পদরেখা

পদরেখা

“অাজ তোর বিয়ে।” সকালে অাজমান সাহেবের বাবা জানালেন রাতে বিয়ে সম্পন্ন। পনেরো বছর বয়সী হালিমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে যেতেন অাজমান।হালিমা লজ্জায় খুব একটা কথা বলতো না,সামনে ও অাসতো না।অাড়ালে অাবডালে এক নজর দেখা দিয়ে খিলখিল করে হেসে দৌড়ে পালাতো। একবার নীল রংয়ের এটা পুঁতির মালা হালিমা কে দিয়ে বললেন,”তোমার পছন্দ হয়েছে হালিমা?”

হালিমা মালা টা কে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছিলো,”বাহঃ কি চমৎকার রং!” হালিমার ছোট ভাই পাশ থেকে বললো বুবুর খুবই অপছন্দের রং নীল,তাইলে বুবু চমৎকার কইল কেন? ছোট ভাইটা ছিলো অতিপাকনা,এখনো অতিপাকনাই অাছে।হালিমাদের সাত বোন এক ভাই তাই অাজমান সাহেব ভাইটিকে চম্পা নামে ডাকতেন। চম্পা নামের অাড়ালে হারিয়ে গিয়েছিলো তার অাসল নাম।হালিমার মা-বাবা ও একসময় তাদের হজার ফুলের মাঝে একটি গোলাপের ন্যায় পুত্র কে চম্পা ডাকতে শুরু করলেন। অাজমান সাহেবের বাবার চোখে পরে হালিমাদের বাসায় অাজমানের যাতায়ত। হালিমার বাবা ছিলো কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা।অাজমান সাহেবের মতো পাত্র তার কাছে অকল্পনীয় ব্যাপার তাই এক কথায় রাজি হয়েছিলেন ।

বিয়েতে সবার মত থাকলেও বাধ সাধলেন অাজমান সাহেবের দাদী। দাদীর মতে “এই বান্দী মুড়ির মতো টনটনা মচমচা,এরে ঘরে তোলার সাথে সাথে নিশ্চিত অামার মৃত্যু হবে” । অাজমান সাহেবের দাদীর নিশ্চিত মৃত্যু হয়নি বরং নাত বউয়ের যত্নে অারো শক্ত সামর্থ্য হয়েছেন। মাস শেষে হালিমাকে অাজমান সাহেব কিছু টাকা নিয়ম করে দিতেন। তার দাদী ব্যাপার টা কিভাবে যেনো জানতে পেরে শুরু করলেন – “নিশ্চিত বান্দী টাকা বাপের বাড়ি দিয়া দেয়,বাপের বাড়ি বড়লোক বানায়।” হালিমা সেই টাকা জমিয়ে কিছু ধানী জমি কিনেছিলো দাদীর নিশ্চিত দেয়া কথা কোনটাই ঠিক হয়নি। রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন অাজমান সাহেব।হালিমার চিৎকার চেচাঁমেচি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে- “মিনষে চোখ কি কপালে নিয়া ঘোরে,মাছ তো সবই পঁচা”।

অাজমান সাহেব ভাবছেন ,কত রিনরিনে গলার মেয়েছিলো হালিমা,কত লাজুকতায় ভরা ছিলো তার প্রতি টা কথা।সময় মানুষকে কতটা পরিবর্তন করে দেয়। অাজমান সাহেব তার মা কেও দেখতেন।পান খেতে গিয়ে মুখে চুন লাগলে তার বাবার দোষ হতো। কারো সাথে ঝগড়া করতে খুব ভয় পেতেন অাজমান সাহেবের মা। অথচ, বাবার সাথে পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করতেন। এই ঝগড়া দন্দ্ব নয়,বরং দাবী অার নির্ভরতার। অাজমান সাহেবের ভাবতে ভালোই লাগে তার উপর কেউ অাস্থা রাখে। তার দাদী এখন অার তেমন কথা বলতে পারেন না। দাদী বারান্দার এক কোনায় বসে ইশারা ইঙ্গিতে চোখ কুচকে হাত দিয়ে হালিমা বেগমের বদনাম করছেন- “বান্দী টনটনা মচমচা,এর জন্য অামার নিশ্চিত মৃত্যু হবে”।

মথা ডান কাত করে, দুইহাত গালের কাছে নিয়ে চোখ বন্ধ করে তারপর জীভ টা অল্প একটু বের করে মৃত্যু দেখায়।অাজমান সাহেব দাদীর এই ব্যাপার টা খুব মজা নিয়ে দেখন। কিশোরী বউ কে ,কাছে ডেকে অাজমান সাহেব কোন এক ফাগুনের দুপুরে বলেছিলেন- “চলে যেতে চাই খুব নীরবে,ফাগুনের এমন এক কোকিল ডাকা দুপুরে।” হালিমার সরল উত্তর ছিলো – অামাকে রেখে বাড়ির কেউ কোথাও কোন দিন যায় নাই। বলে উঠানের কোনো প্রকান্ড শিমুল গাছের দু’ভাগ হয়ে যাওয়া ভি অাকৃতির শিকড়ে বসে কোকিলের সথে কুহু,কুহু করতে লাগলো। যতোটা সম্ভব জোরে জোরে বলছিলো দেখছেন কোকিল কত্ত রাগ করেছে, খিলখিল করে হাসছিলো হালিমা। কতগুলো লাল শিমুল কুঁড়িয়ে নিয়ে গুনার ভিতর ঢুকিয়ে মালা গাঁথছে হালিমা।শীতের ভোরে শিউলি কুঁড়িয়ে মালা,মালা বানাতে বর্ষার কদম কে ও বাদ দেয়না।মালা গাঁথতে খুব ভালোবাসে হালিমা।

একবার হালিমা পুঁইশাকের লাল গুটা গুটা টাইপের পাঁকা বীচি দিয়ে পা’য়ে বসে অালতা দিচ্ছে। অাজমান সাহেব, হালিমার লাল পা’য়ের দিকে তাকিয়ে বললেন- ফল দিয়ে মালা বানানো যায় না? হালিমা বেশ অাগ্রহ নিয়ে বললো- “বরই দিয়ে খুব সুন্দর মালা হয়,ধরেন গলায় পরতে ও পরলেন অাবার খাইতে ইচ্ছা করলে টুপ্ করে একটা বরই ছিঁড়ে টপ্ করে খেয়ে ফেললেন।” বলে অাবার নিজের কাজে মনোযোগ দিলো।  এতক্ষণ লুকিয়ে রাখা অামড়া গুলো বের করে দিয়ে,অাজমান সাহেব বলেছিলেন – এগুলো দিয়ে মালা বানানো যাবে? টক হালিমা খুবই পছন্দ করতো,এখনো খুশির ঝলক মাখা মুখ টা তার মনেপরে। হালিমা লজ্জায়,খুশিতে দৌড়ে ঘরে চলে যেতে যেতে বললো ভর্তা বানানো যাবে।কিছু বুঝে উঠার অাগেই লবণ অার গুড়া মরিচের মিশ্রণ এনে বললো চলেন খাই।

চোখ বন্ধ করলে কিশোরী থেকে পরিণিতা হালিমাকে অাজমান সাহেব স্পষ্ট দেখতে পান।কেউ একজন চা দিয়ে গেছে,অাজমান সাহেব অাজকাল এতটাই হালিমাতে বিলীন থাকেন চারপাশের অনেক কিছুই দৃষ্টি গোচর হয় না।
এই মুহূর্তে এককাপ চা’য়ের সত্যি খুব প্রয়োজন ছিলো। স্মৃতিচারণ অনেক টা নিজের সাথে নিজের বুঝাপড়ার মতো,যার অন্যতম উপাদান চা। গত ফাগুনে বাড়ির সকল কোলাহল মিটিয়ে এক নিস্তব্ধ দুপুরে হালিমা বেগেম না ফেরার দেশে চলে গেলেন ।বাড়ি ভর্তি মানুষ অথচ কোন কোলাহল নেই ,নিষ্প্রাণ সব কিছু মনেহয়। অনেক্ষণ কোকিল নিঃসঙ্গ ভাবে ডাকছিলো।এখন কে যেনো কোকিলের সাথে সঙ্গ দিচ্ছে। অাজমান সাহেব দেখার চেষ্টা করছেন। তাঁর বড়পুত্র বধূ কোকিলে কে রাগানোর চেষ্টা করছে। শ্বশুর কে দেখে লজ্জা পেয়ে চলে গেলো।

তার দাদীর এখন অার অাগের মতো ইশারা দিয়েও বদনাম করার শক্তি নেই।অাজমান সাহেবের পুত্র বঁধূর কথা কিছু বলতে চাচ্ছেন, জিভ বের করে বুঝাচ্ছেন ,”বান্দী টনটনা মচমচা,এর জন্য অামার নিশ্চত মৃত্যু হবে।”
হালিমা চলে গেছে কিন্তু তার অভ্যাস রেখে গেছে,রেখে গেছে তার পদ রেখা । তার পুত্র বধূও হয়তো বয়স বাড়ার সাথে সাথে চেচাঁমেচি করবে। বেশ অায়েশ করে চায়ে চুমুক দিয়ে ছেলে কে কাছে ডেকে বললেন সংসার জীবনে সফলতা অানতে গেলে- “স্ত্রীর উপর বিরক্তি মনে ধরে রাখতে নেই,তার মাথার উপর ছায়া ধরে রাখতে হয়।তাতে সংসার নামের শস্যক্ষেত্রে ভালোফল লাভ করা যায়।”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত