ভালোবাসা বিয়োজন

ভালোবাসা বিয়োজন

ফোনের ক্রিংক্রিং শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম সাদিয়ার কল। এত রাতে কখনো সাদিয়া কল দেয়না। কোন বিপদ হলো না তো? ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রিনরিনে গলায় সাদিয়া বলল-

—- হ্যালো আদ্রিয়ান, ঘুমাচ্ছিলে?
—- হ্যাঁ, এত রাতে তুমি?
—- অনেক বড় বিপদে পড়ে তোমাকে কল দিয়েছি।
—- কি হয়েছে খুলে বলো।
—- আজ ভাবির সিজার করবে।
—- কোন ভাবি?
—- কোন ভাবি মানে? অর্থি ভাবি।
—- ওহ্
—- ইমার্জেন্সি রক্ত লাগবে দুই ব্যাগ। তুমি ছাড়া এখন কেউই নেই যে রক্ত দিবে। তাছাড়া নেগেটিভ রক্ত কতটা রেয়ার সেটা তো জানোই।
—- আচ্ছা আমি আসছি। কোথায় আসবো?
—- নাহিয়ানা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
—- ওকে, বাই।
—- বাই।

দুইব্যাগ রক্ত লাগবে অথচ ডাক্তাররা আমার কাছ থেকে দুইব্যাগ রক্ত নিবে না। বলে আমার নাকি প্রবলেম হবে।এক পর্যায়ে জোড়াজুড়ি করে রক্ত দিলাম দুইব্যাগ। অর্থির কোল আলো করে একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে। ঠিক আমি যেমনটা চেয়েছিলাম। সাদিয়ার সাথে আমার পরিচয় ফেইসবুকে টুকটাক লিখালিখির মাধ্যমে। একদিন জানতে পারি আমরা দু’জনই একই ভার্সিতে, একই সাবজেক্টে, একই ইয়ারে পড়ি। তারপর থেকেই শুরু হলো আমাদের বন্ধুত্ব। বেশ ভালো বন্ধুত্ব।

সাদিয়ার জন্মদিনে সাদিয়া ওর বাসায় দাওয়াত দিয়েছে। আমি গিয়ে দেখি মোটামুটিরকম ভালোই লোকজনের সমাগম। সাদিয়ার কেক কাঁটা হলো।সবাই সবার মুখে কেক মাখিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ কোন এক নারীর স্পর্শে আমি চমকে গেলাম। কত চেনা স্পর্শ। যেন আগেও আমাকে বহুবার ছুয়েছে। পেছন ফিরে তাকাতেই আমি থমকে যাই। এযে অর্থি! আমার অর্থি! আরিয়ানা রহমান অর্থি! আমি একদম স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। নরবার শক্তি পাচ্ছিলাম না আমি। না খেয়েই বাসায় ফিরে এলাম, কাউকে কিছু না জানিয়ে। ক্যান্টিনে বসে সিগারেট ফুঁকছি। পেছন থেকে সাদিয়া আমার মাথায় টোকা দিল। আমি আমলে আনলাম না।

—- কিছু হয়েছে তোমার?
—- নাহ্।
—- তাহলে সেদিন কাউকে না জানিয়ে চলে এলে কেন?
—- এমনি, ভালো লাগছিল না।
—- সত্যি করে বল কি হয়েছিল সেখানে। তুমি কেন এলে? আর তুমি চলে আসার পর অর্থি ভাবি রুমে গিয়ে দরজা আটকিয়ে দিয়েছিল।
—- জানিনা।
—- বলবে না?
—- অন্য একদিন।
—- না, এখনি বলতে হবে।
—- আচ্ছা শোন তাহলে।
—- হুম।

তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটির নাম ছিলো সাদিক। সাদিকের ফুপাতো বোনের বিয়েতে সাদিকের বাসায় কেউ ছিলো না তাই সাদিক আমাকে নিয়ে ওর ফুপাতো বোনের বাসায় যেতে চাইলো। আমি বললাম আমি যাবো না। তখন সাদিক বলে, আমাকে ছাড়া যাবে না। আমি বাধ্য হয়ে বিয়েতে গেলাম দু’দিন আগেই। একে একে অনেক মানুষ আসতে লাগলো। বিয়ের আগেই কত আয়োজন। কোন বিয়ে বাড়িতে যে এত আয়োজন হতে পারে আমি এখানে না আসলে বুঝতাম না। আমি এদিক ওদিক ঘুড়ে ঘুড়ে সব দেখতাম। গায়ে হলুদের দিন আরো অনেক মানুষ আসতে লাগলো। সন্ধ্যায় ফোনে কথা বলার সময় আমার সাথে একজনের ধাক্কা লেগে যায়। পিছন ফিরে তাকাতেই আমি ফিদা হয়ে যাই। এত সুন্দর মানুষ পৃথিবীতে আছে! তাকে নিশ্চয় বিধাতা নিজ হাতে বানিয়েছে। আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মেয়েটি বলল-

—- স্যরি!
—- আরে নাহ্ নাহ্, আমি স্যরি।
—- দু’জনেরই ভুল হয়েছে।
—- হুম, বাই দ্যা ওয়ে, আমি আদ্রিয়ান। ইমদাদুল আদ্রিয়ান।
—- আমি অর্থি।

আরিয়ানা রহমান অর্থি। মেয়েটি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে সামনে দিয়ে চলে গেল। আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। অন্য কোন মেয়ে হলে নির্ঘাত বলত-“চোখ কপালে তুলে হাটেন কেন?” অথচ অর্থি কতটা বিপরীত! বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে আসার আগে অর্থির নাম্বারটা নিয়ে এসেছিলাম। নাম্বার রয়েছে, অথচ কল দিচ্ছি না। কি যেন ভেবে একটা টেক্সট করলাম কিছুটা কবিতার মতো- “তুমি কি আমার মায়াবী কলম হবে? রোজ রাতে তোমায় ছুঁয়ে সুখ-দুঃখের গল্প লিখব। কতগুলো রঙ থাকবে তোমার? কালো-নীল-লাল?

কালো কালিতে সুখের গল্পগুলো লিখব,শুনেছি নীল নাকি বেদনার রঙ, তবে নীল দিয়ে নাহয় কষ্টগুলো লিখলাম। লাল কালিতে থাকুক না ভোলার দিনগুলো? তোমার কালি কোনদিন ফুরোবে না তো? কালি ফুরালে আমি কিভাবে লিখবো বলো? তুমি ছাড়া আর কেউ-ই নেই জীবনে তোমায় ছাড়া ভালোবাসবো কাকে আর স্মৃতিগুচ্ছ সবই রয়ে যাবে মনে মনে বলোনা কলম হবে আমার?” টেক্সট টা করার পর কেমন জানি লাগছিলো। কোন ভুল করলাম না তো? অনেক বড় ভুল। নাহ্, কিছুতেই মনটা ঠিক হচ্ছে না। রিপ্লাই করলো না তো এখনো। তবে কি রাগ করলো? এসব ভাবতে ভাবতে অর্থির কল।

—- হ্যালো…(আমি)
—- হ্যাঁ, কেমন আছো?(অর্থি)
—- ভালো আছি,তুমি? মেসেজ পেয়েছ একটা?
—- ভালোই আছি। হুম, সেইজন্যই তো কল করলাম।
—- কিছু মনে করোনি তো? ইয়ে মানে…
—- আর মানে মানে করতে হবেনা। আমি সব বুঝেছি।
—- কি বুঝেছো?
—- এখন বলবো না।
—- কখন বলবে?
—- কোন একসময়।
—- অপেক্ষায় থাকবো।
—- হুম।
—- ভালো থেকো।
—- তুমিও।
—- বাই
—- হুম, বাই।

অর্থির সাথে এভাবে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হতো। কিভাবে কিভাবে যে আমি অর্থিকে ভালোবেসে ফেলেছি নিজেই জানিনা। নিজের অজান্তেই আমি অর্থিকে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলি। এত ভালোবাসা রাখব কোথায় বল? তুইযে আমার পদ্ম পাতার জল। তোকে ছাড়া বাঁচতে চাইনা আমি, হবি তুই আমার ঘর-গোছানি? আমাদের ভিতরে প্রেমের সম্পর্কের শুরু হয়ে যায়। দু’জন দু’জনকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসি। একদিন দুপুরে অর্থি কল করলো-

—- কেমন আছো?
—- ভালো আছি, তুমি?
—- হুম ভালো। তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।
—- তাই!
—- হুম, দেখা করতে পারবে?
—- কোথায় আসবো?
—- কাল আমাদের এখানে রিনিউ পার্কে আসতে পারবে?
—- হুম বেশ পারবো।
—- আচ্ছা, দেখা হবে।
—- হুম
—- লাভিউ
—- লাভিউ

পার্কে এসে বসে আছি আমি। অর্থি এখনো আসছে না। মনে মনে ভাবছি আজ কি বলবো অর্থিকে। তখনি দেখি আমার সামনে যেন আকাশ থেকে একটা পরী নেমে আসছে। কত সুন্দর লাগছে অর্থিকে! নীল শাড়ি আর কাজল দেয়া চোখে অর্থিকে একদম পরীর মতো লাগছে। আচ্ছা, সবাই বলে যে পরীর মতো লাগে। পরীকে কেউ দেখেছে? আমি অন্য কোন শব্দ খুঁজে পাইনি তাই পরীর সাথে তুলনা করলাম। আমার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ সুন্দরী মেয়েটি এখন আমার পাশে বসে আছে।

—- এইযে মিস্টার, কি দেখছেন এভাবে?
—- তোমাকে।
—- এত দেখার কি আছে!” আগে দেখনি?
—- আমাকে নেশায় ধরেছে।
—- কিসের নেশা?
—- তোমার নেশা!
—- হয়েছে হয়েছে। আর ঢঙ করতে হবেনা।
—- ভালোবাসি খুব।
—- আমিও, তোমাকে ছাড়া অন্য কারো হতে পারবো না আমি।
—- অন্য কারো হতে দিলে তো হবা!
—- কি করবা?
—- বিয়ে করবো।
—- ইশ সখ কত! কি খাওয়াবে?
—- ভালোবাসা। পেট ভরবে তো?
—- খুব…
—- লাভিউ
—- লাভিও।

ইন্টারমিডিয়েট পরিক্ষার শেষে ফ্রি টাইম কাটাতে শুরু করলাম। এতদিনের ব্যস্ততার অবসান ঘটলো। অর্থিকে বেশি বেশি কল করতাম। বেশি সময় দিতে চাইতাম। কিন্তু, অর্থি কোন এক অজানা কারণে আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করে। কল দিয়ে ওয়েটিং পাই। জিজ্ঞেস করলে বলে মামা-চাচা কল দিছিলো। আমি কিছু বলতাম না। মেনে নিতাম। একরাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙে যায়। অর্থিকে নিয়ে দেখা দুঃস্বপ্ন। রাত দু’টায় অর্থিকে কল করলাম। দেখি ওয়েটিং! এতো রাতে কার সাথে কথা বলে অর্থি! টানা দু’ঘন্টায় প্রায় একশ কল দেই। রিসিভ করে না অর্থি। পরে ফোন অফ করে রাখে। আমি সেরাতে ঘুমাই না। পরের দিন অর্থিকে আবার কল দেই।

—- তুমি আমাকে এভাবে ঠকালে কেন?
—- তোমার মত ঠুনকো বিশ্বাসকারীর সাথে আমি থাকতে পারবো না। স্যরি।
—- তোমাকে ভালোবাসতাম আমি। খুব বেশি।
—- তার চেয়ে সন্দেহ বেশি। কোন সন্দেহ কারীর সাথে আমি থাকতে পারবো না।
—- ভালো থেকো।

কথাটা বলার পরেই অর্থি কল কেটে দেয়। আমি কাঁদছিলাম। বাচ্চাদের মতো হাউ-মাউ করে কাঁদছিলাম। কেন অর্থি আমাকে ঠকালো? কি ভুল ছিলো আমার? ভালোবাসায় তো কোন কমতি ছিলো না। তবে কি বেশি ভালোবাসা অন্যায়? অর্থিকে বেহায়ার মতো আবার কল দিয়েছিলাম। আমার নাম্বার ব্লকলিস্টে।

সকল যোগাযোগ মাধ্যম থেকে আমাকে ব্লকড! আমি আর কিছু বলি না। নীরবে চোখের জল বিসর্জন দেই। যে আমাকে নিজ থেকে ছেড়ে চলে গেছে তাকে ফেরানোর ক্ষমতা আমার নেই। অর্থির সাথে দেখা হয়না চার বছর হয়ে গেল। হাসপাতালেই শেষ দেখা হয়েছিলো। আমি আর কোনদিন সাদিয়ার বাসায় যাইনি। অর্থি সুখী আছে। বড্ড বেশি সুখী আছে। আমাকে ভুলে গেলেও তার শরীরে বইছে আমার রক্ত। আমি ভুলতে পারনি অর্থিকে তার দেয়া আকাশ-বাতাস সাক্ষীকে। ভালো থাকুক প্রিয়জন, করে ভালোবাসা বিয়োজন।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত