দি প্ল্যান

দি প্ল্যান

আজ আমার বড় ভাই আরিফের বিয়ে। গাড়িতে বসে আছি আমি, আমার বড় ভাই ও তার বন্ধুরা। আর বাকি লোকজন রা বাসে করে আসছে আর কিছু ফ্রেন্ডরা বাইকে করে। আমরা যতটা না আমেজ ও ফুর্তিতে এ আছি, ঠিক ততটাই ভাইয়া চিন্তায় আছে।

-আরে ভাইয়া বিয়েতেই তো যাচ্ছিস নাকি! এর টেনসন নেওয়ার নেওয়ার কি আছে?যাবো, খাবো, বউ নিয়ে চলে আসবো।জাস্ট চিল ব্রো।

-দেখ আশিক, আমার সাথে এখন ফাজলামো করবি না বলে দিলাম। তুই খুব ভালো করেই জানিস আমি এই বিয়ে করতে চাই না,বা বলতে গেলে করবো না আমি এই বিয়ে। আমি যে অরিনকে ভালবাসি এটা তুই ভালো করেই জানিস।তার পর ও মজা নিচ্ছিস!

-তো যা, বাবাকে গিয়ে বল তুই এই বিয়ে করবি না। তুই অরিনকে বিয়ে করবি।
– এটা যে আমি বলতে পারবো না তুই ভালো করেই জানিস। বাবাকে তো চিনিসই আমাকে আস্ত রাখবে না বললে।
-তো চুপচাপ বসে থাক।

আমরা বাবা-মার দুই ছেলে। কোনো বোন নেই। আমাদের ফ্যামিলিতে বাবার কথাই শেষ কথা। বাবার মেজাজ ও বেশ গরম। ভাইয়া পড়ালেখা শেষ করে এখন একটা জব করে বছর খানেক হবে।আর আমি এখনো বাপের হোটেল এ খাই আর মাস্টার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছি। ভাইয়ার অরিন আপুর সাথে পরিচয় হয় ওর অফিসেই। অরিন আপু নাকি মাস চারেক আগে জয়েন হয়েছে। এই চার মাসের মাঝেই কিভাবে জেনো ওদের প্রেম টা হয়ে উঠে।  যেখানে মেয়ের আগে বিয়ে হয়ে যায়। আর ছেলে ছ্যাকা খায়। ভাইয়ার ক্ষেত্রে তা পুরো উলটো হচ্ছে। অরিন আপু তার বাবার এক মাত্র মেয়ে। তাই ওর বাবা ওকে কখনো জোর করে না। ভাইয়ার থেকে শুনেছিলাম অরিন আপুকে নাকি একবার বিয়ের কথা উনার বাবা বলেছিলো তবে আপু বলে দিয়েছিলো আগে ও পড়া লেখা শেষ করবে দেন বিয়ে নিয়ে ভাববে। এই বিয়ে নিয়ে যেনো জোর না করে।

আমার খাওয়া মোটামুটি অর্ধেক হয়েছে। তখনই বিয়ে বাড়িতে তুমুল একটা হইচই পড়ে গেলো। জামাই নাকি পালিয়েছে বন্ধুদের সাথে বাইক দিয়ে।  আরে ব্যাটা পালাবি ভালো কথা। খাওয়া পর্ব শেষে পালা। খাওয়া তো শেষ করতে দিবি নাকি!  ফির ম্যেনে সোচা, বাকি সাব ছোড়ো ইয়ার, খানে পে ধ্যায়ান দেতে হে। যেই না আবার খাওয়া শুরু করবো তখনই বাবার ডাক শুনতে পেলাম। আমাকে পুরো চিল্লিয়ে ডাকছে। আর কি খাওয়া যায়? উঠে গেলাম বাবার কাছে।ওখানে আমার বাবা আর রুশার বাবা মানে যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো ওনার বাবা, দুই জনেই আছেন।উনাদের মুখ দেখে যা বুঝলাম এদের মাঝে একদফা বোঝাপোড়া হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।  আমি ওখানে যেতেই আমার বাবা রুশার বাবাকে আমাকে দেখিয়ে বললো।

– এই যে আমার ছোট ছেলে। এর কথাই বলছিলাম। আপনার মেয়ের বিয়ে আমি আমার এই ছেলের সাথে দিবো। আপানার মানুষের সামনে হেয় হতে হবে না।
– বাবা কি বলছো এসব? আমার বিয়ে মানে! আমি কি করে বিয়ে করবো! আমারতো এখনো স্টাডিই শেষ হয় নি। আর বিয়ে করে খাওয়াবো কি?
– ওত কিছু তোমার ভাবতে হবে না। বিয়ে করতে বলেছি সো বিয়ে করবে। আর তোমাকে যেহুতু খাওয়াতে পারি আর একজন যোগ হলে কিছু যাবে আসবে না। আমি কিছু বললাম না আর।বাবা যেহুতু তুমি করে বলছে এর মানে রেগে আছে।এখন চুপ হয়ে যাওয়াই শ্রেয়।

– আর চুপচাপ এখানেই আমার সামনে বসে থাকো। বলা তো যায় না তুমিও আবার যদি তোমার বড় ভাইয়ের মত পালাও। বাবা আবার রুশার বাবাকে বললো
– তাহলে এই কথাই থাকলো। যান কাজি ডাকেন।  এখনই আশিকের সাথে রুশার বিয়ে দেওয়া হবে।

-তোমার মাথায় যে এরকম শয়তানি বুদ্ধি ঘুরে তা তো আগে জানতামই না। ভাগ্য ভালো যে সব কিছু প্ল্যান মতই হয়েছে।নয়ত তোমার আজকের পর থেকে আমাকে ভাবি ডাকতে হতো বুঝলা। বাসর ঘরে ঢুকে দরজাটা লাগিয়েছি মাত্র আর তখনই রুশা উপড়ের কথাগুলো বললো। আমি হালকা মুচকি হেসে বিছানায় বসতে বসতে বললাম।

– দেখতে হবে তো কার প্ল্যান নাকি! প্ল্যান ফেইল হবে এটা হতেই পারে না।

রুশা আমাকে একটা খোচা মেরে বললো হলে বুঝতা মজা।  আমি আর রুশা প্রেম করি বছর তিনেক ধরে হবে। আমি যখন অনার্স থার্ড ইয়ারে তখন রুশা অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়। এর কয়েকমাস পরেই আমাদের মাঝে প্রেম হয়।যা এখনও পর্যন্ত আছে। কিছুদিন আগে রুশা এসে বললো

-আমার ফাইনাল এর পরে বাবা আমার বিয়ে দিবে বলে দিয়েছে। তুমি তো এখনও স্টাডি করো। প্রায় বছর খানেক আছে তোমার মাস্টার্স কমপ্লিট এর।পরে চাকরি খোজা। প্রায় দেড় বছর তো যাবেই এতে। এখন কি করবে?
-দেখি কি করা যায় আমি কিছু একটা ভাবি। আমি থাকতে তোমার অন্য কারো সাথে বিয়ে হবেই না।
– হুম। আমিও তোমাকেই বিয়ে করতে চাই।

তারপরেই আমার মাথায় হঠাৎ করেই এই বুদ্ধিটা আসলো। আমি ভাই এর পিছে গোয়েন্দা মানে আমার একটা ফ্রেন্ডকে লাগালাম সব খোজ নেওয়ার জন্যে। আর কিছুদিনের মধ্যেই ভাইয়ার জিএফ মানে অরনি আপুর খোজ পেয়ে গেলাম। তারপর ভাইয়াকে বললাম

– তুই যে প্রেম করিস অরনি আপুর সাথে আমি এটা জানি আর তুই যে কখনো বাবাকে বলতে পারবি না এটাও আমি জানি। ভাইয়ার অবাক হওয়া চেহারা দেখে বললাম
– দেখ এত অবাক হওয়ার কিছু নাই।আমি যেইভাবেই হোক জেনেছি।এখন মেইন পয়েন্ট এ আসি।আমি ও একজনকে ভালবাসি। নাম রুশা। কিন্তু প্রব্লেম হচ্ছে কিছুদিন পরে ওর বিয়ের জন্যে ছেলে দেখবে।আর একে তো তুই থাকতে আমার বিয়ে পসিবল না আর আমার স্টাডি ও শেষ হয় নি। সো আই হেভ এ প্ল্যান।

– কিসের প্ল্যান!
– হুম এটাই বলব তবে আজকে না কাল সবাই একটা রেস্টুরেন্টে মিট করে।তুই অরনি আপুকে নিয়ে চলে আসবি আমি রুশাকে বলে দিচ্ছি।
-হুম সবাই এসে গেছি তো প্ল্যানটা বলি। আমি যেভাবেই হোক বাবাকে উস্কে দিবো ভাইয়ার বিয়ের জন্যে। আর ঘটক ও আমি ঠিক করে দিবো। ভাইয়ার বিয়ের প্রস্তাব যাবে রশার বাড়িতে।
– ওই তোমার ভাই কি পাগল হয়ে গেছে নাকি কি বলছে এসব।(অরনি)
– হুম।আমিই বা তোমার ভাইয়াকে বিয়ে করতে যাবো কেনো।(রুশা)
-আরে বাবা আগে প্ল্যানটা তো বলি।

আমি মোটামুটি শিউরই যে বাবার রুশাকে পছন্দ হবেই আর যখন তোমার মত চাইবে তুমিও বলবে বিয়েতে রাজি।
আসল খেলাটা হবে বিয়ের দিন। আমি যতটুকু জানি অরনি আপুর আব্বু অরনির মন মতই সব করে। তো বেশি একটা জামেলা ও হবে না।  বিয়ের দিন বিয়েতে যাবো পরে ভাইয়া ওখান থেকে পালিয়ে যাবে বন্ধুদের সাথে কাজি অফিসে। আর অরিন আপু ও ওখানে থাকবে।পড়ে ওরা বিয়ে করবে ওখানে আর আমার সুত্র বলছে তোমার বাবার সাথে আমার বাবার একটা তর্কাতর্কি হবেই হবে। তোমার বাবার মান সম্মান আছে এই বিয়েতে জড়িয়ে।তখন তোমার বিয়ে বাবা আমার সাথেই দিবে।  এক ডিলে দুই পাখি মারা হবে।ভাইয়ার বিয়ে অরনি আপুর সাথে আর আমার বিয়ে তোমার সাথে।

– যদি হিতে বিপরিত হয়ে যায়(রুশা)
– হবে না। আমার প্ল্যান এর উপর আমার আস্থা আছে।
-আচ্ছা তো পরে আমি কি করবো?(ভাইয়া)
-তুই আর অরনি আপু মানে ভাবি অরনি আপুর বাড়িতে গিয়ে উঠবি।

কিছুদিন ঘরজামাই হয়ে থাকবি আরকি।পরে পরিবেশ নরমাল হলে বাড়িতে আসতে পারবি।  এর আগে অরনি ভাবির কাজ হচ্ছে তার বাবাকে কনভিন্স করা। তোর কথা বলা যে তোকেই বিয়ে করবে।আশা করি কাজ হয়ে যাবে। তুই ভালো একটা জব ও করিস। আর কনভিন্স হয়ে গেলে আমি আমার এই প্ল্যান টা ও বুঝিয়ে দিবো তোর হবু শশুর কে। সো এই কথাই থাকলো।  মিশন বিয়ে ইজ অন। অবনি বললো আমাদের বেপার টা তো ঠিক হয়ে গেলো।তোমার ভাইয়াকে কল দাও দেখো কি খবর ওখানের।

– কি আর হবে আমাদের মতই বাসর করছে হয়ত
– এত কথা না বলে দাও তো কল। ফোন স্পিকার মোডে দিলাম। রিং হচ্ছে।
– হ্যালো।
-ভাইয়া। কি খবর তোমার।কেমন বোধ করছো?
-তুই মজা নিচ্ছিস। আমাকে তো ঘর জামাই বানিয়ে দিয়েছিস তুই। আছি এখন বাসর ঘরে অরনি দের বাসায়।
– যাই হোক প্ল্যান তো সাকসেসফুল হয়েছে নাকি।  না হয় ছোট ভাইটার জন্যে থাকলি কিছুদিন ঘর জামাই হয়ে।
– হ।রাখ তর ভাই।
-ওই তুমি ওকে এইভাবে বলছো কেনো। ওর জন্যই আজকে আমাদের বিয়ে হয়েছে। নয়ত তুমি যা, না আমাকে নিয়ে পালাতে পারতে আর না তোমার বাবাকে বলতে পারতে।আশিকই তো সব ব্যাবস্থা করলো।(অরনি ভাবি)
আমি আর রুশা হেসে দিলাম। আমি বললাম

– আচ্ছা ফোন রাখলাম।পরে যোগাযোগ হবে। বাবা এখন তোর উপর প্রচুর খেপা।ইদানিং বাড়ির দিকে ভিড়িস না। তোরা বাসর কর তোদের। আর আমরা আমদের টা। রুশা আবার আমায় খোচা মারলো পেটে। আমিও ফোনটা রেখে রুশার দিকে এগিয়ে গেলাম। বাসর রাত তো আর দুইবার আসবে না।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত