন পরিবারের চাওয়া-পাওয়া, পরের সুখ-দুঃখ আর অবাঞ্ছিত সামাজিকতা রক্ষা করতে করতে কাটিয়ে দিলাম।ওইযে মানুষটা যাকে ছুঁয়ে আমার ভালো থাকা হয়, তাকে আর ছোঁয়া হল কই! পিছনে নিশান দাঁড়িয়ে আছে। পায়ে পায়ে দূরে সরে যাচ্ছি। ওই মুখটা আরেকবার দেখতে তৃষ্ণা পাচ্ছে খুব। পিছন ফিরে তাকানো বারণ। সুর কেটে গেছে।মায়া বাড়িয়ে কী লাভ!

-অনামিকা ফিরে আসা যায় না?
-না যায় না।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত