এক গুচ্ছ স্মৃতি

এক গুচ্ছ স্মৃতি

৫৫ বছরের গন্ডি পেরিয়ে গিয়েছে আনিকার বয়স। তবুও রোমান্টিক বই পড়ার অভ্যাসটা এতটুকুও ঘূণে ধরেনি তার। তাই প্রায়ই নীলক্ষেত আসেন নতুন রোমান্টিক বই খুঁজতে। আজও এসেছেন নীলক্ষেত নতুন বইয়ের খোঁজে যদি মনের মত একটাও রোমান্টিক বই খুঁজে পান।

আজ বেশ সকাল সকালই প্রস্তুতি নিয়েছেন নীলক্ষেত যাওয়ার। আজ অনেক সময় নিয়ে বই খুঁজবেন,কেননা তার সেলফে রাখা সব বই অনেক বার করে পড়েছেন। আজ সবগুলো দোকান খুঁজে মনের মত কয়েকটা বই আনবেনই। সমস্যা বাঁধলো তার যাওয়া নিয়ে,আগের মত শরীরে আর শক্তি বা যৌবনের উত্তেজনা নেই। ঠিক মত ড্রাইভিং করতে পারেন না,সে জন্য তো একজনকে সাথে নিয়ে যেতে হবে। আনিকা ছেলে আর মেয়েকে জিজ্ঞেসা করেছিল কেউ নিয়ে যেতে পারবে কি না? ছেলে মেয়ে দুজনই অপারক। কেউ আসতে পারবে না আনিকার সাথে। বাদ্ধ্য হয়ে আনিকা একাই বেরিয়ে পড়ল নীলক্ষেত উদেশ্য।

একটা নীল রংয়ের গাড়ী এসে থামে নীলক্ষেত বই দোকানের সামনের। হাতের কালো ব্যাগ থেকে গোল চশমাটা বের করে চোখে দিয়ে আনিকা বেড়িয়ে পড়ল বইয়ের খোঁজে।ভৌতিক,সাহিত্যিক,সায়েন্স ফিকশন্স এর বেশ কয়েকটি বইও কিনল। তারপরও মনের মত একটা রোমান্টিক বইয়ের অভাব বোধ করছে আনিকা। এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরার পরও যখন বই খুঁজে পাচ্ছে না তখন বাসায় ফেরার কথা চিন্তা করছিল। হঠাত্‍ মাথা ঘুরাতেই একটা বই দেখে রীতিমত থমকে গেল আনিকা। বইয়ের নাম “এক গুচ্ছ স্মৃতি” পাশে ছোট করে লেখা কাব্যহীন।

কী অদ্ভুত সুন্দর বইটার নাম। তার চেয়েও অদ্ভুত লেখকের নাম। এরকমই একটা বই খুঁজছিলাম ।এবার বইটা হাতে নিয়ে খুলে দেখছে আনিকা।পুরো বই ৩৫৭ পৃষ্টা। তাছাড়া গল্পের মেয়েটার নামও আনিকা। এতটুকু দেখে আর কিছু না ভেবেই বইটা কিনে বাসায় ফিরল আনিকা। আজ বেশ খুশি আনিকা। অবশেষে,একটা মনের মত রোমান্টিক বই পেয়েছে সে।

রাতে বিছানায় শুয়ে বই পড়া শুরু করল আনিকা।

-আনিকা,এই আনিকা দাঁড়াও..

-আমার নাম ধরে ডাকবি না।

-কেন?

-বড়দের নাম ধরে ডাকতে হয় না,এটা শিখিসনি

-তুই আমার বড়!

-হু বড়। তোর জন্ম কত সালে?

-০৪-০১-৯৪

-আমার ১৯-০২-৯৩। তাহলে ৯৩,৯৪ মিলিয়ে আমি তোর ১ বছরের বড়।

-ধুর আমি তো দেখি ১মাস ১৫ দিনের বড়।

-সে ১ দিনেরই হোক,আর আধা দিনেই হোক। তোর বড় আমি তাই আমায় আপু বলবি।

-ঠিক আছে আপু,আই লাভ ইউ..!

-একটু বেশী বেশী হচ্ছে নাহ। ভাবছিলাম তোর সাথে যাব। এখন আর যাব না।

এতটুকু পড়তেই বইটা বন্ধ করে দেয় আনিকা।মাথাটা চিনচিন করে ব্যাথা করছে,বুক ধুকধুক করে কেঁপে উঠছে আনিকার। এই কাহিনীটা এই বই এএ কেন? আর কাহিনীটা আমার এত পরিচিত লাগছে কেন। অনেক্ষন ভেবেও পুরোপুরি কিছু মনে করতে পারল না আনিকা। ৫৫ বছর বয়সে সবকিছু মনে না থাকারই কথা ।

আচ্ছা কলেজে থাকতে কি রাব্বি কে আমি এই কথাগুলো বলেছিলাম,আবছা আবছা করে কথাটা মনে পড়ছে আনিকার। এই কথাটা বলার পর তো মনে হয় একটা ট্রেন এসে ছিল। আমি আর রাব্বি ট্রেনে উঠে সিট নিয়ে ঝগড়া করে ছিলাম। একের পর এক ঘটনা মনে পড়ছে আনিকার। তবুও পরের অংশ আনিকার ভাবনার সাথে মিলিয়ে দেখার জন্য বইটা খুলে পড়া শুরু করে।গ্রীষ্মের ক্লান্ত দুপুর। ট্রেন এসে যথাসময়ে স্টেশনে থামে। ট্রেনে উঠে ব্যাগটা উপরে রেখে জানালার পাশের সিটে বসে রাব্বি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই শুনতে পায়,এই যে শুনছেন আড় চোখে বামদিকে তাকাতেই দেখে আনিকা।আনিকা মুখ বাকিয়ে বলে..

-এই যে,এটা আমার সিট ছাড়ুন..

-পাশের সিট খালি আছে।

-না,জানালার পাশের সিটটা আমার।

-আপনার টিকিটে সিট নং কত?

-৪১

-আমার ৪০। আর এখানে দেখুন ৪০ লেখা। মানে জানালার পাশের সিটটা আমার। ঝামেলা না করে পাশের সিটে বসে পড়ুন।

-সিট ছাড়বেন কি না?

-আমি গাড়িতে উঠলে ডান দিকে ঝুকে গ্লাসে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমাই। এই সিটে বসলে আপনি থাকবেন ডানে। তাই আপনার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাতে দিতে হবে। রাজি থাকলে সিট দিব..

-বেশী বেশী বলছেন নাহ। তুই আমাকে আপনিও বলবি না। তুই আমার কেউ না ।রাগে আনিকার ফর্সা মুখ লাল হয়ে যায় ।

এতটুকু পড়েই আনিকা নড়ে চড়ে বসে। হ্যাঁ সবই তো মিলে যাচ্ছে। এই সব ঘটনা তো রাব্বি ছাড়া আর কেউ জানে না। তাহলে কি রাব্বি’ই এই বই লিখেছে। কিন্তু ওর সাথে তো গত ১৭ বছর ধরে আমার যোগাযোগ নেই। কারও মা বাবা মারা গেলে ১ মাস যেতে না যেতেই সবাই ভূলে যায় ।আর রাব্বি সাথে তো আমি শেষ দেখার দিনও ঝগড়া করছিলাম। তাহলে এত বছর পর রাব্বি আমায় মনে রাখবে কেন? আমাকে জানতেই হবে এর পেছনে কি রহস্য। কে এই কাব্যহীন নামধারী লেখক। এসব ভাবতে ভাবতে আনিকা ঘুমিয়ে পড়ে। যদিও এই ঘুমটা শান্তির নয়,চিন্তার।

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই বইয়ের প্রকাশনীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে আনিকা। লেখকের নাম জিজ্ঞেসা করলে ওরা জানায় লেখকের সঠিক নাম তারা জানে না। লেখক ছদ্মনামে লিখেন এবং এটাই তার প্রথম লেখা। কাব্যহীন নামের ছদ্মনাম ধারী লেখকের ঠিকানা জানতে চায় আনিকা। প্রকাশনীর লোক অনেক হন্য হয়ে খুঁজে একটা সম্ভাব্য ঠিকানা দেয় আনিকা কে।

অনেক দূরের পথ তবুও ঠিকানা পেয়েই দেরী না করে রওয়ানা হয় আনিকা। যখন লেখকের গ্রামে পৌছে প্রায় পশ্চিম আকাশে আগুন লাগিয়ে নিজের তীব্র দহনকে রক্তবর্ণ ধারণ করে সূর্য তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের বুকে। চারপাশের সারি সারি গাছে পাখিদের কিচিরমিচির,দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা আযানের ধ্বনি এ যেন আপার্থিব এক জগৎ। সামনের গেটের আবছা আলোয় আলো আধারীর এক অপরূপ খেলা। যা হাজার পাষাণ হৃদয়কেও গলিয়ে দিতে সময় লাগবে না।

-বাড়িতে কেউ আছেন? (আনিকা)

-কে?

কথাটা বলে সাদা চুল,মুখ ভর্তি লম্বা লম্বা দাড়িওয়ালা কেউ একজন এগিয়ে আসছেন।উনার চোখগুলো অনেক ভিতরে ঢুকে গেছে ।দেখেই মনে হচ্ছে কত রাত যে ঘুমাননি তার হিসেব নেই।

-আমি কাব্যহীন নামের লেখকে খুঁজছি।

-আমিই কাব্যহীন। কেমন খুঁজছেন আমায়?

-রাব্বি?

-চিনলাম না তো আপনাকে!

-আমি আনিকা।

-আপনি মানে তুই ১৭ বছর পর কি মনে করে ।ঠিকানা কোথায় পেয়েছিস?

-প্রকাশনী থেকে। আর ১৭ বছর নয়,১৭ বছর,৩ মাস,১৩ দিন,৭ ঘন্টা,৩ মিনিট..

-তুই এত কিছু মনে রেখেছিস?

-তুই ১৭ বছর ধরে আমায় নিয়ে গল্প লিখতে পারিস,আর আমি এটা মনে রাখতে পারব না। তোর বউ কই?

-নেই।

-কেন,বিয়ে করিসনি?

-বিয়ে করতেই হবে এমন কোন কথা আছে। যাকে ভালবাসি না তাকে বিয়ে করে কি হবে।

-কিন্তু আমি তো তোকে ১৭ বছর আগেই ভূলে গিয়েছি তাহলে কেন মনে রেখেছিস আমায়?

-আমিও তো তোকে ১৭ বছর আগেই বলেছি,ভালবাসার জন্ম আছে মৃত্যু নেই। তাই তো গত ১৭ বছর এই বুকে ছিলি। জীবনের বাকিটা সময়ও এই বুকেই থাকবি।

এই আনিকা,এবার উঠ। সেই দুপুর থেকে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস। সকালে যে বললি বই কিনতে নীলক্ষেত যাবি? মায়ের ডাকে চমকে উঠে আনিকা। তাহলে এটা স্বপ্ন ছিল। রাব্বি আজকাল আমাকে স্বপ্নেও ছাড় দিচ্ছে না। একটু বেশিই পাগলামী করে ছেলেটা আমাকে নিয়ে । স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে আনিকা। হয়ত,কোন এক শুভ দিনে বিয়ে হবে রাব্বি আনিকার। হয়ত হবে না। তবে “এক গুচ্ছ স্মৃতি” মনে থেকে যাবে প্রতিক্ষণ।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত